Advertisement
  • খাস-কলম প্রচ্ছদ রচনা
  • জুন ২২, ২০২৩

লক্ষ্য এক, মতাদর্শ আলাদা।কতটা সফল হবে পাটনার বিরোধী বৈঠক ?

শিবপ্রিয় দাশগুপ্ত
লক্ষ্য এক, মতাদর্শ আলাদা।কতটা সফল হবে পাটনার বিরোধী বৈঠক ?

ফাইল চিত্র

২০২৪ এর লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে আগামী কাল, ২৩ জুন, বিজেপি বিরোধী জোটের প্রথম বৈঠক হতে চলেছে পাটনায়। ভারতীয় রাজনীতিতে সব সময় দেখা গেছে মুখ ঠিক না করে কেন্দ্র বিরোধী জোট যতবার হয়েছে ততবারই সেই জোট পূর্ণতা পায়নি। তবে এবারের জোটের মুখ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এটা তৃণমূল যেমন দাবি করছে তেমন কংগ্রেস ছাড়া অন্য অবিজেপি দলগুলোও দাবি করছে। তবে কংগ্রেস নেতা কমলনাথ ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছেন ২০২৪ এর প্রধানমন্ত্রীর মুখ হলেন রাহুল গান্ধি। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন যদি দেখতে হয় তাহলে দেখা যাচ্ছে ২০২৪ এর জোটের মুখ হলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই অবস্থায় আগামীকাল শুক্রবার পাটনায় হতে চলেছে বিজেপি বিরোধী মহাজোটের মহা সম্মেলন, যেখানে হাজির থাকছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, রাহুল গান্ধি, নীতিশ কুমার, শরদ পাওয়ারের মতো নেতৃত্ব।

ভারতে জোট রাজনীতির ইহিহাস খুব মজবুত নয়। অন্যদিকে সারা দেশের এখন রাজনৈতিক দলগুলির যা অবস্থা তাতে একক ভাবে কোনও দলের ভারতে শাসন ক্ষমতায় থাকার অবস্থা নেই। তাই এই পরিস্থতিতে জোট সময়ের দাবি।

ভারতে সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে একটি রাজনৈতিক জোট গঠিত হয়েছিল। তৎকালীন ভারতের ক্ষমতাসীন দল ইন্দিরা গান্ধির নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসকে ঠেকানোর পরিকল্পনা থেকেই সেই জোট গঠিত হয়েছিল।

১৯৭৫ সালের জুন মাসে ইন্দিরা গান্ধির সরকার কর্তৃক ভারতে জরুরি অবস্থা জারি করে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের প্রতিবাদেই বিরোধী রাজনৈতিক জোট গড়ে উঠেছিল। মূলত চারটি রাজনৈতিক দল মিলে সেই জোট গঠিত হয়েছিল। দলগুলো হল ইন্দিরা মন্ত্রিসভার সদস্য জগজীবন রামের নেতৃত্বে বেরিয়ে আসা কংগ্রেসের একটি অংশ, ভারতীয় জনসংঘ, ভারতীয় লোকদল এবং সমাজতান্ত্রিক পার্টি। জোটটির নাম দেওয়া হয়েছিল জনতা পার্টি। এ জোট গঠনের নেতৃত্বে ছিলেন জয়প্রকাশ নারায়ণ, বিজু পটনায়েক, রাজনারায়ণ, সত্যেন্দ্র নারায়ণ সিনহা, জেবুতি রাম কৃপালিনী ও মোরারজি দেশাই। ১৯৭৭ সালের ১৬ থেকে ১৯ মার্চ সময়কাল ধরে ভারতে অনুষ্ঠিত লোকসভা নির্বাচনে জনতা পাটি (জেএনপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। ইন্দিরা গান্ধি ও তাঁর পুত্র সঞ্জয় গান্ধি উভয়েই পরাজিত হন সেই লোকসভা নির্বাচনে। মোরারজি দেশাই হন ভারতের চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী। তবে সেই সরকারও পাঁচ বছরের মেয়াদপূর্ণ করতে পারেনি। শরিকদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধ, কোন্দল, সরকার পরিচালনায় মোরারজি দেশাইয়ের ব্যর্থতা ইত্যাদি কারণে দুই বছরের মধ্যেই সেই সরকারের পতন ঘটে। এর পরের নির্বাচনেই আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন ইন্দিরা গান্ধী। এর আগে অবশ্য ৬০ এর দশকে পঞ্জাবের অকালি দল, কমিউনিস্টরা মিলে জোট গড়েছিল।

