Advertisement
  • গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
  • সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৫

দোলনা

সুতপন চট্টোপাধ্যায়
দোলনা

 
পশ্চিম আকাশে মেঘ উঠেছিল অনেক আগে। নেপালের বউ সান পুকুরের পুব দিকের ঘাট থেকে ভিজে কাপড়ে উঠে আসছিল, ঠিক তখনই আকাশ কাঁপিয়ে হিলহিলে বিদ্যুৎ। বাড়ির উঠোনে আঁচলের জল নিঙড়ে ফেলতে ফেলতেই আকাশ ফেটে পড়ার শব্দ। চিৎকার করে বলল নেপালের বউ, শুনছো, জল নামবে, ধানের বস্তাটা ঘরে ঢোকাও। নাহলে ওই বস্তা থেকেই ধান গাছের চারা মুখ বের করে হাওয়া খাবে।
 
নেপাল এক মনে তলদা বাঁশ ছুলছিল। সে তলদা বাঁশের একটা দোলনা করবে। বাড়ির উঠোনের একদিকে একটা আম গাছের সে একটা দোলনা ঝোলাবে। নেপালের বউএর বহু দিনের শখ। দিনের কাজ শেষ হলে সে দোলনায় দুলবে। কত দিন বলেছে। তাঁর ইচ্ছেটা আর পুরণ হচ্ছে না। এবার হবে। কাল রাতে বাঁশ বাগান থেকে লুকিয়ে একটা লম্বা তলদা বাশ কেটে এনেছে নেপাল। আহা, তলদা বাঁশের চেহারাই আলাদা। বড় লোকদের শরীরে মত মোলায়েম। হবেই তো। তলদা হল জাতে কুলীন বাঁশ। গড়নে সম্ভ্রান্ত। মাখন যেন। এক বিগত অন্তর অন্তর গাঁট নেই। তলদা বাঁশ দু ভাগ চিড়ে পাশাপাশি বসাবে। চার কোনে দড়ি বেঁধে আম গাছের ডালে ঝুলিয়ে দেবে। তা কাঠ থাকতে বাঁশ কেন ? কাঠই তো ভালো। বলেছিল বউ। নেপাল বলেছিল, মেয়েছেলের মাথায় সংসারের বুদ্ধি ভালোই খেলে, এই সব কেরামুতির বুদ্ধি খোলে না। বর্ষার জলে কাঠ নষ্ঠ হবে, তলদা বাঁশ হবে না। যা করছি পারমেন্ট কাজ। একবার ঝুলিয়ে দিলে মরা অব্দি চলবে। আমি না থাকলেও তুমি ঝুলবে।
 
নেপালের বউ মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, আমার জন্য দোলনা করছ মানে কি আমিই দুলবো? তুমি দুলবে না? তোমার মুখের লাগাম নেই? তুমি না থাকলে কাকে দেখে দুলবো?
 
নেপাল বলল, আমি তো সব সময় দুলছি। গরীবের তো সারা জীবনই দোল ? নুন আনতে পান্তা ফুরোয় সে টা কি কম দোল নাকি?
 
এ সব কথার মানে বোঝে না নেপালের বউ। কথাও বাড়ায় না । সোজা ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। পিছনে তখন কাপড়ের ঝড়ে পড়া ফোঁটা ফোঁটা জলে, গোটা উঠোনে ভিজে মাটির আলপনা।

 

 
নেপালের বৌএর নাম নূপুরবালা। বিয়ের পরেই নেপাল বালাটা ছেঁটে দিয়েছে । বলেছে, বালা টালা আর আজকাল চলে না। কেউ নাম জানতে চাইলে বলবে শুধু নূপুর। না দেখে নামটা শুনেই বিয়েতে প্রায় রাজি হয়ে ছিল নেপাল। এই নামটা শুনলেই কেমন ঝনক ঝনক শব্দ হয়। কথাটা একদিন শুনে নূপুরবালা বুঝেছিল তাঁর সঙ্গে অন্যদের মত চাষা ভূষোর বিয়ে হয় নি। লোকটার মন বলে একটা জিনিস আছে। আর এই জিনিসটাই তো চেয়েছিল নূপুর। চাষ করুক, তাতে কিছু আসে যায় না, তা বলে সারা দিন লাঙ্গল, চাষ আর সারের গল্প করবে ? যে দিন নেপাল এসে বলল, জানত, আজ বাঁশ বাগানের ফুর ফুরে হাওয়ায় গায়ের ঘাম যখন শুকুছিলাম তখন মনটা কেমন হালকা হয়ে গেল। সেদিন নূপুরের আর কোন সন্দেহ রইল না, নেপাল অন্য জাতের। তার ভিতরে সুখ টুখ দুক্ষু টুক্ষ আলাদা আলাদা ভাবে খেলা করে। সব গুলিয়ে ফেলে না। আর সে দিনই সে বলেছিল, আমার জন্য একটা দোলনা বেঁধে দেবে ?
 
