- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- জানুয়ারি ২২, ২০২৩
নিখোঁজ রাতের ঠিকানা
তৃষার এভাবে নিখোঁজ হওয়ায় স্তম্ভিত রায় পরিবার, পুলিশের উপর চাপ সৃষ্টি করল। নীলা ফিরে এসে বড়বাবুকে সোজাসুজি থ্রেট দিয়ে বলল, ‘আমি চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে মেয়েকে চাই, নাহলে আপনার চাকরি থাকবে না"।
অলঙ্করণ: দেব সরকার
র। হ। স্য ♦ গ ।ল্প
পর্ব- ১
‘তাহলে তুই ঠিক করে নিয়েছিস কারুর কথা শুনবি না,তাইতো ?’
‘মা,তোমার জীবনটা তুমি নিজের মতোই কাটিয়েছো, আমার ক্ষেত্রে এতো না কেন ?’
‘তুমি এখনও ছোট। তাছাড়া, অযথা রাত্রে বাড়ির বাইরে থাকা সমাজের চোখে শোভনীয় নয়, লোকে খারাপ বলবে তৃষা’
‘ তোমার ছেলেকে তো কিছু বলনা ।’
‘ওর ব্যাপার আলাদা, তুই ওর সাথে নিজেকে কমপ্যায়ার করিস না !’
‘আর তুমি ?’
‘তৃষা ডোন্ট ক্রশ ইওর লিমিট !’
‘মা, আমি বোধ হয়, সীমা ক্রশ করিনি !’
কাবেরী,মা-মেয়ের কথোপকথন শুনে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসে বলল,”কি হচ্ছে তৃষা”?
‘ও মাসি তুমি কখন ফিরলে”?
‘পাঁচটা! আমার কথা ছাড় তুই …..
‘আমার ভীষণ জোরে বাথরুম পেয়েছে তোমার সব প্রশ্নের উত্তর এসে দিচ্ছি “!
তৃষার তখন দেড় বছর নীলা ডির্ভোস নিয়ে বাপের বাড়িতে চলে আসে। তার অফিসের কাজ ও রাজনৈতিক জীবনের বাইরে কোন কিছু নিয়ে চিন্তা করার সময় ছিলনা। ছোট তৃষার সারাদিন ফিটার দুধ ও মাসির কোলেপিঠেই কাটতো। সে কারণে তার জীবনে মাসির গুরুত্বঅনেকখানি । নিজের ভুল বোঝার পর নীলা অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ। কাবেরীর বুঝতে দেরী হল না, তৃষা তাকেএড়িয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই বাথরুমে ঢুকে বসে আছে ।
সে নীলাকে বলল,”এক সপ্তাহ হয়নি আমি গিয়েছি আর তার মধ্যে …. কি হয়েছে বলতো”?
‘গত রাত্রে তৃষা বাইরে ছিল”!
‘বাইরে মানে “?
‘ওকে জিজ্ঞাসা কর”!
মাসির পায়ের শব্দ পেয়ে তৃষা কমটের উপর জাকিয়ে বসল। কাবেরী দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলে,
‘নাটকটা অ্যাটলিস্ট আমার সাথে করিসনা, তোকে বারণ করেছিলাম। তারপরও?
‘আসলে মাসি বন্ধুরা শুনছিল না”!
‘তাহলে আমার এক্সপেকটেশনটা ভুল”!
‘না,মাসি আই প্রোমিস, এটাই লাস্ট”!
‘পাক্কা”?
‘পুরোপুরি”!
‘কমটের উপরই বসে থাকবি, বাইরে আয়”!
‘আসছি “!
তৃষা কথা দিল বটে, কিন্তু তার মর্যাদা রাখা নিয়ে তার নিজেরও যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। কলেজে যাওয়ার পথে নিখিলকে কল করল,”আমার পক্ষে কাজটা কনটিনিউ করা সম্ভব নয়”!
