- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- জুন ২৯, ২০২৫
ঘুম-নির্ঘুম ডুবসাঁতার
লিস্টি বানাতে খাটনি কম যায়নি। একেকটা জিনিস একেক সময় মাথায় এসেছে। তবে যখনই যা এসেছে টুকে রেখেছে, তারপরও মনে হয়েছে না-জানি কী বাদ গেল। শেষমেশ এই :
রিসমি চুরি
আলতা
লিবিসটি
কিরিম
পাউঠার
চুলের ফিতা
গন্দ তেল
কাজল
নক পালিস
ছেন্ট
লাক সাবান
পকেটে লিস্টি নিয়ে বয়তুল মোকররম মার্কেটে কয়েকটা চক্কর মেরে দমে যায় হজরত আলি। এত বড় মার্কেট, সংসারের হাজারটা জিনিস থেকে শুরু করে সাজ-পোশাক কী নাই ! তারপরও ফতুয়ার বুকপকেটে ঘামেভেজা কাগজে টুকে রাখা ফর্দটা বের করা হয় না। জীবনে এসব জিনিস কেনেনি, দোকানদারের সামনে ফর্দ বাড়িয়ে দিলে কী দিতে কী দেবে, আর তার নিজের যেহেতু কোনো ধারণা নাই, বলতে তো পারবে না – এইটা না, ওইটা দ্যান।
বয়তুল মোকররমে হবে না ভেবে সে মৌচাক মার্কেটে চোরের মতো হানা দিয়ে কিছুটা হলেও স্বস্তি পেল। তবে কাজের কাজ হলো না। দোকানে ঢুকে কী বলবে ঠিক করতে না পেরে পিছু হটে এগলি– ওগলি হয়ে একসময় বেরিয়ে আসাই সার হলো। মার্কেটের অভাব নাই শহরে, শয়ে-শয়ে মার্কেট। গাউসিয়াতে কী ভেবে একদিন গিয়ে তড়িঘড়ি বেরিয়ে এসেছে। তার কাজ না ওখানে বাজার-সদাই করে, এত ভিড় ! কাছেই নিউ মার্কেট, কিন্তু গেটের ভিতরে ঢোকার তাকতটা কে দেবে ! দোকানে গিয়ে যদি দাঁড়ায়, তাকে খেঁদাতে দোকানদার নির্ঘাৎ তেড়েমেড়ে আসবে। দূরে থেকে আরেকটা এলাহি মার্কেট দেখেছে, পান্থপথ-লাগোয়া বসুন্ধরা। দেখা পর্যন্তই, যাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। শেষমেশ মৌচাকই যেন ভরসা। গায়ে-গায়ে দোকানপাট, কিছুটা ঘিঞ্জি হওয়ায় সুবিধা, কেউ কারো দিকে নজর দিচ্ছে না। কিন্তু লিস্টি ধরে জিনিসগুলো খরিদ করতে গেলে দোকানদারের সঙ্গে কথাবার্তা তো চালাতে হবে। পকেটে টাকা নিয়ে এ কী জ্বালা !
দিন কয়েক খামোখা ঘোরাঘুরির পর এক দুপুরে একজন মহিলাকে এক দোকানে কেনাকাটা করতে দেখে তার বুকে কোথা থেকে যে সাহস ভর করল, মহিলার পেছনে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে বার দুই খুকখুক কাশল। অল্পবয়সি মহিলা, হয়তো নিজের বাচ্চার জন্য জামাকাপড় বাছাবাছি করছিল। ঘাড় ঘুিরয়ে বিরক্ত মুখে বলল– কী ব্যাপার ?
হজরত আলি মুখ কাঁচুমাচু করে বলল– আম্মা, আমারে যুদি একটু সায্য করতেন।
মহিলার বিরক্তি বাড়ল, খানিকটা গলা চড়িয়ে ধমক দিল– সাহায্য-ফাহায্য হবে না। সরো।
হজরত আলি জিভ কেটে তেমনি কাঁচুমাচু মুখে বলল– টাকা-পয়সা না আম্মা, আমারে এই কয়ডা জিনিস যুদি আপনে কিন্যা দিতেন। বলে বুকপকেটের লিস্টিসহ এক গোছা পঞ্চাশ, একশ-র নোট বের করে গলায় মিনতি ঝরাল– যুদি কিন্যা দিতেন।
বছর পয়ত্রিশ-ছত্রিশের মহিলা এবার কাঁচা-পাকা দাড়ি-গোঁফে আধবুড়ো হজরত আলিকে খুঁটিয়ে দেখে তুমি থেকে আপনিতে উঠে বলল– নিজে কেনেন, আমাকে বলছেন কেন ?
