Advertisement
  • গ | ল্প
  • সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৫

ফেরা ঢেউ

সুধীরকুমার শর্মা
ফেরা ঢেউ

 
ড্রেসিং টেবিলে মেক-আপের কৌটৌকাটরা সাজানো, রোজ মাখি না। আজ… ।
 
টুল পেতে উলটো-আমির মুখে বসে আছি। কেমন যেন লাগছে, আলসেমি নয়, কেমন। উপরে ওয়াল-ক্লকটায় শব্দহীন তিনটে পঁয়তাল্লিশ। বাইরে কমপাউনডে রোগা রোদ্দুর, ঘাসের ডগা কালচে সবুজ।
 
সুরঞ্জন কাল রাতে বলেছিল, নিউজটা ও দেরিতে পেয়েছে। কোথা থেকে, ভাঙেনি। ওর অফিস স্টেটাস বড়ো, সোর্স ­ ইলাবোরেট। শুনিয়ে ও আমার চোখে চেয়েছিল, এক দুই পলক। এমনিই হয়তো। তা সত্ত্বেও মনে হচ্ছিল সুরঞ্জন অ্যাসিড ঢেলে পরীক্ষা করছে। কেন, জানি না, মনে হয়েছিল। তখন চমকে কেঁপেছিলাম। ও সেটা দেখতে পাবে না, নিশ্চিত। দম কেটে নিজেকে বরফ রাখতে পেরেছি।
 
তুমি কি কাল যাবে ? – বলে সুরঞ্জন খাট থেকে পা মেঝেতে রাখলো, জানলায় গিয়ে পর্দাটা সরিয়ে দিয়েছে। হাওয়া এসে ঘরের মরা নীল আলোতে লুটিয়ে পড়লো। সিগারেট ধরাচ্ছে ও। খক কেশে চলে গেছে ভেসটিবিউলে। জমাট কালোর মধ্যে পেতে রাখা সোফায় বসে পড়েছিল তখন। ধোঁয়া সাদা রেখায় এঁকেবেঁকে বিমূর্ত ছবি আঁকছে।
 
ঘরের খাটে হেলান বসে সবটা দেখতে পাচ্ছিলাম।
 
আজ সকালে অফিসে বেরোনোর দরজায় সুরঞ্জন বলে গেছে, – তাহলে,… জাস্ট অ্যাট ফোর আফটার-নুন, …উঁ… রেডি হয়ে থেকো। ফিরে তোমায় নিয়ে যাবোখন।
 
ওর মুখে চোখ রেখেছিলাম, নিভাঁজ চামড়ায় কোনো ভাষা পাওয়া যায় কিনা, কিন্তু ওর একজিকিউটিভ ফেস। পাথর কোঁদা। মন আর মুখের মাঝে চিলতে ফাঁকটুকুও ঢেকে রাখতে পারে। ওর কথাতেও ইকোনমি। সফল মানুষের এরকম গুণ লাগে।
 
রেডি প্রায় হয়েই আছি। কমপ্যাক্ট ব্রাশটাই বাকি। শাড়ি পড়া হয়ে গেছে। সাদা জমিতে গোল গোল কমলা বুটল। জর্জেট । এরকম ডিজাইন আমার এত পছন্দের যে প্রতেক বছরে পুজোয়, নইলে পয়লা বোশেখে, কিনবোই। অথচ পড়ি না। আলমারিতে থাকে থাকে জমে জমিনের সুতোটায় পচন ধরে। তখন আমাদের আয়া মীনুকে দিয়ে দিই।
 
মীনু হাঁ হয়ে দেখে। বুঝতে পারি, দামি শাড়িটা বিলিয়ে দিচ্ছি বলে অস্বস্তিতে পড়েছে। একবার মুখ ফসকে বলেছিল, – এগুলোর বদলে প্লাস্টিকের বালতি, গামলা, নাহয় স্টিলের বাসনকোসন তো নিতে পারো, বউদিমণি।
 
তুই না পড়লে, পালটে এইসব নিয়ে নিস। তোর সংসারে জিনিসপত্র তো লাগেই।
 
মীনু,– না না, পড়বো না কেন ? কি বলছো গো, তুমি ? – বলেছে সঙ্গে সঙ্গে। আমার কথার ভিজোনো ঝাঁঝটা ওর নাকে গোপন থাকেনি।
 
তখন বলেছিলাম – আরেকটা কথা, শোন, পাঁচকান করবি না। এ শাড়িটা পড়ে কখনও এ বাড়িতে কাজে  আসবি না। দাদাবাবু দেখলে রাগ করবে।
 
মীনু কথার খেলাপ করে না। সবসময়। মাইনেটা ভালো দিই। ওকে এবেলা ছুটি দিয়েছি। নিজেই। সুরঞ্জন রাগ করুক। রাতে খাবার কিনে আনা যাবে ক্ষন। কী-ই বা খাই দুজনে !
 
