Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • মে ২২, ২০২২

‘মহাকাব্য’-এর কবিকে কুর্নিশ

যে অগ্নিবীণা তিনি আমাদের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন সেটা বাজানোর দায়িত্ব আমাদের

শাহজাহান মণ্ডল
‘মহাকাব্য’-এর কবিকে কুর্নিশ

ধুমকেতু পত্রিকায় নজরুল স্বাক্ষরিত আলোকচিত্র

আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস,
আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ।

বাংলার কাব্য আকাশে যখন নোবেলজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একছত্র আধিপত্য ঠিক সেই সময়ে সেই আকাশে ধুমকেতুর মতো আবির্ভাব হলো এক তরতাজা যুবকের। নাম তাঁর কাজী নজরুল ইসলাম। বিদ্রোহী সত্তা নিয়েই তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শৈশব থেকেই দারিদ্রের সাথে বিদ্রোহ করতে করতে তাঁর জীবনের পথচলা শুরু, এবং সারাটা জীবন তিনি দারিদ্রতার সঙ্গেই লড়াই করে গেছেন, তাই তো তিনি মহান। শুধু জীবন যুদ্ধ নয়, সারাটা জীবন তিনি লড়াই করে গেছেন সমাজের অন্ধ কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে, নারী পুরুষ বৈষম্যের বিরুদ্ধে, বর্ণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে, জাতপাতের বিরুদ্ধে, মৌলবাদের বিরুদ্ধে, অসাম্যের বিরুদ্ধে। তিনি লড়াই করেছেন ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে, ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। সর্বোপরি অত্যাচারী ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধে। শাসকের বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করে গান এবং কবিতা বাংলা সাহিত্যে নজরুল ইসলাম ছাড়া আর কোন কবি লিখেছেন বলে আমি মনে করি না। লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি কতটা প্রতিবাদী ছিলেন তাঁর ‘নারী’ কবিতা পড়লেই আমরা বুঝতে পারি। তাঁর লেখা ‘জাতের নামে বজ্জাতি’ কবিতা থেকে আমরা সহজেই অনুধাবন করতে পারি জাতপাতের বিরুদ্ধে তিনি কী কঠিন লড়াই করেছিলেন। আর সাম্যের কবি বলতে গেলে তো নজরুল ইসলামের নামই উচ্চারণ করতে হয়। সোজা কথা সোজা ভাবে বলা, অন্যায়কে সরাসরি অন্যায় বলা, নজরুল ইসলাম ছাড়া আর কোন কবি সাহিত্যিক করতে পেরেছেন কিনা সেটা আমরা সবাই জানি। অত্যাচারী ইংরেজ শাসকের চোখে চোখ রেখে সরাসরি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা সেটা একমাত্র নজরুল ইসলামই করে গেছেন। সাহিত্যচর্চার সাথে সাথে তিনি সরাসরি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনেও জড়িয়ে পড়েন। ফলে একদিকে তাঁকে যেমন কারাবরণ করতে হয় অন্যদিকে তাঁর বহু লেখা, কবিতা, গান ইংরেজ সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিল। এক সময় তিনি সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধ থেমে যাওয়ার পর তিনি আবার কলকাতায় ফিরে আসেন। কলকাতায় তিনি কমঃ মুজাফফার আহমেদের সাহচর্যে এলেন। এই সময় মুজাফফার আহমেদের অনুরোধে নজরুল ইসলাম সরকারি চাকরি গ্রহণ না করে পুরোপুরি সাহিত্যচর্চায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। অথচ সেই সময় তার সংসারে প্রচন্ড আর্থিক অনটন। পয়সার অভাবে সংসার চালানো দায়।