– আমি তো এইগুলা বুঝি না, চিনিও না। আপনে যুদি বাছাবাছি কইরা দিতেন। বলে সে আবার টাকার তাড়াটা বাড়িয়ে ধরল।
টাকার বদলে ফর্দটা হাতে নিয়ে একনজর চোখ বুলিয়ে মহিলা বলল– চুরি মানে ? ও চুড়ি। এ তো দেখি কসমেটিক্মের লিস্ট। কার জন্য ?
এতক্ষণে মনে বল পেয়ে হজরত আলি ঢোঁক গিলে জবাব দিল– মাইয়ার।
– মেয়ে লিস্ট দিয়েছে। লেখা কার, মেয়ের ?
– না।
– কার?
– আমার।
মহিলা মজা পেয়ে হাসল। হাসিতে যেন অনিচ্ছুক মায়াও। জিগ্যেস করল– মেয়ে কত বড়ো ? চুড়ির সাইজ কী ?
– সে তো কইতে পারি না। চিকন-চাকন গড়ন, হাত-পাও চিকন-চাকন। সুন্দর দেইখা এক ডজন বাইছা দিলেই অইব।
মহিলা আবার তাকে দেখল। চেহারা-সুরতে গোবেচারা, তবে সত্যি সত্যি মেয়ের জন্য, না বুড়ো বয়সে অল্পবয়সি মেয়েমানুষ পটাতে ফর্দ বানিয়েছে, এ নিয়ে সন্দেহ উঁকি দিলেও সে গা করল না। সময় নষ্ট না করে কাছেই একটা দোকানে গিয়ে ফর্দমতো জিনিস দিতে বলল। নিজেও কিছু বাছাবাছি করল। আলতা কি লাগবে, জিগ্যেস করতে হজরত আলি, আপনে যা বুঝেন বলে ঘাড় কাত করল। বোঝা গেল, কাজ হচ্ছে দেখে সে আরাম পাচ্ছে।
– মেয়ে টিপ পরে না ? টিপ তো লিস্টে নাই। মেয়ে যদি লিস্ট বানাত, টিপ বাদ পড়ত না।
– কী জিনিস ?
– এই যে, বলে মহিলা নিজের কপালের বড়সড় বেগুনি টিপ দেখিয়ে বলল– নেবেন ?
– জি।
– ছোট না বড়ো ?
– আপনার খুশি।
– আমার খুশি বললে তো হবে না। পরবে আপনার মেয়ে। বয়স কত মেয়ের?
হজরত আলি এ কথায় থতমত খেল।
– মেয়ের বয়স জানেন না ?
– তিন বচ্ছর আগে পনরো আছিল।
– মানে কী ? তিন বছর মেয়েকে দেখেননি ? মেয়ে কোথায় ?
হজরত আলি জবাব না দিয়ে বলল– বড়ো-ছোটো মিলাইয়া নেন।
টিপ কেনা হতে মহিলা আবার পুরনো কথা বলল– মেয়ে লিস্ট বানালে আরেকটা জিনিস লিখত।
হজরত আলি বোকার মতো চেয়ে থাকলে মহিলা বলল– চুলে দেয়, শ্যাম্পু। টাকা তো রয়েছে, নেবেন ?
– জি, জি।
দাম মিটিয়ে জিনিসপাতিসহ রংচঙের প্যাকেট হাতে নিয়ে হজরত আলি মহিলাকে কী বলবে ঠিক করতে না পেরে উচিত কথাটাই বলল– কী যে উবকার করলেন গো মা!
বলে সে কিন্তু মহিলার পিছু ছাড়ল না। মহিলা মার্কেট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মুখে পিছুপিছু তাকে আসতে দেখে বলল– আবার কী?
– একটা কতা।
– কী কথা ? আমার তাড়া আছে, অনেক দেরি হয়ে গেছে।
– মাইয়ার বিয়াতে তো আরও জিনিস লাগব আম্মা– শাড়ি-বেলাউজ, গয়নাপাতি, জুতা-সেন্ডেল।
– আজব তো ! আপনার চেনা-জানা কেউ নাই যাকে দিয়ে কেনাতে পারেন ?