সুরঞ্জনের এই শাড়ির উপরে রাগ, বলে এ টাইপগুলো পড়লে নাকি বুড়ি দেখায়। এখনও কচি খুকি আছি ! ওর চুলেও যে সাদা ছিটে ! ওদের অফিসে হামেশাই নানান গেট টুগেদার। সাজগোজে যৌবনকেও হার মানিয়ে যাই। অবশ্য সুরঞ্জন শাড়িই পছন্দ করে। তবে ওর বাচ্যে জারকিং, একসাইটিং, এরোটিক। আমার সামান্য ভার নামা ফিগারে ওরকম নাকি বেশ আকর্ষণীয়। সুরঞ্চনের এই প্রশংসাটা ওর নিজের নয়, বরং ওর শার্টে ঢাকা কর্পোরেট ভাস্কর্যের। প্রত্যেকবার কেনার পরই ও বলেছে, – আচ্ছা, এই প্যাটার্নের শাড়ি তুমি বারবার কেনো, কেন, বলতো।
 
আমি হেসেছি, – অব ­কোর্স। কিন্তু পড়ো না। না, না, আমি সিট বা গ্যাদারিংগুলোর কথা বলছি না। ঘরেও পড়তে পারো। ইন ফ্য্যাক্ট, হাউজিংয়ের পুজো ফেস্টিভে সব মহিলা অমন লাইট শাড়িই পড়ে, দেখি। বাট ইউ ডোন্ট।
 
– পড়ে ওঠাটাই হয়ে ওঠে না। এবার পড়বো। রাইট ?
 
– উঁ…হুঁ ! ওই শাড়িগুলো তোমার অবসেশন। ইয়েট, আই নো নট হোয়াই।
 
সুরঞ্জনের কথা কাঠ লাগে। বসে থাকি এবার। সুরঞ্জনও। দুজনেরই কথা নিরুদ্দেশে পাড়ি দেয়।
 
এমন কথাবার্তা রাতের দিকেই হয়। সুরঞ্জন একসময় শান্ত হতে পারে বানানো অনুশাসনে, বলে – পারহ্যাপস তুমি … আমি,…আনহ্যাপি কাপল। …বিলিভ মি, আমি চেয়েছিলাম…তোমার একটা পোস্ট ইসু হোক। …আই…আয়েভ ট্রায়েড…আটমোস্ট…বাট…তুমি কোনো সাড়া দিলে না। …কেমন ফ্রিজিড ছিলে, ডঃ কোনার বলেছিলেন।
 

জানলায় যাই, সাটার টেনে খুলি। বাইরে থেকে হঠাৎ এসে বাতাস ঢিলে গায়ে হাত বোলায়। সামনে খাড়াই আকাশলিহন হাউজিং ফ্ল্যাটগুলোর কোনো একটার দেয়ালে চোখ আহত হলে, ঘাড় হেলিয়ে, উঁচিয়ে দূ-র-তরকে দেখতে যাই, টিভি স্ক্রিনের মতো বাকসোখোপী আকাশে একটা তারাই তখন জ্বলছে

 
তখন আমি উঠে ধীরে ধীরে জানলায় যাই, সাটার টেনে খুলি। বাইরে থেকে হঠাৎ এসে বাতাস ঢিলে গায়ে হাত বোলায়। সামনে খাড়াই আকাশলিহন হাউজিং ফ্ল্যাটগুলোর কোনো একটার দেয়ালে চোখ আহত হলে, ঘাড় হেলিয়ে, উঁচিয়ে দূ-র-তরকে দেখতে যাই, টিভি স্ক্রিনের মতো বাকসোখোপী আকাশে একটা তারাই তখন জ্বলছে। ওপাশে সুরঞ্জন ভেজটিবিউলে চলে গেছে, হুইস্কি ঢালছে গেলাসে, না ফিরেই শব্দটা শুনি।
 
