- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- আগস্ট ৬, ২০২৩
ফাঁকি
একটা খুন করলে সেটাকে খুন বলে, হাজার হাজার খুন করলে সেটা হয় আন্দোলন...
অলঙ্করণ: দেব সরকার
আমার কোয়ার্টারটা একেবারে পাহাড়ের মাথায় । বিজনবাড়ি এমনিতে আড়াই হাজার ফিট উঁচুতে, তার ওপর একশো আশিটা সিঁড়ি গুনে গুনে উঠলে তবে আমার কোয়ার্টার । উঠতে কষ্ট তবে জানালা দিয়ে গোটা মাইক্রো হাইডেল পাওয়ার প্রজেক্টটা দেখতে পাই । ছোট রঙ্গীত নদী বয়ে চলেছে । বিশ্বম্ভর রক, হিমা ফলস, ছবির মতো লাগে গোটা টাউনটা ।
ছোট রঙ্গীত নদী থেকে একটা খাল টেনে এনে সে জল দিয়ে দু মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটা চলে। দু মেগাওয়াট হলে কী হবে, আমাদের সকলকে বুক দিয়ে বিদ্যুৎ এলাকাটা আগলাতে হয়। জানালা দিয়ে দূরের গ্রাম, প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে সুখিয়া পোখরি সেখানে ঘন পাইন বনের সারি স্থনীয় লোকেরা যাকে বলে ধুপী । বিজনবাড়িতেও গাছপালা বড়ো কম নেই, নয় নয় করে আশেপাশে সাতটা চা বাগান । ধান, স্কোয়াশ, লাউ, টমেটো, এলাচ, কিসেরই বা চাষ নেই এখানে ।
ছোট বাঁশের বাগান, ওক ম্যাপল, চেস্টনাট, প্রায় চব্বিশ রকমের রডোডেনড্রন, বার্চ সারা পাহাড় জুড়ে আছে দেখে মনে হবে বিজনবাড়ী যেন ঘুমিয়ে আছে । বিদ্যুৎ প্রকল্প ক্যাম্পাস এর ভেতরেই ম্যাগনোলিয়া থেকে শুরু করে হাজারো রকমের ফার্ন গাছ পুষ্পহীন বিভিন্ন লতাগুল্ম জায়গাটাকে যেন অন্য একটা মর্যাদা এনে দিয়েছে । এটা আমার দ্বিতীয় পোস্টিং, তাও বছর চারেক কেটে গেছে এখানে, আমার তরফ থেকে বদলি নেবার কোন ইচ্ছা নেই । একাকী কর্মব্যস্ত জীবনের ফাঁকে ফাঁকে এই নিস্কলুষ প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকি।
আমার মানসিক প্রশান্তি ভেঙে আমার অ্যাসিস্টান্ট, প্রত্যুষ স্বভাবিকের থেকে একটু জোরেই বলে উঠল, স্যার শুনেছেন, গতকাল ডাকবাংলোয় ওরা আগুন দিতে এসেছিল, সময় মত পুলিশের হস্তক্ষেপে এটা ঠেকানো গেছে ! কিছু একটা ভেতরে ভেতরে যে হচ্ছে সেটা টের পেয়েছিলাম কিন্তু অগ্নিসংযোগ, লুঠতরাজ এর খবর সেরকম কানে আসেনি। – এটা হয়তো একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা । পুলিশ পিকেট বসিয়েছে ?