‘মিস রায় ,আগেই বলেছিলাম এগ্রিমেন্ট পড়ে সাইন করুন, পেজ নম্বর ফাইভ,প্যারা ফোর, পরিস্কার লেখা আছে আপনি ছেড়ে যেতে চাইলে ক্ষতিপূরন বাবদ নগদ পাঁচলাখ দিতে বাধ্য”।
তৃষা সামান্য হকচকিয়ে ড্রাইভ থেকে কপিটা বার করে পড়ার পর ধীরে বলল,”ওকে,কিছু ডিসকাউন্ট করা যাবে”?
‘প্রোবলেম কী মিস রায়”?
‘একান্ত ব্যক্তিগত “!
‘বলতে চান না।যাই হোক ,আজ ঠিক সময়ে চলে আসবেন”!
তৃষা বেশ চিন্তায় পড়ে গেল।ছোট থেকেই রেডিও জকি হওয়া ইচ্ছা তার।বাড়িতে তার এ ইচ্ছায় সিলমোহর তো দূরের কথা শুনলেই বিদ্রুপ করে। তাই কারুকে কিছু না জানিয়ে, ঠিক মতো না দেখে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর সম্পন্ন করে বিপদ ডেকে এনেছে! অগত্যা সে কলেজ সেরে রওনা দিল।
রাত প্রায় বারোটা, নীলা পার্টির কাজে রাজ্যের বাইরে। বলাবহুল্য, সন্ধ্যা থেকে ব্যস্ততার মাঝে সময় পায়নি, একটু ফ্রি হতেই কাবেরীকে জিজ্ঞাসা করল,”তৃষা ফিরেছে”?
‘এখনও পর্যন্ত নয়, বেশ কয়েকবার কল করলাম,কিন্তু সুইচ অফ”!
‘সুইচ অফ আর তুই এখন জানাচ্ছিস’! নীলা অভিযোগ করে বলল,” তোর জন্যই মেয়েটা শোধরাবে না”।
‘হা হা সব দোষ তো আমার”!
‘আচ্ছা, তুই একবার টিনাকে কল কর ,গত রাতে ওর সাথেই ছিল”!
টিনার কথা শুনে কাবেরী রীতিমতো অবাক।গতরাত তো দূরের কথা গত পনেরোদিন তৃষার সাথে তার সাক্ষাৎ পর্যন্ত হয়নি।এরপর, কাবেরী রোহিতকে কল করে জানতে চায় সে তৃষার সাথে কী করেছে। রোহিত হকচকিয়ে জানায়, ব্রেকাপের পর তৃষার সাথে তার আর কোনো যোগাযোগ নেই।
কাবেরী হাত গুটিয়ে যে কোন উপায়ে রাত কাটিয়ে ভোরের আলো ফোঁটার অপেক্ষায় থাকল।
রাত গড়িয়ে সকালের দরজা ছুঁইছুঁই , চোখ দুটি খুলতেই বেলের শব্দ। সে চোখ মুছতে মুছতে দরজার খোলার পর অমিতকে দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল,”তুই”!
‘অন্য কারুর অপেক্ষায় ছিলে বুঝি”?
‘তৃষা গতকাল রাতে ফেরেনি”।
‘আরও মাথায় তোল‘
বলার পর অমিত আর কোন প্রতিক্রিয়া বা অভিব্যক্তি প্রকাশ না করেই নিজের রুমে চলে গেল।
বেলা গড়িয়ে প্রায় দশটা, সময় অনেকটা পেরিয়ে যাওয়ায় কাবেরীর চিন্তা বৃদ্ধি পেল। কিছুক্ষণ পরে আবারও কলিং বেল বেজে ওঠায় সে লম্বা এক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে রান্নাঘর থেকে তড়িঘড়ি ছুটে এল দরজার কাছে,আঁচলে হাত মুছে লক খুলতেই রীতিমতো থ’ হয়ে জিজ্ঞাসা করল,”আপনি”?
‘থানা থেকে আসছি ম্যাডাম,গত রাতে হাইওয়ের পাশে এই মোবাইল,পার্স ও ব্রেসলেটটা পাওয়া গিয়েছে, ঠিকানা দেখে এলাম।
‘এগুলো….এগুলো তো তৃষার,ও কোথায়”?