পায়ের পাতাজোড়া ছাড়া আয়নাতে আমি পুরোটাই। কতদিন এভাবে নিজেকে পরখ করি না। আমি এখন শাড়ি। কেন আজকেই এটা পড়তে গেলাম ! কোনো পরব তো নেই। আলমারির তাক থেকে হাত এটাকেই বাছলো কেন ? একটু আগে ইচ্ছে জেগেছিল, কাপড়টা খুলে ফেলি, রঙের গৌরবে জাঁকি অন্য একটা পরবো। আচ্ছা, পোশাকের সঙ্গে মানুষের কি কোনো সম্পর্ক থাকে ? কিংবা তার মনের ? আমি কি আমার ভিতরমহলে কোথাও তার বিদায়ী বাজনা শুনতে পাচ্ছি ? এমন নয় যে শাড়িটা অজগর হয়ে আমাকে সর্বাঙ্গে পেঁচিয়ে ধরেছে। টিভিতে একটা সাপ দেখেছিলাম। সাদা। চামড়ার উপর গোল গোল হলুদ ফুট। সুন্দর। বীভৎস সুন্দর । সুরঞ্জন এসে এই শাড়িটার জন্যই জিভে বিষ মেশাবে হয়তো।
 
ঘড়ির কাঁটা কয়েক ধাপ এগিয়েছে, মানে সময় এগোচ্ছে। সময়। এমনি করতে করতেই কোনো একটা জিরো আওয়ারের দিকে এগিয়ে যাবে। ধ্রুব সে মুহূর্ত। এরপর টুকটুক পায়ে ঘাট কেটে কেটে আর হাঁটবে না।
 
সুরঞ্জন চারটেয় আসবে। সকালে উঠে বহুক্ষন ধরে ওর স্কুটারটা জলে ধুয়ে মুছেছে। পুরোনোকে নতুন সাজাচ্ছে ও। যদি এমন হতো, ঠিক এখন থেকেই দুনিয়ার সমস্ত ঘড়ি বন্ধ হয়ে যাবে। কখনো চারটে বাজতো না। ওর ঘরে ফেরার তাগিদ হারিয়ে যেত। অফিসে বিজি ওয়ার্লড। কাজের পাহাড় জমে থাকে। তাহলে, এই শাড়ি পড়ে অপেক্ষা করা অর্থহীন এক স্বপ্ন হতো। তখন এ বস্ত্রবেশ খুলে ভাঁজে ভাঁজ আবার আলমারিতে তুলে রাখতাম। ইস, যদি সুরঞ্জন একবার ফোন করে, – শোনো, যাওয়া হচ্ছে না। অফিসে ইমারজেন্সি, …তারপরেই ফোনটা কেটে যাবে।
 
বাইরে ‘ব্যারাক’ আওয়াজ হল। অফিসের গাড়ি সুরঞ্জনকে পৌঁছে দিতে এসেছে। রোজই দেয়। গ্যারেজ থেকে স্কুটারটা বের করছে। গ্যারেজের শাঁটার বন্ধের শব্দটা গাঢ়। আমি চমকে উঠলাম। মনে হচ্ছে আমার পা কেমন অবশ লাগছে। একমুহূর্তে বুকের ভিতর কাঁপুনি। চোখ বন্ধ করলাম। দাঁতে চেপে কাটলাম ঠোঁট। একদম। দুদম। শান্ত হল যেন শরীর। চোখে কি জলের উদগম? আঁচলে মুছেছি। স্থির থাকো – নিজেকে বলেছি।
 
অণু ! – নিচ থেকে সুরঞ্জন।
 
উঠে দাঁড়ালাম – পায়ে বল এসো – প্রার্থনা করলাম।
 
অনু।
 
আসছি। এক মিনিট।

 

 
স্কুটারে সুরঞ্জনের ব্যাক সিটে উঠে বসেছি। আমি সড়গড়। কতবার সুরঞ্জন আমাকে এরকম বসিয়ে লং রাইড দিত। যেমন ওর চাওয়া ছিল বরাবর, আজও তেমনই। কখনোই পড়ে যাবো না, তবু ওর পিঠে আলতো হাত রাখতে হয়।
 
সুরঞ্জন গাড়ি চালায় ভালো, ও স্বপ্নের জাদুকর, রূপকথার রাজপুত্তুর। গাড়ি আচমকা স্টার্ট দিয়েই  আমাদের হাউজিং প্যাসেজ ছেড়ে রোডে পড়লো, আর একটু এগিয়েই মেন রোড। তারপর সোজা, বড়ো জোর ছ মিনিট লাগবে, রাস্তায় যত খুশি জ্যাম হোক। গন্তব্য। এরপর আর যাত্রা নেই, থেমে যাওয়া। রোডে বাঁক নিয়েই সুরঞ্জন হঠাৎ ব্রেক কষে, মুখ ফেরায় না, বলে, – তোমাকে কতবার বলেছি। অথচ তুমি একইরকম। সিলি। আঁচলটাকে উড়িয়ে রেখেছো। যখন তখন একটা অ্যাকসিডেন্ট ঘটাবে। ওই ট্রাবল ইনভাইট করাটাই কি তোমার ইচ্ছে নাকি ! ইনটলারেবল ! কোমরে জড়িয়ে নাও।
 
