- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৩
ভুবনতীর্থের কথা ও কাহিনি
চিত্র: ফেসবুক
আজ থেকে হাজার বছর পূর্বে কাছাড়ের দক্ষিণপ্রান্তে আত্মপ্রকাশ করেছিল ভুবনতীর্থ । উঁচু পাহাড়ের শীর্ষে গুহার ভিতর অঙ্কিত বেশ কিছু চিত্র, কিছু দুর্বোধ্য প্রস্তরলিপি, এবং প্রতিষ্ঠিত দেবমূর্তি নিয়ে এ শৈব তীর্থ বরাক উপত্যকার প্রাচীন তীর্থগুলোর মধ্যে অন্যতম । এখানে পূজা হয় ভুবনেশ্বর এবং ভুবনেশ্বরীর । ‘কাছাড়ের ইতিবৃত্ত (১৯১০)’ রচয়িতা উপেন্দ্রচন্দ্র গুহ দেব ভুবনেশ্বরের বর্ণনা দিয়েছেন, ‘কৌপিন বস্ত্র পরিহিত, দ্বিভূজ, দ্বিনেত্র, কৃশোদর, বাম হস্ত বাম জানুর নীচে রক্ষিত ও দক্ষিণ হস্ত হৃদয়ে ধারণ করত পূর্বাভিমুখে পাষাণোপরি দণ্ডায়মান । গলদেশে প্রস্তর নির্মিত মালা শোভা পাইতেছে । বিগ্রহের উচ্চতা সার্ধ দুই হস্ত । ভুবনেশ্বরীর বর্ণনা দিয়ে ইতিহাসবিদ লিখেছেন, ‘দ্বিভূজা, দ্বিনেত্র, নবযৌবন সম্পন্না ভুবনেশ্বরী মূর্তি স্বীয় বামহস্ত বক্ষস্থলের কিঞ্চিৎ নিম্নে পার্শান্তর প্রসারিত অবস্থায় দক্ষিণাস্য দণ্ডায়মানা । এই বিগ্রহের দক্ষিণহস্ত ভঙ্গ, মস্তক হইতে উপরিভাগ পর্যন্ত অনাবৃত । কটিদেশ হইতে জানু পর্যন্ত প্রস্তরবসন পরিহিতা এবং তন্নিম্নভাগ ভূমি হইতে প্রোথিত ।’
প্রায় সহস্রাব্দ এই তীর্থস্থান বিস্মৃতির অন্তরালে ছিল। এই মাত্র ১৭০৯ শকাব্দ, অর্থাৎ খ্রিস্টীয় ১৭৮৫ সালে খাসপুর সিংহাসনস্থিত ডিমাসা মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ধ্বজনারায়ণের আদেশে তাঁর সচিব জয়সিং বর্মন এ লুপ্ততীর্থক্ষেত্র আবিষ্কার করেন । তখন থেকেই জনমানসে তীর্থক্ষেত্রটির প্রসিদ্ধি । ওই সময়েই ভুবনপাহাড়ের সন্নিকটে, ভুবনতীর্থের ছত্রছায়ায়ই ভুবনের অনুকল্পে সোনাই বা স্বর্ণপুর (সোনাপুর) নগরে চন্দ্রগিরিতে রাজমহিষী ইন্দুপ্রভার ইচ্ছানুসারে প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রীশ্রী ভুবনেশ্বরের একটি প্রস্তরনির্মিত মন্দির । এ মন্দির গাত্রে সংস্কৃত-বাংলা অক্ষরে খোদিত লিপিতে মন্দির প্রতিষ্ঠার বিবরণ আজও প্রায় অক্ষত রয়েছে ।
ইতিবৃত্তে উপেন্দ্রচন্দ্র গুহ ভুবন সম্বন্ধে বলেছেন, ভূপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা ৩০০০ ফিট । এর নীচে একটি কুকিপুঞ্জির উল্লেখও তিনি করেছেন । ‘থাঙ্কিম’ নামক এ পুঞ্জি থেকে দুই মাইল উপরে ‘শিলচৌকী’র অবস্থিতির উল্লেখ আছে তাঁর বর্ণনায় । এরপর একটি ঝর্ণা, যার সন্নিকটে বৃহৎ সমতল প্রস্তরখণ্ডের অবস্থিতি, এটা অতিক্রম করলে ‘বড় উঠনি’, অর্থাৎ দূর্গম উঁচু পথের শুরু । ‘বৃক্ষের মূল, লতা প্রস্তর প্রভৃতি অবলম্বন করিয়া মঙ্গলময় ভুবনেশ্বরের পাদপদ্ম দর্শনার্থ পাহাড়ের উপর আরোহন করিয়া যে স্থানে উপস্থিত হইতে হয় তাহাই ‘মোকামটিলা’ নামে পরিচিত ।’ শতাব্দী পূর্বে লিখিত এ বয়ানে ওই ‘মোকামটিলা’ থেকে দু’টি রাস্তার উল্লেখ রয়েছে । প্রথমটির অভিমুখ ভুবনেশ্বরের মন্দির আর দ্বিতীয়টির অভিমুখ ত্রিবেণী হয়ে হ্রদের দিকে । গৃহের ছাদের মতো দুই বৃহৎ প্রস্তরখণ্ডের, এবং ‘উক্ত ছাদের নিম্নে ভুবনেশ্বর ও ভুবনেশ্বরীর প্রস্তরময় বিগ্রহ অধিষ্ঠিত রহিয়াছে । দেখিলে বোধহয় ভগবান যেন শীতাতপ, ঝড়-বৃষ্টি হইতে আত্মরক্ষার্থ তথায় দীনবেশে আশ্রয় লইয়াছেন’।
