- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৩
ভেলকিবাজ ফজলু ও জ্ঞানবৃদ্ধ মানুষটা
প্রশ্ন?
এখনো লেখালেখির অলিন্দে, বিস্তৃত প্রাঙ্গনেও কেন জেগে ওঠে এক ধরনের হতাশাব্যঞ্জক প্রশ্ন? কেন, সাম্প্রদায়িক উদাসীনতা আর সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা, মাঝে মাঝে, স্তম্ভিত করে দেয় আমাদের সৃজন আর দৃষ্টিকে? কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে, নাটকে বৃহতের চিত্ররূপ কি উপেক্ষিত হতে থাকবে? স্থবিরতা আর ক্ষুদ্রতাকে ভেদ করে, নির্বিশেষ সাধনার সুস্পষ্ট বীজতলা গড়ে তোলা কি সত্যি অসম্ভব?
সম্পাদক
এমন আতান্তরের সময় এই ঘোষণা ? কোন দুঃখ বেদনা হতাশা ক্ষোভ তাদের জীবন যাপনে নেই। বেঁচে থাকার জন্যে এগুলো বাহুল্যমাত্র।তাই তারা আশ্চর্য হয় নি। তবে অবাক হয়েছে ঘোষণার ঢং-এ। পুলিশ এক সপ্তাহ আগে মাইকে হেঁকে গেছে,ভদ্রমহোদয় ওমহোদয়াগণ,আমরা ব্রিজের ওপর থেকে দেখেছি। এক দুঃসহ বেদনায় আমরা দগ্ধ হচ্ছি। আপনাদের ক্লিষ্ট জীবন আমাদের হৃদয়কে ভারাক্রান্ত করে।আমরা তাই হাতজোড় করে অনুরোধ করি, এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে এক সপ্তাহ সময় সীমার মধ্যে নিষ্কৃতি নিন।
এখন তো তেমন সময় নয় কেউ তাদের ভালো মন্দ নিয়ে মাথা ঘামাবে ? বরং সবার ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। তবে তাদের জন্যে কারো কি কোন বিপদ হল ? জীবনকে সব সময় তারা আয়নার ওপিঠে দেখেছে।
এই লক ডাউনের বাজারে ফজলু অনেকদিন বেরোতে পারে নি। জ্ঞানী মানুষটা বোধহয় তোরঙ্গের ভেতর হাঁপিয়ে উঠেছে। তাকে বাইরে বের করে কিছু ভালো মন্দ কথা জিজ্ঞেস করবে ভাবছে এমন সময় পুলিশের অতি আন্তরিক আবেদন। তার ডানদিকে বসে আছে বিশু আর বাঁদিকে শুঁটকিবিবি। বিশু জিভ আর ঠোঁটের ভেতর একটু গুটখা ফেলে বলে, তোর যাদু মাথা কী বলচে রে ফজলু ? পকেটমার বিশু তার চেয়ে অন্তত এক যুগ আগে জন্মেছে তবু তুই তোকারি সম্পর্ক। ফজলু বলে,কী জানতে চাস তুই ?
কী বলতি চাইছি বুজতি পারচিস নে ? আমাদের জীবন এমন কেন ?
যেদিন থেকে আমাদের কূল ভেঙেছে সেদিন থেকে এ অবস্থা।
তোর এই খটমট কথা একটু বুজিয়ে বল।
কোন ছোটবেলার কথা মনে পড়ে কিংবা পড়ে না। কোন এক নদীর তীর থেকে রেল স্টেশান। তারপর—তারপর—
কী ভাবছিস তুই ?
তার কথায় চটকা ভাঙে। দীর্ঘশ্বাসের মতো বলে, আমাদের পেছনে কিছু নেই সামনে কিছু নেই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ভেসে বেড়ানোই আমাদের জীবন।
বাঃ! ভালো বলেছিস। গুটকার পিক ফেলে বলে বিশু।
শুঁটকি বিবি এতক্ষণ চুপচাপ তাদের কথা শুনছিল। সে এবার বলে, এই ভয়ানক বেমারির সময় কোথায় যাব ?