– সরি। – আমি কাপড়টা জড়াই।
 
– অনু, কীসের টেনশন ! নাথিং উড বি। আমি খোঁজ নিয়েছি।
 
সুরঞ্জনের উপর আমার কৃতজ্ঞতা জাগে, কিন্তু ও জানে না, আমার টেনশন নেই, আমি এক যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে প্রবেশ করছি। পুণ অথবা শূন্য কিছু একটা ঘটবে। কী ঘটবে আমি জানি না, এ বিশ্ব সংসারে কেউ জানে না, হয়তো একমাত্র সময় জানে। অথচ নির্জীব সে, অবোধ সে জানে কী করে।
 
আমি উপর থেকে নিচে তাকাই। চেয়ে থাকি। চাকার তলায় অ্যাসফল্টের রাস্তা পিছলে চলে যাচ্ছে। বড়ো অদ্ভুত। যেন একটি নদী, কালো নদী, তার উপরে আমরা ভাসছি। সে নদীর পারে পারে কত নুড়ি, কত উপল, বোল্ডার, ঘাট, জনপদ, মানুষের পা। কোলাহলমুখর জীবনধারা। শুধু এই স্কুটার নৌকোয় বসে থাকা আমরা দুজনের যেন জীবন নেই। ভুল বললাম, সুরঞ্জনের হয়তো আছে, জানি না। সব কি জানা যায়। কে জানে সব? পিছন থেকে ওর মুখটা দেখা যায় না, ওর মুখে কি কোন উষ্মার দাগ আছে; যেন আমাকে শেষবারের জন্য চিতার যজ্ঞে দাড় করিয়ে তৃপ্তি পাবে। ও হয়তো তখন উল্লাসে হাততালি দিয়ে উঠবে, বলবে, – আমি জানতাম। কেন …কেন তুমি…। আমাকে এইভাবে ঠকালে !
 

লিফট নেমে দোল খেতেই অপেক্ষার ভিড় হুড়মুড় করে উঠতে ব্যস্ত। ওটার পেট চিরে ঝাঁক বেরিয়ে আসার রেয়াত করতেও রাজি নয়। সময় ওরা যেন পাবে না, সব জিরো আওয়ারে পৌঁছে ধ্রুবমুহূর্ত হয়ে যাবে। শোঁ – ও – ক। শব্দ তুলে এইমাত্র লিফটখানা বেহাজিরা হয়ে গেল

 
বিশ্বাস করো সুরঞ্জন আমি তোমাকে ঠকাইনি। সেরকম ইচ্ছে আমার কষ্মিনকালে ছিল না। আমি শুধু বাঁচতে চেয়েছিলাম, আমার মতো, আমার তৈরি মনগড়া সুখ নিয়ে। বিশ্বাস করো। স্কুটারটা রাস্তা ছেড়ে গন্তব্যের কমপাউনডে ঢুকে গেল। লোহার মতো গেটটা পেরোতেই ডানদিকে পোস্টে গাঁথা ভবনের মানচিত্র। কমপাউন্ডে লোহার রেলিং ঘেরা বেশ বড়ো পুকুর, কালো জল, পুকুর ঘিরে লন, কয়েকটা বাহারে, কয়েকটা মাঝারি ফুলের গাছ – কোনোটায় ফোটা ফুল, কোনোটায় নেই। লনে হেলান- বেঞ্চি এখানে ওখানে, একজন দুজন বসে। গাড়িটা অধবৃত্ত পাক খেয়ে দরজায় এসে থামে। সুরঞ্জন আমাকে একটা শপার ধরিয়ে দেয়, বলে, – এগুলো দিও। আর শোনো, জাস্ট অ্যাট সিক্স এখানে নিতে আসবো, অন্য কোথাও যেও না। – ওর গাড়ি বৃত্তের বাকি অর্ধেকটা পাক মেরে উধাও হল।
 
এবার স্থানু হয়ে দাঁড়াই, পায়ে ভার লাগছে, ফিরে আসছে সেই অবশ ভাবটা। চোখ বুঁজি, মন্ত্র জপি, – ভগবান, শক্তি দাও, শক্তি দাও।
 
