- বি। দে । শ
- এপ্রিল ৩, ২০২৬
মায়ানমারে প্রেসিডেন্ট পদে সেনপ্রধান মিন অং হ্লাইং। গৃহযুদ্ধ ও মানবিক সংকটের মধ্যেই ‘সামরিক শাসন’-এর নতুন অধ্যায় শুরু
আরও একবার ইতিহাসের মোড় ঘুরল মায়ানমারে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশকে কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণে চালানো জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং এবার আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত হলেন। সামরিক-প্রভাবিত সংসদের ভোটাভুটিতে তিনি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নির্বাচিত হন, যার মধ্য দিয়ে ৫ বছর আগে ক্ষমতা দখলের পর, তাঁর হাতেই রাষ্ট্রক্ষমতার এক নতুন সাংবিধানিক আবরণ তৈরি হলো বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
শুক্রবার, ৩ এপ্রিল, সংসদের ৫৮৪ জন সদস্যের মধ্যে ৪২৯ জন ভোট দেন মিন অং হ্লাইং-এর পক্ষে। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ও বর্তমান জান্তা-সমর্থিত প্রধানমন্ত্রী নিয়ো সাও পান মাত্র ১২৬ ভোট। তবে, এ ফলাফল কার্যত আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক মহল। কারণ, মায়ানমারের সংসদের বৃহৎ অংশই এই মুহূর্তে সেনা-নিয়ন্ত্রিত বা সেনা-সমর্থিত রাজনৈতিক শক্তির অধীনে।
২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত অং সান সু চির সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন মিন অং হ্লাইং। সে সময় থেকেই মায়ানমারের রাজনৈতিক ক্ষমতার লাগাম তাঁর হাতেই ছিল। তবে এবার প্রেসিডেন্ট পদে তাঁর অভিষেক সে ক্ষমতাকে আরও আনুষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক রূপ দিল। ২০১১ সাল থেকে মায়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী টাটমাডোর সর্বোচ্চ পদ কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন মিন অং হ্লাইং। ওই সময় থেকেই সেনাবাহিনীর ভেতরে তাঁর নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব ক্রমশ বিস্তৃত হয়। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সেনা অভিযানের সময় তাঁর নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও ওঠে।
২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে তাঁর শাসনামলে দেশজুড়ে গণবিক্ষোভ শুরু হয়, যা দ্রুতই সশস্ত্র বিদ্রোহে রূপ নেয়। বর্তমানে মায়ানমারের বড়ো অংশই নিয়ন্ত্রণ করছে বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও পিপলস ডিফেন্স ফোর্স। ফলে দেশ কার্যত দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের আগুনে জ্বলছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই তিনি সেনাপ্রধান পদ ছেড়ে দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বেসামরিক রাষ্ট্রপতির ভূমিকায় প্রবেশ করলেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ অনুগত ইয়ি উইন ও-কে সেনাবাহিনীর নতুন প্রধান হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে, যা ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ ধারাবাহিকতা বজায় রাখারই কৌশল বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে সেনা-সমর্থিত ‘ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি’ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, সংসদের প্রায় ৮০ শতাংশ আসন দখল করে তারা। দেশটির উল্লেখযোগ্য বিরোধী দলগুলো অংশ নিতে পারেনি। সু চির দল বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে এবং অন্য প্রধান প্রধান বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ নেয়নি।
ওই নির্বাচনকে তাই আন্তর্জাতিক মহল ও পশ্চিমা দেশগুলো ‘প্রহসনমূলক’ বলে অভিহিত করেছে। ফলে মিন অং হ্লাইং-এর প্রেসিডেন্ট পদে আরোহনকে অনেকে গণতান্ত্রিক বৈধতার চেয়ে ক্ষমতার আনুষ্ঠানিকীকরণ হিসেবেই দেখছেন। চিন, রাশিয়া এবং ভারতের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলো সরাসরি কোনো কঠোর অবস্থান না নিয়ে। নীরব কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছে। তাদের অগ্রাধিকার হিসেবে উঠে এসেছে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা। ফলে পশ্চিমা বিশ্বের সমালোচনা সত্ত্বেও মায়ানমারের জান্তা প্রশাসন আন্তর্জাতিকভাবে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি। বেইজিং ইতিমধ্যেই নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়ে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
তবে ওয়াকিবহাল মহলের মতে, সেনাপ্রধানের রাষ্ট্রপতি পদে অভিষেকের রাজনৈতিক মুহূর্তের আড়ালে মায়ানমারের বাস্তব চিত্র অন্ধকার। গত পাঁচ বছরে প্রায় ৩৬ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ ভূখণ্ড এখন সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে বলে দাবি বিভিন্ন প্রতিরোধ গোষ্ঠীর। রোহিঙ্গা সংকট আরও জটিল হয়েছে। এখনো প্রায় ৬ লক্ষ রোহিঙ্গা দেশের ভেতরে নিত্য নিপীড়নের মধ্যে বসবাস করছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ আটক শিবিরে বন্দি। অন্যদিকে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় ১০ লক্ষের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত মিন অং হ্লাইং-এর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা নিপীড়নের অভিযোগে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন জানায়, যা তাঁর আন্তর্জাতিক অবস্থানকে আরও বিতর্কিত করে তোলে।
অন্যদিকে, মায়ানমারে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বিরোধী শক্তিগুলোও নতুনভাবে সংগঠিত হচ্ছে। অং সান সু চির দলের অবশিষ্টাংশ, জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং বিভিন্ন প্রতিরোধ সংগঠন মিলে নতুন একটি জোট গঠন করেছে, যার লক্ষ্য এককভাবে সামরিক শাসন ভেঙে একটি ফেডারেল গণতান্ত্রিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। তবে এই প্রতিরোধ আন্দোলন ক্রমশ কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলেই আশঙ্কা। সামরিক বাহিনীর পুনর্গঠিত নেতৃত্ব, আন্তর্জাতিক সমীকরণ এবং অভ্যন্তরীণ বিভাজন, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, মিন অং হ্লাইং বহুদিন ধরেই রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করছিলেন। কমান্ডার-ইন-চিফ থেকে প্রেসিডেন্ট, এ যাত্রা তাই কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং দীর্ঘদিনের ক্ষমতা-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক পরিকল্পনারই পরিণতি। ফলে, এটি গণতন্ত্রের দিকে কোনো অগ্রগতি নয়, বরং আরও কঠোর সামরিক শাসনের সূত্রপাত।
❤ Support Us







