Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • মে ২২, ২০২২

নিঃশব্দ বিস্ফোরণ

কবিকে বিদ্রুপ করে--কবি গোলাম মোস্তাফা ‛সওগাত’ পত্রিকায় ‛নিয়ন্ত্রিত’ নামে একটি কবিতায় লিখেছিলেন-- ওগো “বীর।” সংযত কর, সংহত কর “উন্নত” তব শির।

শেখ কামাল উদ্দীন
নিঃশব্দ বিস্ফোরণ

সত্যজিতের আঁকা নজরুল চিত্র

‛আজি হতে শতবর্ষ পরে
কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি
কৌতূহলভরে,
আজি হতে শতবর্ষ পরে!’

(১৪০০ সাল)- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

অনেকে কেন, স্বয়ং নজরুল-ই তো নিজেকে বলেছিলেন হুজুগের কবি–
‛পরোয়া করিনা, বাঁচি বা না-বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে!’
না, তিনি বেঁচে আছেন, খুব ভালো ভাবে বেঁচে আছেন পাঠকের ‛অন্তরে-বাহিরে’। আছেন বলেই দিন দিন তাঁকে নিয়ে আলোচনা। আর এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবশ্যই ‛বিদ্রোহী’ কবিতা।

একদা শীতের ভোরে ভালো কাগজপত্র ছাড়াই কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন ‛বিদ্রোহী’। অরুণকুমার বসু তাঁর ‛নজরুল জীবনী’-তে লিখেছেন–
‛তারপর ১৯২১-এর ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে কলকাতার তালতলা লেনের বাসাবাড়িতে একদিন একটি নিঃশব্দ বিস্ফোরণ ঘটল। সম্ভবত শেষরাতে অথবা ভোরের দিকে শীতের হিমার্ত হাওয়াকে উপেক্ষা করে ভিতরকার কোনো এক অলৌকিক তাপ নজরুলকে অস্থির করে তুলল। হাতের কাছে কি ভালো কাগজকলম ছিল?  হয়তো তাও না। একটা খাতা আর কপিইং পেন্সিল নিয়েই যেন মন্ত্রচালিতের মতো তিনি লিখতে শুরু করে দিলেন:
বল  বীর
বল  উন্নত মম শির!

তারপরের ঘটনা ইতিহাস।একটা কবিতা লিখে তিনি বন্দিত হলেন ‛বিদ্রোহী’ কবি বলে। সমকালে অন্তত চারটি পত্রিকাতে কবিতাটি মুদ্রিত হয়েছিল– সাপ্তাহিক ‛বিজলী’-র ১৩২৮-এর পৌষ সংখ্যায়, ওই বছরের ‛প্রবাসী’-র মাঘ সংখ্যায়, ১৩২৮-এর ‛মোসলেম ভারত’-এর কার্তিক সংখ্যায় এবং ১৩২৯-এর ‛সাধনা’-র  বৈশাখ সংখ্যায়। এমন উদাহরণ বাংলা সাহিত্যে বিরল। কবি নন্দিত হলেন তরুণ প্রগতিশীলদের কাছে। অফুরান প্রাণশক্তিতে ভরপুর রাজনৈতিক কর্মী, গুপ্ত সমিতির তরুণ সদস‍্যদের কাছে এই কবিতা মন্ত্রের মতো কাজ করল। হুগলি থেকে বিপ্লবী তরুণদ্বয় বিজয় মোদক ও হামিদুল হক কলকাতায় ছুটে এলেন কবির সঙ্গে দেখা করতে।