কত জায়গায় বসাবে ? ট্যুরিস্টরা খবর পেলাম রিসর্ট খালি করে চলে যাচ্ছে ! ডাকবাংলো আমাদের পাওয়ার প্রজেক্ট থেকে এমন কিছু দূরে নয়। চিন্তার বিষয়, বাড়িতে মাঝে মাঝে ফোন করি, বাবা মা ভাই বোনদের সাথে কথা হয় । ওদেরকে এসব কথা জানতে দিলে চলবে না, উদ্বেগে ভুগবে ।
হিমালয়ের রানী এই দার্জিলিং পর্বতমালা চিরঘুমন্ত, এখানে আমি, আমার সহকর্মী সকলেই যেন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কাজ করি, দু মেগাওয়াটের এই বিদ্যুৎ যা উৎপন্ন হয় তা দিয়ে সারাদিন বিদ্যুতের হয়ত জোগান দেওয়া যায় না ।
সিদ্রাপং, র্যাম, জলঢাকা সমস্ত প্রকল্প থেকে যতটা বিদ্যুৎ পাওয়া যায় তাকে আমরা চেষ্টা করি সমবন্টন করতে, তবুও পুরো বিজনবাড়িতে সারারাত বিদ্যুৎ দেওয়া যায় না । সাতটা চা বাগানে বিদ্যুৎ পাঠাতেই আমরা হিমসিম খাই । ট্যুরিস্ট লজ গুলো আছে, একটা নামী স্কুল, ডাকবাংলো । কথা হচ্ছে ভুটানের চুখা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ আনার । তা হয়তো দেরী হবে । ততদিন এমন ভাবেই চলতে হবে । সরকারের করার কিছু নেই ।
ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন ছিলো, হিলকার্ট রোড ধরে অনেকটা এগিয়েছি কিন্তু ঘুম পৌঁছানোর আগেই লম্বা গাড়ির সারি, শুনলাম পুলিশ ব্যারিকেড করেছে । গাড়ি ঘুম পেরোতে দিচ্ছে না। সামনে দাঁড়ানো গাড়ির যাত্রীকে জিজ্ঞাসা করতে তাকে বেশ উত্তেজিত দেখা গেল ।
জানেন কিভাবে খুনখারাবি শুরু হয়েছে এখানে ? পঞ্চাশটা গাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে । অনেক বাঙালি খুন করেছে । সোনাদার রাস্তার দুপাশে দুটো কাটা মুন্ড ঝুলিয়ে রেখেছে । – ও তাহলে এটা দুষ্কৃতীর কাজ নয় ?
জানিনা, আপনি এটাকে কী বলবেন, কিসের কাজ, তবে লাইমলাইটে আসতে গেলে প্রচুর নিরীহ মানুষ খুন করতে হয়, প্রচুর সাধারণ মানুষের সম্পত্তি পোড়াতে হয়…
একটা খুন করলে সেটাকে খুন বলে, হাজার হাজার খুন করলে সেটা হয় আন্দোলন… ভদ্রলোক দেখলাম অনেক কিছু জানেন । আমি সত্যি সত্যিই ঘুমিয়ে ছিলাম ।
— তাহলে পাহাড় আর ঘুমিয়ে নেই…
— আপনি কোথায় আছেন মশাই… এ যে একটা লোক, অন্যের থেকে বিড়ি চেয়ে ফুঁকতো, সে এখন বড় নেতা… সুভাষ ঘিসিং… শুনছি জ্যোতিবাবু নাকি ওর সাথে আলোচনায় বসবেন । ভাবুন জ্যোতিবাবুর মত নাক উঁচু লোক !
কলকাতার কাগজগুলোয় দার্জিলিংয়ের আগুন পৌঁছাতে শুরু করেছে। অনেক কাগজেই খবর হেডলাইন হচ্ছে।পাহাড়িয়া খেটে খাওয়া মানুষগুলোও শান্তিতে নেই । ওদের চোখমুখ দেখলে বোঝা যায় । জিনিষপত্রের দাম ক্রমশ আকাশ ছোঁয়া হচ্ছে।
আমাদের ছোট রঙ্গীত আর রঙ্গন্যু (তিস্তা) দিয়ে তাহলে অনেক জল গড়িয়ে গিয়েছে টের পাইনি। রাস্তা খালি হলে ড্রাইভারকে গাড়িটা ব্লুমফিল্ড চা-বাগানের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখতে বলে হাঁটা দিলাম। অনেকেই হাঁটছে রাস্তা বেশি নয়, এগারো কিলোমিটারের মত হবে । ভরা কালো মেঘের ফাঁক দিয়ে সূর্য্যের টুকিঝুঁকি। বেলা ঘড়িয়েছে, এ সূর্য সকালের গোলাপী সূর্য নয়। শীতল গা । মানবাড়ি বস্তি। লুই জুবিলি কমপ্লেক্স একে একে পেরোতেই দূর থেকে দেখা গেল । কালো ধোঁয়া আকাশের কালো মেঘের সাথে ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে । চোখের সামনেই দেখতে পেলাম পাহাড় জ্বলছে । কাছে গিয়ে দেখা গেল কে বা কারা দামি দামি গাড়িগুলো জ্বালিয়ে দিচ্ছে । সমতলের মানুষ যারা গাড়িগুলোয় ছিলো তারা যে যেদিকে পারছে, ছুটছে । তাদের চোখেমুখে অসহায়তা !