‘না ম্যাডাম, রাস্তায় রক্তের ছাপ ও এই জিনিষগুলো বাদে ঘটনাস্থলে আর কিছু পাওয়া যায়নি”।
‘পাওয়া যায়নি মানে “?
আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মতো কাবেরী মাটিতে লুটিয়ে পড়ে,অমিত বেরিয়ে এসে তাকে সামলানো দূরের কথা,উল্টে পুলিশের সাথে ঝামেলা শুরু করে।এধরণের পরিস্থিতির সম্মুখীন সে ইতিপূর্বে হয়নি, কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা থেকেই এহেন আচরণ। তাছাড়া, বোনের প্রতি কমবেশি স্নেহও তাকে বাধ্য করে।
‘দেখুন দাদা রাতে রাস্তাটা জেনারেলি সকলে এভয়েট করে। এলাকাটি দুর্ঘটনা প্রবণও বটে। আপনার বোন এই রাস্তা কেন বেছে নিয়েছিল বা তার সাথে ঠিক কী ঘটেছিল, এসবের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা পুলিশ ডিপার্মেন্টের কাজ নয়। যাইহোক,পরবর্তী আপডেট আপনারা সময় মতো পেয়ে যাবেন”!
অমিত থামল না সে পাল্টা বলতে শুরু করল “বললেই হল,এটা আপনাদের ডিউটি”।
‘দাদা,দশহাজার সামলাতে একজন পুলিশকর্মী। সম্ভব নয়, আপনার যদি কিছু বলার থাকে থানায় আসতে পারেন “।
সামান্য ভেবে অমিত বলল ‘আমি একবার জায়গাটা দেখতে চাই, যদি আপনাদের কোন আপত্তি না থাকে।
‘আপত্তি কেন থাকবে,চলুন”!
হঠাৎ ,তৃষার এভাবে নিখোঁজ হওয়ায় স্তম্ভিত রায় পরিবার, পুলিশের উপর চাপ সৃষ্টি করল। নীলা ফিরে এসে বড়বাবুকে সোজাসুজি থ্রেট দিয়ে বলল, ‘আমি চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে মেয়েকে চাই, নাহলে আপনার চাকরি থাকবে না”।
‘ম্যাডাম আমরা চেষ্টা করছি, আমাদের তরফ থেকে কোনো ত্রুটি আপনি পাবেন না”!
‘অফিসার চেষ্টা নয়,আই নিডস রেজাল্ট”, কিছুক্ষণ চিন্তা করে সে আরও বলল, ‘আই থিঙ্ক এসব এই বুনো মহিষটার কাজ।”
‘বুনো মহিষ”?
‘মিস্টার কৌশিক সেন”।
‘উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া কোন পদক্ষেপ গ্রহন করা সম্ভব নয়,আমাদের হাত বাঁধা ম্যাডাম”।
‘আমার বয়ানকেই আপনি উজকরতেপারেন।আপনিএফ.আই .আর লিখুন।নচেৎ, এনিহাউ আপনি তৃষাকে হাজির করুন।কিচ্ছু জানিনা,আমার মেয়েকে আমার চাই,সেকি ভাবে সেটা সম্পূর্ণ আপনাদের ব্যাপার”!
‘ম্যাডাম আমাদের স্পেস দিন, সন্ধ্যার মধ্যে আপডেট দিচ্ছি “।
‘সেটাই মঙ্গল’।
হাই প্রোফাইল কেসে অত্যাধিক চাপের সঙ্গে থাকে রাজনৈতিক প্রেশার। বড়বাবু চাপ না নিয়ে স্বাভাবিক গতিতে কাজ শুরু করার কথা মনস্থ করলেও বাড়তি প্রেশার থেকে বেড়িয়ে আসতে পারলেন না। গলায় গলায় টেনশন নিয়েই সারারাত বসে পড়া শুনা চালিয়ে যাওয়ার পরও কোন ক্লু পাওয়া গেল না।
সাব ইন্সপেক্টর অরিন্দম সঙ্গে ছিল। বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর সে বলল,”স্যার একটা কথা মনে পড়ে গেল,মে বি হেল্পফুল হতে পারে”!