অন‍্যদিকে নিন্দিত হলেন ‛কূপমণ্ডূক’-দের কাছে। রচিত হলো একের পর এক প‍্যারোডি, কবিকে বিদ্রুপ করে–কবি গোলাম মোস্তাফা ‛সওগাত’ পত্রিকার ১৩২৮-এর মাঘ সংখ‍্যায় ‛নিয়ন্ত্রিত’ নামে একটি কবিতায় লিখেছিলেন–
ওগো “বীর।”
সংযত কর, সংহত কর “উন্নত” তব শির।
১৩২৯-এর ‛ইসলাম দর্শন’ পত্রিকায় সম্পাদক আবদুল হাকিম ‛বিদ্রোহদমন’ নামে এক অপভ্রষ্ট খেউড়ে লিখেছিলেন–
ওগো   বীর
অসংযত বিদ্রোহী অধীর।
ওই পত্রিকাতেই ওই বছরের অগ্ৰহায়ণ সংখ‍্যায় ‛প্রলয়ের ভেরি’ নামে একটি বিদ্রুপাত্মক প‍্যারোডিতে লিখলেন–
তুমি   অহংকার মত্ত ইবলিস!
তুমি   রুদ্র পিশাচ শয়তান খাবিস!
একটি কবিতাকে কেন্দ্র করে এতগুলি প্যারোডি রচনাও একটি ইতিহাস। যাঁরা প্যারোডিগুলি লিখেছিলেন তাঁরা অবশ্যই কবিতাটি মন দিয়ে পড়েছিলেন এবং তাঁদের লেখায় নজরুলের ‛বিদ্রোহী’ কবিতার একাধিক শব্দ সংযোজিত হয়েছিল। এর দ্বারাই প্রমাণিত হয় কবিতাটি সকল স্তরের মানুষের মনে কী বিপুল সাড়া ফেলেছিল!
একটি কবিতায় একটি শব্দ ‛আমি’ মোট ১৪৩  বার ব‍্যবহৃত হলো, বাংলা সাহিত্য কেন, বিশ্বসাহিত্যেও এর নজির মেলা ভার।
এই ‛আমি’ কে? দেখা যাক–

‘আমি   চির-উন্নত শির’
‘আমি   বিদ্রোহী’
‘আমি   হাম্বীর’
‘আমি   ছায়ানট’
‘আমি   চপলা চপল হিন্দোল’
‘আমি   চির দুর্দম’
‘আমি   নটরাজ’
‘আমি   সাইক্লোন’
‘আমি   ধ্বংস’
‘আমি   মহাভয়’
‘আমি   দুর্বার’
‘আমি   অনিয়ম উচ্ছ্বঙ্খল’
ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার
‘আমি   বন্ধন-হারা কুমারীর বেণী’
‘আমি   ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম-উদ্দাম’
‘আমি   শ‍্যামের হাতের বাঁশরী’
‘আমি   থর-থর-থর প্রথম পরশ কুমারীর’
‘আমি   গোপন-প্রিয়ার চকিত চাহনি’
‘আমি   চপল মেয়ের ভালোবাসা’
ইত্যাদি ইত্যাদি।

একই কবিতায় কবির এই দ্বৈতসত্তার ব‍্যাখ‍্যা সিগমুন্ড ফ্রয়েডের তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করেছেন অধ্যাপক শেখ মকবুল ইসলাম–
‛সমগ্ৰ বিদ্রোহী কবিতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, কবির সৃজনী সত্তা ও বিধ্বংসী সত্তা উভয়ের প্রকাশ রয়েছে’
‘নজরুল নানা মাত্রা’

আমরা জানি নজরুল বিদ্রোহের কবি, কেননা আমাদের সেইভাবে শেখানো হয়েছে, পড়ানো হয়েছে।
তাই!
নজরুল শুধু বিদ্রোহের কবি?
তিনি প্রেমের কবি নন!
‛যেদিন আমায় ভুলতে গিয়ে
ক’রবে মনে, সেদিন প্রিয়ে
ভোলার মাঝে উঠব বেঁচে, সেই তো আমার প্রাণ!
নাইবা পেলাম, চেয়ে গেলাম, গেয়ে গেলাম গান!’
গোপন-প্রিয়া

তিনি সাম‍্যের কবি নন!
‛গাহি সাম‍্যের গান—
যেখানে আসিয়া এক হ’য়ে গেছে সব বাধা-ব‍্যবধান।’
সাম‍্যবাদী 

আর মাঝে মাঝে বলা হয় তিনি অসম্প্রদায়িক কবি।
তাই!
আর কিছু নয়?
তিনি শ্রমিকের কবি নন !
‛ঘোর  —
ঘোর  রে ঘোর ঘোর রে আমার সাধের চরকা ঘোর ওই  স্বরাজ-রথের আগমনি শুনি চাকার শব্দে তোর।’
চরকার গান 

তিনি কৃষকের কবি নন !
‛ওঠ  রে চাষী জগদবাসী ধর কষে লাঙল
আমরা মরতে আছি ভালো করেই মরব এবার চল।।’
কৃষকের গান