১৯৯৬-১৯৯৮ সাল হচ্ছে ভারতে যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের অস্থিরতার যুগ। এই সময় একাধিক স্বল্পসময়ের জোট কেন্দ্রে সরকার গঠন করে। ১৯৯৬ সালে সংক্ষিপ্ত সময়কালের জন্য বিজেপি সরকার গঠন করে। তারপর কংগ্রেস ও বিজেপি বিরোধী যুক্তফ্রন্ট দেশের ক্ষমতায় আসে। ১৯৯৮ সালে বিজেপির নেতৃত্বে ন্যাশানাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স বা এনডিএ ক্ষমতা দখল করে। এই সরকারই ভারতের প্রথম পূর্ণ সময়কালের অকংগ্রেসি সরকার। ২০০৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স বা ইউপিএ লোকসভায় বিপুল সংখ্যক আসনে জয়লাভ করে এবং বিজেপি-বিরোধী বাম সাংসদদের সহায়তায় সরকার গঠন করে। ইউপিএ ২০০৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে পুনরায় ক্ষমতায় আসে। অবশ্য, জোটের মধ্যে বামপন্থী পার্টির প্রতিনিধিত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভাবে তখন কম ছিল। এর পর ২০০৯ এর ইউপিএ সরকারকে ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে পরাজিত করে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে দেশে এনডিএ সরকার গঠন হয়, যারা এখনও ভারতের শাসন ক্ষমতায় আছে। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন এই এনডিএ সরকারের বিরুদ্ধেই এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মুখ করে ২০২৪ এর লোকসভা নির্বাচনের আগে বৃহত্তর জোট গঠিত হতে চলেছে। এই জোটে কংগ্রেস,বাম,তৃণমূল,এনসিপি,আপ সহ দেশের সব বিজেপি বিরোধী দল থাকছে।

প্রসঙ্গত ১৯৯৬ সালের একটি ঘটনা মনে পড়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী কে হবেন এই নিয়ে তখন খুব আলোচনা চলছে যুক্তফ্রন্টে। প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য জ্যোতি বসুর নাম প্রস্তাব করলেন নেতাজি অর্থাৎ মুলায়ম সিং যাদব। আমি আর নেতাজির নির্দেশে বঙ্গভবনে গিয়ে জ্যোতি বসুর সঙ্গে দেখা রাজ্যের তৎকালীন বামফ্রন্ট মন্ত্রিসভার শরিকদলের মন্ত্রী কিরণময় নন্দ। হরকিষণ সিং সুরজিতের সঙ্গেও এই নিয়ে কথা তাঁর। সুরজিৎ তখন সিপিআইএম-এর সাধারণ সম্পাদক। কিরণময় নন্দ তাঁকে বলেম, আমরা চাই, জ্যোতি বসু প্রধানমন্ত্রী হোন। জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী করতে সকলেই সহমত হলেন।

জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী করতে চেয়ে সেই সময় সকলেই সহমত হয়েছিলেন। এই উদ্যোগে বড় ভূমিকা ছিল মুলায়ম সিং যাদবের। তবে তখন জ্যোতি বসুর প্রধানমন্ত্রী হওয়া হল না। সিপিআইএম পার্টি জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী হতে দিল না। দলের এই সিদ্ধান্তকে “ঐতিহাসিক ভুল” বলে মন্তব্য করলেন জ্যোতি বসু। তখন জ্যোতি বসু মুলায়ম সিংকে যাদবকে প্রধানমন্ত্রী করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে তখন বলেন কিরণময় নন্দ। এরপর মুলায়ম সিং যাদবকে প্রধানমন্ত্রী করার জন্য সকলের সঙ্গে কথা হল। সকলে রাজিও হয়ে গেলেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তও শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়।

আমরা ২০১৯ সালেও সেই বিজেপিকে হারাতে বিরোধী জোটের প্রস্তুতি, তৎপরতা দেখেছি কিন্তু সেই জোট বাস্তবায়িত হয়নি। অনেকে বলোন, ২০১৯নএর জোটের কোনও মুখ ছিল না, তাই জোট টেকেনি। এখন প্রশ্ন, ২০২৪-এ হবে কি? ৫৪৩টি লোকসভা আসনে সত্যিই কি ‘একের বিরুদ্ধে এক’ প্রার্থী বিজেপির বিরুদ্ধে প্রস্তাবিত জোট দিতে পারবে?

এই প্রশ্নের উত্তর পেতেই শুক্রবার পাটনায় বসছে ২০২৪ এর লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজেপি বিরোধী জোটের বৈঠক। তবে এই বৈঠক থেকে একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত বার হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক মহল, কারণ এবারের জোটে একটি মুখকে সামনে রেখে এগোবার চেষ্টা চলছে, আর সেই মুখটি হলেন এই মুহূর্তে দেশের মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বিজেপি বিরোধী মুখ – মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

ভারতে জোট রাজনীতিকে সহানুভূতির রাজনীতি বার বার পরাজিত করেছে, এই ঘটনাও আমাদের নজরে এসেছে।

১৯৮৪ সালে লোকসভা ভোটে এই সহানুভূতি কাজ করেছিল বলে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর দেহরক্ষীর গুলিতে প্রাণ হারান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি। তার পর দেশজুড়ে এমন সহানুভূতির হাওয়া ওঠে যে, পরবর্তী লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ৫১৬টি লোকসভা আসনের ভেতর একক ভাবেই ৪০৪টি আসনে জয়ী হয়। তবে এর পর ১৯৮৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের আসন সংখ্যা এক ধাক্কায় ১৯৭ তে নেমে আসে। এই ঘটনাই প্রমাণ করে ১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস সহানুভূতি ভোটেই লোকসভায় ৪০৪টি আসন পেয়েছিল।