ঠিক এই সময় ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের এক রাত্রে নজরুল ইসলাম রচনা করলেন তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘বিদ্রোহী’। যে কবিতার জন্য তাঁর খ্যাতি বাংলার গন্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বের দরবারে ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্রোহী কবিতার মতো দ্বিতীয় আর একটা কবিতা তথা বাংলা সাহিত্যে আছে বলে আমার জানা নেই। এই কবিতার মাধ্যমে তিনি স্বর্গ, মর্ত, পাতাল, এই ত্রিলোক দাপিয়ে বেড়িয়েছেন, এবং এই ত্রিলোকে যেখানে যত অন্যায়, অনিয়ম, অত্যাচার দেখেছেন সবকিছু ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন। ত্রিলোকের যেখানে যত প্রেম, ভালোবাসা পেয়েছেন সেগুলোকে কবি বুকে জড়িয়ে ধরেছেন। বিদ্রোহী কবিতা শুধু একটি কবিতাই নয়, এটি একটি মহাকাব্য। তাই আমি নজরুল ইসলামকে অবশ্যই মহাকবি বলব। এই কবিতা তখনকার পরাধীন আপামর ভারতবাসীর রক্তে উন্মাদনার সৃষ্টি করেছিল, ব্রিটিশদের চোখের ঘুম হারাম করে দিয়েছিল। শুধু এই কবিতাটি পড়ার জন্য চারিদিকে এত আগ্রহ, এত উন্মাদনা দেখা গিয়েছিল যে ‘বিজলী’ পত্রিকার প্রকাশক এক সপ্তাহের মধ্যে পত্রিকার দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

এই কবিতায় কবি ‘আমি’ শব্দটি বহুবার ব্যবহার করেছেন। এই ‘আমি’ কথাটি দিয়ে তিনি একদিকে যেমন প্রতিটি ভারতবাসীকে বোঝাতে চেয়েছেন, ঠিক অপরদিকে এই শব্দটি দিয়ে তিনি প্রত্যেকের আমিত্বকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। প্রত্যেকের ভিতরের যে ঐশ্বরিক শক্তি, তাকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। তিনি প্রতিটি মানুষের কাছে আহ্বান করেছেন মাথা নত করে নয়, সবসময় মাথা উঁচু করে বাঁচতে। এবং এমনভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচবে যেন তোমার উন্নত মস্তক দেখে হিমালয় পর্বতও শ্রদ্ধায় মাথা নিচু করে থাকে।

এই কবিতাটি যেমন বিদ্রোহের কবিতা, ঠিক তেমনি এটি আত্ম উন্মোচনের কবিতা, সমাজ সংস্কারের কবিতা, অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার কবিতা। এটি যেমন যুব সমাজকে উদ্বুদ্ধ করার কবিতা ঠিক তেমনি এটি প্রেমের কবিতা, ভালোবাসার কবিতা। আমার মনে হয় নজরুল ইসলাম যদি আর কোন গান, কবিতা নাও লিখতেন তা হলেও শুধু এই কবিতার জন্য তিনি বিশ্বখ্যাত হয়ে থাকতেন।

বিদ্রোহী কবিতা রচনার একশ বছর পরে এসেও আমরা এর প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে চলেছি। যেমনভাবে গত একশ বছর ধরে শুধু এই কবিতার উপর আলোচনা, সমালোচনা, গবেষণা করে বহু বই লেখা হয়েছে — আমার দৃঢ় বিশ্বাস আগামী একশ বছর নয়, একশ গুণ একশ বছর ধরে চলবে কবির এই অমর সৃষ্টি ‘বিদ্রোহী’ কবিতা নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা, গবেষণা, কারণ আজও বঞ্চিত, নিপীড়িত, অবহেলিত, অত্যাচারিত মানুষের কান্না থামেনি। তাই আজও যেন শুনতে পাই কবি উদাত্ত কণ্ঠে বলছেন-
মহা-বিদ্রোহী, রণ-ক্লান্ত,
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না,
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।

যে অগ্নিবীণা তিনি আমাদের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন সেটা বাজানোর দায়িত্ব আমাদের। আমরা যারা নজরুল ইসলামকে ভালোবাসি বা ভালোবাসার চেষ্টা করি আমরা আমাদের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারি না। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মধ্যে দিয়ে কবি সমাজকে যে বার্তা দিতে চেয়েছিলেন সেই কাজকে বজায় রাখা এবং আরও ত্বরান্বিত করার দায়িত্ব আমাদের। আমরা সেই কাজ করে যাবো আগামী একশ নয় একশ গুণ একশ বছর ধরে।

♦–♦♦–♦♦–♦


❤ Support Us
error: Content is protected !!