হজরত আলি জোরে মাথা ঝাঁকাল। মহিলা বলল– শোনেন, আমার একদম সময় নাই। কাল বিকালে এখানে আরেকবার আসতে পারি, দেখেন যদি তখন আসতে পারেন।
মহিলা চলে যেতে প্যাকেটটা বুকে চেপে হজরত আলি ভাবল এক কাপ চা খেলে হয়। এত হালকা লাগছে !
আগামীকাল যেভাবেই হোক মহিলাকে ধরতে হবে। দুপুর থেকেই এখানে ঘোরাঘুরি করবে। একবার যখন তার দেখা পেয়েছে, আর চিন্তা কী ! আর মহিলাটা কী ভালো, টিপ কিনে দিল, আবার চুলে লাগানোর জিনিস। এসব তো তার মাথায় আসেনি, নামই জানে না। টিপের কারণে মনটা ফুরফুরে লাগছে, তার ইচ্ছা করল প্যাকেট খুলে টিপগুলো নেড়েচেড়ে দেখে।
পর পর দুই দিন মহিলার আশায় আশায় থেকে লাভ হলো না। মার্কেটে মহিলার দেখা মিলল না। তবু কেন জানি হজরত আলির মন বলল দেখা হবে। মনের জোরের কারণেই হয়তো চার দিনের দিন দুপুরবেলা সে চমকে খেয়াল করল মহিলা আগের দিন যে দোকানে কেনাকাটা করছিল সেখানে ঢুকছে। এবার আর খুকখুক কাশি না, সে এক ছুটে এগিয়ে গিয়ে মহিলার মুখোমুখি হলো– শইল বালা আম্মা ?
মহিলা চোখ তুলে, আপনি কি সবসময় এখানেই থাকেন বলে জিজ্ঞাসু মুখে তাকাতে হজরত আলি বলল, আম্মা, হেইদিন যে কইছিলাম …
– কী ?
– মহিলা ভুলে গেছে দেখে মন খারাপ হলেও সে তড়বড় করে বলল– মাইয়ার শাড়ি, আর…
হজরত আলি ফতুয়ার পকেট থেকে কাগজমোড়া টাকার প্যাকেট বের করে বলল– বিয়ার শাড়ি বাদে আরও দুইখান লাগব, একখান নামাজের। সাড়ে চাইর হাজার আছে, অইব না? বলে টাকার খামটা মহিলার হাতে গছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আর একসময় কাজটা সে করেও ফেলল। টাকা হাতে নিয়ে ভ্যাবাচেকা খেয়ে যেন কী করে টাকাগুলো হাতে চলে এল বুঝতে পারছে না এমনভাবে মহিলা হজরত আলির দিকে চেয়ে থেকে বলল– কী করেন?
– মিন্তির কাম আম্মা। বাজারে মাইনষ্যের সদাইপাতি তুইল্যা দেই, আর রাইতে টেরাকের মাল খালাসের কামও করি। অনেক দিনের রোজগার আম্মা, তিন বচ্ছরের, খাইয়া না খাইয়া জমাইছি।
নাছোড় লোকটার হাত থেকে নিস্তার নেই বুঝেই যেন মহিলা বলল– কী শাড়ি চান, কত দামের …
হজরত আলি গদগদ হয়ে বলল– আপনের যা খুশি। সাড়ে চাইরের মইদ্যে। শাড়ি বাদে কিছু গয়নাগাটিও লাগব– সোনার কালারের আছে না? কানের, গলার। আর এক জোড়া জুতা, খুরা-তোলা।
মহিলা কথা বাড়াল না, এ আপদের হাত থেকে রক্ষা পেতেই যেন পা চালিয়ে একটা বড়ো শাড়ির দোকানে ঢুকল। পেছন ফিরে আসেন বলতে হজরত আলি মিনমিনে গলায় বলল– আমি বাইরে থাকি, আপনের যেমন খুশি কিনেন গো মা। বিয়ার শাড়িটা … বলে একটু কেশে বলল– লাল অইলে বালা না ?
কেনাকাটা শেষ, মহিলা বেরিয়ে এসে জানাল তিনটাই কিনেছে, সাড়ে তিন হাজারে হয়ে গেছে, বিয়ের শাড়ি টুকটুকে লাল। সুন্দর ব্যাগ ভরতি শাড়িগুলোর ওজন মনে হলো বেশ ভারী, ব্যাগটা নিজের হাতে নিতে বুকটা শিরশিরিয়ে ওঠল হজরত আলির। পরপরই সে বলে উঠল– আরও কিছু …
– গয়নাগাটি ?
