Advertisement
  • গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
  • আগস্ট ৬, ২০২৩

আলতাপুরের সদরঘাট

রাজকুমার শেখ
আলতাপুরের সদরঘাট

 
বিকেল হয়ে এসেছিল। মুরলীর আজ কাজ শেষ হতেই ও চলে আসে ঘাটে। নৌকোয় পার হয়ে তাকে যেতে হবে মীরপুর। সেখানে তার স্থায়ী বাস। বহু বছর ধরে তার আলতাপুরের সঙ্গে এক ভালোবাসার যোগ। এ ঘাটের আশেপাশে যে সব দোকান পাসার তারা সকলে মুরলী কে চেনে। কত দিনের আনাগোনা। ঘাট সে একই অবস্থায় রয়ে গেছে।  মাধুকাকা, সুখি, আদিলচাচা এরা এখানেই জীবন কাটিয়ে দিলেন। কত মানুষের আনাগোনা এই ঘাটে। সাজু মাঝির কোনো ক্লান্তি নেই।  পারাপারের জন্য সে এক মাত্র ভরসা। এ ঘাটকে জড়িয়ে কত গল্প। তখন সবে মাত্র ঘাট চালু হয়েছে। এই ঘাটের পাশেই হঠাৎ এক সাধু বাবার উদয় হয়। একটা ঝুপড়ি গড়ে ওঠে। তার মধ্যে সাধু বাবা বসে থাকতেন। দুএকটা পান আর চায়ের দোকান হল। বেশ জমে উঠেছে তখন এই সদর ঘাট। আর তখনই সাধু বাবার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে সুখির মা মাধুরি। সেও এই ঘাটে ছোট্ট একটা পান বিড়ির দোকান দিয়েছিল। রাতে সে এখানেই থাকতো। ওর বর হঠাৎ মারা যাওয়াতে তার দুকূল ভেসে যায়। তাকে তার নিয়তি টেনে আনে এই ঘাটে। সাধু চরণলাল সকালে ঘাটে গা ধুতে গেলে মাধুরির সঙ্গে চোখাচোখি হয় রোজই। তারপর আলাপ। চরণ লাল বলেন, তুর কপালে সুখ ছিল ঠিকই। কিন্তু তোর শনিদশা তুকে ছাড়েনি।
 
তা কেমন করে বুঝলেন সাধুবাবা?
 
সব বুঝিরে পাগলি। সব !
 
কেমন গম্ভীর গলায় বলেন চরণলাল সাধু।
 
মাধুরী বেশ অবাক হয়ে যায়। তারপর এক সময় সে সাধুর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। তার কথা গোটা ঘাটের দোকানদারদের মধ্যে ছড়িয়ে গেল। মাধুরির ভরা যৌবন এই আষাঢ় এর উথাল-পাতাল ঢেউ এর মতো আছড়ে পড়লো চরণ লালের ওপর। তারপর এক সময় তার পেটে সন্তান এলো। কিন্তু তা আর ঢেকে রাখতে পারলো না মাধুরি। গোটা আলতাপুরের সদরঘাটের লোকজন জেনে গেল। চরণলালের ওপর সকলে ক্ষেপে গেল। মাধুরি সকলকে বাধা দিল। কিন্তু একদিন রাতে চরণলাল হঠাৎ কোথায় যেন হারিয়ে গেল। অনেক বলে এটা নাকি দিলবারের কাজ। সে এক সময় মাধুরিকে বিয়ে করতে চেয়ে ছিল। করে কিন্তু মাধুরি রাজি হয়নি। দিলবার এ ঘাটে এসে দোকানদারদের সঙ্গে জোর করে পয়সা নেয়। না দিলে তার বাঁচোয়া নেই। সকলে তাকে ভয় পায়। দিলবার জানতো সাধুর কথা। মাধুরিকে সে শাসিয়ে ছিল একদিন।  সব থেকে বড় বিপদে পড়লো মাধুরি। তার পেটে চার মাসের বাচ্চা। সে এখন কি করবে? একদিন রাতে সে দোকানের চালা থেকে বেরিয়ে চলে যায় আমগাছটার নিচে। গলায় দড়ি দিতে গিয়ে ওকে দেখে ফেলল মাধুকাকা। ওকে ফিরিয়ে আনে। মাধুকাকা ওকে বিয়ে করে। তারপর বাচ্চার জন্ম হয়। মেয়ে সন্তান। সুখি এখন মাধুকাকার মেয়ে। মুরলী ওকে অনেক দিন থেকে দেখে আসছে। এখন সে ডাগর হয়ে উঠেছে। মাধুকাকার দোকানে এখন সে বসে। মুরলী ঘাটে এলেই একবার সুখির দেখা চায়। আজকাল যেন ওকে বেশি টানে। আগাম কাজ সেরে এসে বসে সুখির দোকানে। একটু গলা ভিজাবার জন্য। শুধুই কি চায়ের জন্য?  মুরলী ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। ওর আঁখি জুড়ে এক পাগল ঢেউ। দু’একটা কথা বিনিময় হয়। সুখি খুব হাসিখুশি। ওর ঘনচুলে আঙুল চালিয়ে দেয় মাঝে মাঝে। মুরলীর কেমন নেশা লেগে যায়। সুখির মা এখন বেঁচে নেই। মাধুকাকা সুখির হাতে সব ছেড়ে দিয়েছে। একটু আধটু বসে দোকানে। সারাদিনে বেশ ভালো বেচাকেনা হয়। ঘাট পারাপারের লোকরা একটু বসে এখানে জিরিয়ে নেয়। চা খায়। সুখি খুব ভালো ঘুগনি করে। ওর ঘুগনির নাম আছে। সে ঘুগনি মুরলী খায়। মুরলী ঘুগনি খুব ভালো বাসে।
 

