Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • মে ২২, ২০২২

শতবর্ষে ‘বিদ্রোহী’-র পুনর্পাঠ

বিদ্রোহী কবিতা কোনো নৈরাজ্য সৃষ্টির জন্য রচিত হয়নি, এ ছিল যুগের কথা

সৈয়দ কওসর জামাল
শতবর্ষে ‘বিদ্রোহী’-র পুনর্পাঠ

চিত্র: আরম্ভ আর্কাইভ

বিদ্রোহী কবিতা রচিত হয়েছিল ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে । পরের বছর জানুয়ারিতে প্রায় একই সময়ে প্রকাশিত হয়েছিল সাপ্তাহিক ‘বিজলী’ ও মাসিক ‘মোসলেম ভারত’-এ। একশো বছর পর এই কবিতাটি পুনর্পাঠের আগে অবশ্যই স্মরণ করে নেওয়া উচিত সেই সময়ের উত্তাল রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিকে। মহাত্মা গান্ধীর ডাকে অসহযোগ আন্দোলনে আলোড়িত হয়েছে গোটা দেশ। এমাসেই গ্রেফতার হয়েছিল দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। তখন ২২ বছর। যুদ্ধ ফেরত তরুণের মনে তখন প্রবলভাবে উপনিবেশিকতাবাদ বিরোধী ক্ষোভ– শোষণ ও সাম্প্রদায়িকতার বিভেদকামী শক্তির বিরুদ্ধে সংক্ষুদ্ধ প্রতিবেদী চেতনা তাঁকে অস্থির করছে। আর অদ্ভুত সমাবর্তনের মতো সাম্যবাদী চেতনায় উদ্ধুব্ধ মুজফফর আহমদ নজরুলের নিরাশ্রয় জীবনে সহায় হয়েছেন। ইউরোপের ধনলোভী উন্মাদনার বিপরীতে সংগঠিত হয়েছে রুশ বিপ্লবের মতো শোষণমুক্তির যুগন্তকারী ঘটনা। এই প্রেক্ষিতে নজরুলের নিজস্ব জীবনবোধ ও বিপ্লবীচেতনা। মধ্যবিত্তসুলভ দোলাচল ছিল না তাঁর মধ্যে তাই বেপোরোয়া যৌবনের উদ্দাম আবেগ তাঁর পক্ষে ঢেলে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল শোষণের বিরুদ্ধে, ধর্মব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে নিপীড়কের বিরুদ্ধে। অসাম্যের বিরুদ্ধে। এই দ্রোহ প্রাণের আবেগে প্রকাশ পেয়েছিল ‘বিদ্রোহী’ কবিতায়। এই কবিতা রচনার সময় নজরুল আবেগজড়িত হয়েছিলেন । যে আগ্নেয়গিরির মতো স্বতঃস্ফূর্ত ঝরে পড়েছিল। তখন তিনি থাকতেন ৩/৪ সি তালতলা লেনের বাড়িতে।

মুজফফর আহমদ আমাদের জানিয়েছেন: আজ নজরুল আর আমি নীচের তলায় পূবদিকের, অর্থাৎ বাড়ীর নীচের তলার দক্ষিণ-পূর্ব কোনের ঘরটি নিয়ে থাকি। এই ঘরেই কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বিদ্রোহী কবিতাটি লিখেছিল। সে কবিতাটি লিখেছিল রাত্রে। রাত্রির কোন সময়ে তা আমি জানিনে। রাত দশটার পর আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে মুখ ধুয়ে এসে আমি বসেছি এমন সময় নজরুল বলল, সে একটি কবিতা লিখেছে। পুরো কবিতাটি সে তখন আমায় পড়ে শোনালো। এখন থেকে চুয়াল্লিশ বছর আগে নজরুলের কিংবা আমার ফাউন্টেন পেন ছিল না। দোয়াতে বার বার কলম ডোবাতে গিয়ে তার মাথার সঙ্গে তাঁর হাত তাল পাবে না। এই ভেবেই সম্ভবত সে কবিতাটি প্রথমে পেন্সিলে লিখেছিল।

                                                                                 (মুজফফর আহমদ, কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা )

এই দ্রোহ, এই বিদ্রোহ একদিনে কবির মনে তৈরি হয়নি। এর প্রস্তুতি ছিল চেতন বা অবচেতনে। তাই ১৩৯-পঙক্তির এই দীর্ঘ কবিতাটি একটানা, বিনা আয়াশে উৎসারিত হয়েছিল। এই কবিতাটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে এত আলোড়ন তুলেছিল যে বিদ্রোহী শব্দটি নজরুলের নামের সঙ্গে অভিধা হয়ে যুক্ত হয়ে গেছিল। যেন এই বিশেষণটিই নজরুলের একমাত্র পরিচয়, এ তাঁর কবিমানসের একমাত্র পরিচয় হয়ে উঠেছে । অথচ তিনি যে শুধু বিদ্রোহী ছিলেন তা  নয়,  তিনি প্রেমিকও−এক হাতে তাঁর বাঁশের বাঁশারি, আর হাতে রণতূর্য− এই ঘোষণাও তিনি করেছেন। আসলে এই দুই পরিচয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ ছিল না তাঁর কাছে। তিনি তো কবি, রাষ্ট্র ও সমাজে পরিবর্তন চেয়েছিলেন যাতে সবকিছু সুন্দর হয়ে ওঠে, পৃথিবীতে ভ্রাতৃত্বে ও প্রেমের পরিবেশ তৈরি হয়। তাঁর বিদ্রোহী কবিতা কোনো নৈরাজ্য সৃষ্টির জন্য রচিত হয়নি, আর তা তাঁর ব্যক্তিগত আকাঙ্খার কথাও নয়, এ ছিল যুগের কথা। তাঁর কথা একদিকে যেমন দেশীয়, তেমনি আন্তর্দেশীয়, ফলত সর্বকালের। কবিতাটির মর্মে পৌঁছতে হলে এ কথাটি আমাদের মনে রাখতে হবে। আমরা যেন না ভুলি কবিতার শেষের সেই স্তবকটি যেখানে কবি বলেছেন, যে তাঁর বিদ্রোহ সেইদিন শান্ত হবে, যেদিন উৎপীড়িতের ক্রোন্দলরোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না/ অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ ভূমে রণিবে না।’ এই উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর বিদ্রোহের অন্তর-সত্তার পরিচয় আমরা পেয় যাই।

নজরুলের বিদ্রোহ কোনো সরলরেখার ব্যঞ্জনার সৃষ্টি নয়। কখনো তিনি অতি বাস্তববাদী, কখনো অতি সাম্যবাদী, কখনো স্বদেশী চেতনায় আক্রান্ত, কখনো যেন সন্ত্রাসবাদীর ভূমিকায় অবতারণ তিনি। পৃথিবীর মেহনতি, শ্রমিক, কৃষক মানুষের বন্ধু তিনি, তাঁদের মর্মবেদনা যেন ধ্বনিত হতে চেয়েছে তাঁর অগ্নিবাণ-বিচ্ছুরিত পংক্তিগুলিতে।