মহিলা যেন হজরত আলির কথায়ই চলছে। সে একটা ইমিটেশনের গয়নার দোকানে গিয়ে হজরত আলিকে না ডেকে নিজে নিজেই দরদস্তুর করে কানের দুল, গলার চেন কিনল। চেন কিনতে গিয়ে কী মনে হতে একটা বাড়তি ও খানিকটা দামি চেন কিনে বেরিয়ে বলল– নেন। এগুলো আপনার টাকায়, আর এটা আমি আপনার মেয়েকে দিলাম, উপহার। হজরত আলি কী বলবে ভেবে পেল না। বিয়েতে উপহার দেয় আত্মীয়-স্বজন। তাই বলে চেনা নাই জানা নাই এমন আত্মীয়ের উপহার ! লজ্জায় সে মুখ তুলে তাকাতে পারল না। মহিলা বলল– টাকা তো এখনো রয়ে গেছে, জুতার কথা বলছিলেন না ?
– জি, খুরা-তোলা।
মহিলা হাসল। হাসিটা সুন্দর, হাসিতে তাকে ছোটো মেয়ের মতো লাগল হজরত আলির। বাটার দোকানে সেল চলছে, সেখান থেকে স্যান্ডেল কেনা হলো। হজরত আলি বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকল। একশ বত্রিশ টাকা ফেরত দিয়ে মহিলা বলল, বাজার ভালো হয়েছে। মেয়ের কপাল ভালো। বিয়ের শাড়িটা সুন্দর, লালের ওপর সোনালি-রূপালি কাজ। গায়ের রং কেমন মেয়ের ?
– ফরশা। এক্কেরে আপনের গায়ের রং।
– বিয়ে কবে ? দাওয়াত দেবেন না ?
হজরত আলি থতমত খেয়ে শাড়ির ব্যাগটা এহাত-ওহাত করে মাথা নিচু করল।
– আরে, এমনি বললাম। দাওয়াত নিজে নিজেই নিলাম, ঠিক আছে ?
হজরত আলিকে ঠায় দাঁড় করিয়ে মহিলা– এখন অবশ্য তাকে মহিলা না, কম বয়সের মেয়েই মনে হচ্ছে – দ্রুত পায়ে মার্কেটের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল। যাওয়ার আগে একটা কিছু বলা উচিত ছিল, অন্তত সেদিনের কথাটা বললেও চলত– বড়ো উবকার করলেন গো মা। কিন্তু বিয়ে কবে, দাওয়াত দেবে কি না শুনে তার পা দুটো মার্কেটের পাকা মেঝেতে গেড়ে বসেছিল, দুই কদম এগিয়ে সালাম দেওয়ার ফুরসতও মিলল না।
হজরত আলি চৌকিতে টানটান শুয়ে ভাবল, কতকিছু এখন তার ভাববার। মাল খালাস বাদ। এত বছর তো এই করে গেছে, আজ সে ভাববে। গোছগাছ করে ধীরেসুস্থে ভাববে। লিস্টিটার আর দরকার নাই, পকেটে থেকে থেকে তেনা-তেনা হয়ে গেছে। এক কাজ করলে হয়, নতুন একটা লিস্টি করা যায় যাতে সব জিনিসের নাম থাকবে
সে রাতে কাঠগোলা তিন নম্বর বস্তির ঘরে ঢুকে হজরত আলি দরজা লাগাল টাইট করে। হুড়কো, ছিটকিনি আটকে মনে হলো দরজাটা আরও মজবুত হলে ভালো হতো। চৌকির তলা থেকে কালো রঙের মাঝারি ট্রাঙ্ক টেনে আগের দিনের সওদাপাতির নিচে শাড়ির বড়োসড়ো ব্যাগ, জুতার বাক্স আর অলঙ্কারগুলো সামলেসুমলে রাখতে গিয়ে বড়ো ইচ্ছা জাগল সবকটা জিনিস খুঁটিয়ে খুঁঁটিয়ে দেখে, বিশেষ করে বিয়ের শাড়িটা। কিন্তু কী এক ভয়ে তার মন বলল দেখার সময় উড়ে যাচ্ছে না। ট্রাঙ্কে তালা লাগিয়ে আবার চৌকির নিচে