সামনে বিশাল টানা কোলাপসিবল গেটটা দুপাশে টেনে খুলে দিয়েছে। লোকজন ঢুকছে দলে দলে। অনেকে বেরিয়েও আসছে। কারোর মুখে উদবেগ, কারোর ভারসা মোক্ষের আলো । আমার মুখটা কেমন ! জানি না। এখানে আয়না নেই। চারটে চওড়া সিঁড়ি। দুধারে কালভার্ট, সেখানেও লোক বসে, কেমন এলিয়ে থাকা, জড়তায় গ্রন্থি আঁটা। ওই লোকগুলোর মুখগুলি কি আমায় শক্তি জোগাবে ! দাঁড়িয়ে থাকি কিছুক্ষণ। অনেক আওয়াজ কানে আসে, এলোমেলো, কিছু দাঁড়ায়, অনেক ব্যস্ততা চোখে পড়ে, আকাশফাটা বাজের আলোর মতো দ্রুত সরে যায়। এবার প্রথম সিঁড়িটায় পা রাখবো। দম নেবো বুক ভরে। আবার দুই। থামা। দম। তিন। চার। জমা করা দীঘশ্বাসটি এবার বুকে থেকে বেরিয়ে যাবে। অভ্যেসে যেমন হয়, তেমন, হালকা লাগে, মনে হয় ভার নেই। এবার ফ্লোর ল্যানডিং। ভিতরে ঢুকছে বরাবর, যেন সুরঙ্গের মধ্যে গলে যাচ্ছি। সিলিং থেকে, বাদুড়ের মতো মাথা নিচু, ঝুলছে এক একটা বালবের আগুন। শপারটা হাতে ভারী লাগছিল, এতক্ষণে তুলে দেখতে পেলাম ভিতরে কী আছে।
 
কয়েক পা সামনে কোন ঘেঁষে ড্রাইভার-ছাড়া লিফটের কেবিন। সামনে লম্বা কিউ। লিফট নেমে দোল খেতেই অপেক্ষার ভিড় হুড়মুড় করে উঠতে ব্যস্ত। ওটার পেট চিরে ঝাঁক বেরিয়ে আসার রেয়াত করতেও রাজি নয়। সময় ওরা যেন পাবে না, সব জিরো আওয়ারে পৌঁছে ধ্রুবমুহূর্ত হয়ে যাবে। শোঁ – ও – ক। শব্দ তুলে এইমাত্র লিফটখানা বেহাজিরা হয়ে গেল। নিয়তিই আমাকে দাঁড় করিয়ে রাখবে। পিছন থেকে শশব্যস্ত যাত্রী তাড়া দেয়,- আপনি এগোন, ম্যাডাম।
 
ঘোর কাটতে দু সেকেন্ড ভেসে গে্ল। সরে যাই পাশে। লোকটা আমায় অবাক চোখে মাপে। মনে করতে পারে, আমি পাগলাটে গোছের।
 
বাঁদিকে ফাঁকায় সিঁড়ি শুয়ে আছে। ওটাই এখন চাইছি। একটা মানুষের ছায়াও সেখানে পড়ছে না। থেকে থেকে দুটো বাচ্চা দৌড়ে উঠছে নামছে, লুকোচুরি খেলছে বুঝি। হঠাৎ আমায় ওদের আঙিনার সীমায় পেয়ে হকচকিয়ে যায়, থমকে গ্রিল ধরে স্ট্ট্যাচু হয়ে থাকলো, তারপর আমায় পাত্তা না দিয়ে নিজেদের আনন্দে আবার মজে গেছে। আমি বুক ভরে শ্বাস টানলাম। এবার প্রথম ধাপটায় পা ফেলবো, তারপর পরের পা আরেকটায়। জীবনছাই সময়কে এভাবেই ক্ষইয়ে দেবো।
 
ঠিকানাটা জানাই আছে, এম এম সেভেন বাই ফোর, লেফট উইং। সুরঞ্জন সাবধান করে দিয়েছিল, – ভুলেও রাইট উইংয়ে ঢুকো না যেন, খুঁজে মরবে। আননেসেসারি হ্যারাসমেন্ট।
 
যদি প্রত্যেক তলায় কুড়িটা করে সিঁড়ির ধাপ থাকে ! আশিটা কদম । আশিটা মুহূর্তের সঙ্গে মুখোমুখি। এই যুদ্ধটা ভীষণভাবে চাইছি, কেননা দহনপালার শেষে যে অন্য লড়াই, অথচ সে ফ্রন্টের বিন্দুবিসর্গ যে আমার অনুমানেই নেই ! আশিটা পা, আশিটা জীবন। ল্যানডিংয়ে ল্যানডিংয়ে, লম্বা যুদ্ধবিরতি।

 