নূপুর জানত, নেপাল না বলবে না। সে মানুষটাকে ঠিক চিনেছে। চিনেছে কিন্তু ঠিক চিনেছে কিনা মাঝে মাঝে সন্ধেহ হয় নূপুরের। যেমন গত বারের ঝাঁপানের মেলায় বলেছিল,আসার সময় মাস- কলাই ভাজা আর লাল জিবে গজা নিয়ে এসো। আর ঘাড়ে করে একটা পাকা কাঁঠাল। ঝাপানের দিন সে যেতে পারেনি। শরীর অশৌচ, পড়ল তো ঠিক ওই দিনেই পড়ল? আর দিন পেলো না ? রাগে বিড় বিড় করলে কী হবে ? যাবার সময় নেপাল বলে গিয়েছিল, সব মনে করে আনবে। কিন্তু আসলে হলো কী ? সন্ধ্যেবেলা বন্ধুদের সঙ্গে একটু বেশী গিলে যখন ফিরল তখন প্যাকেটে জিবে গজা ছাড়া আর কিছুই পেল না নূপুর। সে রাতে খুব একচোট মুখ করেছিলো নূপুর। কিছুই মনে করে নি নেপাল। নেশার ঘোরে নূপুরের গালি গালাজ মনে হচ্ছিল ঝাপানের গরম পাঁপোড় ভাজা। মুচ মুচে, তেলের গন্ধভর্তি হলুদ পাঁপড়। জ্ঞান ছিল । মনে মনে বলেছিল, একটু পড়েই মিইয়ে যাবে। কিচুক্ষণের ব্যাপার। আসলে নেপাল কেন আনে নি তার কারণ অন্য।

 

 
নেপাল কি কোন দিন জানতো যে বাবা তার যাবার আগে তাকে একেবারে ধসিয়ে দিয়ে যাবে? কোন ছোটোবেলায় মা মরে গেছে মায়ের দয়ায়, সে তার কিছুই স্মৃতিতে নেই। হয়তো ছিল ,বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই স্মৃতি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে গেছে। কিছুই আর তলানিতে নেই। তার মনে আছে এক পিসি তাকে মানুষ করেছিল। এই টুকুই আছে, কেউ তাকে মায়ের কথা বললে সে পিসির গল্প বানিয়ে বানিয়ে মায়ের গল্প বলে চালিয়ে দিতো। যারা জানত তারা মুচকে মুচকে হাসত। এই যন্ত্রণাটাই বুকে লুকিয়ে সে বড় হয়ে গেল বাবার কাছে। খুব একটা দরিদ্রা ছিল না তারা। দু বিঘে ছিল, চাষ করলে খোরাকীটা হয়ে যেত। আর নুন তেল ? সে টা বাবা কামার শালে গরম লোহায় ঘা দিয়েই ঘরে তুলত। কামারশালটা ছিল গ্রামের শেষ প্রান্তে। কোদাল, বর্শা, লোহার তীর, লাঙ্গলের ফাল, ইঁদুর ধরার জাঁতা কল লোহা পিটিয়ে করতে জানত বাবা। সেই সময়টাই ছিল নেপালের স্বর্ণ যুগ। চাষের কাজ করতে চাইতো, কামার শালের ধারেও সে মারাত না। বাপ লোহার গরমে ঘাম ঝরাত আর সে ফুটবল মাঠে খেলে কাটাত। এই একটা ভূলই তার মনে হয় বাপটাকে তাড়াতাড়ি নিয়ে নিল। কে জানত এক দিন হাতুড়ি মারতে মারতে গরম লোহার টুকরো তাঁর দু চোখে আচমকা বিঁধে যাবে ? ব্যাস। সদর এর ডাক্তার, যাতায়াত, অষুধ পত্তর এই করতে করতে এক এক করে দু বিঘে জমি বিক্রি হয়ে গেল। চোখ ঠিক হল না। অন্ধ বাপ তাঁর যত না যন্ত্রণা ,বাপের যন্ত্রণা তার শত গুণ। চোখের সামনে দেখল মানুষটা শুকিয়ে গেলো। মন কষ্ঠে বারবার বলত, আমি তো কোন খারাপ কিছু করি নি। তাহলে আমারই এমন হলো কেন? পাশের বাড়ির হরিকাকা বোঝাতো, আমাদের মতো মানুষের কেন এমন হয়, ভাবতে নেই। হলে, সহ্য করতে হয়। তুই তাই কর। তর তো তবু ছেলে আছে। আমার তো কেউই নেই। কার কাছে উত্তর চাইবো ?
 