রাখতে গিয়ে যতটা সম্ভব ঠেলেঠুলে ভিতরে ঢোকাল। তারপর ছেঁড়া কম্বল, চটের বস্তা, আস্ত ও কয়েকটা আধলা ইট, প্লাস্টিকের ফুটো বালতি, হাড়িকুড়ি দিয়ে ছোটো চৌকির নিচটা প্রায় ভরে ফেলে হাঁফ ছাড়ল। সারাদিন তেমন কিছু পেটে পড়েনি। চায়ে ভিজিয়ে বানরুটি খেয়েছিল সেই জোহরের আজানের পরপর। কিন্তু খিদা-টিদা টের পাচ্ছে না। চাইলে বস্তির মাথায় রুজিনার মার হোটেলে টাকি মাছের ভর্তা দিয়ে ভাত খেয়ে আসতে পারে। আসার সময় রম্নজিনার মার গলা কানে বাজছিল– খাইলে জলদি আহো, ব্যাক খতম, খালি টাকি ভর্তা।
নাহ্, খেতে ইচ্ছা করছে না। এদিকে আড়তে ট্রাক আসার সময় হয়ে গেছে। গেলে মাল খালাসে ঘণ্টা তিনেক লাগবে, শ দুয়েক বা কিছু কম-বেশি রুজি তো হবেই। হজরত আলি চৌকিতে টানটান শুয়ে ভাবল, কতকিছু এখন তার ভাববার। মাল খালাস বাদ। এত বছর তো এই করে গেছে, আজ সে ভাববে। গোছগাছ করে ধীরেসুস্থে ভাববে। লিস্টিটার আর দরকার নাই, পকেটে থেকে থেকে তেনা-তেনা হয়ে গেছে। এক কাজ করলে হয়, নতুন একটা লিস্টি করা যায় যাতে সব জিনিসের নাম থাকবে। চুলে লাগানোর জিনিসটার নাম অবশ্য ভুুলে গেছে, কঠিন নাম, না হয় চুলে লাগানোর জিনিসই লিখবে। কী আছে, এ তো আর কেউ দেখতে যাচ্ছে না, লিখবে তার নিজের জন্য, আর এমনও তো হতে পারে, নয়া লিস্টি করতে গিয়ে নতুন কোনো জিনিসের কথা মনে পড়বে, তবে তেমন সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে হয় না।
ভাবাভাবি হলো না। চোখমুখ অবশ হয়ে আসতে সে রাতভর আরামের ঘুম দিল। সকালে চোখ মেলতে বরাবরের মতো মনে পড়ল কারওয়ান বাজারে ছুটতে হবে। রোজই ভোর-ভোর যায়, পাইকাররা ভোরেই আসে। দরজা খুলে বাইরে মাথা বের করতে রোদের বাড়ি লাগল চোখে। চারধারে রোদ আর রোদ। তখনই চৌকির নিচে জঞ্জালঘেরা ট্রাঙ্কের কথা মনে পড়তে সে বিশ্বাস করতে পারল না এতক্ষণ ট্রাঙ্কটা তার মাথায় ছিল না। বছর খানেক আগে কেনা, খালি পড়েছিল এত দিন, এবার প্রায় টায়টায় ভরা। একবার টেনে বের করলে হয়, রাতে তো কিছুই দেখেনি। চিন্তাটা সঙ্গে সঙ্গে মাথা থেকে ঝেড়ে ভাবল কী করে ? কিছু খাওয়া দরকার, খিদায় পেট মোচড়াচ্ছে। রুজিনার মা ছোলার ডাল বানায় ভালো, সঙ্গে আধপোড়া মজাদার রুটি। সাধারণত সে ঘুম থেকে উঠে খালি পেটেই কারওয়ান বাজারে দৌড়ায়। কাম-কাজের ফাঁকে যা জোটে মুখে দেয়। আজ দিনটা অন্য রকম। ভেবে ভেবে সে ডাল-রুটিতে থিতু হলো।
কয়েকটা দিন গেল। হজরত আলি প্রায় সময় ঘরে শুয়ে-বসে কাটায়। এইটুকু ঘর, গরমে দুপুর হতে না হতেই টিনের বেড়া তেতে আগুন হয়ে থাকে। হাঁসফাঁস লাগলে কাছাকাছি এদিকে-ওদিকে চক্কর দিয়ে আসে। সেই যে ভেবেছিল কত কিছু এখন তার ভাববার, এত ফাঁকা সময় হাতে থাকতে শান্তিতে গোছগাছ করে ভাববার তেমন সুযোগ মিলছে না, এ বড়ো আশ্চর্যের। মুশকিল হলো, সে তো অন্য কারো সঙ্গে শলা-পরামর্শ করতে যায় না, করার ইচ্ছাও নাই।