খোদার জগত আমাদের জন্যি অকৃপণ না। আমাদের জগত আমরা ঠিক খূঁজে পাব। ফজলুর গলায় আত্মবিশ্বাস।
শহরের পুবদিকে চার নম্বর রেল ব্রিজের উত্তর গায়ে এক ফালি জায়গা। শহরে শূন্যস্থান বলে কিছু হয় না। এখানে বিশটার মতো খুপরির ঘর আর তাতে যেন অগুন্তি মানুষ। আর এরা হয়েছে যত যন্ত্রণা।
এখানে ঈশ্বর ঢোকে না। তারা নিজেদের খেয়াল খুশিমতো বেঁচে আছে। তাই বুঝি এই প্রতিশোধ। ফজলু জ্ঞানী মাথার দিকে তাকায়। অনেকদিন পর তোরঙ্গের বাইরে এসে সে দিনের আলোয় চক্ষুহীন কোটর পিটপিট করছে। ফজলু বলে, তোরা আর কিছু জানতে চাস ?
বিশু বলে, সবই তো বললি।
তবে যেভাবে আছিস তেমনি থাকবি।
তার কথা শুনে বৃদ্ধ শূন্য বাতাসে মাথা নাড়ে। সত্যিই তো তাদের অতীত বর্তমান ভবিষ্যতের মধ্যে কোনও ফারাক নেই।
তুই ভরসা দিচ্চিস ? শুঁটকি বিবি বলে।
বাজে কথা বোলো না। চটে যায় ফজলু।
এই সব বিচিত্র পেশার মানুষ লক ডাউনে ঘরমুখো হয়েছে। বিশু ঊনচল্লিশ নম্বর বাসে পকেটমারি করে। বড়দা কালু গোবরা কবরখোলা থেকে কঙ্কাল তুলে বড়বাজারে বিক্রি করে। ফজলু যাদু বাক্স মাথায় করে মোড়ে মোড়ে ঘোরে। এখন সব বন্ধ। শুঁটকি বিবি আর মালেকা ডাস্টবিনে প্লাস্টিক কুড়িয়ে ধাঙড় বাজারে চালান দেয় তাও অচল। তবে ঘরে ঘরে হাহাকার পড়েনি। তারা জানে বাঁচার প্রক্রিয়া। কোন কিছুই তাদের বাঁচার ইচ্ছাকে মেরে ফেলতে পারে না। পাশে মাদার তেরেসার প্রেমদানে খুলেছে লঙ্গরখানা। তাদের উদ্দেশ্যে যে খোলা তা বুঝতে ও সদ্ব্যবহারে তারা অপারগ হয় না। এরপরও কিছু কথা থেকে যায়। তখন রানি বুধি মালেকারা সেজেগুজে গোপনে মুখ ঢেকে রাস্তায় পুলিশের সঙ্গে লুকোচুরি খেলে। সে খেলা রাত নামলে তবে জমে।
মাইকে এমন সন্মান জানানোর পর তারা ভেতরে ভেতরে তল্পিতল্পা বাঁধলেও একটা কিছুর অপেক্ষায় থাকে। অনেক সময় বিনা মেঘে বিষ্টি নামে।পাথরে ফুল ফোটে। এসবের কোন মাথামুণ্ডু নেই। তবুও মানুষ অলীক কথা মনে ঠাঁই দিতে ভালোবাসে।
অলস সময়ও দ্রুত কেটে যায়। ব্রিজের ওপর দিয়ে হামেশা সাইরেন বাজিয়ে অ্যাম্বুলেন্স আর শেষ যাত্রার কাঁচে ঢাকা গাড়ি এদিক ওদিক করে। উচ্ছেদ বিচ্ছেদ তাদের ভারাক্রান্ত করে না। তবুও এই আঁধির সময় শহর ছেড়ে চলে যেতে হবে।
দেখতে দেখতে সেদিন এসে যায়। দুপুরে লঙ্গরখানা থেকে এসে মুখোমুখি বসে দুজনে। মালেকা ফজলুর হাত ধরে বলে,এই তো সুযোগ। চল অন্য কোথাও চলে যাই।
আমারও এরকম ইচ্ছে।
তবে বাধা কীসে ?
