Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুলাই ১৬, ২০২৫

মোদির দশকে চাকরি মাত্র ১২ লক্ষ, ২ কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি উধাও ! রোজগার মেলা নিয়ে কটাক্ষ বিরোধীদের

মোদির দশকে চাকরি মাত্র ১২ লক্ষ, ২ কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি উধাও ! রোজগার মেলা নিয়ে কটাক্ষ বিরোধীদের

২০১৪ সালে কংগ্রেস জমানার অবসান ঘটিয়ে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি যখন কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসে, তখন দেশের যুবসমাজের কাছে তারা যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তার অন্যতম স্তম্ভ ছিল কর্মসংস্থান। বলা হয়েছিল, প্রতিবছর ২ কোটি চাকরি তৈরি হবে। সঙ্গে ছিল আরো গালভরা প্রতিশ্রুতি— পেট্রোল, রান্নার গ্যাস, জীবনদায়ী ওষুধ সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় একাধিক জিনিসের দাম কমবে, প্রত্যেক নাগরিকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা আসবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সে সময় এইসব প্রতিশ্রুতি এতটাই আলোড়ন ফেলেছিল যে, বহু তরুণ-তরুণী এই স্বপ্নে ভর করেই গেরুয়া শিবিরকে সমর্থন জানিয়েছিল। ১০ বছর পর স্বপ্ন কতটা বাস্তবের মুখ দেখল, তা নিয়ে ফের বিতর্ক শুরু হয়েছে কেন্দ্রীয় সংসদীয় কমিটির সাম্প্রতিক বৈঠকে।

মঙ্গলবার সংসদ ভবনে বসেছিল ‘পার্সোনেল, পাবলিক গ্রিভান্স এবং আইন ও বিচারবিভাগীয়’ সংসদীয় কমিটির বৈঠক। ওই কমিটির চেয়ারম্যান বিজেপির রাজ্যসভার সদস্য ব্রিজ লাল, বৈঠকে ছিলেন বিরোধী দলের নেতারাও। এদিনের আলোচনার বিষয় ছিল, ‘কেন্দ্রীয় সরকারের শূন্য পদ পূরণ’। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ডিপার্টমেন্ট অব পার্সোনেল অ্যান্ড ট্রেনিং বা ডিওপিটি-র সচিব রচনা শাহ, স্টাফ সিলেকশন কমিশনের চেয়ারম্যান রাকেশ রঞ্জন এবং অন্য একাধিক শীর্ষ আধিকারিক। সেখানেই স্পষ্ট হয়ে যায়, এক দশকে মোদি সরকারের আমলে কেন্দ্রীয় স্তরে সরাসরি নিয়োগ হয়েছে মাত্র ১১ লক্ষ ৯৪ হাজার ২৭৫ জনের। এর মধ্যে রেলেই চাকরি পেয়েছেন ৫ লক্ষ ৮ হাজার ৬৯৯ জন।

