Advertisement
  • গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
  • আগস্ট ১০, ২০২৫

চুমু

ময়ূরী মিত্র
চুমু

 
কাঞ্চনজঙ্ঘায় সূর্য আজ কাঞ্চন ঢেলেছে ৷ একমনে, অনেকটা করে ৷ প্রতি ঘন্টায় রোদ বাড়ছে ৷ মহারাজের তৈরি করা দেড়তলা বাড়ি রোদে হলুদ ৷ সূর্য কি বুঝতে টুঝতে পেরেছে মহারাজের পনেরো বছরের বউ এই মাঝলা যৌবনেই মহারাজকে বর ছেড়ে যাচ্ছে ? নতুবা মে জুন মাসে দার্জিলিং জেলার পাহাড়ি অঞ্চলে রোদ খুব দুর্লভ ৷
 
ঢাউস সুটকেশটা খুলে বসেছিল গায়ত্রী ৷ পনেরো বছরে কত বসন, রঙ এবং বেরঙের ৷ প্রত্যেকটা যত্ন করে প্যাক করছে খুরশিদ, এই পাহাড়ের সংসারে তার ও মহারাজের সবসময়ের সঙ্গী ৷ পনেরো বছরের সাথীর ব্যাগ গোছানো দেখতে দেখতে এ সংসারের প্রথম দিন মনে আসছে গায়ত্রীর ৷
 
বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী ঝিমলির জ্ঞানের মোহে পড়েছিলেন মহারাজ সর্বানন্দ ৷ সংঘের ঘাটে সন্ধে হলেই একটা মাদুর পেতে বসতেন  ৷ পূর্বাশ্রমে চিকিৎসক হওয়ায় সংঘ তাঁকে চিকিৎসাবৃত্তির কাজটিই দিয়েছিল ৷ সূর্যাস্ত মাখা গোরা হাতে মিক্সচার বানিয়ে গরিব রোগীর মুখে ঢেলে দিতেন সর্বানন্দ ৷ একপাশে বসে ঝিমলি দেখত, সূর্য ও জলের জোড়া আভায় তার সর্বানন্দের চোখ বড় কামমধুর হয়ে উঠছে ৷ রোগী চলে গেলে ঝিমলি আবৃত্তি করত মাইকেলের মেঘনাদবধ, টানা এবং বই না দেখে ৷ ঝিমলির চোখ থেকে পালাতে আরতির অছিলায় খানিক পরেই উঠে যেতেন সর্বানন্দ ৷ ঝিমলি অবশ্য তাতে বিচলিত হত না মোটে ৷ ততদিনে সে নিশ্চিত,পরের সূর্যাস্ত তাদের আবার মেলাবে কিছু গরিব আর গঙ্গার মাঝে ৷
 
মাস্টার প্ল্যান ফাঁদলেন দুই না হওয়া বর বউ, সর্বানন্দ ঝিমলি ৷ পৈতৃক সম্পত্তি বেচে দার্জিলিংয়ে এই বাড়ি কিনলেন সর্বানন্দ ৷ ঝিমলিকে অবশ্য কিছু নিয়ে আসতে দেননি তিনি ৷ এ বিষয়ে ঝিমলির মহারাজ বরের যুক্তি ছিল, ভগবানের মন্দিরে ভক্তকে নিরাভরণ আসতে হয় ৷ ঝিমলি অবশ্য এ ব্যাখ্যাটা অনেকদিন পরে শুনেছিল মহারাজের কাছে ৷
 
দার্জিলিং মেইলে করে যখন সর্বানন্দ ঝিমলিকে নিয়ে এ বাড়িতে প্রথম পা রাখলেন ঝিমলির গায়ে ছিল একটি সবুজ শিফনের সালোয়ার কামিজ ৷ নতুন বউকে দীর্ঘ চুমু দিয়ে দ্রুত হাতে বাক্স থেকে বার করেছিলেন একটি লালপাড় গরদ শাড়ি ৷ নিজের হাতে ঝিমলিকে পরিয়ে বলেছিলেন, এই শাড়ি পরে প্রতি ভোরে আমার পুজোর ফুল গুছিয়ে দেবে ৷ তোমার নাম দিলাম গায়ত্রী ৷ কেমন? সুন্দর নাম না ? কেমন পুজো পুজো গন্ধ আছে নামটায় ৷ তুমি আমার পূজারিণী গো ৷
 
