Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • আগস্ট ২, ২০২৫

শুরু ‘আমাদের পাড়া, আমাদের সমাধান’ প্রকল্প। রাজ্যজুড়ে প্রথম দিনেই ৬৩২টি শিবির

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
শুরু ‘আমাদের পাড়া, আমাদের সমাধান’ প্রকল্প। রাজ্যজুড়ে প্রথম দিনেই ৬৩২টি শিবির

রাস্তার ধারে নষ্ট হয়ে পড়ে থাকা নলকূপ, স্কুলে বছরের পর বছর রং না লাগা দেওয়াল, অঙ্গনওয়াড়ির ছাদ দিয়ে বর্ষায় জল পড়া, কিংবা বাজার চত্বরের অন্ধকারে আলোর হাহাকার, এমন অসংখ্য ছোটখাটো অথচ জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার অভিযোগ জমা পড়ে প্রতিদিন। অথচ এসব নিত্যকার ঝক্কি নিয়ে প্রশাসনের দোরে গিয়ে দাঁড়ানোর সময় বা সামর্থ্য অনেকেরই থাকে না। সেই সমস্যারই সমাধান করতে এ বার প্রশাসন পৌঁছল নাগরিকের দোরগোড়ায়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘোষণা অনুযায়ী, শনিবার থেকে রাজ্যজুড়ে শুরু হল ‘আমাদের পাড়া, আমাদের সমাধান’ প্রকল্প।

নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে এবার সরাসরি মানুষের কথা শোনা হবে তাঁদের নিজ নিজ পাড়ায় আয়োজিত শিবিরগুলিতে। নবান্ন সূত্রে খবর, প্রথম দিনেই রাজ্যের ৬৩২টি স্থানে একযোগে চালু হয়েছে এই বিশেষ শিবির, কর্মসূচি চলবে চলতি বছরের ৩ নভেম্বর পর্যন্ত। প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য, স্থানীয় স্তরে ছোটখাটো সমস্যাগুলিকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত সমাধান করা এবং একইসঙ্গে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরকারের নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলা। প্রথম পর্যায়ে রাজ্যের প্রায় ৮০ হাজার বুথকে ভিত্তি করে ৩টি করে বুথ মিলিয়ে একটি শিবির গঠন করা হচ্ছে। সে হিসেবে রাজ্য জুড়ে আয়োজিত হতে চলেছে প্রায় ২৭ হাজারেরও বেশি শিবির। প্রতিটি বুথের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ১০ লক্ষ টাকা করে। ফলে প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাস, আগামী জানুয়ারির মধ্যেই জমা পড়া সমস্যাগুলির বড়ো অংশের নিষ্পত্তি করা যাবে এই প্রকল্পের মাধ্যমে।

নবান্ন থেকে জেলাগুলিতে পাঠানো নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছে, এ প্রকল্পের আওতায় মোট ১৬টি পরিষেবা সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে পাড়া, গ্রাম বা শহরের রাস্তা সংস্কার, পানীয় জলের টিউবওয়েল বসানো কিংবা পাইপলাইনের মাধ্যমে জলের সংযোগ পৌঁছে দেওয়া, ফুটপাথে আলো বসানো, এলইডি বা সোলার আলো, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাদ বা শৌচালয় সংস্কার, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের নিরাপত্তা, জল ও খেলার মাঠের পরিকাঠামো উন্নয়ন, বাজারে নিকাশি বা আলোর বন্দোবস্ত, বাসস্টপ বা রিকশা স্ট্যান্ড গড়ে তোলা, বিদ্যুৎ খুঁটি সংস্কার থেকে শুরু করে পুকুর খনন বা ঘাট বাঁধানোর কাজ পর্যন্ত একাধিক বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি রয়েছে বর্জ্য অপসারণ, উন্মুক্ত পার্কে বেঞ্চ বসানো, পথচারীদের জন্য ফুটপাত তৈরি, কমিউনিটি সেন্টার সংস্কার ও জরুরি ভিত্তিতে অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও।

কী ভাবে এই পরিষেবা মিলবে? শিবিরে গিয়ে নিজের সমস্যার কথা জানাতে হবে লিখিতভাবে। সঙ্গে আনতে হবে ভোটার কার্ড এবং ঠিকানা, বুথ নম্বর, ওয়ার্ড নম্বর, ফোন নম্বরের মতো প্রাথমিক তথ্য। শিবিরগুলিতে থাকবেন সংশ্লিষ্ট পঞ্চায়েতের সদস্য, প্রধান, পঞ্চায়েত সমিতির প্রতিনিধি, বিডিও, জয়েন্ট বিডিও সহ জেলা পরিষদের সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক। তাঁদের সঙ্গে থাকবেন নানান সরকারি দফতরের আধিকারিকরা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যাঁরা শিবিরে আসবেন, তাঁদের সমস্যা সরাসরি শোনা হবে। এরপর প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিদর্শন করে সমস্যা যাচাই করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমস্যাগুলির দ্রুত সমাধান করা হবে। আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যেই জমা পড়া সব সমস্যার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে।

শনিবার, কলকাতাতেও একাধিক ওয়ার্ডে শুরু হয়েছে এই প্রকল্পের শিবির। ভবানীপুরের গুজরাটি এডুকেশন কলেজ, উল্টোডাঙা মার্কেট, লাহা কলোনি ও রিফিউজি হোম-সহ চারটি জায়গায় শনিবার সকাল থেকেই সাধারণ মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকেই তাঁদের এলাকার রাস্তাঘাট, আলো কিংবা জলের সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন প্রশাসনের কাছে। শিবিরে উপস্থিত কর্মীরা জানিয়েছেন, আবেদন করতে গেলে ভোটার কার্ড ও সমস্যার লিখিত বিবরণ সঙ্গে রাখতে হবে। প্রতিটি সমস্যার তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হবে। এরপর অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমেই প্রকল্প বাছাই ও বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে।

তবে রাজ্য সরকারের এ প্রকল্প ঘিরে রাজনৈতিক মহলে চলছে নানান জল্পনা। বিরোধীরা বলছেন, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্য সরকার ‘বুথভিত্তিক জনসংযোগ’ গড়ে তোলার জন্যই এই কর্মসূচি নিচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, সরকারি অর্থ ব্যয় করে, উন্নয়নের মোড়কে রাজনৈতিক সংগঠনকে চাঙ্গা করতে চাইছেন তৃণমূল। যদিও রাজ্য প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, ‘আমাদের পাড়া, আমাদের সমাধান’ প্রকল্পের সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং কেন্দ্র সরকার ১০০ দিনের কাজ সহ একাধিক প্রকল্পের অর্থ আটকে রাখায় বহু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, ওই ঘাটতি পুষিয়ে দিতেই রাজ্য সরকার বিকল্প কর্মসূচি চালু করেছে। প্রশাসনের স্পষ্ট বার্তা, মানুষের দরজায় পৌঁছে তাঁদের সমস্যা শুনে, স্বচ্ছতা বজায় রেখে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নই এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। তবে সরকার যাই বলুক না কেন, এ প্রকল্পের মাধ্যমে একদিকে যেমন নাগরিক পরিষেবা সহজ হবে, প্রশাসনিক দক্ষতা ও মানুষের আস্থা যেমন বাড়বে, পাশাপাশি আগামী নির্বাচনে লাভের মুখ দেখবে তৃণমূল তা বলাই বাহুল্য। ‘ডোরস্টেপ গভর্নেন্স’ মডেল সফল হলে বুথস্তরে জোড়াফুল শিবিরের ঘাঁটি আরো মজবুত, আরো অভেদ্য হতে চলেছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!