সে সময় নূপুর এসে গেছে এই ঘরে। সেও দিন দিন দেখেছে নেপালটা কেনন উদাসীন হয় থাকে মাঝে মাঝে। বাড়ির সব ডাক্তারের পিছনে বইয়ে দিয়ে একদিন বাপ মার গেল। নুপুরের পেটে তখন সবে নতুন প্রাণ।
 

মানুষটা মাঝে মাঝে ভূলে যায় কিন্তু মনটা যাত্রা দলের বিবেকদের মতো। গান গেয়ে ভালো ভালো কথা বলে সবাইকে মাতিয়ে রাখে কিন্তু তার মনের খবর কিছুই জানা যায় না। অভাবের মধ্যেও তাঁর মুখে কিন্তু কোনও রা নেই। সে আপন আনন্দে মন দিয়ে তলদা বাঁশ দু ভাগ করে চলেছে

 
এতোদিন নূপুর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছে নেপালের সঙ্গে। এই ঘটনাটা জানার পর নেপাল একটু সতর্ক হল। জীবনটাকে নিয়ে অনেকবার চি কিত কিত খেলা খেলেছে । দেখেছে লাভের কিছু হয় নি। সে কিছুতেই প্রতিপক্ষের একটা পা ধরে টান দিতে পারে নি নিজের কোর্টের দিকে। উলটে ধরা পড়ে গেছে । তাই সে সতর্ক হল। সব দুঃখ কষ্ঠের মধ্যে এই নতুন প্রাণের আসাই তো তাঁর একমাত্র জিত। আর তো কোন আনন্দ তার ঝুলিতে নেই। তাই যেদিন নূপুর এই দোলনার কথা বলল, সে দিন যে এক কথায় রাজী হয়েছিল। তার একটা কারণ নূপুর নয় ওই নতুন যে আসছে তার জন্যেও। আস্তে আস্তে নূপুরের বাইরের কাজের ভার কমিয়ে দিতে হবে। পুকুর ঘাটে কুলে খাড়ার ঝাড় বানাতে হবে। শরীরে রক্ত হতে হবে। পেয়ারা জোগার করতে হবে গায়ের জঙ্গল থেকে। সদরের ডাক্তার বলেছে, পেয়ারায় নাকি অনেক ভিটামিন আছে। এ সব যে নেপাল করছে সেটা বেশ ভালো লাগে নূপুরের। মানুষটা মাঝে মাঝে ভূলে যায় কিন্তু মনটা যাত্রা দলের বিবেকদের মতো। গান গেয়ে ভালো ভালো কথা বলে সবাইকে মাতিয়ে রাখে কিন্তু তার মনের খবর কিছুই জানা যায় না। অভাবের মধ্যেও তাঁর মুখে কিন্তু কোনও রা নেই। সে আপন আনন্দে মন দিয়ে তলদা বাঁশ দু ভাগ করে চলেছে। সে দিকে তাকিয়ে নূপুর বলল, তা বাঁশ দু ভাগ করছো কেন। গোটা গোটা রাখলে কি শক্তপক্ত হত না ?
 