কারওয়ান বাজারে যায় বটে, তবে ঘরে ফেরার তাড়ায় আগের মতো বেশি সময় থাকে না। আর রাতে ট্রাক থেকে মাল খালাসের কথা মনে হলে ভাবে কী দরকার ! এতদিন যে দরকারটা ছিল সেটা মিটে যেতে রুজি-রোজগার থেকে বলতে গেলে মন উঠে গেছে। রাতে দূর-দূর থেকে আসা আলু-পেঁয়াজের বস্তা বা সব্জি-মাছের চাঙারি বওয়ার খাটনির কথা ভেবেও আগ্রহ পায় না। জমানো টাকা কিছু যা আছে তাতে বেশি দিন চলবে না। নিজের তার তেমন খরচ আর কী, বড়ো খরচের মধ্যে ঘর ভাড়া। বরাবর মাসপয়লা ঘরভাড়া দিয়ে আসছে। ঘরভাড়ার জন্য রুজিটা চালু না রেখে উপায় নাই। আর এখন তো ঘর মানে ঢেউটিনের এই চারকোনা বাক্স না, ঘর বলতে অনেক কিছু।
এ অবস্থায় রাতে ট্রাক থেকে মালাখালাসে না গিয়ে কী উপায় ! তবে মন থেকে একদম সাড়া পেল না, যেন এতদিন ঝোঁকের মাথায় খাটনি খেটেছে, কারণ ছিল তাই। এখন শুধু ঘরভাড়া মেটাতে ঘাড়-গর্দান ভেঙে মোট বওয়া। মনে মনে সে বলল, যেটুকু না করলে নয়।
পাশের ঘরের মন্তাজ বেপারি অবস্থাপন্ন মানুষ। শান্তিনগর বাজারে মুদি দোকান নিয়ে ভালোই আছে। বস্তিতে তার থাকার মানে হয় না, তবু বস্তি ছাড়ার কথা ভাবে বলে মনে হয় না। ঘরটা তার বড়ো, দুইটা কামরা, রান্নার আলাদা জায়গা। ঘরে মাছ-মাংস রান্না হয়, হজরত আলি নাকে রান্নার খুশবু পায়, মাঝেসাজে এক টুকরা মাছ কি মাংস বা আলু-বেগুনের তরকারি পাঠায় মন্তাজের বউ। লজ্জা লাগে হজরত আলির, সে তো কিছু দিতে পারে না।
সেদিন আসরের কিছু বাদে মন্তাজের বউকে দেখল দুই হাতভরতি নানা জিনিস নিয়ে আসছে। জিনিসের ভারে মাথাটা প্রায় নুয়ে পড়েছে। হজরত আলি এগিয়ে গিয়ে আমারে দ্যান বলে একটা মাঝারি বস্তা হাতে নিতে অবাক হলো, ছোটো হলেও রীতিমতো ভারী। কী ভরছেন গো বলতে মন্তাজের বউ হাত ঝাঁকিয়ে হালকা হয়ে বলল– সংসারে কত কিছু লাগে, ল্যাখাজোকা আছে! শিল-পাটা। পাত্থরের পাটা পাওয়া মুশকিল, সবই সিমিন্টের, ঘষা দিলে বালি আর বালি। এইটা পাত্থরের, আগে বায়না কইরা রাখছিলাম। আইজ খবর দিল মাল রেডি। কাম-কাজ ফালাইায়া না গিয়া কী করি, গেলাম ! খচ্চইরা বেটা একটা টেকা কম রাখল না, পাক্কা দেড় হাজার নিল।
শিল-পাটা শিল-পাটা বারকয়েক মনে মনে আউড়ে হজরত আলি মন্তাজের বউয়ের হাতের বাকি জিনিসের দিকে চোখ দিতে দেখল লাল রঙের দুটো বালতি, একটার ভিতরে আরেকটা, তার ভিতরে একটা মাছকাটা বঁটি, রুটি বেলার পিঁড়ি-বেলুন, চালুনি, ডালঘুঁটনি, আরও টুকিটাকি কীসব।
