- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- ডিসেম্বর ৭, ২০২৫
গ্রামের নাম ভিচিংছা
গ্রামের নাম ভিচিংছা, হাইলাকান্দি শহরের উপকণ্ঠ, ইদানীং খানিকটা কণ্ঠও ছুঁয়ে আছে, বড়ো গ্রাম, জনবহুল, একভাষিক, এককালে গ্রামবাসীদের প্রধান জীবিকা ছিল চাষাবাদ, ইদানীং তাঁদের বেঁচে থাকার দিক বদল ঘটছে, চাষের কাজে এ প্রজন্মের আগ্রহ নেই, মজুরি-চাকরি, ব্যবসা, অন্যান্য পেশাও দেহ-মনকে টেনে নিচ্ছে, গ্রামের পেছনে আঁকাবাঁকা ধলেশ্বরী, মিজোরাম থেকে নেমে গড়াতে গড়াতে, এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে, গ্রামের পর গ্রাম পেরিয়ে, খুদে জেলাশহর হাইলাকান্দির পাশ কেটে, বইতে বইতে দূরে, অনেক দূরে, পাহাড়িয়া পাঁচ গ্রামের মাটি নিয়ে, বালু নিয়ে, কাঁকড় নিয়ে ঝাঁপ দিয়েছে বরাকে।
ভিচিংছার মতো বহু গ্রামের, বিস্তীর্ণ প্রান্তরের খোরাক জোগাত ধলেশ্বরী, এখন সে অনাথ, মৃতপ্রায়, ক্ষীণস্রোতা। বর্ষার জলে হাবুডুবু খায়, হেমন্তে একদা-সুন্দরী অকাল বৃদ্ধার বিনুনির মতো স্রোতের সঙ্গে ঝুলতে থাকে, কেন এমন দশা, সদুত্তর জানা নেই আমাদের, ধলেশ্বরীকে স্রোতহীন করে দেওয়ার একাধিক জনশ্রুতি চালু আছে লোকমুখে।
উজানে আরো উজানে— চা বাগানের সেঁচব্যবস্থার স্বার্থে, ধলেশ্বরীর স্রোতমুখ বন্ধ করে দেয় ব্রিটিশ বেনিয়ারা, কাঁটাখাল নামের বিকল্প, কৃত্রিম নদী তৈরি করে মিজোরামের জল পূর্ব হাইলাকান্দি দিয়ে বরাকের দিকে ঠেলে পাঠায়, এর পরিণামে শুকিয়ে প্রায় মৃতপ্রায় হয়ে উঠল জলাধিপতির স্মৃতিবাহী নদী, একই নামের আরেকটি নদী আছে বাংলাদেশে, সে অনাথ নয়, জীবিত, জাগ্রত। ত্রিপুরায় ধলেশ্বর নামে একটি এলাকা আছে, ধলেশ্বর কার নাম, নামান্তরে কি শিবের আরেক পরিচয়, হতে পারে, তবে এ বিষয়ে আমার একটু সংশয় আছে। একসময় বৌদ্ধধর্ম পূর্ববঙ্গের জলে-জঙ্গলে ছড়িয়ে পড়লে নদীমাতৃক স্থান ও নদীর নামে বৌদ্ধজাত প্রভাব দেখা দেয়। এই যেমন আমাদের ভিচিংছা, কিংবা উত্তর হাইলাকান্দির চিপসাঙ্গন। ধ্বনিগতভাবে দুটি নামেই চিনের মান্দারিন শব্দধ্বনি কানে বাজে। ভিচিংছা বংশানুক্রমে, যুগ যুগ ধরে আমাদের অনেকের বসবাসভূমি, বঙ্গভাষী প্রধান গ্রাম, পশ্চিম দিকে হেলান দেয় ধলেশ্বরীর কোলে, পুর্ব দিকে বড়বনদ, দক্ষিণে ভাউরার ঘাট, উত্তরে হাইলাকান্দি, গ্রাম ছোঁওয়া শহর, গ্রামটির নাম কেন ভিচিংছা, নামের অর্থ কী, গ্রামবাসীদের জন্মগত পেশা কী ছিল অতীতে, এখন কোনদিকে তাঁরা ছুটছেন, কোন্ কোন্ দুদর্শায় আক্রান্ত, ভবিষ্যৎ কী, পুরোপুরি আধাশহরের গ্রাসে চলে যাবে গ্রামের বুড়ো ইতিহাস, সবই অনিশ্চিত। সামান্য একটি উদাহরণ দিই, একসময় বরাকের প্রান্তিক মহকুমা, এখন যা জেলায় পরিবর্তিত, তার দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি দা-কুড়ুল-কোদাল-খুন্তি-ছুরি ইত্যাদি লৌহজাত সরঞ্জাম তৈরি হতো ভিচিংছায়, এখনো হয়, এসবের