এদিনের বৈঠকে প্রাথমিকভাবে সরকারের তরফে দাবি করা হয়, গত ১০ বছরে প্রায় ২২ লক্ষ চাকরি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তথ্য খতিয়ে দেখতেই বেরিয়ে আসে সত্যতা, জানা যায়, ওই সংখ্যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে পদোন্নতিও। অর্থাৎ, কোনো সরকারী কর্মচারী তাঁর পুরনো পদ থেকে এক ধাপ ওপরে উন্নীত হয়েছেন, তাকেও নতুন চাকরি হিসেবে ধরা হয়েছে। এই ‘তথ্যের জাদুকরী’ প্রকাশ্যে আসতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন বিরোধীরা। তাঁরা প্রশ্ন তুলছেন, পদোন্নতি কীভাবে নতুন নিয়োগ হিসেবে ধরা যায় ? যদি তা-ই হয়, তাহলে আগের আট বছরে কেন সেই হিসাব দেওয়া হয়নি ? ডিএমকে-র সাংসদ পি উইলসন এবং তৃণমূল কংগ্রেসের সুখেন্দু শেখর রায়ের মতো নেতা সরাসরি প্রশ্ন তোলেন সরকারি আধিকারিকদের কাছে। তাঁরা জানতে চান, ২০১৪ সালে কত জন চাকরিপ্রার্থী ছিলেন, আর এখন সংখ্যাটা কত? প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি ডিওপিটি বা এসএসসি-র আধিকারিকেরা। বরং পরিস্থিতি সামাল দিতে কমিটির চেয়ারম্যান আশ্বাস দেন, পরবর্তী বৈঠকে লিখিত জবাব দেবে সরকার। কিন্তু সেই জবাব আসার আগেই বিরোধীরা সাফ জানিয়ে দেন, সরকারি তথ্যে যতই শব্দের খেলা থাকুক, বাস্তবে বছরে ২ কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতি যে একধরনের ধাপ্পাবাজি ছিল, তা প্রমাণিত। তাঁদের বক্তব্য, যদি ১১ বছরে ২২ কোটি চাকরি হওয়ার কথা হয়, আর বাস্তবে তা হয় মাত্র ২২ লক্ষ, তবে ‘আচ্ছে দিন’ শব্দটা নিছক ‘রাজনৈতিক ধাপ্পাবাজি’ ছাড়া আর কিছু নয়।

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্নের মুখে পড়েছে প্রধানমন্ত্রীর ‘রোজগার মেলা’ কর্মসূচি। এতদিন ধরে বারবার সরকারের তরফে প্রচার করা হয়েছে, রোজগার মেলার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতী চাকরি পাচ্ছেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, ১৬ বার আয়োজিত এই মেলার আসল উদ্দেশ্য নিয়োগ নয়, নিয়োগপত্র তুলে দিয়ে প্রচারসর্বস্ব অনুষ্ঠান করা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিয়োগগুলি আগেথেকেই নির্ধারিত ছিল, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকারের নিজস্ব পরিসংখ্যানও চোখ কপালে তোলার মতো। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সামগ্রিক বেকারত্বের হার ৫.৩ শতাংশ। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি তরুণদের মধ্যে এই হার ১৫.৩ শতাংশ। মেয়েদের ক্ষেত্রে ছবিটা আরো করুণ— ১৫-১৯ বয়সের যুবতীদের বেকারত্ব ১৭.৪ শতাংশে পৌঁছেছে। শহরাঞ্চলে বেকারত্বের হার ১৮.৮ শতাংশে পৌঁছেছে জুন মাসে। গ্রামেও আশার আলো নেই, ১৩.৮ শতাংশ বেকার রয়েছে সেখানকার যুবসমাজের মধ্যে। গত এক বছরে এ চিত্র বিশেষ বদলায়নি, বরং ধীরে ধীরে আরো অন্ধকার, আরো দুঃসহ ভবিস্যতের দিকে এগোচ্ছে। বিরোধীদের দাবি প্রধানমন্ত্রী মোদির চাকরির প্রতিশ্রুতি একপ্রকার ‘জুমলা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, বৈঠকে আরো একটি স্পর্শকাতর ইস্যু তোলা হয়। অভিযোগ, তফশিলি জাতি ও উপজাতি প্রার্থীদের জন্য সংরক্ষিত পদগুলি নিঃশব্দে বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে। সরকার দাবি করছে, যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ার কারণে পদগুলি সাধারণ ক্যাটেগরিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। কিন্তু বিরোধীদের প্রশ্ন, এ সিদ্ধান্ত কি সংবিধানবিরোধী নয়? সরকারি স্তরে কি তাহলে পিছিয়ে পড়া শ্রেণির চাকরির সুযোগ কেটে নেওয়া হচ্ছে? বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রতিটি পরিসংখ্যান, প্রতিটি ব্যাখ্যাই ধরা পড়েছে তীব্র সমালোচনার মুখে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে উঠেছিল যে শেষ পর্যন্ত কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই বিষয়গুলি নিয়ে পরবর্তী বৈঠকে বিস্তারিত লিখিত জবাব দিতে হবে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলিকে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!