- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- মে ২২, ২০২২
নজরুলের বয়স
মানুষ নজরুলের বয়স বাড়লেও, কবি নজরুলের বয়স সেই বয়ঃসন্ধিতেই থমকে গিয়েছিল।
নজরুলের কাছে আমাদের একটি ঋণস্বীকার আজও বাকি থেকে গেছে। আমরা একদা নজরুলকে পুরোপুরি গ্রহণ করেছিলাম। বলেছিলাম, তিনি আমাদের সেই তন্বী সাহিত্যাকাশের ধূমকেতু। নজরুলকে তারপর আমরা প্রায় পুরোপুরি বর্জন করলাম। বললাম, তাঁর প্রবেশ যেমন ধূমকেতুর মতো, প্রস্থানও তাই।
কিন্তু সম্পূর্ণ গ্রহণ কিংবা সম্পূর্ণ বর্জন কখনোই সত্যাশ্রয়ী নয়। নজরুল সম্পর্কে আমাদের প্রতিক্রিয়ায় তাই একটি মিথ্যাচার লুকিয়ে আছে। এই মিথ্যাচার আমাদেরই লজ্জা। তাছাড়া, নজরুলোত্তর সময়ে আরও অনেক অনেক কম মেধাবী কবিকে কি আমরা নজরুলের চেয়েও বেশি সম্মান দিইনি ? আজও কি দিচ্ছি না?
প্রতিটি যুগেরই এক একটি সংস্কার থাকে। খুব বড়ো প্রতিভা যাঁরা, তাঁরা যুগধর্মকে মেনে বা না-মেনে ব্যক্তিত্ববান হয়ে ওঠেন। নজরুলের কবিত্বে তাঁর যুগসংস্কার সকল বাহুল্য সমেত এক স্বচ্ছ আয়না খুঁজে পেয়েছিল। এই যুগধর্মই নজরুলের কবিব্যক্তিত্বে প্রাণসঞ্চার করেছিল অনেকাংশে।
নজরুল বয়ঃসন্ধির কবি। বাংলাভাষায় অনেক শিশুসাহিত্যিক আছেন ; নজরুল নিজেও খুব উঁচুদরের কিছু ছড়া-কবিতা ইত্যাদি লিখে রেখে গেছেন শিশুদের জন্য। কিশোর সাহিত্যিকের অভাব বাংলাসাহিত্যে সেই আদি-মধ্যযুগের পরে আর কখনোই হয়নি। বাদবাকি, আর সকলেই তো বড়োদের লেখক। কিন্তু, বয়ঃসন্ধির কবি, নজরুল ছাড়া, আমার জ্ঞানত, আর দু’জনই আছেন বাংলা ভাষায় : সুকান্ত ভট্টাচার্য ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। সুকান্ত আবার শিশুসাহিত্যও রচনা করছেন। আর কিশোর সাহিত্যিক হিসেবে, কাকাবাবু সিরিজের সুনীল তো রীতিমতন জনপ্রিয়। বড়োদের লেখক হিসেবেও তাই। কিন্তু সুনীলের অনেক কবিতা, অসংখ্য গল্প, আর ‘নীললোহিত’ ছদ্মনামে লেখা বেশিরভাগ উপন্যাসই বয়ঃসন্ধির সাহিত্য।
আসলে, বয়ঃসন্ধি যতটা না একটি বয়স, তার চেয়েও অনেক বেশি একটি মানসিকতার নাম । রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি ‘ গল্পে বয়ঃসন্ধির অসহায়ত্বের দিকটিই ফুটে উঠেছে। কিন্তু এর একটি সুন্দর, উজ্জ্বল দিকও রয়েছে। বস্তুত সৌন্দর্য এবং ঔজ্জ্বল্যই বয়ঃসন্ধির ধর্ম। এই বয়সে হৃদয় খুব প্রশস্ত থাকে। কারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি হিন্দু-মুসলমান ছেলেমেয়ের শৈশব-কৈশোর সাধারণত গৃহকাতর । বয়ঃসন্ধিতে এসেই তাদের মন প্রথম বাহিরের আবেদনে সাড়া দেয়। সেই প্রথম তাদের হৃদয়ে প্রেম আসে। সেই প্রথম তারা মা-বাবা-পূর্বপুরুষের চিনিয়ে-দেওয়া জগৎকে নিজের অভিজ্ঞতায় যাচাই-ঝালাই করে নিতে চায়। তাদের মনে চেনা বাস্তব সম্পর্কে প্রশ্ন জন্মায় । তাদের মন বাস্তবের রূঢ়তায় আহত হয়। এই আঘাতে বিদ্রোহের ভাব জন্ম নেয়। তারা বিবেকবান হতে শেখে। আবার, তাদের মধ্যে কেউ কেউ উচ্ছৃঙ্খলও হয়ে ওঠে। শৈশবের উচ্ছৃঙ্খলতার সঙ্গে এর তুলনা চলে না, কারণ শৈশবের উচ্ছৃঙ্খলতা কেন্দ্রচ্যুতি নয়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সর্বাংশে না হলেও প্রেমধর্মের ব্যাপারে এই বয়ঃসন্ধির কবি। ‘যে হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ / সে হাত কি কখনো পাপ করতে পারে?’ — এই পবিত্র প্রশ্নটির রূপকার যিনি, তিনি বয়ঃসন্ধির সাহসেরও রূপকার। নজরুলের সাহিত্যে এই একই সাহস একটি আবেগের তীব্রতায় আত্মপ্রকাশ করেছিল। ‘বলো বীর / চির উন্নত মম শির ।’ সেই যে, কিশোর-কবির আঠারো বছর বয়সের স্পর্ধা। নজরুলের বিদ্রোহ তারই এক পূর্বতন চেহারা। তফাত এই, সুকান্ত সাম্যবাদী, নজরুল মানবতাবাদী।
সুকান্তর কাব্যচর্চার পশ্চাদপট হিসেবে এক তাত্ত্বিক দূরদৃষ্টি কাজ করেছিল, নজরুলের ছিল কেবলই এক আবেগের মথিত দৃষ্টি। বস্তুত, আবেগই নজরুলের সাহিত্যে প্রজ্ঞাদৃষ্টির অপর নাম।
মানুষ নজরুলের বয়স বাড়লেও, কবি নজরুলের বয়স সেই বয়ঃসন্ধিতেই থমকে গিয়েছিল। মানুষ সুকান্তর বয়স যদি মৃত্যুর ছায়ায় হারিয়ে না যেত, তাহলে কবি হিসেবে তাঁর বয়স হয়তো বাড়ত। সুকান্তর কবিতায় এর সপক্ষে কিছু কিছু সাক্ষ্য আছে। কিন্তু নজরুলের বয়ঃসন্ধি বয়সের ভারকে মেনে নিতে পারেনি। রহস্যময়তা কিংবা সূক্ষ্মতা, দার্শনিকতা কিংবা নির্লিপ্তি এই তথাকথিত পরিণতিগুলির কোনোটিতেই কখনও ভেড়েনি তাঁর তরী। তাঁর অসংখ্য তেজোদ্দীপক কবিতায় , সংখ্যাহীন প্রেমের গানে , এমনকি তাঁর ধর্মীয় পদাবলীতেও আবেগই সর্বস্ব। এর প্রমাণ, তাঁর কিছু কিছু গানে যৌনতার অনুপ্রবেশ ঘটলেও তা কখনোই কামোদ্দীপক নয়, নেহাতই একটি ভাব মাত্র। নজরুলের অগ্রজ এবং অনুজ অনেক দেশি-বিদেশি কবিই আরও অনেক কম বয়সে যে প্রজ্ঞাদৃষ্টি বা নির্লিপ্তির বোধ লাভ করেছিলেন, নজরুলের ভাগ্যে তা জোটেনি। এটা কবি হিসেবে নজরুলের ব্যর্থতা নয়, বৈশিষ্ট্যই। নজরুলের জন্ম দিয়েছিল তাঁর সময় । তিনি তাঁর সমকালীন ইতিহাসের সন্তান ।
একদা রবীন্দ্রসাহিত্যপাঠে ক্লান্ত আমরা, নজরুলের কবিতায় নতুনত্বের সুর শুনে উজ্জীবিত হয়েছিলাম। সেই আমাদের তথাকথিত আধুনিকতাবাদের বয়ঃসন্ধিকাল। তারপর সেই আধুনিকতাবাদ দিনে দিনে পরিণত হয়েছে , প্রৌঢ় হয়েছে, এমনকি বেশ কিছু দিন ধরে তার মৃত্যুর কথাও আমরা শুনতে পাচ্ছি। আগেও আমাদের অনেকেই জানতেন, আজ আবার আমরা অনেকে নতুন করে বুঝতে পারছি, রবীন্দ্রনাথকে আমাদের কোনো আধুনিকতাবাদই আজ পর্যন্ত অতিক্রম করে যেতে পারেনি। তবু , নজরুল আমাদের গত শতাব্দীর আধুনিকতাবাদের বয়ঃসন্ধি— এ সত্য কিছুতেই ভোলার নয়।
নজরুলের কাছে আমাদের একটি ঋণস্বীকার আজও বাকি থেকে গেছে। এই ঋণস্বীকার তখনই সম্পন্ন হবে যখন আমরা অকুণ্ঠিতচিত্তে মেনে নিতে পারব যে নজরুল বয়ঃসন্ধির কবি এবং আমাদের তথাকথিত আধুনিকতাবাদেরও বয়ঃসন্ধি তাঁকে দিয়েই শুরু। এই আধুনিকতাবাদের আঁতুড়, কী আশ্চর্য, সেই রবীন্দ্রনাথই যিনি নিজে আবার এই আধুনিকদের সর্বাংশে মেনে নিতে পারেন নি।
♦–♦♦–♦♦–♦
❤ Support Us