তিনি ‛কুলি মজুর’-এর কবি নন !
‛দেখিনু সেদিন রেলে,
কুলি ব’লে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিলে নীচে
ফেলে!
চোখ ফেটে এল জল,
এমনি ক’রে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?’
তিনি ‛ছাত্রদলের’ কবি নন !
‛আমরা শক্তি আমরা বল
আমরা ছাত্রদল।
মোদের     পায়ের তলায় মূরছে তুফান
ঊদ্ধে বিমান ঝড়-বাদল।’
ছাত্রদলের গান

তিনি মৎস্যজীবীর কবি নন! বলা হয় এসব! কেন বলা হয়? সেকথা স্বতন্ত্র ।
যাই হোক, ফিরে আসি ‛বিদ্রোহী’-র কথায়।

‛বিদ্রোহী’-তে বিদ্রোহ কার বিরুদ্ধে, কিসের বিরুদ্ধে? একবার দেখে নেওয়া যাক–
তিনি উৎপীড়ন ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কথা বলেছিলেন। কবির জবানিতে ছিল-
‛মহা-     বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত,
আমি     সেই দিন হব শান্ত,
যবে  উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে
বাতাসে/ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়্গ ও কৃপাণ ভীম রণ
ভূমে/ রণিবে না’
এই উদ্ধৃতিতে পরিষ্কার বোঝা যায় যেখানে অন্যায়, অত্যাচার, উৎপীড়ন তার বিরুদ্ধে কবির বিদ্রোহ। এখন প্রশ্ন হলো উৎপীড়নকারী ও অত্যাচারী কারা? স্বাভাবিকভাবেই সাম্যের বিরোধী যারা, তারাই উৎপীড়নকারী ও অত্যাচারী। কবি তাদের বিরুদ্ধে তাঁর বিদ্রোহের কথা বলেছিলেন। অশান্ত পৃথিবীতে শান্তি আনার জন্য ছিল তাঁর বিদ্রোহ। প্রয়োজনে তিনি এই বিশ্বকে ক্ষত্রিয়মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। যদি যুদ্ধবাজ ক্ষত্রিয়রা না থাকে, তাহলে পৃথিবীতে শান্তি আনয়ন সম্ভব হবে। কবির কথায়
‛আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার,
নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি/
শান্ত উদার!
মহাকাব্য সম্পর্কে বিশ্বনাথ কবিরাজ তাঁর বিখ্যাত ‛সাহিত্য দর্পণ’ গ্রন্থে জানিয়েছিলেন, মহাকাব্যের কাহিনি স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল ত্রিলোকব‍্যাপী হবে। বাংলা সাহিত্যে মাইকেল মধুসূদন দত্তই প্রথম ও সার্থক মহাকাব্য রচয়িতা হিসেবে খ্যাত। মধুসূদন একদা বলেছিলেন, বিশ্বনাথ কবিরাজের শর্ত তিনি মানবেন না, যে শর্তে বলা ছিল যে মহাকাব্য হতে গেলে কাব্যের পরিধিকে ত্রিলোক ব্যাপী বিস্তৃত হতে হবে । যদিও শেষ পর্যন্ত ‛মেঘনাদবধ কাব্য’-এর কাহিনি ত্রিলোকব্যাপী বিস্তৃত ছিল। পৃথিবীতে রাম-রাবণের যুদ্ধ, স্বর্গে দেবতাদের ষড়যন্ত্র, পাতালে বারুণী-লক্ষ্মী দেবীর প্রসঙ্গ এনেছিলেন। জানি না, তুলনা হয়তো বাতুলতা কিন্তু ‛বিদ্রোহী’ কবিতার কাহিনিতে কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বক্তব্য ত্রিলোকব‍্যাপী উপস্থাপন করেছেন। মর্ত‍্যের কথা বলতে গিয়ে তিনি একাধিকবার বলেছেন–
‛আমি মহামারী, আমি ভীতি এ ধরিত্রীর!’
‛আমি যৌবন-ভীতু পল্লীবালার আঁচর কাঁচলি নিচোর’  ‛আমি মরু-নির্ঝর ঝর ঝর আমি শ্যামলিমা ছায়া-ছবি’
‛আমি বসুধা-বক্ষে আগ্নেয়াদ্রি,বাড়ব-বহ্নি, কালানল’ ‛আমি ত্রাস সঞ্চারি ভুবনে সহসা’ ইত‍্যাদি।
আবার একই কবিতাতে তিনি একাধিকবার স্বর্গের প্রসঙ্গও এনেছেন। বলেছেন–
‛খোদার আসন ‛আরশ’ ছেদিয়া’
‛আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা-হুঙ্কার’
‛আমি দেব-শিশু’
‛ভয়ে সপ্ত নরক হাবিয়া দোজখ নিভে নিভে যায়/কাঁপিয়া’
‛আমি ছিনিয়া আনিব বিষ্ণু-বক্ষ হইতে যুগল কন্যা’ ‛আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি’ ‛আমি বিদ্রোহী ভৃগু ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন’
আবার পাতালের প্রসঙ্গও এই কবিতায় ঘুরে ফিরে এসেছে–
‛আমি কৃষ্ণ-কণ্ঠ মন্থন-বিষ পিয়া ব্যথা বারিধির’
‛ধরি বাসুকির ফণা জাপটি’
‛আমি পাতালে মাতাল’
এছাড়াও বেশ কয়েকটি পঙক্তিতে তিনি স্বর্গ-পাতাল-মর্ত-এর কথা একসঙ্গে বলেছেন। যেমন,
‛ছুটি ঝড়ের মতন করতালি দিয়া স্বর্গ মর্ত্য-করতলে’
‛আমি তাথিয়া তাথিয়া মথিয়া ফিরি স্বর্গ-পাতাল-মর্ত‍্য’

