- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুন ১০, ২০২৫
ওবিসি নিয়ে রাজনৈতিক তরজা, বাদল অধিবেশনের প্রথমদিনেই উত্তাপ তুঙ্গে বিধানসভায়। ইউজিসির নিয়ম মেনে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই হবে কলেজে ভর্তি, জানালেন শিক্ষামন্ত্রী
রাজ্য বিধানসভার বাদল অধিবেশনের প্রথম দিনের অন্যতম চর্চিত ইস্যু হয়ে উঠল ওবিসি শংসাপত্র বিতর্ক। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিক বার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন— ওবিসি তালিকা সংক্রান্ত সমীক্ষা হয়েছে আর্থ-সামাজিক অনগ্রসরতার ভিত্তিতে, কোনোভাবেই ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। সে সাফাই সত্ত্বেও বিজেপির তীব্র প্রতিবাদে উত্তাল হল অধিবেশন। জঙ্গি হামলার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর অপারেশন সিঁদুর’ ও সাহসিকতার প্রেক্ষিতে রাজ্য বিধানসভায় আনা হয় সেনাবাহিনীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর প্রস্তাব। তা সত্ত্বেও শাসক-বিরোধী রাজনৈতিক তরজা চলছেই।
মঙ্গলবার বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ঘিরেই শুরু হয় সংঘাত। এদিন মমতা বলেন, ‘ওবিসি শংসাপত্র দেওয়ার সঙ্গে ধর্মের কোনও সম্পর্ক নেই। কেউ কেউ ভুয়ো প্রচার চালাচ্ছেন। সমাজমাধ্যমে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।’ সঙ্গে জানান, ১৪০টি জাতিগোষ্ঠীকে ওবিসি শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ৪৯টি ‘এ’ ক্যাটাগরিতে এবং ৯১টি ‘বি’ ক্যাটাগরিতে। সমীক্ষা হয়েছে আর্থসামাজিক অনগ্রসরতার ভিত্তিতে। ধর্মের কোনও সম্পর্ক নেই এতে। মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পরেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। বিক্ষোভে শামিল হন বিজেপি বিধায়কেরা। শুভেন্দুর অভিযোগ, ‘মুখ্যমন্ত্রী মিথ্যে বলছেন। এটা সংখ্যালঘু তোষণের প্রচেষ্টা। সংখ্যাগরিষ্টদের সংরক্ষণের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।’ এরপরই উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় শুরু হয় বিধানসভায়। কক্ষজুড়ে সৃষ্টি হয় প্রবল রাজনৈতিক নাটকীয়তা। বিরোধী দলনেতা প্রশ্ন তোলেন, হাইকোর্টে মামলাটি বিচারাধীন, ১৫ জুলাই রয়েছে সুপ্রিম কোর্টে পরবর্তী শুনানি। অথচ মুখ্যমন্ত্রী একতরফা বক্তব্য দিয়ে স্পিকারকে দিয়ে অধিবেশন মুলতুবি করিয়ে দিলেন।’
২০১০ সালের আগে রাজ্যে ৬৬টি জাতিকে ওবিসি তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। পরে তৃণমূল জমানায় সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় ১৭৯-এ। এই প্রসঙ্গে কলকাতা হাইকোর্টে প্রশ্ন ওঠে তালিকা তৈরির প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে। আদালতের রায়ে বলা হয়, তালিকাটি বিধি মেনে হয়নি। সেই নির্দেশের বিরুদ্ধে রাজ্য সুপ্রিম কোর্টে যায়। এরই মধ্যে রাজ্য সরকার নতুন করে একটি সমীক্ষার উদ্যোগ নেয় এবং রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে ১৪০টি জাতিকে ওবিসি তালিকাভুক্ত করার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, ‘আমরা সুপ্রিম কোর্টে তিন মাস সময় চেয়েছি। সমীক্ষা চলছে। ইতিমধ্যেই ৫০টি নতুন জাতির তথ্য সংগ্রহের কাজ এগিয়েছে অনেকটাই।’ তবে বিরোধীদের অভিযোগ, ধর্মীয় উদ্দেশ্যেই এই সংরক্ষণের নীতি প্রণয়ন করেছে রাজ্য সরকার। তৃণমূল নিজের অবস্থানকে ‘ধর্মনিরপেক্ষ ও সংবেদনশীল’ বলে দাবি করলেও বিজেপির মতে, এটি আসলে ‘তথাকথিত সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক পোক্ত করার পরিকল্পনা।’ শুভেন্দুর বক্তব্য, ‘প্রকৃত ওবিসিরা এই প্রক্রিয়ায় উপেক্ষিত হচ্ছেন। রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে ধর্মীয়ভাবে বাছাই করে সংরক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।’ এর মধ্যেই উঠে আসে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করা ছাত্রছাত্রীদের কলেজে ভর্তি নিয়ে প্রশ্ন। বিজেপির বিশ্বনাথ কারকের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু জানান, ‘গত বছর ১৯ জুন শুরু হয়েছিল অনলাইন ভর্তি। এ বছরও ইউজিসির গাইডলাইন মেনে, তার মধ্যেই ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হবে।’ আইনি জটিলতা কাটিয়ে কলেজে ভর্তি শুরু হওয়ার আশ্বাসে খানিকটা স্বস্তি পেয়েছেন অভিভাবক আর ছাত্রছাত্রীরা।
আজই বিধানসভায় ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মাধ্যমে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে সেনাবাহিনীর ভূমিকাকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এই প্রস্তাব আনার জন্য স্পিকারকে ধন্যবাদ। সেনাবাহিনীর সাহসিকতার কাছে আমাদের অসীম কৃতজ্ঞতা।’ এরপর তিনি অভিযোগ তোলেন, সন্ত্রাসের কোনো ধর্ম নেই। যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁরা মানুষ। বাংলার ৩ জনও রয়েছেন তাঁদের মধ্যে। অথচ তাঁদের নাম নেওয়া হচ্ছে না।’ সেনার প্রতি শ্রদ্ধার প্রস্তাবেও বাদ যায়নি রাজনীতি। বিজেপি বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পালের প্রশ্ন, ‘বিধানসভার প্রস্তাবে ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামটি রাখা হয়নি কেন?’ শুভেন্দু অভিযোগ তোলেন, ‘৪ জন তৃণমূল বিধায়ক অপারেশন সিঁদুর নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছেন।’ এই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, ‘সন্ত্রাসবাদের কোনও ধর্ম নেই। আমরা সবাইকে সম্মান করি। যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁরা আগে মানুষ। তাঁদের শ্রদ্ধা জানাই। বিজেপি শুধু মার্কেটিং করে। দেশের প্রকৃত দায়িত্ব বোঝে না।’ উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়, যখন মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি শুভেন্দুকে বলেন, ‘আপনি বিরোধী দলনেতা? লজ্জা! অপদার্থ বিজেপি।’ শুভেন্দু প্রশ্ন তোলেন, ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আলোচনা হতে পারে, কিন্তু একপক্ষের রাজনৈতিক বক্তৃতা কি এই প্রস্তাবে যুক্তিযুক্ত?’ পাল্টা মমতা বলেন, ‘আমরা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে। পাকিস্তানে কীভাবে রাষ্ট্রপুঞ্জে চেয়ার পেল ? বিদেশমন্ত্রকের কূটনৈতিক ব্যর্থতা এর জন্য দায়ী।’
অধিবেশনের শেষের দিকে মুখ্যমন্ত্রী আহ্বান জানান, বাংলাকে অবহেলা করবেন না, নবজাগরণ থেকে স্বাধীনতা সংগ্রাম—সবেতেই বাংলা পথ দেখিয়েছে। পুলওয়ামার পরে প্রাক্তন রাজ্যপালও প্রশ্ন তুলেছিলেন, প্রশ্ন তোলার অধিকার সবার আছে। আমাদের সেনা-জওয়ান, টাট্টুওয়ালা, হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকলেই দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন। তাঁদের শ্রদ্ধা জানানো আমাদের কর্তব্য।’ বিধানসভায় এদিন একাধিক ভাষায় বক্তৃতা হয়—সাঁওতালি, রাজবংশী, ইংরেজি। সাঁওতালি ভাষায় বক্তৃতা করায় বিজেপির জুয়েল মুর্মুকে থামিয়ে দেন স্পিকার। বলেন, ‘আগে জানালে ব্যবস্থা নেওয়া যেত।’ আলোচনায় অংশ নেন তৃণমূলের চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, বিরবাহা হাঁসদা ও বিজেপির অসীম সরকার, আনন্দময় বর্মণ সহ মোট ১৭ জন বিধায়ক। রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও সেনার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধার বার্তা রেখে শেষ হল বাদল অধিবেশনের প্রথম দিন।
❤ Support Us