‘তাহলে চকটা মেরে সময় নষ্ট না কর বলো “!
‘গত বছর একই তারিখ,একই সময়, এই জায়গায় নাতাশা নামের একটি মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা রেজিস্ট্রার হয়েছিল! সে সময় পোদ্দার বাবু ছিলেন”।
‘ইন্টারেস্টিং, ফাইলটা পাওয়া যাবে কি?”¡
‘হয়তো “।
‘তাহলে আর দেরি কেন কাজ শুরু করো”।
‘আজ আর মেশিন চলছে না, যদি আপনি অনুমতি দেন তাহলে কাল শুরু করি….কাজ”?
‘আমার এদিকে কেরোসিন কেরোসিন অবস্থা, আর তুমি করছো বাহানা”!
‘সত্যি বলছি স্যার “!
বড়বাবু মুখখানা শুকনো বেগুনের মতো করে বলল,”এতোই যখন মচকে গিয়েছো, আগামীকালই মাচা দিও “।
টেনশন একটু বেশি হলেই বড়বাবুর কথাবার্তার ধরণ পাল্টে যায়, অরিন্দম ভুক্তভোগী। সেকারণে, সেদিকে মাথা না ঘামিয়ে সে পুরোদমে কাজ চালিয়ে যায়। সারাদিন চিরুনী তল্লাশির পর, সন্ধ্যায় অরিন্দম বড়বাবুর টেবিলে ফাইলটা রাখল।
কৌশলে জরুরি নথির রদবদল ঘটেছে। বড়বাবু সেটা বুঝতে পেরেই অরিন্দমকে বলল,”এই রদবদলের পিছনে তোমার অবদান কতোখানি অরিন্দম “?
বাকি ফাইলগুলো যথাস্থানে রেখে সে মৃদু হেসে বলল,” আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ “?
বড়বাবু আর কথা না বাড়িয়ে কিছুটা পড়ার পর বলল,”কাস্টেডিয়ান ডেথ ,একজন সাইকো সিরিয়াল কিলার, অরিন্দম খাপের খাপ নয়”।
‘কী স্যার”!
‘ আচ্ছা তুমি কোনদিন ভূত দেখেছো”?
‘কী যে বলেন স্যার”!
‘ আচ্ছা ধরো আসামীর অতৃপ্ত আত্মা ঘটনাটা ঘটিয়েছে”।
অরিন্দম ভ্যাবাচেকা খেয়ে একটা লম্বা ঢোক গিলে বলে,”হতে পারে প্রকৃত অপরাধী ধরা পড়েনি”।
বড়বাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে গোল্টফ্লেকে লম্বা টান দিয়ে বলল‘অথবা কাকতালীয় …।
তারপর,থামলেন!কিছু সময় পর জিজ্ঞাসা করল‘নথি কিভাবে সারানো হয়েছিল , তোমার ডেটাতেকিছুআছে”?
‘না স্যার তদন্ত শুরু হওয়ার কয়েকদিন বাদে আমি
অসুস্থতার কারণে লিভ নিয়েছিলাম “!
‘পরে কিছু নিশ্চয় কানের পাশ দিয়ে যাত্রা করেছিল “?
‘উপায় ছিল না, আসামীর মৃত্যুর পর মানবাধিকার কমিশনের সঙ্গে অকারণ সংঘাত। আমি তখন অন্য এক মার্ডার কেস নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। তাছাড়া,পোদ্দারবাবু নিজের হাতেই তদন্তের দায়িত্ব রেখেছিলেন।বেশি নাক গলানো তিনি পছন্দ করতেন না!”
বড়বাবু তার চাপদাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন,’থাক থাক,সুযোগ হয়নি,তাইতো?