মুরলীর আজ যেন ফেরার তাড়া নেই। সুখির দোকানে এই সময় ভিড় থাকে না। ফাঁকা থাকে। সুখি একটু বসে আরাম করে এই সময়। আজ সে রকম পারাপার নেই। সাজু মাঝি এমন সময় এলো একটু গলা ভেজাতে।
 
ও সুখি, দে দেনি একটা জমপেশ করে চা।
 
আমরণ তুর বুঝি এখন চা খাওয়ার সময় ?
 
আজ আর তো হাটবার লয়। চাপ কম আছেরে।
 
এমন সময় মুরলীর দিকে সাজুর চোখ পড়ে।
 
কি মুরলীবাবু, আজ এখনো এখানি ?
 
জয়ভবা বাস এলেই যাব সাজু।
 
ঘাটটা আর ঘাট নেই কো গো ! সব দখল করি লিলো সদর হাত কাটা। আর হয়তো ঘাটের ডাক পাবোনি। ভালো নেই মুরলী বাবু।
 
সাজুর গলায় কেমন এক আক্ষেপ ঝরে পড়ে। এ ঘাট তাদের পূর্ব পুরুষ থেকে দখলে আছে। এখন সমিতি হয়েছে। তারা এবার নাকি ঘাটের ডাক দেবে। যে যত টাকা দেবে ঘাট তার। এ ঘাট হাত ছাড়া হলে সাজুর সংসারটা ভেসে যাবে। এই নদীর সঙ্গে তার কতদিনের যোগ। এ ঘাটের সঙ্গে তার স্বপ্ন জড়িয়ে। সদর হাত কাটা তাকে একবার শাসিয়ে গেছে। তার লোকজন পার হলে তাদের পয়সা ও নিতে পারবে না।
 
কি হল সাজু?
 
আর কি হবেক গো দাদা ? সব শেষ হয়ি যাবেক !
 
কি শেষ হবে ?
 
আমাদের জীবনটো।
 
কেন?
 
ঘাট তো সমিতির লোকজন লিয়ে লেবে গো দাদা। সদর ছাড়বেনি।
 
সাজু ধপ করে বসে পড়ে বাঁশের মাচানে। ওর চোখ দুটো জলে ভিজে যায়। মুরলী কি বলে ওকে শান্তনা দেবে তা ও ভেবে পায় না। কত আপনজন এরা। এরা ঘাটে না থাকলে মুরলীর সব ফাঁকা লাগবে।
 
বেলা পড়ে আসছে। এমন সময় জয়ভরা বাস এসে থামলো। করে কিছু লোকজন নামলো। সাজু তাড়াতাড়ি চাটা গলায় ঢেলে নৌকায় গিয়ে উঠলো। জয়ভবা একটু সময় এখানে দাঁড়ায়। লোকজন হলেই তবে বাস ছাড়বে। এ বাসেই মুরলী চলে যাবে মীরপুর। ঘাটটা খাঁ খাঁ করবে। সুখি চায়ের দোকানের ঝাপ বন্ধ করে ও চলে যাবে। সদর ঘাট বন্ধ হয়ে যাবে।
বেলা মরে আসছিল। মুরলী সুখির হাতে আর এক পিয়ালি চা খেয়ে ও উঠে পড়ে। জয়ভবা ছুটে চলে। জানালার কাছে বসে সাজুর কথা ও ভাবতে থাকে। ফাগুনের বাতাসটা আজ বড়োই এলোমেলো ।
 