উৎপাদন ক্রমশ কমছে, হাতে তৈরির বদলে নতুন কৌশল পুরনোর জায়গা দখল করছে, হার মানছে সাবেকি ঐতিহ্যবাহী উৎপাদনের রসদ, জীবিকার সন্ধানে কামারকূল এখন শহরমুখী, ভিন্ন ভিন্ন পেশামুখী, ঘরোয়া সরঞ্জাম তৈরির পুরনো ব্যবস্থার নবীন মুনশিয়ানা সংযুক্ত হলে আয় আর ঐতিহ্য দুটোই বহাল থাকত, সে উপায় নেই, বাপ-ঠাকুরদার পেশাগত পরম্পরা টিকিয়ে রাখার ইচ্ছে নেই, ইতিহাসের চিহ্ন বাঁচানোর তাগিদেও প্রাণ নেই
জলে যা ভাসবার ভাসুক, ডুবে যাক, এটাই যেন নিয়তি, ইতিহাসের ছেঁড়া কাঁথা ডুবছে, ডুবুক; কচু পাতার জলের মতো ঝরে পড়ুক, অদৃশ্যের চিহ্নহীন সঙ্কেতে আশপাশের অসংখ্য গ্রামের মতো ভিচিংছাও মেনে নিচ্ছে শরীরী রদবদল, পেশা বদল, নাম বদল। আদ্দিকালে গ্রামের নাম কী ছিল, হদিস দেবেন কে, মুরুব্বিরা বিগত, নতুনরা দিশাহীন, ইতিহাসহীন, দিগন্তহীন।
শোনা যায়, হিউয়েন সাঙ এসব এলাকা দিয়ে হেঁটে হেঁটে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে ছুটে গেছেন, তাঁর পরিক্রমার ছায়া দেখি ভিচিংছা নামকরণে, উত্তরের চিপসাঙ্গনে, এসব এলাকায় চিনা পরিব্রাজকের ভ্রমণবৃত্তান্তের বিশদ তথ্য নেই, যা আছে সবই জনশ্রুতি আর গল্পকথার সত্য-অর্ধসত্য। তাহলে সত্যের খোঁজে কোন্ আশ্রয়কে বেছে নিতে হবে? লোকতত্ত্বের ঘুণেধরা ইতিহাসকে?
না, ব্যবহৃত শব্দের ব্যুৎপত্তিগত ইঙ্গিতকে ? আধুনিক ভাষাবিজ্ঞান শব্দের উৎসভিত্তিকে বিশেষ আমল দেয় না, সরাসরি প্রমাণ চায়, হিউয়েন সাঙ ভিচিংছা দিয়ে হেঁটেছিলেন কি না, প্রমাণিত দৃষ্টান্ত খুঁজে দেখবেন কে ? ব্যস্ত ব্যবসায়ী ? লক্ষ্যসর্বস্ব জনপ্রতিনিধি ? না পেশাদার বিদ্যাদাতা ? তাঁদের ফুরসৎ কোথায়? সবাই উদাসীন, তাৎক্ষনিকতার ডাকে সাড়া দিয়ে নিরন্তর ছুটছেন, ছুটবেন, ছুটতে থাকবেন, এটাই সবকালের নিশানা, নিশান নেই, তবু ছোটো, ঘুরে বেড়াও, দেখো, দেখতে থাকো; এই যে ভিচিংছার ‘কুচু’ একসময় বুক ফুলিয়ে বাজারে উঠত, হৈচৈ করা দামে বিক্রি হতো, এখন সেই কচুজমানাও নেই-র তালিকায় ঢুকে পড়েছে, বাজারে কত খাবারের আমদানি, চিন থেকে, মিজোরাম থেকে, মায়ানমার থেকে বারমিজ সুপুরি কিংবা ‘সর্বমঙ্গলা’ মাদকের মতো স্রোত হয়ে সমতলে উপচে পড়ছে, রুট তাদের অনেক, ভিচিংছারও রেহাই নেই, অতএব গ্রামটির ‘কচুকাল’-এর অবসান অনিবার্য।
এভাবেই আগামীর আশঙ্কায় দাঁড়িয়ে আছি আমরা।
স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি।
দেখছি কালো মুখ, ক্রুদ্ধ মুখ, হলুদ মুখ।
কিছুদিন— কাল, পরশু, পরশুর পরশুও দেখতে হবে।
দেখে যাব জলজীবন মিশনের অকেজ সাবমারসিবেল, পাম্পের বিষন্ন স্তম্ভিত বুক। বাইপাস থেকে কুল্লে ৩০০ মিটার দূরে, দূষিত জলে চোবানো জিহ্বায় এ কীসের রং, জলের না আর্সেনিকের? জবাব দাও হে ভগবান! জবাব দাও ছাতাওয়ালা পীর, জবাব দাও বাবা খিজির এবং তোমারও স্পষ্ট বয়ান চাই নির্বাক কুমীর।
♦•♦•♦•♦•♦•♦•♦•♦•♦•♦
লেখক : বরাকের কীর্তি সন্তান। সুদক্ষ ইঞ্জিনিয়ার। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী।
❤ Support Us