সে মাথা কাত করে বলল ‘সেটাই”!
‘নাতাশা আর তৃষা নামে যৎসামান্য মিল খুঁজে পাওয়া গেলেও আপাতত কোনভাবেই লিঙ্ক পাওয়া যাচ্ছে না। তুমি বরং ফাইলটা যথাস্থানে রেখে চটপট তৈরি হয়ে যাও”!
‘ওকে স্যার‘
অরিন্দম ওকে বলল বটে কিন্তু ফাইলটা হাতে নিয়ে বড়বাবুর গোলগাল ফর্সা মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বড়বাবু টুপি মাথায় খাটিয়ে বলল, ‘আমি শাহারুখ খান নই, চোখটা আলমারির দিকে ঘুরিয়ে সত্বর হেমুকে ডাক দাও”।
সে আমতা আমতা করে জিজ্ঞাসা করল ‘কো…কো…..কোথায় যাবেন স্যার”?
‘ওয়েট, জানতে পারবে,ধৈর্য রাখতে শেখো”!
প্রায় এক বছর সংসার করেও অরিন্দম বড়বাবুকে ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। সে বিশেষ কথা না বাড়িয়ে চুপ করে গেল। শহরের যানজট কাটিয়ে জিপ গন্তব্যে উপস্থিত। অরিন্দম ঝলক দেখেই বলল,”স্যার, বেতার কেন্দ্র”!
‘এখানেও একটা ভাইরাস আছে। নামটা সম্ভবত নিখিল বারুচা “।
‘ অবাঙালি নিশ্চয়”?
‘ নিঃসন্দেহে “।
‘ কানেকশনটা বুঝলাম না!?
‘ইডিয়ট,সাত কান্ড রামায়ণ পড়ে সীতা রামের মাসি….. রাম,রাম”।
‘স্যার আপনি কি রামভক্ত “.
‘শাটআপ আমি আননেসেসারি রাজনৈতিক কথাবার্তা পছন্দ করি না”।
অরিন্দম রীতিমতো অবাক, তার কথাটা বড়বাবু রাজনীতির সঙ্গে জুড়ে দেবেন সে বুঝে উঠতে পারিনি,অগত্যা বলতে বাধ্য হয় সে,’সরি স্যার’।
‘অ্যাসেপ্টেট’।
নিউজ দেখার পর নিখিল আঁচ করে নিয়েছিল, সে মোটামুটি তৈরি উত্তর মারফৎ বড়োবাবুকে বোঝাতে সক্ষম।প্রমাণস্বরূপ সিসিটিভি ফুটেজ সামনে রাখলেন।কিন্তু , তাকে সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ রাখা যায় না।
‘উফফফফফ, মাথাটা পুরো যন্ত্রণায় ফেটে
যাচ্ছে, এখানে এতো অন্ধকার কেন? আমি…..আমি……এখানে কীভাবে…….,এটাকোথায়?
তৃষার গলা শুকিয়ে এসেছে ,শব্দ বার হচ্ছে না, তবুও সে কষ্টের মধ্য দিয়ে চিৎকার করল ‘ কেউ আছেন ?হ্যালো কেউ আছেন? শুনতেপাচ্ছেন “?