•২•

মাধুকাকা হঠাৎই চলে যাওয়াটা ঘাটের কেউ মেনে নিতে পারেনি। সুখি খুব ভেঙে পড়েছে। তিনি ছিলেন এদের মাথা। কোনো সমস্যা হলেই মাধুকাকা থেকে তা মিটমাট করে দিতেন। কিন্তু মাথাটা চলে যাওয়ায় সব থেকে বিপদে পড়লো সাজু মাঝি। মাধুকাকার সঙ্গে পার্টির লোকজনের সঙ্গে খুব দহরমমহরম ছিল। ভোটের সময় কত নেতা গোতা মানুষ আসতো। তাঁর সঙ্গে বসে চা খেত। ঘাটের পাশে যারা বাস করতো তাদের জন্য মাধুকাকা অনেক কিছু আদায় করে দিয়েছেন।
 
ঘাটটা আজ বড়ো ফাঁকা হয়ে গেল। সুখি একা হয়ে গেল। বেশ কদিন ধরে চায়ের ঝাঁপি ও খুলছে না। ওর দেখাও পাওয়া যায় না। অনেক ফিসফাস করছে ওকে নিয়ে। মাধুকাকা থাকতে ও কোথাও যেত না। এখন নাকি ওর পাখা গজিয়ে উঠেছে। এখন ও উড়ছে। কথায় কথায় সাজু মাঝি ওকে বলে, মুরলীদা, সুখিটা এবার লষ্ট হয়ি যাবি গো !
কেন ?
 
ও তো খয়ের এর ছেলেটির সঙ্গে যত ওর ফষ্টিনষ্টি। ঘাটের সকলে জানে গো দাদা।
 
বাপটা মরলো আর অমনি ফুরুৎ করে বেরিয়ে পড়লি। মাগী জাতটো বড়ো বে- আড়া। বুঝা যায় না গো মুরলীদা।
 
অত বুঝে কি হবে সাজু?
 
আরে ও নাকি কোন সাধুর বেজন্মা সন্তান। লোকে বলে কথাটা। চাপা থাকবি কেমন করে। ঘাটের কথা চিতার ছায়ের আগি ওড়ে গো দাদা।
 
মুরলীর মনটা হঠাৎই খারাপ হয়ে গেল। মাধুকাকার সঙ্গে তার অনেক দিনের আলাপ। এ ঘাটে না এলে মনে হয় মাধুকাকার সঙ্গে আলাপ হতো না। সে সুখির হাতে কত চা খেয়েছে। ওর সামনে সে বড়ো হল। ডাগর হয়ে উঠলো। চোখের চাহনি বদলে গেল। গলার স্বরে মাধুরী মিশে। মুরলী চা খেতে খেতে এ সব লক্ষ্য করতো। ওর মনের ভেতর কোথাও সুখি যেন একটু একটু করে বাসা বাঁধছিল। আজ সে টুকুও সাজুর কথাটে ছিঁড়ে গেল। এ ঘাটটা কি আবার তার কাছে অর্থহীন হয়ে যাবে? বেশ অনেকটা সময় সুখির দোকানে কাটাতো ও। এখন কেমন সব বিষাদ লাগছে।
 
বেলা পড়ে আসছে। জয়ভবা আসবে আর একটু পরে। রোজকার মতো সব দোকানপাট খোলা। শুধু সুখির দোকানে ছাড়া। খয়ের এ এলাকায় বেশ নাম ডাক আছে। সুখিকে সে ঠিক খুঁজে বের করবে। মাধুকাকা বেঁচে থাকতে এ সব কি করে ঘটলো ? মাধুকাকা নিশ্চয় জানতেন না। তবে ওর দোকানের আশেপাশে কখনো খয়েরের ছেলেকে ও কোনো দিনই দেখেনি। কি করে ওর সঙ্গে এত ভাব হয়ে গেল? মুরলী ভেবে পায়না।
 
সাজুর নৌকাতে এখন তেমন কেউ নেই। জয়ভবার জন্য সাজু অপেক্ষা করছে। সাজু নৌকায় বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছে। একটা বিড়ি ধরিয়ে সুখ টান দেয় সে। সাজু এই ঘাটের সঙ্গে কত কালের তার ভাব। তার সংসার চলে এই ঘাটের রোজগারে। যা আয় হয় তাতেই কোনো রকমে চলে যায়। কিন্তু সে এখন মহা সংকটে পড়েছে। সমিতির ডাকে সে পারবে না। অত টাকা পাবে কোথায় ও। এমনিতেই তার সংসার চলে না। তার অপর অসুখ বিসুখ লেগেই থাকে। ওর চোখের ঘুম চলে গেছে। মাধুকাকা বলছিলেন, তার জন্য কিছু একটা ব্যবস্থা করে দেবে পার্টির লোকজনদের বলে। কিন্তু তার আগেই মানুষটা চলে গেল। তার ঘরেও এই নদীর ঘোলা জলের মতো ঘোলা জল ঢুকে পড়ছে বিনা আমন্ত্রণে। এ যে বড় জ্বালা। সাজু দুটান দিয়ে বিড়িটা জলে ছুড়ে ফেলে দিল।
 

