- খাস-কলম পা | র্স | পে | ক্টি | ভ
- জুলাই ৮, ২০২৩
বসুর জন্মদিনে আজ কী শপথ নেবেন কমরেডরা ? নিজেকে কতটা ‘কম্যুনিস্টি’ ভাবতেন জ্যোতিবাবু ?
আজ জ্যোতিবাবুর জন্মদিন । ১৯১৪ সালের ৮ জুলাই তিনি জন্মেছিলেন । ঘটনাচক্রে আজই বাংলায় ২০২৩ সালের এক দফার পঞ্চায়েত নির্বাচন হচ্ছে।
জ্যোতি বসুর আমলে ১৯৭৮ সালের জুন মাসে পশ্চিমবঙ্গের নবগঠিত ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেটাই রাজ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচনের শুরু । ভারতে ওই প্রথম দলীয় প্রতীকের ভিত্তিতে একই দিনে অর্থাৎ এক দফায় পঞ্চায়েতের তিনটি স্তরে নির্বাচন হয়েছিল।
বসুর আমলে পঞ্চায়েত নির্বাচনে হিংসা, খুন, বিরোধীদের মনোনয়ন জমা দিতে না দেওয়ার ঘটনা ঘটেনি তা নয় । তবে “শাসন” নামের বস্তু ছিল, যার আজ খুব অভাব । পঞ্চায়েত নির্বাচন ঘোষণার পর থেকে আজ পর্যন্ত রাজ্যে ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এই জায়গায় দাঁড়িয়ে সিপিএম কী আজ শপথ নিচ্ছে? শপথে তাঁরা কী মনে মনে বলছে, বাংলা আবার দখল করবে লাল পতাকা। এটা কী সম্ভব ?
সিপিআই(এম)-এর নতুন কোনো রাজনৈতিক উদ্ভাসও নেই। নেই বিধানসভায় প্রতিনিধিত্ব। আজ কী সিপিআই(এম) শপথ নেবে যে তাঁরা সোশ্যাল মিডিয়ার অদৃশ্য ময়দানে বিচরণ কমিয়ে আবার রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে বাস্তবের রাজনৈতিক ময়দানে অনেক অনেক বেশি করে নামাবে ! মানুষ বড়ো বিপন্ন, অসহায় মানুষ পাশে বন্ধু চায় । রেড ভলিন্টিয়ার্সের মতো করে পুরো দলটা কী আজ আবার মানুষের পাশে, মানুষের কাছে পৌঁছবার শপথ নেবে ?
১৯৭৭ থেকে ২০০০, জ্যোতি বসু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর আমল ছিল বামফ্রন্ট সরকারের জোয়ারের সময়। অনেক রাজনীতির অলিগলি দিয়ে সে জোয়ারের জল ঢুকে বাংলার রাজনীতির মাঠে অনেক রাজনীতির ফসল ফলিয়েছিল। ২০০০ থেকে ভাঁটা শুরু। মাঠ থেকে রাজনীতির সেই সেচের জল নেমে যাবে, রাজনীতির ময়দানটা রুক্ষ হয়ে যাবে। এখনও সিপিআই(এম)- এ অনেক ভালো মানুষ আছেন, এটা বাংলার মানুষ বলেন কিন্তু ভালো মানুষদেরও তাঁরা ভরসা করেন না। গড়িয়ার যিনি বাসিন্দা, যাদবপুরের সিপিআই(এম)-এর মিছিলে তিনি পা মেলান, কিন্তু তাঁর নিজের পাড়ায় অনেকেই তাঁকে পথ চলার সাথী হিসাবে ভাবেন না বা চেনেন না। সমস্যাটা এখানেই।
জ্যোতি বসুর জামানায় যেমন পঞ্চায়েত ব্যবস্থার শক্তিবৃদ্ধি, ভূমি সংস্কারের মতো সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন তৈরি হয়েছিল, তেমনি তাঁর প্রায় আড়াই দশকের রাজত্বে অনেক বিতর্ক জন্ম নিয়েছে । জ্যোতি বসু, শুধু একজন রাজনীতিবিদ নয়, আলোয়-আঁধারে তিনি বাঙালির মনে হয়ে উঠেছিলেন এক মাইলফলক