‛বিদ্রোহী’ কবিতা নিয়ে আরেকটি বিতর্ক রয়েছে। বিতর্কটি উসকে দিয়েছেন কবি মোহিতলাল মজুমদার। অভিযোগ, নজরুলের ‛বিদ্রোহী’ কবিতাটি মোহিতলালের ‛আমি’ নামক প্রবন্ধ থেকে গৃহীত। কারণ হিসেবে তিনি জানিয়েছেন, একদা মোহিতলাল তাঁর ‛আমি’ প্রবন্ধটি কাজী নজরুল ইসলামকে শুনিয়েছিলেন। কিন্তু একটি শোনা প্রবন্ধ থেকে একটি স্বতন্ত্র কবিতা লেখা এবং বহুদিন পরে, সেটি গ্রহণীয়! আবার একথাও সত্য যে মোহিতলালের ‛আমি’ প্রবন্ধটি এর ‛অভয়ার কথা’ নামে একটি রচনার প্রেরণায়, অনুসরণে লিখিত। তাহলে মোহিতলাল কি করে নজরুলের প্রতি এই অভিযোগ আনতে পারেন? যেখানে তাঁর প্রবন্ধটিই আর একটি প্রবন্ধের অনুকরণ বা অনুসরণে লেখা! সুতরাং মোহিতলালের এই তথ্য মেনে নেওয়া পাঠকের পক্ষে কঠিন।

তবে ‘বিদ্রোহী’-র শতবর্ষ পরেও সমাজে অন্যায়, অবিচার, অত্যাচার, বঞ্চনা, শোষণ রয়ে গেছে বা বলা চলে তার মাত্রা বেড়ে গেছে। ফলে কবি যে বলেছিলেন তিনি ‘রণ ক্লান্ত’, তিনি সেই দিন শান্ত হবেন যেদিন ‘‛অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ ভূমে রণিবে না’ তা সম্ভব হয়নি। এখনো বিশ্বব্যাপী শক্তিধর দেশগুলি তথা সম্প্রদায়গুলি তুলনায় কম শক্তির অধিকারী দেশ বা সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি অত্যাচার, অবিচার চালিয়ে যাচ্ছে। শান্ত হওয়ার লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। আমরা একালের পাঠকেরা সেই দিনই প্রকৃত অর্থে শান্ত হব এবং কবিকে তিনি যেখানেই থাকুন না কেন শান্ত রাখতে পারব যখন জাতপাত সম্প্রদায় নির্বিশেষে একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ে উঠবে। তাহলেই আর ‘‛বিদ্রোহী’ কবিতার শতবর্ষে কবির প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করা সম্ভব হবে।

♦–♦♦–♦♦–♦


❤ Support Us
error: Content is protected !!