নেপাল বলল, অত বাঁশ পাব কোথায়, এই না লুকিয়ে চুড়িয়ে রায়দের বাগান থেকে নিয়ে এসেছি। কোন অসুবিধা হবে না। দারুণ দোলনা হবে। বাঁশ চেরাই করে কদিন রোদে ফেলে রাখবে নেপাল। বাঁশের শরীরের রস কিছুটা টেনে গেলে নিচে দুটো বাঁশের কাটাকুটি করে পেরেক দিয়ে আটকে দিলেই দোলনা । তার পর, খালি আমগাছের ডালে ঝুলানো ।

 

 
নেপালের শরীর খুব আটোসাই নয় কিন্তু তাঁর হাতের উপরের পেশী বড গুলির মত ওঠানামা করে। এই দেখেই নূপুরের সুখ। পুরুষ মানুষের আসল তো পেশী। যতদিন আছে ততদিনই ভেল্কি। আলগা হতে আরম্ভ হলেই জীবনও কেমন নেতিয়ে যায়। নেপালের এই দোলনা বাঁধার দিকে তাকিয়ে ছিল নূপুর। হঠাৎ ওরে বাবারে বলে কাটারিটা ছিটকে পড়ে গেল নেপালের হাত থেকে। তলদা বাঁনশের উপর কোপটা ধরে থাকা আঙ্গুলের উপর পরেছে অসাবধানে। আর সঙ্গে সঙ্গে ভল ভল করে রক্ত। আঙুলের মাথা থেকে গড়িয়ে নামতে লাগল । যন্ত্রাণায় হাতটা উপরের দিকে তুলে ধরল নেপাল। এবার রক্ত হাতের পাতা থেকে হাত গড়িয়ে কনুইয়ের থেকে মাটিতে পড়ছে টপ টপ। চিৎকার শুনে ছুটে এসছে নূপুর। দেখেই সে বাড়িরর পিছনে গ্যাঁদা ফুলের ডাল ছিঁড়ে নিয়ে এসেছে। দু হাতের মধ্যে গ্যেদাপাতা পিষে সে নেপালের হাতের আঙুলের মাথায় চেপে ধরল নূপুর । তার পর সে সামনের দড়িতে ঝলানো গামছা দিয়ে বেঁধে দিল বুড়ো আঙুল।
 
বুড়ো আঙ্গুলের কিছুটা অংশ কেটে ঝুলে ছিল, তাকে ঠিক জায়গায় এনে ভালো করে বেঁধেছে নূপুর । যন্ত্রণায় দু চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে। সহজে রক্ত বন্ধ হচ্ছে না। একপ্রস্থ গাঁদা পাতা ফেলে আবার নতুন গাঁদা পাতা চেপে ধরল নূপুর। নেপাল বলল, খুব যন্ত্রণা হচ্ছে।
 
নূপুর বলল, হবেই।
 
নেপাল বলল, আমার মাথা ঘুরছে। হ্যাঁ, ঘুরছে। নেপাল বুঝতে পারচ্ছিল একটা দোলনা দুলছে, ঝোড়ো হাওয়ায়। মাথার মধ্যে এক দিক থেকে অন্য দিকে। তাঁর মাথার মধ্যে দিক বদল করছে দোলনাটা। সে দেওয়ালের ঠেসান দিয়ে চুপ করে বসে পড়ল। অনেকক্ষণ যন্ত্রণা সহ্য করল নেপাল। তাঁর পর চোখ খুলে দেখল, নূপুর তারই দিকে তাকিয়ে আছে। মনটা শান্ত হল।
 
নূপুর জিজ্ঞাসা করল, কি করে হলো?
 
নেপাল বলল, জানি না। হঠাৎ আঁঙুলের উপর কোপ পড়ল। বুঝতে পারিনি?
 
নূপুর বলল, কার কথা ভাবছিলে বলো তো ?
 
নেপাল বলল, কার আবার ? তোমার। তোমাকেই দেখছিলাম দোলনায় দুলছো। দু পাশে হাওয়া কাটছে, আঁচল উড়ছে।
 
অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল নূপুর। তারপর বলল, তুমি আমায় এতো ভালোবাস ?
 
নেপাল উত্তর দিল, কেন? গরীবের ঘরে কি ভালোবাসা থাকতে নেই ?
 

♦–♦–♦•♦–♦–♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!