প্রলয়ের নটরাজ, সাইক্লোন, ধ্বংস মহাভয় অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল, অকাল-বৈশাখি ঝঞ্ঝা, ঘূর্ণি, টর্নেডো, ভাসমান মাইন−এ সবই নৈরাজ্যের দ্যোতনা সৃষ্টি করলেও বস্তত তা নবসৃষ্টির পর্যভূমিকা নির্মাণ করেছে মাত্র। ধ্বংস না হলে নবনির্মাণ সম্ভব হয় না। তাই কবিকে ‘পথিক কবির গভীর রাগিণী, বেণু বীণে গান’ গাইতে হয়। ধ্বংসের পাশে তিনি সৃষ্টি, শ্মশানের পাশে গড়ে ওঠে লোকালয়। আর তাই— ‘আমি ইন্দ্রনীসৃত হাতে চাঁদ ডালে সূর্য/ মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণ-তূর্য।’ তাঁর উদ্দেশ্যে-‘আমি বিশ্বতোরণে বৈজয়ন্তী, মানববিজয় কেতন।’ মানুষের গান গাইছেন তিনি, তাই মানুষের বিজয় কেতন ওড়াতে চান তিনি। পৃথিবী অশান্ত থাকলে ‘অর্ফিয়াসের বাঁশরী’ ধ্বনি কানে আসে না, তাই বিশ্বকে নিঝঝুম করতে চান তিনি, আর তখনই ‘শ্যামের হাতের বাঁশরী’ বেজে উঠতে পারে।
কবি বীর, উদার, মুক্ত মনের অধিকারী। তাঁর কোনো পিছুটান নেই। শাসন তাঁর কাছে ত্রাসের বার্তা বয়ে আনে। তিনি তরুণদেরও এই বিদ্রোহের পথে টেনে আনতে চান, সত্য নিষ্ঠতার জন্য প্রচলিত ধর্মকে আঘাত করতেও যারা পিছু পা হবে না। তাঁর বিদ্রোহী ভৃগুর মতো, যাঁকে ভগবানও ভয় পায়, তিনি সেই তরুণদের আহ্বান করতে চান যারা দামামা-দুন্দুভি বাজিয়ে যুদ্ধে যাবে, এবং একথা বলার সাহস রাখে যে নতুন করে এই জগৎকে তারা সৃষ্টি করবে।

এই বিদ্রোহ শুধু দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভেই সন্তুষ্ট হওয়ার নয়। বিদ্রোহের চেতনা আরো সুদূরপ্রসারী। একাধারে তা কবিপ্রাণের মতো রোমান্টিকতার ভাবাবেগে অশ্লিষ্ট অন্যদিকে বাস্তব পৃথিবীর অবিচার অত্যাচার ও নিগ্রহের অবসানকামী । তাঁর এই চেতনাই কর্ম তৈরি করতে চেয়েছে সামাজিক রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে । নারী-স্বাধীকার ও নারীশক্তি জাগরণের পক্ষে। নজরুলের বিদ্রোহের মূল সুর ‘মানুষ’, মানুষের মুক্তিই তাঁর লক্ষ্য। সব মানুষকে সবধরণের সামাজিক আচরণবিধির ঊর্দ্ধে উঠে, সম্প্রদায় ও ধর্ম নির্বিশেষে তাদের বিদ্রোহ-চেতনার জাগরণ হবে, কবি তাই চান। আমরা সমালোচকের সঙ্গে একমত হই যখন তিনি বলেন–‘নজরুলের বিদ্রোহ কোনও বিশেষ খাদে প্রবাহিত নয়।’ তাঁর বিদ্রোহের মূলে স্বভাবগত অকৃত্রিম মানবপ্রেম এবং সে প্রেমের প্রকাশ তাঁর অন্তরের নির্দেশানুসারে। শুধু স্বদেশের নয়, বিশ্বের মানবগোষ্ঠীর সঙ্গে তিনি একাত্মতা অনুভব করেন বলেই তাঁর রোমান্টিক কবি চিত্ত মানুষের নির্যাতন, লাঞ্ঝনা, শে্াষণ প্রভৃতি উচ্ছেদ করতে বিদ্রোহীর ভূমিকায় অবতীর্ণ।’ (সুশীল কুমার গুপ্ত)
রোমান্টিক কবিচিত্তের প্রকাশ আমরা লক্ষ করছি বিদ্রোহী পরিচয়ের অন্তরালে। কবি জানান –

আমি ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম উদ্দাম, আমি ধন্যি!
আমি উন্মন মন উদাসীর
আমি বিধবার, বুকে ক্রন্দন-শ্বাস হা-হুতাশ
আমি হুতাশীর।’

এরপরই আসে ইন্দ্রিয়সচেতন এই চিত-চুম্বন-চোর-কম্পন আমি থরথর প্রথম মরণ কুমারীর’ এখানেই পাই ‘গোপন প্রিয়ার চকিত চাউনি’, ‘চপল মেয়ের বালোবাসা, তার কাঁকন চুড়ির কন-কন’, কিংবা ‘যৌবন ভীতু পল্লীবালার আঁচর কাঁচলি নিচোর’ উত্যাদির ব্যবহার। এইভাব স্থায়ী হতে পারে না কোথাও, গোটা কবিতাটি জুড়ে একের পর এক বিস্ময়কর বৈপরীত্যের খেলা চলে। তিনি পুনরায় বলে ওঠেন–‘আমি তুরীয়ানন্দে ছুটে চলি এ কি উন্মাদ, আমি উন্মাদ!/ আমি সহসা চিনেছি আমারে, গুলিয়া গিয়েছে সব বাঁধ।’

