- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ বি। দে । শ
- মার্চ ১১, ২০২৬
নতুন ক্ষমতা, পুরনো দ্বন্দ্ব। তারেক রহমানের বাংলাদেশে স্থিতি নাকি অস্থিরতার নতুন অধ্যায় !
১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পর বাংলাদেশে ‘কাঙ্ক্ষিত’ পরিবর্তন এসেছে। জাতীয় নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছে বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি বা বিএনপি। ২১২টি আসনে জিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ঢাকার মসনদে বসেছেন খালেদা-পুত্র তারেক রহমান। তাঁর প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার পর প্রায় ১ মাস অতিবাহিত। অস্থিরতার সময় পেরিয়ে ঘরে-বাইরে আবারও সুজলা-সুফলা বন্ধুবৎসল হয়ে উঠছে বাংলাদেশ ? না কি জামায়াত-ই-ইসলামী ও যুবনেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টি (এনসিপি) থেকে আসা বিরোধী কণ্ঠস্বরের চাপে ফের ভিতরে ভিতরে তৈরি হয়ে চলেছে নতুন অস্থিরতার বীজ?
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির সামনে এই মুহূর্তে চ্যালেঞ্জ নানাবিধ। এক, মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারে আমলে ভারত সহ একাধিক দেশের সঙ্গে নিম্নগামী কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনুরুদ্ধার, দেশের অর্থনৈতিক পরিকাঠামো দৃঢ় করা, শিল্প-বাণিজ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া, ‘মব কালচার’-কে পরাস্থ করা, সামাজিক অবক্ষয় ও সক্রিয় মৌলবাদী উত্থানকে যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণ করা। সংখ্যালঘু ও বিরোধী রাজনীতির বিশাল সংখ্যক মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়াও তারেক রহমানের আশু দায়িত্ব। বিশেষত দেশের পুনর্নির্মাণের সময় পার্টির আদর্শগত দিক নির্দেশনা স্পষ্ট না হলে এগুলো সামলানো কঠিন হবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে দীর্ঘদিন ব্যবহার করা হয়েছে পরিচয় গঠনের জন্য। মুক্তিযুদ্ধ বনাম মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ধারা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের সংবিধানের চারটি মূল নীত — জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র প্রতিটাই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে অনুপ্রাণিত। তবে ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে ১৯৭১-এর স্মৃতি মূল ফ্যাক্টর ছিল না। বরং ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবকে ‘সত্যিকারের স্বাধীনতা’ হিসেবে তুলে ধরেছে এনসিপি ও জামাত। যুব সমাজের মধ্যে এ ভাবনা নতুন পরিচয় হিসেবে প্রবেশ করেছে, যেখানে জামাতের উত্থানের জন্য এই দৃষ্টিভঙ্গি সুবিধাজনক। মনে রাখা দরকার, এখন ঢাকার পার্লামেন্টে প্রধান বিরোধীদল জামাত। ফলে, অদূর ভবিষ্যতে বিএনপি-র নানান ‘নিরপেক্ষ’ প্রস্তাব সঙ্গসদে নাকজ হতে পারে। ভারত লাগোয়া সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে জামাতের জয়, বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে আশঙ্কার পরিবেশ গড়ে তুলছে। বিএনপি যদিও চতুরভাবে অবস্থান নিয়েছে, জুলাই চেতনার সমর্থন জানিয়েও ১৯৭১-এর মূল্যবোধকে তারা ক্ষুণ্ণ করেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি একটি ‘নতুন বাংলাদেশ’ গঠনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। স্থায়ী কর্মসংস্থান, নারী-উন্নয়ন এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী। পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপি ৩১-পয়েন্ট সংস্কার এজেন্ডা হাতে নিয়েছে। ‘জুলাই সনদ’ যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পর রাজনৈতিক সমঝোতা থেকে উদ্ভূত, নির্বাচনী প্রক্রিয়া, পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে বিএনপির বেশ কিছু অবস্থান ‘জুলাই সনদ’-এর মৌলিক প্রস্তাবের সঙ্গে মিলছে না। প্রধানত নির্বাহী ক্ষমতা, সংসদের উচ্চকক্ষের ভূমিকাসহ নির্দিষ্ট নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে তারেক রহমান ‘বিরোধের নোট’ প্রকাশ করেছে। ফলে দেখার বিষয়, নতুন সরকার কিভাবে চার্টার ও ৩১-পয়েন্ট এজেন্ডাকে সামঞ্জস্য করবে এবং অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সমঝোতা করবে।
জুলাই-আগস্ট আন্দোলন, হাসিনা সরকারের পতন, অন্তর্বর্তী সরকার— বাংলাদেশের অস্থিরতম সময়ের পর নির্বাচনে বিএনপির জয়কে উদার গণতন্ত্রের ম্যান্ডেট হিসেবেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিএনপি জাতীয়তাবাদী ও কিছুটা মধ্যপন্থী হিসেবে পরিচিত। তারা দেশের রাজনীতিতে মধ্যপন্থী ও সংহত দৃষ্টিভঙ্গি আনার আশা রয়েছে, বিশেষত সংখ্যালঘু ও মহিলাদের অধিকার, মৌলিক স্বাধীনতা আর নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষায়। কট্টোর রাজনৈতিক দলের উত্থান, বিশেষ করে জামাত, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র নির্বাচনের জয়ে দৃশ্যমান হয়েছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে জামাত বিরোধী অঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে, যা পদ্মাপাড়ের ভবিষ্যতের জন্য অশনি সংকেত। বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ হলো—কিভাবে তারা মধ্যপন্থী ধর্মীয় পরিচয় বজায় রেখে ধর্মীয় রাজনীতির উত্থান সামলাবে এবং উদার জাতীয়তাবাদী চেতনায় দেশের বহুমাত্রিক জনগণকে সামিল করবে।
বিএনপির সরকার ইতিমধ্যেই ব্যবহারিক কূটনীতির দিকটি স্পষ্ট করেছে। তারেক রহমান ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি অনুযায়ী ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি এবং বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর জোর দেবেন বলে জানিয়েছেন। তবে, কিছু রাজনৈতিক চাপ থাকবে। দিল্লি, ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্কের অবস্থান, ভারতের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, পূর্ববর্তী সরকারের নীতির পরিবর্তন ইত্যাদি নানা বিষয় চাপে ফেলতে পারে জিয়াপুত্রকে। প্রাথমিক সংকেত হিসেবে, ভারতের কূটনীতিকরা আবার ঢাকার সঙ্গে ‘মধুর’ সম্পর্ক গড়ে তোলবার কাজে নেমেছেন, পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছে ঢাকাও। বিএনপি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বন্ধ করা কনস্যুলার পরিষেবা পুনরায় চালু করেছে, যা নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্স্থাপনের ইঙ্গিত। ইরান যুদ্ধের কারনে তেল ঘাটতি পড়ায় ভারত বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণে ডিজেল দেবার ঘোষণা করেছে। সুতরাং, তারেক রহমানকে এই মুহূর্তে দেশের পুনর্নির্মাণ, জাতীয় ঐক্য ও আইনের শাসনের মাধ্যমে পুনর্মিলনের প্রক্রিয়া পরিচালনা করতে হবে।
❤ Support Us