ভুবনেশ্বর বিগ্রহের বর্ণনা করে উপেনচন্দ্র ভুবন পাহাড় থেকে ২০/২৫ ফিট পশ্চিমে পাথরের খিলান দেওয়া ছোট্ট একটি গহ্বরের সন্ধান দেন, যে গহ্বরের দ্বারদেশে বিশাল এক দণ্ডায়মান প্রস্তরমূর্তির উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, উল্লেখ করেছেন ‘ইহা কাহার প্রতিমূর্তি জানা যায় না ।’
ভুবনেশ্বরীর বর্ণনা শেষে লেখক বিগ্রহের বাম পাশে প্রস্তরখণ্ডে বিষ্ণুপাদপদ্মের চিহ্নের কথাও উল্লেখ করেছেন । উপেনচন্দ্র আরও কয়েকটি ভগ্নমূর্তির সংবাদও দিয়েছেন । মন্দির চত্বরে হনুমানজিউ, বিভীষণের মূর্তি এবং কয়েকটি ফলকে সুভদ্রা, গরুড় প্রভৃতি দেবদেবীর নামও খোদিত ছিল । মন্দির সংলগ্ন মোকাম টিলায় শঙ্খ-চক্র-পদ্মধারী বাসুদেব মূর্তি আজও বিদ্যমান ।
ইতিহাসবিদ সুজিৎ চৌধুরীর অভিমত, ‘ভুবন পাহাড় এমন একটি সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করছে যাতে আরোপিত ব্রাহ্মণ্য উপাদানের চাইতে পূর্বভারতীয় আঞ্চলিক উপাদানই বেশি সক্রিয়’। ভুবনে রয়েছে একটি ক্ষুদ্র পুকুর, কয়েকটি গুহা, প্রাচীন ভাস্কর্যের কিছু নিদর্শন । অনুমান করা হয়, এখানের অনেক মূর্তিই বিলুপ্ত । তবে কয়েকটি মূর্তি আবার শিলচর নর্মাল স্কুলেও এনে রাখা হয়েছিল ।
ভুবন তীর্থ নিয়ে প্রচলিত কিংবদন্তি ছাড়াও পাঁচালি আকারে কিছু লোকশ্রুতিও আছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘ধনুকধারীর পাঁচালি, ‘পাষাণ পাঁচালি’। প্রথমোক্ত পাঁচালিতে বর্ণিত হয়েছে কী করে মহাদেব শিব প্রাগৈতিহাসিক আয়ুধ থেকে লাঙ্গল সৃষ্টি করে জমিকর্ষণে নেমে গেলেন ।
ভুবনে দুটি প্রধান বিগ্রহ ছাড়াও আরও একটি অর্ধভগ্ন দেবমূর্তি রয়েছে । সুজিৎবাবুর ধারণা, এ মূর্তিকে যদিও বিষ্ণুমূর্তি বলা হয়ে থাকে তবুও পৌরাণিক বিষ্ণুর সঙ্গে এর কোন মিল নেই। অবশ্য বাকি দুটো মূর্তিকে তিনি দ্বারপাল হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন । ওই স্থান থেকে প্রায় দেড় মাইল দূরে অবস্থিত বিখ্যাত সুড়ঙ্গগুলো, যেগুলোর কথাও উপেন্দ্রচন্দ্র গুহ বলেছেন ‘জনশ্রুতি এই যে, পূর্বকালে ভুবনপাহাড়ে নাগাদের পুঞ্জি ছিল । নাগারা উক্তদেব-দেবীকে আপনার আদিপুরুষ ভাবিয়া নিজ পুঞ্জিতে স্থাপন করিতে সঙ্কল্প করে ।‘ অবশ্য এ কর্ম আর সম্ভব হয়নি বলাই বাহুল্য ।