চুপ করে থাকে ফজলু।
বুজেচি। ওই বুড়ি আমাদের সংসার করতি দেবে না। ফজলুর মা রহমতির সঙ্গে তার চুলোচুলি সম্পর্ক।বুড়িটা নাকি লোকের বাড়ি কাজ করতে গিয়ে জেনা করে আসে।
শুধু মা’র কথা বলছিস কেন ? এতগুলো লোক ফেলে পালাব।
তুই তো ভেলকিবাজির নামে লোককে ঠকিয়ে বেড়াস আবার ইমানদারি দেকাচ্ছিস। গোঁসা করে উঠে পড়ে সে। ফজলু হাজার ডাকলেও পেছন ফিরে তাকায় না।
মাকে নিয়ে ফজলুর সংসার। পশ্চিমদিকের দেয়ালে বাপের এক ঝাপসা ফটো। ছোটবেলার কথা এখন অতটা মনে নেই।বাপ ছিল এক ওস্তাদ যাদুকর। সবাই ভেবেছিল যেকোন একটা খেলায় মরণ হবে কালাচাঁদের। দশতলা বাড়ির ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে নেমে আসত পাখির ডানার মতো হাতে ভর দিয়ে বাতাসে। মুখে থাকে তখন পাখির অচেনা এক শিস। আবার হাত পা বেঁধে লাইনে রাখা হত।তারপর চলন্ত ট্রেনের ফাঁক দিয়ে গলে এসে অবহেলায় স্যালুট দিত সবাইকে। বাপের রঙচটা তোরঙ্গ আর রক্ত পেয়েছে ফজলু কিন্তু এমন দুঃসাহসী খেলা সে দেখায় না। দেখাতে পারে না।যদিও বাপ তার রোগে ভুগে মারা গেছে। সে জ্ঞানী মাথার পরামর্শ মতো কালো পর্দা টাঙিয়ে ভোজবাজির খেলা দেখায়।
মালেকা রাগ করে চলে যাওয়ার পর সে ফিরে আসে। ঘরে মা নেই।কোথায় বেরিয়েছ হয়তো। সে কলকে বের করে গাঁজা ধরায়।কয়েক টান দেওয়ার পর খাটে এসে শোয়। বাপের ঝাপসা ফটোর দিকে তাকিয়ে একটা ঘোরের মধ্যে ডুবে যায়। হয়তো এভাবেই পড়েছিল কতক্ষণ। হঠাৎ তার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। বাপ যেন ফটো থেকে বেরিয়ে তার পাশে এসে দাঁড়ায়। খোকা, কী ভাবচিস ?
কী আর ভাবব ? হয়তো তারা আসতে পারে আজ।
আমি বুজেচি। ঘাবড়াস নে।
ঘাবড়ানি। তবে তুমি দেখা দিলে কেন ?
সে এক কথা।
কী কথা ?
আমার ওস্তাদ রোমজান বাজিগর ছিল কামেল লোক। সেদিন চাঁদের চৌদ্দ তারিখ ছিল ভাগ্য রজনী। পূর্ণিমার চাঁদের দিকে তাকিয়ে বলেছিল এই ত্রিকালদর্শী জ্ঞানীকে তোর হাতে তুলে দিচ্চি অমর্যাদা করবি নে। তোর মান রাখবে।
আমি তো তোমার মতো জান বাজি রেখে খেলা দেখাতে পারি নে।
তাতে কী হয়েছে ? আজগে খেলায় তোর জিত হবে।
বাপের সঙ্গে কথাবার্তা সেরে স্বপ্নের ঘোরের ভেতর যেন সে পাশ ফিরে শোয়।
ওদিকে রাত নেমেছে আর পৃথিবী জুড়ে অমাবস্যা। এমন তো হওয়ার কথা না। শহরে কখনো রাত হয় না অথচ আজ লোড শেডিং? তাদের আরো অবাক করে দিয়ে হ্যাজাকের মতো বড়ো বড়ো আলো নিয়ে এক শোভাযাত্রা এসে থামে সেখানে। দেবতার মতো একজন সবচেয়ে দামি গাড়ি থেকে নেমে আসে। এই প্রথম যেন তারা ঈশ্বরের মুখোমুখি হয়। তাদের আর বিভ্রম থাকে না।
কার ঠেলায় ঘুম ভেঙে যায়। ঘরের ভেতর আবছা আঁধারে কে যেন দাঁড়িয়ে। বেশ কিছুক্ষণ পর চোখ সইয়ে নিয়ে বলে,মালেকা নাকি ?
কেন, গাঁজা টেনে চোখের মাথা খেয়েচ নাকি ?