 
দরজাটা আগে থেকেই খোলা। জলস্বচ্ছ পর্দা দু-ধারে, চৌকাঠের পাশায় ইলিউসিভ বিড়ালের থাবায় গিঁট বাধা। চোখ সে ঘরের সমস্তটা দেখতে পাচ্ছে। শোভন কক্ষ। বাঁয়ে ডানে পরপর সাজানো বিছানা, দুধ সাদা। বেডে বেডে শুয়ে আছে যাদের শুয়ে থাকা দরকার, কেউ কেউ উঠে বসেছে। ওদের সঙ্গে দেখা করবে বলে আপনজনেরা এসেছে। আটটা প্রহর অদর্শনে থাকে, মন ভারী, কোনো অশুভ কল্পনায় ময়লা থাকে, চোখে দেখলে সে ক্লেদ কেটে যায় হয়তো। আমার তো এমনই হওয়ার কথা ছিল। হয়েছি কি! জানি না। নিজেকে খুঁড়ে দেখিনি তো।
 
ওই তো ও। বাঁয়ে সাত নম্বরে। অমনি বুকের ভিতরে ছ্যাঁত তাপ উগলে ওঠে, পা কাঁপে, শান্ত হয়, আবার কাঁপে। উঠে বসেছেও, মাথার নিচু আড়াটায় পিঠ হেলান দিয়েছে। এ মহিলা গেলাসে করে কিছু একটা খাওয়াচ্ছিল।
 
– আর খাবো না।
 
উঁহু, সবটা খা। একটুখানি আছে। পাগল ছেলে কোথাকার !
 
ও গেলাস উচিয়ে খেল। মহিলাটি হাসছে। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আমি তাকিয়ে দেখি, কেমন একটা অনুভূতি হয়, যার ভাষা নেই। মহিলাটির পড়নে আমার মতো সাদা শাড়ি, কেন, অন্য রঙের তো পড়তে পারতো ! তবে বুটল নেই, হালকা খয়েরি সরু চেক ফাঁকে ফাঁকে, সহজে নজরে পড়ে না। কে যেন ঠেলা মারে পিছন থেকে। কেউ না। গুটিসুটি পায়ে এগিয়ে যাই। 

টাপুন আমার হাত দুটো চেপে ধর, এমনটাই তো করতিস, ধর না। আমার হাত যে মরুভূমির তেষ্টাশুষ্ক গুল্মচারাটা, একটু জল চাইছে। কত দীর্ঘ  দীর্ঘ দিনের চেয়ে থাকা

 
ও আমাকে নির্বিকার দেখলো। মহিলাটি সচকিত হয়েছে, চোখে যেন জিজ্ঞাসা। বললাম, আমি অনুভা।
 
– ওঁ ! – হাসলো মহিলাটি;  – আপনি বসুন। – নিজে উঠে বেডের পাশে রাখা টুলটা এগিয়ে দেয়,- বসুন, ভাই। – এবার ওকে বলে, – বাবুন, আমি নিচে যাই কেমন ! – ওদিকে থেকে সাড়া পেল না। আমি টুলটায় বসি। শপারটিকে পাশের শেলফের মাথায় রাখি।
 
ওকে বড়ো শীর্ণ দেখাচ্ছে। গেঞ্জি পড়া, তাও যেন বুকের হাড়গুলো স্পষ্ট দেখতে পেলাম। হাত দিলাম বুকে। ও কিছু বললো না। আমার চোখ বুঁজে এলো, জ্বালা করছে কোন দুটো, জল ভাসবে নাকি ! টাপুন আমার হাত দুটো চেপে ধর, এমনটাই তো করতিস, ধর না। আমার হাত যে মরুভূমির তেষ্টাশুষ্ক গুল্মচারাটা, একটু জল চাইছে। কত দীর্ঘ  দীর্ঘ দিনের চেয়ে থাকা। ওর কোন সাড়া পেলাম না। বললাম, কবে এসেছিস এখানে ?
 
শুকনো জবাব দিল ও, সাতদিন।
 
– হাই ফিভার। নামছিল না। ডাক্তার বললো, প্যারাটাইফয়েড। ভর্তি করিয়ে দিন।
 
প্রচণ্ড হতাশ লাগছে নিজেকে। আমিই কি সেই অপরাধী, যার বিচারে, শাস্তির বদলে পুরস্কার দেওয়া হয়। অথচ প্রতিদিন প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে হাজার শাস্তি বিধান করেও যার মুক্তি ঘটে না।
 
– উনি আসেননি ?
 
শিউরে ওঠলাম। ও সুরঞ্জনকে আঙ্কেল পর্যন্ত বললো না।
 
– নেসপাতি এনেছি, বাবা, খাবি ? কেটে দিই? তুই তো ভালবাসতিস।
 
– রেখে দাও। মাধুরী পিসি খাইয়ে গেছে।
 
মানে একটু আগে বসেছিল, সেই মহিলা। সাদা শাড়ি, হালকা মেরুন চেক। বলতে চাইলাম, দেখ, আমি সেই  শাড়িটা পড়ে এসেছি। সেই যে তুই বলেছিলি, ‘এই শাড়িটা পড়লে তোমাকে ঠিক সত্যিকারের মা লাগে’। ও মহিলা ওকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিচ্ছে, নিয়েছে। বললাম, – তোদের কাছে থাকে ?
 