বসুর অনুপস্থিতিতে সিপিআই(এম) অভিভাবকহীন একটা দলে পরিনত হয়েছে। কথাটা অনেকে মানবেন না। বলবেন কম্যুনিস্টরা ব্যক্তিপূজায় বিশ্বাস করেন না। প্রশ্ন এখানেই, জ্যোতি বসু কি নিজেকে কম্যুনিস্ট বলতেন ? এসব যুক্তিতক্ক দূরে ফেলে আজ তাঁর জন্মদিনে উত্তাল জনমুদ্রের ঢেউয়ে মিশে যেতে সিপিআই(এম) হয়তো অন্য কোনো শপথ নেবে।
মার্কসবাদী কম্যুনিস্ট পার্টির সমর্থক নন, কংগ্রেস, তৃণমূল, বিজেপির সঙ্গে সমান দূরত্ব বজায় রেখে চলেন, এমন বাঙালি এক সময় জ্যোতি বসুর মূল্যায়ন করতেন, এখনও করেন। রাজ্য রাজনীতি নিয়ে কথা বলার সময় তাঁরা বনেন, “আরে দাদা, জ্যোতি বসু এখনও আছেন বলেই সিপিএমের এখনও অস্তিত্ব, উনি না থাকলে দেখবেন অবস্থাটা কী হয়।”
জ্যোতি বসু সম্পর্কে এমনই একটা স্বচ্ছ ভাবনা বাঙালির মনে ছিল, আজও আছে। কিন্তু তারপর ? আসলে জ্যোতি বাবু, তাঁর ব্যক্তিত্ব দিয়ে সবটা আগলে রাখতে পারতেন। দূর থেকে তাঁকে কঠিন মনে হলেও ভেতরে তিনি ছিলেন কোমল। ঠিক সপ্তস্বরের “কড়ি” ও “কোমল” স্বরের যেমন পার্থক্য হয় ঠিক তাই।
সময়টা ১৯৯৫ হবে। জ্যোতি বসু মহাকরণে নিজের চেম্বার থেকে বেরিয়ে ভিআইপি লিফটের দিকে দূঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যেতেন। সাংবাদিকরা তাঁর কাছে কোনও প্রশ্ন করলে যদি তিনি মনে করতেন উত্তর দেবেন দিতেন, উত্তর দেওয়ার না হলে হেঁটে গিয়ে লিফটে উঠে মহাকরণের সেন্ট্রাল গেট দিয়ে অ্যাম্বাসেডর গাড়িতে উঠে চলে যেতেন। জ্যোতি বসু উত্তর না দিয়ে চলে গেলে তাঁর ওপর কেউ কখনো অসন্তুষ্ট হতেন না। কেন না তাঁর চলায়, বলায় যে ব্যক্তিত্বের ছটা ছিল তাতে তাঁর প্রতি মনে কখনও অসন্তোষ আসত না। এই লেখা পড়ে কারো কারো মনে হতেই পারে জ্যোতি বসুকে এত বড়ো করে দেখাবার কী আছে ? জ্যোতি বসুর আমলেই তো মরিচ ঝাঁপি, বিজন সেতু, বানতলা, ২১ জুলাইয়ের মতো ঘটনা ঘটেছে।
এসব ভাবলে পাশাপাশি ভাবতে হবে, জ্যোতি বসুর আমলে, ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধি হত্যার পর বাংলাকে হিংসার হাত থেকে তিনিই রক্ষা করেছেন। জ্যোতি বসু বলতেন, “সরকার না চাইলে দাঙ্গা হয় না।” জ্যোতি বসুর রাজত্বে বাংলায় রাম নবমী, হনুমান জয়ন্তী ঘিরে দাঙ্গা হয়নি বাংলায়। দুর্গাপূজো, কালীপূজো,ইদ,মহরম, বড়দিন হয়েছে মানুষের ইচ্ছেয়। তাতে তিনি যেমন প্রবেশ করেননি আবার কাউকে বাঁধাও দেননি।