তুই এইচিস, ভালো হয়েচে। আমরা এই আঁধারে পালাব।
অত আদিখ্যেতা করতি হবে না। তোরে ডাকতি এইচি।
কেন ?
তেনারা সব এসে গেচেন।
তা আমি গে কী করব ?
গুষ্টির পিণ্ডি করবি।
এরাম বলচিস কেন ?
তা আমি কি জানি ? বস্তির লোক চলে যেতি চেয়েছেল তুই নাকি তাদের থাকতি বলিছিস।
সে তো এক কথার কথা। আমি কারো লুঙ্গি ধরে টেনে রেকেচি ?
আমি অতশত জানি নে। ওরা ডাকচে চল।
তুইও শেষ পজন্ত ওদের দলে হয়ে গেলি। কাঁদো কাঁদো গলায় বলে ফজলু।
ভয় করিস নে। আমি তোর সঙ্গে থাকব।
তাহলি চল। খাট থেকে নেমে সে একটা পুরোনো তাপ্পি দেওয়া আলখাল্লা পরে।
মালেকা অবাক হয়ে বলে, ও কী করচিস ?
দ্যাক না কী করি ? ততক্ষণে মাথায় তোরঙ্গ চাপিয়ে নিয়েছে।
এখন কি ভেলকিবাজির সময় ? ভয়ানক বিরক্ত হয় মালেকা।
তার কথার জবাব দেয় না ফজলু। ঝুপড়িখানা থেকে বেরিয়ে একটু থমকে দাঁড়ায় সে।কিছু যেন একটা বাদ পড়ে যাচ্ছে।
আবার কী হল ? ভুরু কোঁচকায় মালেকা। এবারও কোন জবাব আসে না।
ফজলু ঘরে ঢুকে বাপকে সেলাম করে। তারপর বেরিয়ে হনহন করে হাঁটা দেয়।
রাত গভীর। অন্য কোন গাড়িঘোড়া নেই। বস্তির জটলা তাকে পথ ছেড়ে দেয়। সে সামনে এসে দাঁড়াতে সেই ঈশ্বরের মতো লোকটা বলে, আপনি তো তৈরি হয়ে এসেছেন ওরা কিন্তু সব অন্য কথা বলছে।
মাথা থেকে তোরঙ্গ নামিয়ে সে বিরাট এক সেলাম ঠোকে, স্যার, আপনি যে সন্মান দিয়ে কথা বললেন তা জীবনে এই প্রথম।আপনার কথা অমান্যি হবে না।
আমরা কোন দ্বন্দ্বের মধ্যে যেতে চাইনা। নেহাত অতিমারি এসে গেল বলে এমন কুচ্ছিত সিদ্ধান্ত নিতে হল। ঈশ্বরের মতো লোকটার নাম জগদীশবাবু।
স্যার আপনাদের আতঙ্ক আমরা বুঝি। তবে এত লোক লস্কর যন্ত্রপাতির দরকার নেই।
আমরা তাহলে চলে যাব ? বিস্মিত কণ্ঠস্বর।
সে কথা বলি নি ?
তবে ?
আমরাও কোন অশান্তি চাই নে। আপনাদের কাজের সমাধান হয়ে যাবে।
কিন্তু কোদাল গাঁইতি পে-লোডার ছাড়া কীভাবে হবে ?
স্যার,সারারাত পড়ে আছে এখন একটু যদি সময় দেন। ফজলু যেন তাঁর যান্ত্রিক কথায় কান দেয় না।
আপনি কী করবেন ?
আপনি আমাকে যতটা সন্মান দিয়েছেন ততটা যদি সুযোগ দেন।
তিনি একটু চুপ করে যান। লোকটার মতলব কী ? শেষ পর্যন্ত তীরে এসে তরী ডুববে ? বিষণ্ণ হয়ে যান। রক্তপাতহীন অপারেশানের কৃতিত্ব বোধহয় তাঁর কপালে নেই।তিনি গম্ভীর গলায় বলেন, আপনি কি আরও লোকজন ডাকবেন ? মিডিয়ায় খবর দেবেন ?