সে যাই হোক, সুজিৎ চৌধুরী বলেছেন, ওখানে অনেকগুলো সুড়ঙ্গের একটি দেওয়ালে দুটো মূর্তি খোদাই, আরেকটিতে রয়েছে শিবলিঙ্গ । জনশ্রুতি আছে যে এ সুড়ঙ্গের সঙ্গে নাকি কামাখ্যা তীর্থের সংযোগ রয়েছে । দুর্গমতা, প্রাচীনত্ব, রহস্যময়তা—এ তিনটি লক্ষণ নিয়েই আত্মপ্রকাশ করেছে এ ভুবনতীর্থ । এ তীর্থস্থানটি গড়ে উঠতে বিভিন্ন পার্বত্য জনজাতির অবদানও অস্বীকার করা যাবে না । দেবদেবীর মূর্তিগুলোর উপর ব্রাহ্মণ্য ধর্মীয় সংস্রব আরোপনও হয়ত খুব বেশি দিনের নয় । মূর্তিগুলোর শৈল্পিক বিশ্লেষণ করে সুজিৎ চৌধুরী এতে পাল আমলের শিল্পকলার প্রচ্ছায়া দেখতে পেয়েছেন । তবে মূর্তি বা রেখাচিত্র কোনোটাই শিল্পের বিচারে একেবারে প্রাথমিক স্তর অতিক্রম করতে পেরেছে তা বলা যায় না । কিন্তু অর্বাচীন কালে নতুন মূর্তি স্থাপন, পুরনো মূর্তির সংস্কার, এর উপর চড়া রঙের প্রলেপ দেওয়া, যা সাম্প্রতিক কালের ধারা, এতে কিন্তু প্রাচীন এ তীর্থ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভাস্কর্যের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ম্লান হতে বাধ্য যদি এ দিকে যোগ্যজনের হস্তক্ষেপ না ঘটে । স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ভগ্ন, অপটু হাতের অসম্পূর্ণ কাজ এসব নিয়েই এ নিদর্শন গুলো নিজস্বতায় ভাস্বর । এতে অতি উৎসাহের হস্তক্ষেপ অনভিপ্রেত বলাই বাহুল্য ।
ভুবন তীর্থ নিয়ে প্রচলিত কিংবদন্তি ছাড়াও পাঁচালি আকারে কিছু লোকশ্রুতিও আছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘ধনুকধারীর পাঁচালি, ‘পাষাণ পাঁচালি’। প্রথমোক্ত পাঁচালিতে বর্ণিত হয়েছে কী করে মহাদেব শিব প্রাগৈতিহাসিক আয়ুধ থেকে লাঙ্গল সৃষ্টি করে জমিকর্ষণে নেমে গেলেন । শ্মশানে মশানে বিচরণশীল দেবাদিদেব মহাদেবের এমনিভাবে গার্হস্থ জীবনে প্রবেশের কাহিনিকে এ অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক জীবনচর্যার আত্মপ্রকাশের সূচক হিসেবে দেখাও সম্ভব । নিধনপুরের তাম্রশাসন প্রাপকদের হাতে যদি এ অঞ্চলে প্রথম কৃষি-বিপ্লবের সূচনা হয়ে থাকে তবে ভুবনতীর্থকে ভিত্তি করে আদি-মধ্যযুগে দ্বিতীয় কৃষি-বিপ্লবের সংকেত এখানে খুঁজে পাওয়া সম্ভব । ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের বিচারে ভুবন পাহাড় সহ এ ভূখণ্ড সমুদ্রগর্ভ থেকে বেরিয়ে আসা স্থলভাগের অন্যতম অঞ্চল, এবং এখানে লাঙ্গল ভিত্তিক কৃষির সূচনা ওই সময়সীমায় সংঘটিত হওয়া্র সম্ভবনার তথ্য গ্রহণযোগ্য ।
দুর্গম এ তীর্থকে বিশ শতকের প্রথম দশকে সুগম করার প্রাথমিক প্রয়াস কে করেছিলেন, এর কোন ইতিহাস কেউ লিখে রাখেনি । উপেন্দ্রচন্দ্র গুহ ‘স্বর্গীয় প্রাতঃস্মরণীয় মহাত্মা রামদাস বন্দ্যোপাধ্যায় কনট্রাক্টর মহাশয়ের উদ্যমে’ এ স্থানে পুণ্যার্থীদের জন্য একটি ছোট পুষ্করিণী খনন করার কথা লিখে গেছেন । আজ এত লোকসমাগ, উৎসাহ উদ্দীপনামর মুহূর্তে প্রাতঃস্মরণীয় এ ব্যক্তির কথা কে বা মনে রাখবে ?