আজ নদী বড়ো উতলা। সে সব বাঁধন ছিঁড়ে এগোতে চায়। মুরলী বসে থাকে। গোটা ঘাট জুড়ে কেমন এক হিম হিম সন্ধে নামছে। ঝিঁঝিঁ ডাকছে। চরে কার দাহ হচ্ছে। চিতার ধোঁয়া কুন্ডলী পাকিয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে। চেনা ঘাটটা আজ বড়োই অচেনা লাগছে। কেমন এক অন্ধকার খেলা করছে চারপাশে

 
মুরলীর চোখ দুটো জলে ভিজে যায়। ওর মন গেয়ে ওঠে,
 
ওরে আমার পাল তোলা নোকৌ মাঝি,
পার করে দে।
 
বুকটা কেমন যেন করছে। জয়ভবার কথা ও বেমালুম ভুলে যায়। কখন থেকে বাসে হর্ন দিচ্ছে। ওর কানে সে শব্দ পৌঁছায় না। এ রোডে একটাই বাস চলে। এটা চলে গেলে ওকে সারারাত বসে থাকতে হবে।
 
দূরে একটা পাল তোলা নৌকা ভেসে যাচ্ছে। আজ নদী বড়ো উতলা। সে সব বাঁধন ছিঁড়ে এগোতে চায়। মুরলী বসে থাকে। গোটা ঘাট জুড়ে কেমন এক হিম হিম সন্ধে নামছে। ঝিঁঝিঁ ডাকছে। চরে কার দাহ হচ্ছে। চিতার ধোঁয়া কুন্ডলী পাকিয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে। চেনা ঘাটটা আজ বড়োই অচেনা লাগছে। কেমন এক অন্ধকার খেলা করছে চারপাশে।
 

•৩•

খবরটা ছড়িয়ে পড়েছিল সকাল হতেই। কেমন যেন ঘাটে একটা থমথমে ভাব। চারপাশে মানুষজনের ফিসফাস। কেউ খোলসা করে বলছে না।
 
ঘাটে মুরলী আসতেই খবরটা পেল সে। সাজুই দিল খবরটা। সুখি আর বেঁচে নেই শুনে ও আঁৎকে ওঠে ও।
নেই মানে?
 
মুরলীদা, ও তো গত রাতে নাকি ফিরে ছিল বটে। কিন্তু হঠাৎ করে।
 
কি?
 
সুখি গলায় দড়ি দিয়েছে গো। ওর নাকি পেঠে বাচ্চা এসেছিল। খয়ের ছেলের বাচ্চা। ওকে নিয়ে ফুর্তি তুর্তি করেছে। বেয়েটা করেনি।
 
সাজুর নৌকাতে পার হবার জন্য পা দিতে গিয়ে ও থেমে যায়। কেমন যেন সব অবস অবস লাগছে।
 
তুই ঠিক শুনেছিস?
 
হু গো দাদা। তাহলি বলছি কেনে !
 
সাজুর নৌকাতে সে আজ পার হয় না। কাঁপা কাঁপা পায়ে ও এগিয়ে যায়। দেখছে কিছু মানুষের জটলা। পুলিশ কে খবর দেওয়া হয়েছে।  সুখি এখনো ঝুলে আছে। মুরলী চোখ ফিরিয়ে নেয়। ওর গর্ভে একটা ছোট্ট শিশু। যে জগতের আলো দেখলো না। সুখি, তুই কি ওপারে গিয়ে সুখ পাবি? ছিঃ!
 
মুরলীর মুখটাতে কেমন তেঁতো তেঁতো লাগে। চারপাশে মাছি ভনভন করছে। মুরলী আর দাঁড়িয়ে থাকে না।  এই ঘাটের মায়া ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কোথায় ও জানে না। আজ তার বুকের সুখটাতে কে যেন হাত দিয়ে মচলিয়ে দিচ্ছে। খুব ব্যথা লাগছে। যে ব্যথা আমরণ কাল তাকে বয়ে নিয়ে বেড়াতে হবে।

 

♦—♦♦—♦♦—♦♦—♦

 


  • Tags:
❤ Support Us
ভেসে যায় নধরের ভেলা, ভেসে যায় বেহুলা পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
ঈশানবঙ্গের শক্তি পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
error: Content is protected !!