কী যে বলেন, স্যার! এই বাক্স ছাড়া আমার কিছু নেই।
কী আছে ওতে ? জগদীশবাবুর সন্দেহ জাগে। যা কোন অস্বাভাবিক নয় এখানে। বোমা পিস্তল ভাইরাস তো স্বাভাবিক।
সেটাই তো দেখাব। তোরঙ্গের ডালা খোলে ফজলু।
বলা যায় না। তিনি ডান পকেটে হাত ঢুকিয়ে পিস্তলটা চেপে ধরেন। লোকটা বাক্সের ভেতর থেকে যা বের করে তাতে হাতের মুঠো আলগা হয়ে যায়। লোকটা যাদুকর নাকি ? তিনি একটু লঘু হলেন। কৌতূকের সঙ্গে বলেন, ম্যাজিক নাকি?
আজ্ঞে না।
তবে ?
আমাদের জীবনের ভেলকিবাজি ।
আপনাদের জীবন চন্দ্র সূর্য দিন রাতের মতো বাস্তব নয় ? জগদীশবাবু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন।
স্যার,আপনি বিচার করুন।
ঠিক আছে দেখি আগে।
লম্বা টানা কালো কাপড় বস্তির সামনে টাঙিয়ে দেয় ফজলু। স্যার,এবার কী দিকচেন ?
এ আপনার বড়ো কাঁচা কাজ।অদৃশ্য করলে কি উচ্ছেদ হয় ?
বেশ বলেচেন। ফজলুর কথায় তাঁকে সমর্থন। এবার আপনারা মাঝখানে তাকান মাত্তর পাঁচ মিনিট। সবাই সেদিকে তাকায়।চারশো চল্লিশ ভোল্টের মতো সেখানে চুন রং দিয়ে নরকঙ্কাল আর হাড়গোড় আঁকা। ফজলু আকাশের দিকে তাকিয়ে কী সব বিড়বিড় করে আর ডান হাতে রাখা জ্ঞানী খুলি তার চারপাশে বাতাসে হেলে দুলে ঘুরতে থাকে। ফজলুও ঘুরপাক খায় তার সঙ্গে।
এক সময় থেমে যায় সেই খুলি। ফজলু এক অপার্থিব গলায় হাঁক দেয়, পর্দা সরা। বিশু আর কালু দুদিক ধরে রেখেছে। তারা হাত নামায়।
হ্যাজাকের মতো আলোগুলো আরো দম নিয়ে জ্বলে ওঠে। ফজলু জগদীশবাবুর দিকে তাকিয়ে বলে, স্যার, কী দেকচেন ?
তিনি হাই তুলতে তুলতে বলেন, এ আর নতুন কী ? তোমরা যা সৃষ্টি করেছ তা শেষ করেছ।
ফজলু কাঁচুমাচু খেয়ে বলে, কিন্তু আপনার কাজ তো হয়ে গেল।
তা হয়েই যেত। জগদীশ যেন একটু তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলেন।
আপনার কথা অবশ্য ঠিক। তবে আরেকটা কথা ছিল, স্যার।
আবার কী কথা ? তিনি মোবাইলে সময় দেখেন, রাত প্রায় শেষ হয়ে এল।
আরেকবার যদি সুযোগ দেন।
তুমি আবার পুরোনো জিনিসে ফিরে যাবে ?
ফিরে যাব তবে নতুনে। আমার জ্ঞানী মানুষ তাই বলচে।
কে তোমার জ্ঞানী লোক ?
সে তিন কালের কথা জানে।
ওসব বুজরুকি রাখো। তোমাকে অবশ্য একটা সুযোগ দিচ্ছি তবে একটা শর্ত আছে।
কী শর্ত, স্যার ?
নতুন বলছ তা যেন আমাকে অবাক করে।
চেষ্টা করব তবে অবাক হওয়ার পালা আপনার।
বস্তির লোক হৈ হল্লা শুরু করে,তাদের যখন সব হারিয়েছে তখন আর এখানে অপেক্ষা কেন ? কোথায় কতদূর পাড়ি দিতে হবে কে জানে ?