উত্তর নেই, এতক্ষণে সে বুঝতে পেরেছে তাকে আটক করে রাখা হয়েছে। ঘরটা দৈর্ঘ্য-প্রস্থে বৃহৎ হলেও একটা দরজা এবং ভেন্টিলেশনের জন্য খুব ছোট একটা উচু জানালা বাদে একটা চৌকি , জলের মিডিয়াম সাইজের জার ও কমট ছাড়া কিছু নেই।
বেশ বোঝা যাচ্ছে কারুকে বন্দী করে রাখার উদ্দেশ্যেই জরুরী ভিত্তিতে ঘরটা নির্মিত, সিমেন্টের কয়েকটা খালি বস্তাও এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
প্রায় সারাদিনের চেষ্টার পর সে ক্লান্ত, বাইরের জগতের সাথে কোন যোগাযোগ সহজ নয় বুঝেই তৃষা মাটিতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। তৃষার মাথায় অনেক গুলো নাম একত্রে, সে বুঝে উঠতে পারে না এই ঘটনার পিছনে কার হাত থাকতে পারে।দেখতে দেখতে এক সপ্তাহ গড়িয়ে যায়।
পুলিশের হাতেও ইতিবাচক কিছু না আসায় সকলেই বিভ্রান্ত।
রাত প্রায় সাড়ে বারো, উপরের দুই বাই দুই জানালার দিয়ে চাঁদের তীব্রতর আলো মুখে পড়তেই তার ঘুম ভেঙ্গে যায়।বেশ কিছু সময় সেদিকে তাকিয়ে থাকার পর তৃষা মৃদু হেসে বাবার কথা ভাবতে থাকে।ছোটবেলায় বাবা তাকে প্রায় বলতেন চাঁদেরটুকরো।
এই চাঁদের সঙ্গে আজকের নয়, দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের সম্পর্ক।অনেকদিন পর তার চোখে চোখ রেখে তৃষা কিছুটা হলেও অনুপ্রেরণা জোগাতে পেরেছে নিজ অন্তরে বসে থাকা মানুষটাকে।
দরজার তলা দিয়ে আসা প্রতিদিনের খাবারগুলোর উপর আরশোলা ও পোকামাকড়ে আড্ডা জমেছে। টাটকা খাবারগুলো ঝেড়ে সে হাতে তুলে নেয়,দু-একটা পিঁপড়া তখনও লেগেছিল, সবশুদ্ধ দুই হাত দিয়ে ঠেসে ঠেসে সে মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
থানা আর বাড়ি করতে করতে কিছুটা হলেও তার পরিবারের উদ্দীপনা হারিয়ে গিয়েছে।কিন্তু, কাবেরী হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নয়। পুলিশি তদন্তের গতিবিধি দেখেই সে প্রাইভেট গোয়েন্দা আলোক সাহার সাথে যোগাযোগ করে।মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে চুক্তিসম্পন্ন হয়।
কয়েক দিন টানা প্রচেষ্টার মাধ্যমে তৃষা কিছুটা রপ্ত করে নিয়েছে কীভাবে দেওয়ালে চড়তে হয়। কিন্তু দেওয়ালে উচ্চতা কুড়িফুটের উপর, কোন অবলম্বন ছাড়া এই বিশাল উচ্চতা পার করা তার পক্ষে সহজ নয়।তবু সে হাল ছাড়ে না।
‘ম্যাডাম আমি অলোক বলছি‘
‘বলুন অলোকবাবু , কোন আপডেট আছে?”
‘একটা আর্জেন্ট ডিসকাশনের প্রয়োজন”।
‘হা হা বলুন না,”!
‘ওভার টেলিফোনে আলোচনাটা বোধহয় সেফ নয়। যদি একবার সাক্ষাৎ সম্ভব হয়”!
‘ওকে। কোথায় দেখা করতে হবে বলুন”!
‘মাচা ট্রি ক্যাফে,সন্ধ্যা সাতটায়”।
‘ঠিক আছে,আমি পৌঁছে যাব”।
ঘড়ির কাঁটায় ঠিক সাতটা বেজে কুড়ি মিনিট , অলোকবাবুর দেখা নেই।
পরিকল্পনা মাথায় আসতেই,পায়ের শব্দ পেয়ে তৃষা যথাস্থানে চলে যায়।এই সময় সাধারণত কেউ আসে না।সে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
কয়েক জন যুবক মুখ বাঁধা অবস্থায় ঘরে ঢুকে কিছু একটা খোঁজার চেষ্টায় ব্যস্ত, এইসময় ওদের মধ্যে একজন বলে, ‘আজ রাতের মধ্যেই মালটাকে সরিয়ে ফেলতে হবে”।
‘কেন বলতো’?