বিদ্রোহী কবিতার এই স্বতঃউৎসার কবিতাটিকে দিয়েছে এক প্রবল গতিময়তা। রোমান্টিকতা, প্রাণপ্রাবল্য উদযাপনেই কবির আনন্দ। ইংরাজ কবি ওয়ার্ডস ওয়ার্থ কবিতায় সংজ্ঞায় ‘শক্তিশালী অনুভবের’ ‘স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের প্লাবী প্রকাশ সর্বতোভাবে লক্ষণীয়। গতিময়তায় এমন অবিস্মরণীয় অভিক্ষেপণ শুধু বাংলা কবিতায় কেন, বিশ্বের কবিতায় বিরল ঘটনা বলেই মনে করি। ভাবের এমন প্লাবনে ভারতীয়, ইসলামিক, গ্রিক ইত্যাদি প্রায় সব ক্ষেত্রের মিথ ও পুরাণকথাকে ব্যবহার করেছেন নজরুল। বিদ্রোহ কবিতা আমাদের জ্ঞাত করে যে বিভিন্ন দেশের ইতিহাস, মিথ ও লোককথার সঙ্গে কী নিবিড় যোগ ছিল নজরুলের। আর কী অবলীলায় তিনি ভারতীয় হিন্দু মিথের পাশে বসাতে পারেন ইসলামের পরম্পরা। ইসলামিক ঐতিহ্য থেকে, উঠে আসা খোদার আসন ছেদিয়া, ইস্রাফিলের সিঙ্গা, বোরবাক, জিব্রাইল, হাকিয়া-দোজখ, প্রভৃতি শব্দের পাশাপাশি ‘নটরাজ’, ‘হোমশিখা’, ‘জমদাগ্নি’, ‘কৃষ্ণকণ্ঠ’ ‘পিনাক পাণি’, ‘দুর্বাসা’ ‘বাসুকি’ ‘পরশবাস’, প্রভৃতি শব্দের ব্যবহার শুধু ভিন্ন ঐতিহ্যের মিলন ঘটায়নি। বাংলা কবিতার শব্দভান্ডারকে বিস্তৃত ও ঋদ্ধ করেছে।

কবি বুদ্ধদেব বসু যিনি নজরুলকে চড়াগলার কবি, তাঁর কাব্যে হৈ-চৈ অত্যন্ত বেশি এবং এই কারণেই তিনি লোকপ্রিয় বলে মনে করেছেন, তিনিও বিদ্রোহী কবিতা সম্পর্কে লিখেছেন–

‘কৈশোর কালে আমিও জেনেছি রবীন্দ্রনাথের সম্মোহন, যা থেকে বেরোবার ইচ্ছেটাকেও অন্যায় মনে হত, যে রোজদ্রোহের সামিল; আর সত্যেন্দ্রনাথের তন্দ্রাভরা নেশা, তাঁর বেলেয়ারি আওয়াজের জাদু– তাও আমি জেনেছি। আর এই নিয়েই বছরের পর বছর কেটে গেল বাংলা কবিতার; আর অন্য কিছু চাইলো না কেউ, অন্য কিছু সম্ভব বলেও ভাবতে পারলো না– যতদিন না বিদ্রোহী কবিতার নিশান উড়িয়ে হৈ হৈ করে নজরুল ইসলাম এসে পৌঁছলেন। সেই প্রথম রবীন্দ্রনাথের মায়াজাল ভাঙলো।’

(রবীন্দ্রনাথ ও উত্তরসাধক, বুদ্ধদেব বসু)

রবীন্দ্রনাথের কাব্যধারা ভেঙে নতুন কন্ঠস্বর আনয়ন করাও তো নজরুলের বিদ্রোহের আর এক পরিচয়।


❤ Support Us
error: Content is protected !!