ব্রিটিশরা দার্জিলিংয়ে এসে শহরটাকে মনের মত সাজিয়েছিলো, চাচ, কনভেন্ট স্কুল থেকে ঘোড়ায় আস্তবল, হোটেল, সার্কিট হাউস, ম্যালের একটু দূরে চিড়িয়াখানা, মিউজিয়াম, তারা বেশ ভেবেছিলো এদেশ ছাড়লেও এ পার্বত্য শহর ছাড়বে না। আজ সে ম্যালের অবস্থা দেখলে কান্না পায়। দোকানপাট, বাজার বন্ধ, এখানে ওখানে পার্বত্য লোকেদের জটলা কোথাও টায়ার পুড়ছে, কোথাও গাড়ি জ্বলছে। না, কোথাও যাওয়া যাবে না এগোনোর পথ নেই, খালি হাতে ফিরতে ফিরতে ভাবলাম, আরও একটু বেশি সতর্ক হতে হবে । দুজন লেপচা স্টাফ আছে ওদেরকে পালা করে রাত জাগতে বলতে হবে । আমরাও জাগব, অবশ্যই !
পুলবাজার থানায় গিয়ে ওসির সাথে দেখা করলাম । একথা সেকথার পর ডাকবাংলোর কথা উঠল, উনি বললেন :
— ও আপনি জানেন না বুঝি, স্কুলটাও গুড়িয়ে দিয়েছে। সিরিয়াসলি ড্যামেজড। আমি ডি.এম.এস.পি সাহেব কে জানিয়েছি, রিকনস্ট্রাকশন না হলে বাচ্চারা পড়তে আসতে পারবে না ।
— তাহলে এখানকার ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ারও প্রয়োজন নেই ? — আরে মশাই, ওদের এখন একটাই লক্ষ্য লাইমলাইটে আসে, যাতে স্টেট, সেন্টার উভয়েই ওদের কথায় ধ্যান দেয়। নেগেটিভ পথেই খুব তাড়াতাড়ি ওপরে ওঠা যায় । না- কি ?
এখানকার সরকারি অফিসারদের সবাই মোটামুটি একটু বিকাল হলেই মদ খেতে শুরু করে। সমতলে সংসারের সঙ্গে কারোরই যোগাযোগ নেই। রাতে শরীর ভারী হয়ে পড়লে শুয়ে পড়ে। এ ভদ্রলোক অন্ত্যত সেরকম না। যখনি যে প্রয়োজনে গেছি উনি সাধ্যমত সাহায্য করেছেন।
— দেখবেন, আর কিছুদিন পর পাহাড় আবার ঠান্ডা হয়ে যাবে। ১৯৪৭ এর পর থেকে অনেক নেতাই তো মূলস্রোত থেকে সরে এসেছেন আবার মূলস্রোতে গিয়ে মিশেছেন। পাহাঢ় গরম হয়েছে আবার ঠান্ডা…
— কিন্তু এখন তো ঠান্ডা হবার কোন লক্ষণ নেই।
— আস্তে আস্তে হে। রাজীব গান্ধি, জ্যোতি বসু শীঘ্র সুভাষ ঘিসিং এর সাথে আলোচনায় বসবেন। মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এসব রাজ্যগুলোও তো ক্রমশ ঠান্ডা হয়ে এসেছে….