‘ম্যাডামের নির্দেশ আছে’।
গলাটা বেশ চেনা, ইতিপূর্বে হয়তো শুনছে মনে হলেও তৃষা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না।ওরা চলে যাওয়ার পর তৃষা পুনরায় উপরে ওঠার চেষ্টা করে।কিন্তু, তার ঋতুচক্র হঠাৎ শুরু, বেশিদূর ওঠা সম্ভব হয় না।
‘অলোকবাবু এতো দেরি করলেন কেন”?
‘ম্যাডাম আসলে, যতই ভিতরে ডুবছি প্রবালের অঙ্ক বৃদ্ধি পাচ্ছে”!
‘স্বাভাবিক,বৃদ্ধি পাওয়াটাই স্বাভাবিক ধরেই এগিয়ে যেতে হবে।এই পরিমাণটা আরও বাড়তে পারে?”
‘কয়েকদিন ধরে আমিও ওয়াচে আছি”।
‘ আপনার বিষয়টাও কি জেনে গিয়েছে”?
‘সম্ভবত”।
‘তুমি চলো ডালে ডালে,আমি চলি পাতায় পাতায়, প্রবাদটি শুনেছেন নিশ্চয় ?
আলোক সাহা ,রন্ধ্র্রে রন্ধ্র্রে চলে।আপাতত আমরা গুগল পে তে প্রয়োজনীয় দরকার মেটাতেপারি””!
‘আমি মোবাইলের অত্তোসতো বুঝিনা,পে তে চ্যাটিংয়ের ,কোনো সমস্যা হবে না তো”?
‘ নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন “।
‘ঠিক আছে, যেটা আপনার সুবিধা হয়, আমার তৃষাকে, আই মিন রেজাল্ট চাই”।
ক্রমাগত দেওয়ালে চড়া প্রাকটিসের ফলে তৃষা তলপেটআঘাতপায়।পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই তাকে জোর করে দুজন টানতে টানতে গাড়িতে তোলে। অন্ধকারের গাঢ়ত্ব ও রাস্তায় আলো না থাকায় সে ঠাওর করতে পারছে না, তাকে ঠিক কোথায় রাখা হয়েছিল।
ঘন্টাখানেক পথ যাওয়ার পর সে অনুধাবন করে গাড়িটা উঁচু কোন জায়গায় আছে। গাড়ির কাঁচ এতটাই কালো , বাইরের দৃশ্যও পরিস্কার দেখা যাচ্ছে না।
তৃষা কোন কিছু না ভেবেই ড্রাইভার চা’পানের জন্য গাড়ি থামাতেই সে পিছনের দরজা খুলে ঝাঁপ দেয়।লম্ফঝম্ফ করেও শেষরক্ষা হয় না,মুহূর্তের মধ্যেই সবকিছু থমকে যায়।
মিনিট পাঁচেক পর ওদের মধ্যে একজন বলল ‘আরে শালা বেহেনচোদ ধরতে পারলি না ,ম্যাডামকে কী জবাব দেব”?
‘ 16000 ফিট উপর থেকে পড়ে আস্তো থাকবে না “?
‘ ম্যাডাম জানতে পারলে বিপদ, বীরু”!
ড্রাইভার মাথা চুলকে বলল,”আপাতত কিছু জানানোর প্রয়োজন নেই, চেপে যা”।
অলোক বাবুর তদন্ত কিছুটা এগোতেই তিনি কাবেরীকে কল করেন, ‘ম্যাডাম আপনার পেডিকসন রাইট। তৃষাকে কিডন্যাপ করা হয়েছে, ওকে গতকাল এনজিপিতে দেখা গিয়েছে”!
‘জয় মা দূর্গা,আমি জানতাম।আচ্ছা আলোক বাবু আমি বাইরে আছি , সময় বুঝে আপনাকে কল করছি”!
‘ওকে ম্যাডাম”!
এক গজ ভিতরে ঢুকে যাওয়া ছোট্ট দুটি চোখ,চামড়ার ভাঁজগুলিও বোধহয় গোনা যাবে, বৃদ্ধাকে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে, তৃষা জিজ্ঞাসা করল,”আপনি”?