১৯৮৯ সালের লোকসভা ভোটে কংগ্রেসের প্রাপ্ত আসন নেমে আসে এক ধাক্কা ১৯৭ আসনে। এই নির্বাচনে জনতা দল পায় ১৪৩টি আসন, বিজেপি পায় ৮৫ ও বামপন্থীরা পায় ৩৩টি আসন। ১৯৮৯ সালে জনতা দল,বিজেপি,বাম, সবার প্রতিপক্ষ ছিলেন কংগ্রেস নেতা রাজীব গান্ধি। এই সম্মিলিত শক্তি রাজীব গান্ধিকে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অপসারিত করে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং দেশের প্রধানমন্ত্রী হন। আমরা দেখেছি গত ২০১৯ সালে পুলওয়ামা সহানুভূতির হাওয়া কাজে লাগিয়ে ৩০৩ টি আসন পেয়ে দেশে সরকার গঠন করে বিজেপি। তাই ২০২৪-এ লোকসভা নির্বাচনের আগে স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন উঠছে এবার কি ১৯৮৯-র লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের মতো অবস্থা হবে বিজেপির? প্রশ্ন হচ্ছে এটা তখনই সম্ভব হবে যখন সব বিরোধী দল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফর্মুলা মেনে “একের বিরুদ্ধে এক প্রার্থী’’ দেওয়া নিশ্চিত করতে পারবে।

এই মুহূর্তে জাতীয় রাজনীতির যা অবস্থা তাতে নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর দল বিজেপি দেশের রাজনীতিতে এতটাই ক্ষমতাশালী ও প্রভাবশালী যে, কোনও একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে একক শক্তিতে বিজেপিকে পরাজিত করা সম্ভব নয়। ১৯৮৯ সালে কিন্তু রাজীব গান্ধির বিরুদ্ধে দেশের সব রাজনৈতিক দল এক হয়েছিল। গো-বলয়ে তখন জনতা দল ও বিজেপির সরাসরি জোট হয়। তাতে শামিল হয়েছিল অন্ধ্রপ্রদেশের তেলুগু দেশম নেতা এন. টি. রামা রাও, তামিলনাড়ুর করুণানিধি, অসমের অসম গণ পরিষদ। কমিউনিস্ট, সোশালিস্টরাও সেই জোটে ছিল। ২ জুলাই শহিদ মিনারে জ্যোতি বসুকে মধ্যমণি করে মঞ্চ আলো করে বসেছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী, বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংয়। সেই জোট ভারতের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় জোট। কারণ এই জেটে রাজীব গান্ধিকে পরাজিত করতে নীতিনৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে বিজেপির হাত ধরেছিল কমিউনিস্টরা। তবে মানুষ সমর্থন দিয়েছিল এই জোটে।

এর পর লোকসভা নির্বাচনে দেশে আবার সহানুভূতির হাওয়া উঠেছিল ১৯৯১ সালের লোকসভা নির্বাচনে। ভোটপর্বের মধ্যে শ্রীপেরামপুদুরে রাজীব গান্ধি আততায়ীর হাতে নিহত হন। রাজীব গান্ধি হত্যার পর ভোটের ফল প্রকাশ পায়। কংগ্রেস সেবার সরকার গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় আসনের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।

রাজীব গান্ধি হত্যার সহানুভূতিকে কাজে লাগিয়ে ওই লোকসভা নির্বাচন হয়েছিল, কংগ্রেসের বিপুল জয় পেয়েছিল। তখন পি ভি নরসিমা রাও প্রধানমন্ত্রী হলেন।

২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের আগে যেটা সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তা হল, বিরোধীরা কি এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মুখ করে বিজেপি বিরোধী সার্বিক ঐক্য গড়তে পারবে? লোকসভার ৫৪৩ টি আসনে কী মমতার ফর্মুলা “একের বিরুদ্ধে এক” দেওয়া যাবে? নাকি এই ফর্মুলাই আবারও থমকে দেবে মমতা-রাহুল-ইয়েচুরি-পাওয়া-নীতিশের বিজেপি বিরোধী মহা জোট। লক্ষনীয় বিষয় হল এই জোট হতে চলেছে বিজেপির বিরুদ্ধে, যাতে হাত ধরতে চলেছেন মমতা-রাহুল-ইয়েচুরি। ঠিক যেভাবে একদিন কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ১৯৮৯ সালের ২ জুলাই হাত ধরেছিলেন জ্যোতি বসু, এল কে আদবানি, বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংরা।

তবে এবার রাহুল গান্ধি মার্কিন মুলুকে থাকাকালীন ২০২৪ এর এই বিজেপি বিরোধী জোট সম্পর্কে আশাপ্রকাশ করে বলেছেন, “জোট সঠিক পথে এগোচ্ছে, আমাদের সবার মধ্যে সমন্বয় রয়েছে।” তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, “সময়মতো বিরোধী জোট টর্নেডোর রূপ নেবে।” এই জোটের বৈঠক হচ্ছে জয়প্রকাশ নারায়ণের বিহারে, বাকিটা বলবে সময়।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!