রাতে কারওয়ান বাজারে যাবে-যাবে করেও হজরত আলি নড়ল না। মন্তাজ বেপারির বউ তার মাথায় নতুন জিনিস ঢুকিয়ে গেছে। ঠিকই তো, শিল-পাটা ছাড়া চুলা জ্বলে! আর বটি বাদ দিলে সবই অচল। বেলুন-পিঁড়ি না হলেও চলে, তবে হলে ভালো ছাড়া মন্দ না। গাও-গেরামের বিয়েতে এসব জিনিস দেওয়ার রেওয়াজ। নতুন সংসারে মেয়ের কাজে আসবে বলে গরিব-গুর্বোরাও এসব দেয়। খালি সাজ-পোশাকে চলে! ভাবতে ভাবতে সে আনমনা হয়ে পড়ল, আর অবাক হয়ে খেয়াল করল মাথায় একেকটা নতুন জিনিস না চাইতেই ঘুরঘুর করছে। শুধু মাথায়ই না, চোখের সামনেও যেন হইচই করে বেড়াচ্ছে। একটা ডালঘুঁটনি ঠক্ ঠক্ করে ঘরের এমাথায়-ওমাথায় এক ঠ্যাঙে নাচছে, সঙ্গে আবার টুংটাং বাজনার মতো চামচ-খুন্তির বাড়ি, বাড়িগুলো পড়ছে হাঁড়িকুড়িতে– অ্যালুমিনিয়ামের চোখধাঁধানো ছোটো-বড়ো হাঁড়ি। দেখতে না দেখতে আরো কত কিছু সামিল হচ্ছে ! বালতি, মগ, বদনা, জগ, গেলাস, চালুনি, কুলা, আর ময়ূরের পেখমের মতো উড়ন্ত ছোটো চাঁদোয়াটা কি জায়নামাজ?
কয়েক দিন ঝিম ধরে পার করে হজরত আলি আবার গা ঝাড়া দিয়ে উঠল। ঘুম ভাঙতেই চোখে-মুখে পানি ছিটিয়ে দৌড়। ফিরতে দুপুর পার, আবার রাতে ট্রাক ধরতে ছুট ছুট। খাটতে আপত্তি নাই, আর সে জানে, কারণ থাকলে খাটনিটা নেশার মতো পেয়ে বসে। এ-ও জানে, যেভাবে লেগেছে বেশি দিন লাগবে না, সবই জোগাড় হয়ে যাবে।
হয়েও যায়। শিল-পাটা, বঁটি থেকে বেচাল ডালঘুঁটনি, বাসনকুসন, হাঁড়িকুড়ি সব। এক চিলতে ঘরে ছোটো চৌকি বাদে হাত দেড়েকের মতো জায়গা। সেখানে ফাঁকা বলতে কিছু নাই। হাঁটা-চলা দূরের, নড়াচড়াও কঠিন। বাইরে থেকে ঘরে ঢুকে কোনো কোনো দিন সে ঘাবড়ে যায় কার না কার ঘরে ঢুকে পড়েছে। কোনো রাতে ঘুম ভেঙে চোখ খুলে ধাতস্থ হতে সময় লাগে।
এমনই এক রাতে ঘুম ভাঙতে সে বুঝতে পারল না জেগে না ঘুমিয়ে। ঘুমের মধ্যে মনে হচ্ছিল গোটা ঘরসহ সে তলিয়ে যাচ্ছে। বাতি জ্বালিয়ে চৌকিতে বসে মনে হলো ঘুমের মধ্যেই রয়েছে। জেগে ওঠার পরও ঘুমটা কেন জ্বালাতন করছে এ ধাঁধা দূর করতে সে চৌকি থেকে কষ্টেসৃষ্টে নামল, কিন্তু নামা পর্যন্তই, দুই পা এগোবে সে পথ বন্ধ। হঠাৎ কী খেয়াল হলো, উবু হয়ে বসে চৌকির নিচে জঞ্জালের আড়াল থেকে ট্রাঙ্কটা টেনে বের করল। এইটুকু পরিশ্রমেই তার হাঁপ ধরে গেল। ট্রাঙ্কটাকে চৌকির ওপর বসিয়ে পাশে বসল। বুকের মধ্যে জোরে জোরে কিসের ঝাপটা উঠছে। উঠুক, ঘুম তাড়াতে সে বারকয়েক টেনে টেনে লম্বা শ্বাস নিল। ট্রাঙ্কটা যে কোন ফাঁকে খুলে ফেলেছে খেয়াল নেই, তাকিয়ে চল্লিশ পাওয়ারের মিনমিনে আলোয় চমকে উঠল। আলোটা মাথার ওপরের নাঙ্গা বাল্ব থেকে