বড়খলার রায়সাহেব, অতঃপর রায়বাহাদুর, সোনাপুর পরগনার মৌজাদার, লক্ষীপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, আসাম বিধান পরিষদের সরকার মনোনীত সদস্য বিপিনচন্দ্র দেবলস্কর এবং তস্য ভ্রাতা, স্বাধীনতা সংগ্রামী, লোক্যাল বোর্ডের মেম্বার এবং আসাম বিধান পরিষদের আরও এক সদস্য বড়খলার জমিদার যতীন্দ্রমোহন দেবলস্কর– এ দুই জনই ভুবনতীর্থের পথঘাট, পুষ্করিণীর সংস্কার সাধনে বিস্তর সময় ও শ্রম ব্যয় করেছেন, এ কথাটিও এখানে স্মর্তব্য । এঁদের তৎপরতায় ভুবন তীর্থ মাহাত্ম্য যে কাছাড়ের বাইরে বিদ্বজ্জনের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল, এর কয়েকটি নিদর্শন ১৩২৯ বঙ্গাব্দে (১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে) শিলচরে অনুষ্ঠিত ‘সুরমা সাহিত্য সম্মিলনীর দ্বিতীয় অধিবেশনে সভাপতি প্রাচ্যবিদ পদ্মনাথ বিদ্যাবিনোদ মহামহোপাধ্যায়ের অভিভাষণে রয়েছে । মহামহোপাধ্যায় তাঁর সূত্রবন্দনায় ভুবন তীর্থের একটি অর্থবহ উল্লেখ রেখে আমাদের ধন্য করেছেন—
‘ সর্ব্ববিঘ্নবিনাশন দেব গণপতিকে নমস্কার যিনি এই জেলার পূর্ব্বদক্ষিণ প্রান্তে ভুবন শিখরে অবস্থিত হইয়া নিজের এবং মাতাপিতার প্রস্তরময়ী মূর্তির হস্তপদাদি ভঙ্গকার্য্যেরও নির্ব্বিঘ্নে সম্পাদন করিতে দিয়া স্বীয় বিশেষণের সার্থকতা অব্যাহত রাখিয়াছেন ।’ এখানে প্রস্তরমূর্তি ‘ভঙ্গকার্য্যের’ যে ইঙ্গিতময় সংকেত রয়েছে, তা নিয়ে আপাতত বিশদ অনুসন্ধানে না’ই বা গেলাম ।
তবে যে-তৎপরতার সঙ্গে সদাশয় সরকার বাহাদুর এবার ভুবনের রাস্তার সংস্কার কার্যে মনোনিবেশ করেছেন, এ জন্য ধন্যবাদ তাঁদের প্রাপ্য । ভুবন যদি ভবিষ্যতে আরও সুগম হয়ে ওঠে, স্থানীয় অর্থনীতিতে এর সুফল অবশ্যই দেখা যাবে । তবে ভুবনের পাহাড় এবং অরণ্যসম্পদ যাতে লাভের এবং লোভের কুঠারে বিক্ষত না হয় এ দিকে এখনই বিশেষ যত্নবান না হলে দেবাদিদেব মহাদেব যে রুষ্ঠ হয়ে তাণ্ডব শুরু করবেন না– অতি সম্প্রতি উত্তরাখণ্ডের যোশীমঠের প্রাকৃতিক তাণ্ডব দেখে এরকম আশঙ্কা উড়িয়ে দিতে পারছি না।
♦—♦♦—♦♦—♦
❤ Support Us