‘হামি একজন মানুষ”!
ঘরের চর্তূদিক ভালোভাবে দেখার পর তৃষা জানতে চাইল,”এটা কোথায়”?
‘ট্রি গার্ডেন দার্জিলিং,অ্যায়েস বেটা তুম উপর সে গিরে ক্যায়েসে”!
‘আমি গিরিনি,মানে ঝাঁপ দিয়েছিলাম”।
এরপর,তৃষা উঠে বসার চেষ্টা করে।তার কোমরের চোট বুঝিয়ে দিল আপাতত তার রেস্টের দরকার।বৃদ্ধা তার কাঁধে হাত রেখে বলল,” উঠিস না, হামি খাবার আনছি, খেয়ে লেটে রেহ”!
আপাতত থাকার জন্য জায়গাটা নিরাপদ, তৃষা স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয়। জানালার ফাঁকা অংশ দিয়ে পড়ন্ত বিকালের চাকচিকন আভরণে ঢাকা কাঞ্চনজঙ্ঘার মহিমা অনুভব করার বিরতিতে তার বাড়ির কথা মনে পড়ে।
অলোকবাবুও রওনা দিলেন নিউ জলপাইগুড়ি, স্টেশন পা রাখতেই একজন দুষ্কৃতি তার পিছনে বন্দুক ধরে সেডের তলায় নিয়ে যায়।প্রায় মধ্যরাত, স্টেশন চত্বর জনশূন্য।লোকটি তাকে বলে,”কেসটা ছেড়ে দে, নচেৎ অকালে প্রাণ হারাবি”।
‘আরে ভাই ছেড়েই তো দেব‘সুযোগে সে বন্দুক ধারী ব্যক্তির যৌনাঙ্গে লাথি মেরে তার হাত থেকে হাতিয়ারটি হাতিয়ে নিয়ে কপালে টার্গেট করে এবং জানার চেষ্টায় তাকে জিজ্ঞাসা করে,”কে,কে পাঠিয়েছে বল”?
মুখ থেকে টু শব্দ তো দূরের কথা।অলোক বাবু কিছু বোঝার আগেই ধামাকা!লোকটি চম্পট দেয়।
তাপস শার্টের বোতামটা খুলে বলে ‘নীলা এভাবে আর কতদিন? এবার তো আমরা আমাদের কথা ভাবতে পারি”।
‘তাপস পালিয়ে যাচ্ছি কোথায়!বোঝার চেষ্টা করো সামনে ইলেকশন।তাছাড়া, তৃষার ব্যাপারটাও আছে। মিডিয়া বিষয়টা নিয়ে অযথা জল ঘোলা করবে”!
তাপস একটু হেসে বলল ‘তুমি কতটুকু চেষ্টা করেছো।তাছাড়া,বাকি আছে কী,প্রতিদিনই কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি চলছে”!
‘পরিচিত মহল, জবাবদিহি এসব তো আছে”।
তাপস খাটে হেলান দিয়ে বলল‘আবার মহল কোথা থেকে এল, তোমার আসলে ইচ্ছা নেই সেটাই বলো”।
‘ও ,তোমার তাহলে শেষ পর্যন্ত এটা মনে হল”?
‘আসলে কী জানো তুমি নিজেকে নিয়ে অনেক বেশি ব্যস্ত,আমাকে নিয়ে ভাবার সময় নেই “!
‘দেখো ,দায়িত্ব……
নীলার কথা সম্পূর্ণ না হতেই তাপস প্রসঙ্গ পাল্টে বলল
‘আচ্ছা ,ছাড়ো এবার একটু কাছে এসো‘
‘না ,রাগ করেছি”।
‘আচ্ছা বাবা সরি,এবার কিন্তু একটা কিস ‘
‘উমমমম,
‘আর একটা, আর একটা ,….,তাপস হাত ধরে টানতেই পুরো আশি কেজি ওয়েট নিয়ে নীলা তার বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
ক্রমশ…
❤ Support Us