– বর্ধমানে। আমার শরীর খারাপের খবর পেলেই চলে আসে। বাবা বোধহয় খবর দিয়েছিল।
 
কী প্রচণ্ড পরাজয় ! এই ঘরের দেয়াল, ঝোলানো সাদা আলো, সাজানো সুবিন্যস্ত বেডের শাড়ি, এ সময়ে  আসা কত ভিজিটর সব একসঙ্গে চক্রব্যূহে আমাকে ঘিরে ধরেছে। ইচ্ছা করছিল বলে উঠি, ‘ আমি শেষ পর্যন্ত চেয়েছিলাম, বাবা। বিশ্বাস কর, তোকে ছেড়ে যেতে চাইনি। তুই যে আমার…।’ তোর বাবা একটু কম্প্রোমাইজ করতে পারতো না। জীবনটা যে অ্যাডজাস্টমেন্ট । তুই কি ভাবিস তোকে ছেড়ে আমি…। আর তুইও ­কোর্টে গিয়ে কেন বললি, আমি ওখানে যাবো না। কেন বললি ? তুই জানিস না, কতদিন শুধু তোর জন্য ইস্কুলের দরজায় দাঁড়িয়ে থেকেছি। স্কুলের গাড়ি থেকে নেমে আমার দিকে না তাকিয়ে সোজা চলে গেছিস। কেন ? তোর কাছে তো কিছু করিনি। বন্ধুরা তোকে ডেকে দেখালে তুই বললি কে্‌ যে ও ম্যাডামকে তুই চিনিস না। আমি এত অচেনা তোর কাছে। কতগুলো মাস অন্ধকারে শরীরের ভিতরে, তারপর ফুল ছিঁড়ে বাইরে, তারপর কত মাস, বছর। সব আবছা ! স – অ – ব !
 
– এখন কেমন আছিস। টাপুন ?
 
– ভালো। – আবারও সেই নির্লিপ্ত জবাব।
 
আচ্ছা, এই এম এম সেভেন বাই ফোর লেফট উইংয়ের বেডগুলো কি আমায় দেখে মুচকে মুচকে উপহাস করছে ! বলতে চাইছে এ জগতসংসারে তুমি একটা নো-ওয়ান পারসন ! আমি শেষবারের জন্য কুটো ধরতে চাই, – কাল আবার আসবো, কেমন ?
 
আমার কথা উড়িয়ে ও বললো, – উনি আসেননি ?
 
হায় ঈশ্বর। সুরঞ্জনকে ও আঙ্কেল পযন্ত বললো না, আমার নতুন পরিচয়ের আগে ওই নামেই তো ডাকতো। কত হাসি, খেলা, আবদার।
 
– আমার কথার জবাব দিবি না, বাবা ? – আমার কান্না স্নায়ু হয়ে জিভ আড়ষ্ট করে দিচ্ছে।
 
– আমার ছুটি হয়ে গেছে। ডাক্তার লিখে দিয়ে গেছে। বাবা নিচে আছে। ভিজিটিং আওয়ারস শেষ হলে নিয়ে যাবে।
 
ব্যাস। আমার অন্তিমযাত্রার নির্দেশ যেন। পা দুটো ফ্লোরে গেঁথে গেছে, কোমর কোথায় বুঝতে পারছি না। তবু উঠতে হল, বেরোতে হবে এ ঘর থেকে এখনি, এই বিশাল আপনজনের মহোৎসবে আমি অনাকাঙ্খিত, অতিরিক্ত। বিড়ালের থাবাটা হাতে ধরে ওয়াডের বাইরে আমি, একবারেও পিছনে ফিরে চাইবো না, বুক ভেঙে ইচ্ছে জাগুক, তবুও না। জানি টাপুন হয়তো শুয়ে উলটো মুখে কাত হয়েছে, আমাকে দেখবে না, হয়তো আমারই মতো দানবিক আত্মকৌশলে চোখের পাতার জলটাকে …। সামনে একপাশে সিঁড়ি অন্যধারে লিফট। আমার এখন লিফটটাই চাই। দ্রুত নিষ্ক্রান্তি। দ্রুত সময়ের মৃত্যু। কব্জি উঁচিয়ে ঘড়ি দেখলাম, পাঁচটা পয়ঁতাল্লিশ। এখনও পচিঁশ মিনিট, পচিঁশটা দহন।

 