জ্যোতি বসু শাসন ক্ষমতায় ছিলেন ২৩ বছর। সম্রাট জাহাঙ্গিরের শাসনকাল ছিল ২২ বছর, ১৬০৫ থেকে ১৬২৭। দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ ক্ষমতায় ছিলেন ২১ বছর, ১৮৩৭ থেকে ১৮৫৮। এটাও জ্যোতি বসুকে স্মরণে রাখার একটা কারণ। তাই সময়ের বিচারে বিধান রায় থেকে জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধি থেকে অটল বিহারী বাজপেয়ীর মতো দেশের সব মুখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীদের পিছনে ফেলে ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে উজ্জল জ্যোতি বিস্তার করে তিনি আছেন, ম্লান হয়ে যাননি। স্বেচ্ছায় মুখ্যমন্ত্রিত্ব ছেড়েছেন, যা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার আঙিনায় বিরলতম ঘটনা। আবার এই জ্যোতি বসুকেই যখন তাঁর দল প্রধানমন্ত্রী হতে দেয়নি তখন তিনি বলেছিলেন, “ঐতিহাসিক ভুল।” সে ভুলের মাশুল হয়তো দেশের মানুষ এখন দিচ্ছেন।
জ্যোতি বসুর শাসনকালে যেমন পঞ্চায়েত ব্যবস্থার শক্তিবৃদ্ধি, ভূমি সংস্কারের মতো সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন পথ খুলে গেছে, তেমনই তাঁর প্রায় আড়াই দশকের রাজত্বে অনেক বিতর্ক জন্ম নিয়েছে। তবে তিনি জ্যোতি বসু, শুধু একজন রাজনীতিবিদ নয়, তাই আলোয়-আঁধারে তিনি বাঙালির মনে হয়ে উঠেছেন একজন মাইলফলক। ধর্ম এবং রাজনীতি তিনি কখনও মিলিয়ে ফেলেননি।
সময়টা ১৯৮৯। সীতারাম ইয়েচুরি জ্যোতি বসুর সঙ্গে প্রথম বিদেশ অর্থাৎ নেপাল সফরে গিয়েছেন । নেপাল সরকারের রাষ্ট্রীয় অতিথি ছিলেন। জ্যোতি বসুর সফরসূচীর তালিকায় নেপালের পশুপতিনাথ মন্দির দর্শনও রাখা ছিল। সীতারাম ইয়েচুরি জ্যোতি বসুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, যে মন্দিরে যাওয়ার ব্যাপারে মানা করে দিলেন না কেন ? উত্তরে জ্যোতিবাবু বলেছিলেন, “ভারতে আসা প্রত্যেক বিদেশী অতিথিকে রাজঘাটে অর্থাৎ গান্ধিজির স্মারকস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়, সেই অতিথির গান্ধির মতাদর্শে বিশ্বাস থাক বা না থাক। সেই একই ভাবে নাস্তিক হওয়া স্বত্ত্বেও আমাদের পশুপতিনাথ মন্দিরে যাওয়া উচিত।” এই রাজনৈতিক শিক্ষাটা জ্যোতি বসুর প্রয়াণের ১৩ বছরে যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে, সেটা ভাবলে সত্যি ভয় হয়। তাঁর জন্মদিনে মনে হচ্ছে,
“সনাতন জীর্ণ কু-আচার
চূর্ণ করি জাগো জনগণ
ঘুচাও এ দৈন্য হাহাকার
জীবন-মরণ করি পণ।
শেষ যুদ্ধ শুরু আজ কমরেড
এসো মোরা মিলি একসাথ
গাও ইন্টারন্যাশনাল
মিলাবে মানবজাত।”
❤ Support Us