জগদীশবাবু এবার এগিয়ে এসে হাত জোড় করে বলেন,আপনারা একটু শান্ত হোন।
সব হারিয়ে মানুষ কি মাথা ঠান্ডা রাকতি পারে ? চিঁচিঁ গলায় বলে শুঁটকি বিবি।
কিন্তু আমরাও একটা কাজে এসেছি।
আমাদের উচ্ছেদ করা তো আপনাদের কাজ।
শহরের মানুষের আতঙ্ক দূর করা আমাদের কাজ। সঙ্গে আছে সেপাই পুলিশ।
আপনি আমাদের ভয় দেকাচ্চেন ? জটলার মধ্যে থেকে কে একজন বলে ওঠে।
শহর আপনাদের ভয় পাচ্ছে।
কেন, স্যার ? বিশু জিজ্ঞেস করে।
অতিমারি এখান থেকে শহরের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ার আভাস রয়েছে।
স্যার, আমরা এই বস্তি থেকে কোথাও যাই নি। আমরা এই মারিকে ডেকে আনি নি।
সেসব তদন্ত সাপেক্ষ। জগদীশবাবু কঠিন গলায় বলেন।
চুপ বিশু। তর্ক করিস নে। কারোর বিরুদ্ধে আমাদের কোন ক্ষোভ বিক্ষোভ নেই। আবার আগের মতো যাদু কাপড় ধরে দাঁড়া। ফজলু এক অদ্ভুত গম্ভীর গলায় বলে যা অমান্য করার সাহস হয় না তার।
আবার সেই একই খেলা। খেলা শেষে জগদীশবাবু বলেন, ভগবানের দোহাই, এ আপনি কী করেছেন!
স্যার, আপনি অবাক হন নি ?
এ নকশা কোথায় পেলেন ?
আপনার পছন্দ হয় নি ?
আপনি যে পার্ক তৈরি করেছেন তা আমাদের গোপন ডিজাইনের সঙ্গে হুবহু মিলে গেছে। আপনি কে বলুন তো ? বিস্মিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করেন জগদীশবাবু।
ফজলু সেলাম ঠুকে বলে, স্যার, আমি একজন সামান্য বাজিগর। যা করেচে তা এই জ্ঞানী মানুষের দূরদৃষ্টি। করোটির চক্ষুহীন জোড়া গহ্বরের দিকে তাকিয়ে বলে। তত’খনে ডান হাত থেকে বাঁ হাতে পরম শ্রদ্ধায় ধরে রেখেছে তাকে।
তা সে যাই হোক আপনি কিন্তু অসামান্য কাজ করেছেন।
চলমান শহরের বাইরে তাদের জীবন। সামান্য বা অসামান্য যাই হোক না কেন আলো আঁধারির মায়াময় জগত তাদের। দধীচির মতো বুকের হাড় দিয়ে তৈরি করে স্বর্গের প্রাচীর। অক্লেশে নিজেকে ছুঁড়ে দেয় তার বাইরে।
রাত ভোর হয়ে এসেছে। জগদীশবাবু দলবল নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন। লোডশেডিং কেটে গেছে, স্তম্ভে স্তম্ভে আলোর ছড়াছড়ি।সবাই হতবাক হয়ে ফেলা আসা জায়গার দিকে তাকায়। রুপোর ঘাসে মোড়া উদ্যান। গাছে গাছে সোনার পাখি। দেব শিশুরা সব খেলা করছে।
জিনিস পত্তর সব গুছিয়ে নেয় ফজলু। তোরঙ্গটা মাথায় নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। মালেকা জিজ্ঞেস করে,কোথায় যাবি ?
যেখান থেকে এসেছি সেখানে ফিরে যাব।
সে তো এখন বেহেস্তের বাগান।
আমরা তো সেখান থেকে আসি নি।
বিশু এতক্ষণ বসে ছিল। সেও উঠে দাঁড়ায়। বলে, ফজলু ঠিক বলেছে।আস্তে আস্তে সবাই মাথা নাড়ে।
জ্ঞান বৃদ্ধ মানুষটির অনেক ধকল গেছে। বোধহয় সে তোরঙ্গের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে। ফজলু আপন মনে বকবক করতে করতে হাঁটছে।তার পেছন পেছন বাকি সবাই। শহর কখন ফুরোবে কে জানে ? রাত কাবার হওয়ার আগে আবার অন্য এক অন্ধকার জগত খুঁজে নিতে হবে। ভাইরাস ছড়ানোর কলঙ্ক নিয়ে দ্রুত পা চালায় তারা।
♦♦♦ ♦♦♦ ♦♦♦ ♦♦♦
লেখক, পেশায় সুপরিচিত চিকিৎসক। কলকাতার বাসিন্দা।
❤ Support Us








