- এই মুহূর্তে স | হ | জ | পা | ঠ
- অক্টোবর ১৬, ২০২৫
সক্রিয়, সুস্থ মস্তিস্কের দাওয়াই – দিনে অন্তত ১০ মিনিট পড়ুন বই । পরামর্শ স্নায়ু বিজ্ঞানীদের
অক্টোবরে বিশ্বের সাহিত্যপ্রেমীদের চোখ থাকে স্টকহোমের দিকে। এ সময়েই প্রতিবার ঘোষিত হয় সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার। আর সে উপলক্ষে নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে বই পড়া ও পাঠাভ্যাসের গুরুত্ব। কিন্তু প্রযুক্তির চাপে, স্মার্টফোনের ঠেলায়, সোশ্যাল মিডিয়ার মোহে হারিয়ে যাচ্ছে বইয়ের পাতার ঘ্রাণ, হারিয়ে যাচ্ছে মন দিয়ে পড়ার অভ্যাস। অথচ, বিজ্ঞান বলছে, বই পড়া মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্য ভীষণ প্রয়োজন।
সম্প্রতি, ফ্রান্সের খ্যাতনামা স্নায়ুবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানী গ্রেগোয়ার বোর্স্ত এক সাক্ষাৎকারে জানালেন, ‘বই পড়া মানেই মস্তিষ্কের ব্যায়াম। যা শুধু স্মৃতি বা মনোযোগই বাড়ায় না, মস্তিষ্কের গঠনই পাল্টে দেয়, তাকে সুস্থ-সক্রিয় রাখে।’ প্যারিস ডেসকার্তেস বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপকের বক্তব্য, প্রতিদিন মাত্র ১০ মিনিট পড়ার অভ্যাস আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। বোর্স্তের বলেছেন, ‘যে বইই পড়ুন না কেন—তা হোক উপন্যাস হোক বা জীবনী— পাঠাভ্যাস থাকলে তৈরি হয় নতুন স্নায়ুপথ।’ যেমন, ‘ফিকশন’ পড়লে মানুষ শেখে সহানুভূতি, অন্যের মানসিক অবস্থান অনুধাবনের ক্ষমতা বাড়ে, যাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘থিয়োরি অব মাইন্ড’। একা বসে পড়ার মধ্যে দিয়েই তৈরি হয় অন্যকে বোঝার প্রবণতা। আর নন-ফিকশন পাঠ ? বোর্স্ত বলেছেন, ‘সেখানে সক্রিয় হয় বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা, তথ্য যাচাই করার ক্ষমতা।’ আর এই বিশ্লেষণই তৈরি করে বাস্তবজ্ঞান।
স্মার্টফোনে চোখ রেখে হেডলাইন স্ক্রল করলে কি মস্তিষ্ক সচল হয় ? বোর্স্ত স্পষ্ট বলছেন, না। তাঁর মত, ‘বই পড়ার সময় পাঠক কল্পনায় তৈরি করেন চরিত্র, দৃশ্যপট, সংলাপ। এটা একধরনের মানসিক অনুশীলন, যা বাস্তব জীবনেও কাজে লাগে। কারণ তখনো তো আমরা অন্যের মানসিক অবস্থান বোঝার চেষ্টা করি।’ এই কল্পনা ও অনুভূতির অনুশীলন মস্তিষ্কে শক্তিশালী করে কল্পনাপ্রবণতা, অনুভূতি রক্ষা ও আবেগের স্নায়ুপথ। অথচ, স্ক্রিনভিত্তিক তথ্য গ্রহণে এই প্রক্রিয়াগুলি হয় অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। বয়স বাড়লে অনেকেই ভোগেন ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশে। এ ব্যাধি প্রতিরোধেও বই পড়া কার্যকর। বোর্স্ত জানাচ্ছেন, ‘যে কোনো মস্তিষ্ক-সক্রিয় কাজই ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে পারে। কিন্তু বই পড়া একটু বেশি কার্যকর। কারণ এতে একসঙ্গে মনোযোগ, ভাষা, যুক্তি ও স্মৃতি সক্রিয় থাকে।’ তিনি আরো বলেন, ‘মোটা বই পড়তে গেলে পাঠককে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তথ্য মনে রাখতে হয়, সংযোগ তৈরি করতে হয়। এই প্রক্রিয়া মনে রাখার ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। আর এই ‘ওয়ার্কিং মেমোরি’ই জীবনের সবক্ষেত্রে সাফল্যের পূর্বশর্ত।
কিন্তু বর্তমান যুগ সংক্ষিপ্তের। কয়েক সেকেন্ডেই ক্লান্ত মন। প্রশ্ন জাগে, কতটা পড়লে মস্তিষ্ক উপকৃত হবে? বোর্স্তের উত্তর, ‘একটুখানি পড়াও অনেক উপকারী। প্রতিদিন মাত্র ১০ মিনিট। কিন্তু তা যেন হয় মনোযোগী, কল্পনাশক্তি উদ্বুদ্ধকারী পাঠ। মেসেজ পড়া নয়!’ শিশুরা বারবার একই গল্প শুনতে চায়, বিরক্ত হয়ে অনেকেই বলেন, ‘আবার সেই গল্প?’ কিন্তু বোর্স্ত জানাচ্ছেন, এটাই তাদের মস্তিষ্কের প্রশিক্ষণ। শোনা গল্প শিশুদের শব্দভাণ্ডার তৈরি করে, যা ভবিষ্যতের পড়ার ভিত্তি। একই গল্প শোনার পুনরাবৃত্তি শেখায় ভাষার গঠন, সংযোজন ও অনুমানের কৌশল।
স্মার্টফোনের যুগে ই-বুকের চাহিদা বাড়ছে। ডিজিটাল স্ক্রিনে পড়া কি কাগজের বইয়ের মতোই? বোর্স্তের স্পষ্ট উত্তর— ‘না। কারণ, কাগজের বইয়ে যে ধারণা তৈরি হয়, যেমন আপনি বইয়ের কোথায় আছেন, পাতার কোন প্রান্তে কী লেখা, তা স্মৃতিতে সহায়ক। স্ক্রিনে সে সুবিধা নেই। সব কিছু একরকম দেখতে লাগে, ফলে তথ্য ধরে রাখা কঠিন।’ শেষে স্নায়ুবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানী গ্রেগোয়ার বোর্স্ত মনে করিয়ে দেন, ‘আমরা তো প্রতিদিনই কিছু না কিছু পড়ি, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, ইমেল। কিন্তু সেগুলি নয়, প্রকৃত পাঠ হতে হবে বইয়ের পাতা জুড়ে।’ আর সে অভ্যাসই হতে পারে আজীবনের সঙ্গী— স্নায়ু সুস্থ রাখার নির্ভরযোগ্য উপায়। সুতরাং আপনার হাতে এখন যে বইটি আছে, তা শুধু গল্প নয়। সেটিই আপনার মস্তিষ্কের নির্মাতা। তাই, স্ক্রল নয়, একটু বই পড়ুন… আপনার মস্তিষ্ক কৃতজ্ঞ থাকবে।
❤ Support Us






