Advertisement
  • এই মুহূর্তে বি। দে । শ
  • নভেম্বর ১৩, ২০২৫

বাংলাদেশে একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের রূপরেখা ঘোষণা করলেন মুহাম্মদ ইউনূস

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বাংলাদেশে একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের রূপরেখা ঘোষণা করলেন মুহাম্মদ ইউনূস

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বৃহস্পতিবার দুপুরটি ছিল এক ঐতিহাসিক। এই সময় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণা করলেন, আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে যে বিতর্ক চলছিল—গণভোট নির্বাচনের আগে হবে নাকি পরে—সেই প্রশ্নের অবসান ঘটালেন ইউনূস। তাঁর এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে গেল, জনগণ একই দিনে নিজেদের সরকার নির্বাচন করবেন এবং নতুন রাষ্ট্রকাঠামোর বিষয়ে মত দেবেন।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার এদিনের ভাষণটি ছিল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সংবিধান ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার রূপরেখা ঘোষণা করার এক রাজনৈতিক দলিল। তিনি জানান, উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ অনুমোদন করা হয়েছে। এই আদেশের অধীনেই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেছেন, ‘আমরা সব দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, জাতীয় নির্বাচনের দিনেই গণভোট হবে। এতে নির্বাচন আরও উৎসবমুখর ও সাশ্রয়ী হবে এবং সংস্কারের লক্ষ্যও ব্যাহত হবে না।’ এই গণভোটে নাগরিকরা এরকম প্রশ্নে ভোট দেবেনযে, ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?’ এই প্রশ্নের মধ্যে চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একত্রিত থাকবে। প্রথমত, নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় গঠিত হবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে সংসদীয় কাঠামো পরিবর্তন করে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এতে জাতীয় নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। সংবিধান সংশোধনের জন্য এই উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ অনুমোদন বাধ্যতামূলক হবে। তৃতীয়ত, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ ও স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণের মতো ৩০টি বিষয়ে যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নে নির্বাচিত দলগুলো বাধ্য থাকবে। আর চতুর্থত, জুলাই সনদে উল্লিখিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে কার্যকর হবে।

ড. ইউনূস জানান, যদি গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার ‘হ্যাঁ’ দেন, তবে নতুন সংসদই সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। সেই পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে। সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে, যার মেয়াদ নিম্নকক্ষের মেয়াদের সঙ্গে সমান থাকবে। এই উচ্চকক্ষের অনুমোদন ছাড়া ভবিষ্যতে কোনো সাংবিধানিক সংশোধন কার্যকর হবে না। রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের এই বিশদ প্রস্তাব প্রস্তুত করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। ইউনূস জানান, গত নয় মাস ধরে কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা করেছে। এই আলোচনার সব পর্ব দেশবাসী সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে দেখেছে, যা তাঁর মতে ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে তো বটেই, বিশ্বের অনেক দেশের জন্যও নজিরবিহীন ঘটনা।’ কমিশনের প্রস্তাবিত ৩০টি সংস্কার বিষয়ে প্রায় সব রাজনৈতিক দল ঐকমত্যে পৌঁছেছে বলে জানান তিনি। কিছু প্রস্তাবে সামান্য ভিন্নমত থাকলেও নীতি ও লক্ষ্য নিয়ে কোনো দল মৌলিকভাবে দ্বিমত পোষণ করেনি।

অধ্যাপক ইউনূস তাঁর সরকারের গত পনেরো মাসের কর্মকাণ্ডও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের অর্থনীতি গভীর সংকটে ছিল। ‘আমরা অর্থনীতিকে সেই গহ্বর থেকে উদ্ধার করেছি। রপ্তানি, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও রিজার্ভ—সব সূচকেই ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।’ তিনি জানান, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরের বছর বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ ১৯ দশমিক ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বৈশ্বিক প্রবণতার বিপরীতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে বিচার ও জবাবদিহির প্রসঙ্গও। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রায় শেষ পর্যায়ে, গুম ও নিখোঁজের মতো অপরাধের বিচারও চলছে। একই সঙ্গে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন, দুর্নীতি দমন এবং আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা বৃদ্ধির জন্য বেশ কিছু আইন সংস্কার করা হয়েছে।

তবে এই ভাষণ শুধু পরিসংখ্যান ও সংস্কারপ্রস্তাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। শেষাংশে প্রধান উপদেষ্টার কণ্ঠে ধ্বনিত হয় এক গভীর আবেগ। তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যারা প্রাণ দিয়েছেন—১৩৩ শিশু, শত শত তরুণ-তরুণী, নারী-পুরুষের রক্তের বিনিময়ে আমরা এই মুহূর্তে এসে পৌঁছেছি। তাদের আত্মত্যাগ যেন দলীয় স্বার্থে ম্লান না হয়। আমরা যেন বিভেদ ভুলে ঐক্যের পথে হাঁটি।’ বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেখানে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য দলের মধ্যে গণভোটের সময়সূচি নিয়ে তীব্র মতভেদ দেখা দিয়েছিল, সেখানে ইউনূসের এই ঘোষণা কার্যত মধ্যপন্থা হিসেবে ধরা হচ্ছে। একদিকে নির্বাচনের আগে গণভোট চাওয়া জামায়াতের প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন, অন্যদিকে নির্বাচনের আগে কোনো গণভোট নয়—এই দাবিতে অনড় বিএনপির অবস্থানকেও পুরোপুরি উপেক্ষা করেননি। তাই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন দিক নির্দেশ করবে। ইউনূসের ভাষণে ছিল আশার সুর—‘আমরা নতুন বাংলাদেশের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছি। দীর্ঘ দেড় যুগ পর জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেতে চলেছেন। ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও গণভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রবেশ করবে একটি নতুন গণতান্ত্রিক যুগে।’ বাংলাদেশ এখন অপেক্ষায় ফেব্রুয়ারির সেই দিনে, যেদিন একসঙ্গে নির্ধারিত হবে সরকার ও সংবিধান—ক্ষমতার কেন্দ্র এবং কাঠামো দুয়েরই ভবিষ্যৎ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!