কলকাতার কাগজগুলোয় দার্জিলিংয়ের আগুন পৌঁছাতে শুরু করেছে। অনেক কাগজেই খবর হেডলাইন হচ্ছে। ইচ্ছা ছিল আমাদের প্রজেক্টের সমস্ত স্টাফদের পরিবারকে এনে সামনের সেপ্টেম্বরে বিরাট চড়ুইভাতি করব, তা বুঝি আর হল না । পাহাড়িয়া খেটে খাওয়া মানুষগুলোও শান্তিতে নেই । ওদের চোখমুখ দেখলে বোঝা যায় । জিনিষপত্রের দাম ক্রমশ আকাশ ছোঁয়া হচ্ছে। শিলিগুড়িতে ট্রাক আটকে দেওয়া হচ্ছে। পলায়মান ট্যুরিষ্টদের থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা চাইছে নেপালি গাড়িওলারা। কী অরাজকতা !
অন্ধকার রাত। গভীর ধোঁয়াশায় পাহাড় ঢাকা শুতে শুতে অনেক রাতই হয়ে গেল। বাড়িতে ফোন করার ছিলো। বাবা ভীষন উৎকণ্ঠায় আছেন । হেডকোয়ার্টারের অফিসারদের সাথে কথা বলার ছিলো। রাতে ভালো ঘুমও আসতে চায় না । ডাকবাংলোটা ওরা পুড়িয়ে দিয়েছে । কবে আমাদের ক্যাম্পাসে ওরা অ্যাটাক করে এই দুশ্চিন্তায় আছি । ঘুমালেও সজাগ থাকতে হয় । আমায় সমস্ত স্টাফ ও অবশ্য সজাগই থাকে । মাঝরাতে ধুক ধুক আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। আওয়াজটা গেট থেকে আসছে। খুব আস্তে করে কেউ বা কারা আওয়াজ করছে । কিন্তু তীক্ষ্ণ। সকলকে বলা ছিলো, রাতে সেরকম কিছু টের পেলে যেন প্রথমে আমাকে খবর দেয় । প্রত্যুষ ছুটে এলো। চোখেমুখে তার উৎকণ্ঠা । আমি পুলওভারটা গায়ে চাপিয়ে বড়ো টর্চ টা নিয়ে ওর সাথে তাড়াতাড়ি নেমে এলাম । গেট খুলতেই কয়েকটা গোর্খা তরুণ এগিয়ে এলো। মিনতি সহকারে বলল, দাজু কৃপয়া কেহী পানী দিনু হোস্ (দাদা, দয়া করে একটু তেষ্টার জল দেবে…
—আপনারা ?
—কৃপয়া হামালাই মাক্ গর্ণাহাস …. হামী স্থানীয় জনতা হো । হরেক রাত হামী রাতি তপাই লাই পহরা দিনছো…ম..
(দয়া করে আমাদের ক্ষমা করবেন । আমরা স্থানীয় লোক । প্রতি রাতে আমরা আপনাদের পাহারা দিই ।)
— তামাং দাওয়া লামা সাহেব । উহালে হামালাই পাঠাউনুভয়ো (উনি আমাদের পাঠিয়েছেন । এই ধোয়াশা রাত সমস্ত কুহেলিকা যেন কাটিয়ে দিচ্ছে । সামনে চারটি তরুণ । হাতে সামান্য অস্ত্রশস্ত্র । কিন্তু তাদের চোখেমুখে বরাভয় ।
তামাং দাওয়া লামা সাহেব বলেছেন, সুভাষ তো জানেনা এই সামান্য দু মেগাওয়াট পাওয়ার প্ল্যান্টের কী দাম এখানে।সাত সাতটা চা বাগান আছে এখানে । আর এই পাওয়ার প্ল্যান্টটা ধ্বংস করে দিলে চা বাগান গুলো বন্ধ — হয়ে যাবে, কয়েক হাজার লোক তাদের পরিবার সহ না খেয়ে মরবে ।
উসলাই থাহা ছ…(উনি বলেছেন…)
♦—♦—♦
❤ Support Us