 
পুকুরধারের সেই লন। একটা ফাঁকা বেঞ্চিতে ধুপ করে বসে পড়েছি। কান্না আসছে না, কেবল হাঁটু ভেঙে তুলে মুখটাকে গুঁজে রেখেছিলাম। অনেকক্ষণ শবদেহ ঘরে রাখার পর নিকটজন যেমন শুকিয়ে যায়। অঘ্রাণের সন্ধ্যা, হালকা হিম, পুকুরধারে উঁচু থেকে এল ডি বালবের সান্ত্বনা দেয়া আলো। চোখ তুলতেই কাছে ফোয়ারার ঝর্ণা, রঙিন আলো ফেলে জীবন্ত প্রিজমের জলপ্রপাত। জীবনের স্রোত, স্নিগ্ধতার বর্ষণ। চোখ সরে গেল এবং তখনই…।
 

ইচ্ছে হচ্ছে ওর কাছে যাই, বলি, টেনশন করো না। ঠিক হয়ে যাবে সব, দেখো। বড়ো অল্পেতে ভেঙে পড়ো তুমি। – বলা গেল না। যে সুতোর সেতু বেয়ে কথা যাবে, সে সাঁকোটি ছাই হয়ে গেছে

 
টাপুনের বাবা বসে আছে, মাথা ঝোঁকানো। কোলে একটা বই। পড়ছে, নাকি পড়ছে না, ধরে আছে শুধু। আমাকে কি দেখেছে ! চোখের সমস্যাটা কি বেড়েছে ! গ্লুকোমা। ধীরে ধীরে অন্ধ হয়ে যাবে, বলতো কতবার হাসতে হাসতে, বলতো – তোমার হাত ধরে, টাপুনের হাত ধরে, অন্ধের যষ্টির মতো। – গায়ে হালকা সুতোর কম দামি পাঞ্জাবি। কতদিন শেভ করেনি মনে হয়। উস্কোখুষ্কো দেখাছে। বেদনাবিলাসী। এখন দুঃখ কীসের ! অঢেল সুখ থাকার কথা। দুঃখের কারণ তো জীবন থেকে সরে গেছে। ইচ্ছে করছে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াই, ও আঁতকে উঠুক। ওর জামাটা টেনে ছিঁড়ে দিই, চিৎকার করি – তোমার জন্য। শুধু তোমার জন্য ! ওইটুকু তুমি ছাড়তে পারলে না ! মেয়ে আমি, একটু বেশি সুখ, আমার জন্য ! আমাদের জন্য চাওয়াটা কি অন্যায়। কী মনে করো নিজেকে ? শেলফে ওই কখানা মলাট ছেঁড়া বই নিয়ে তোমার এত জাঁক ! শুধু তুমি ! শুধু তুমি …।
 
বলা হল না। ও বইয়ে ডুবে অথবা ভেসে আছে। ওর হাতে সময়ের সীমা আছে। ছ-টা। ভিজিটরস আওয়ারস শেষ হয়ে যাবে। আমার যে অনন্ত। ওকে দেখে এখন মায়া লাগছে। ইচ্ছে হচ্ছে ওর কাছে যাই, বলি, টেনশন করো না। ঠিক হয়ে যাবে সব, দেখো। বড়ো অল্পেতে ভেঙে পড়ো তুমি। – বলা গেল না। যে সুতোর সেতু বেয়ে কথা যাবে, সে সাঁকোটি ছাই হয়ে গেছে। ও এখন আমাকে দেখে আনন্দ পাচ্ছে, তাই বইয়ে পাতা না উলটিয়ে এত মন।
 
ওদিকে অ্যানেকাসিওর বিলডিংয়ের দিক থেকে আকাশবিদীর্ন কান্না ভেসে আসছে। ওর বাচ্চাটি বোধহয় ওর কোন ছিঁড়ে চলে গেল। চিৎকারে ও ঘোষণা করছে ও মা।
 
আমি কার জন্য শোক করছি ? নিজের জন্য কি ? উঠে পড়লাম। পালাও, পালাও, অনুভা ! জোর কদমে অর্ধবৃত্ত পেরিয়ে কমপাউন্ডের গেটে। মায়াবী সন্ধেতে এ গণিকা শহর ঝলমল।

 

 
সুরঞ্চন সময়ের কাঁটায় বাঁধা। ছ-টায় আসবে। সঙ্গে সঙ্গে ব্যাকসিটে উঠে বসবো। ও যতই বলুক, – অ্যাকসিডেন্ট ডেকে আনছো, কিন্তু কিছু করার থাকবে না, – আমি আঁচল উড়িয়ে রাখবো। কোমরে জড়াবো না।
 

♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!