না, ডালাখোলা ট্রাঙ্কের ভিতর থেকে ঠিকরাচ্ছে। অস্থির হাতে ট্রাঙ্ক উপুড় করে দুই ভাজ হোগলার চাটাইয়ের ওপর ছেড়ে দিতে করার মতো যেন কিছু পেল। একে একে ভাজ খুলে শাড়িগুলো এপাশে-ওপাশে ছড়াল, বাক্স থেকে জুতা, তার পর যা যা চোখে পড়ল– আলতা, সাবান, শ্যাম্পু, টিপ, কানের দুল, গলার চেইন সব ছত্রখান ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গোটা চৌকিটা ভরে ফেলে মনে হলো ঘুমটা এত সময়ে পিছু হটছে। তবে দূরে যায়নি, কানের কাছে ঘাপটি মেরে আছে, যখন-তখন হামলা চালাবে। সে তার চিলতে ঘরটা একনজর চোখ ঘুরিয়ে দেখল, হরেক জিনিসের ঠাসাঠাসিতে ঘর আর ঘর কই ! শ্বাস টানতে গিয়ে নানা জিনিসের এত এত গন্ধের মধ্যে কোনটা ছেড়ে কোনটা শুঁকবে ভেবে পেল না। আর গন্ধগুলো যেন জট পাকিয়ে নাকটাকে বিকল করে দিচ্ছে। শ্বাস টানতে পারছে কই! চোখজোড়া একটু আগেও ঠিকরানো আলোয় ধাঁধিয়ে গিয়েছিল, এবার মনে হচ্ছে ঘোলা-ঘোলা।
সে বুঝতে পারছে একটা মুশকিলে পড়ে গেছে। জিনিসগুলো বের করায় কি এমন হলো ? কিন্তু যার জন্য এত কিছু, সে যদি একবার এসে দেখে যেত বাপ তার কী মুসিবতে! তিন বছর আগের মুখটা মনে করতে গিয়ে সে আচমকা ধাক্কা খেল। পারছে কই? মুখটা গেল কোথায়, এই তো ছিল, মাথায় ছিল, চোখের মণির মধ্যে ছিল, এত এত জিনিসপাতির মধ্যেও ছিল। পরপরই বোকার মতো, বেহদ্দ বেকুবের মতো চৌকিভরা, ঘরভরা জিনিসপাতির দিকে তাকিয়ে বুঝে উঠতে পারল না দিনের পর দিন সে-ই এসব বয়ে এনে ঘর ভরেছে ! সে এতটাই বিস্মিত হলো, বিমূঢ়, হতভম্ব হলো, ভেবে পেল না গত তিন বছর কিসের টানে, না-কি বেঘোর ঘুমের নেশায় বেহুঁশ হয়ে ছিল। কিন্তু এখন যখন হুঁশ ফিরবে ফিরবে করছে, কী করতে পারে !
হজরত আলি টের পাচ্ছে কানের কাছে ওঁৎ পেতে থাকা ঘুমটা হেলেদুলে চোখ বরাবর ধেয়ে আসছে। আর পারছে না। ঘুম তাড়াতে এত কিছু করল। কিন্তু ঘুমাবে যে, জায়গা কোথায়! চৌকি তো আর তার দখলে নেই। গুটিসুটি মেরে কু-লী পাকিয়ে শোবে তা-ও অসম্ভব। সবই বেদখল হয়ে গেছে। কিন্তু এত ভাবাভাবির সুযোগ তাকে দিচ্ছে কে ! জায়গা না পেলেও ঘুম যে ভারী হয়ে চোখের ঝাঁপ ফেলে দিচ্ছে। এদিকে বাতাসহীন বুকে চাপ বাড়ছে, শ্বাস টানতে এত জবরদস্তি কেন করতে হচ্ছে ? আর তিন বছর দেখা নেই বলে মুখটাই-বা কেন মাথা ফাঁকা করে হারিয়ে যাবে !
রাত শেষ হতে বাকি ছিল না। একটু পরে বাইরে ভোরের আলো ফুটল, তাজা-টাটকা আলো-হাওয়ায় ঝলমলে আনকোরা দিন। আলো বাড়ল, রোদ-গরম বাড়ল। টিনের চৌখুপি তেতে উঠল। বেলা গড়াল। হজরত আলিকে ডেকে তুলবে কার সাধ্য !
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
❤ Support Us