গায়ত্রীকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন সর্বানন্দ ৷ পূর্ণ সঙ্গম করেছিলেন সেই মুহূর্তেই, সেদিনও কী রোদ জেগেছিল পাহাড়ে, এক এক জায়গায় গুচ্ছরোদের ফুল ফুটেছিল ৷ মিলন শেষে সুখী মহারাজ বার বার বলছিলেন, গায়ত্রী আমার জগদ্ধাত্রী ৷ ঝিমলি বুঝতে পারছিল না, তার সংসার ও সহবাস ঠিকঠাক শুরু হলো কিনা ৷ স্বামীর বুকের মধ্যে থেকে সে কেবল বলতে পেরেছিল, আমি একটু চা খাব ৷ সর্বানন্দের নির্দেশে খুরশিদ চা এনে দিয়েছিল ও ঝিমলির সবুজ সালোয়ারটা নিয়ে চলে গিয়েছিল ৷ আর কোনোদিন প্রিয় পোশাকটি ঝিমলির চোখে পড়েনি ৷ ওইদিন থেকেই সর্বানন্দ খুরশিদকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, প্রত্যহ বিকেল তিনটেতে একবারই চা দেবে মাকে ৷ সকাল সন্ধ্যায় এবং দিবাভাগে ওঁকে পুজোয় থাকতে হবে আমার সঙ্গে ৷ খুরশিদ প্রথম নির্দেশ মেনেছিল, দ্বিতীয়টা মানেনি ৷
 
গায়ত্রী বা ঝিমলিকে কক্ষনো মা ডাকেনি ৷ না, মহারাজ বা ভক্তদের সামনেও না ৷
 
আরে ! করছে কি খুরশিদ ৷ ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে মহারাজের দেওয়া রাশ রাশ লাল পাড় সাদা শাড়ি ৷ পনেরো বছর ধরে মহারাজ গায়ত্রীকে শুধু এই শাড়ি কিনে দিয়েছেন ৷ আর রোজ গায়ত্রী সেগুলো একটা একটা করে পরে মহারাজের সঙ্গে পুজোয় বসেছে ৷ গায়ত্রী ভাবছিল, মহারাজ ঠিক কতটা খুশি হতেন বউয়ের এই বদলে যাওয়ায় ! সেদিনের ভাবনাটা আজ চলে যাওয়ার দিনে কেনই বা ভাবতে বসেছে ঝিমলি ! আরে বাবা ! সেদিন এসব ভাবার অবকাশই বা কোথায় ! বিভিন্ন তিথিতে নানাবিধ সুস্বাদু নিরামিষ রান্না, সন্ধেতে আসা পাহাড়ি রোগীদের জন্য ফলপ্রসাদ ও পায়সের ব্যবস্থা করা, এসবে সময় বয়ে যেত হু হু করে ৷ এখানকার মানুষগুলো নানারকম বাঙালি পায়েস খেয়ে চমকে উঠত ৷ মহারাজ বলতেন, আজ ভালো করে নামগান কর ৷ কাল তোমাদের জন্য আর একটা নতুন পায়েস ৷
 
ঝিমলি ভুলে যাচ্ছিল প্রিয় কবিদের ৷ রাতের অন্ধকারে খুরশিদের লুকিয়ে আনা চিকেন মোমো খেতে খেতে ভাবত, কালই-কালই সর্বানন্দকে বলে কলকাতা থেকে এম-এর সিলেবাস আনাতে হবে ৷ সে যে মানের ছাত্রী, তাতে ক্লাস না করেও নিজের প্রস্তুতিতে পাশ করতে পারবে ৷ হ্যাঁ , হ্যাঁ কালই বলতে হবে ৷ আর দেরী করা চলবে না ৷ পাশে বসে খুরশিদ মোমোর সুপ চুকচুক করে খেত ৷ পরের দিন ঝিমলিকে নিয়ে যেত ম্যালের সুপার মার্কেটে ৷ রঙিন জামাকাপড় নিয়ে ফেরার সময় ঝিমলি বলত, পরতে পারব না, কেনালে কেন এসব ৷ খুরশিদ বলত, না কিনলে পছন্দও ভুলবে যে !
 
সিলেবাস বই সব কলকাতা থেকে আনিয়ে দিয়েছিলেন ৷ বারবার প্রশ্ন করেছিলেন, তুমি কি পারবে গায়ত্রী ? মায়ের পুজো সামলে পারবে তো ? উত্তরও নিজেই দিতেন সর্বানন্দ– কেন পারবে না ? পারবে পারবে ৷ মায়ের কাজ করে চলেছ একমনে ৷ মা তোমায় ঠিক আশীর্বাদ করবেন দেখো ৷
 
ঝিমলি চুপ ৷ দুচোখে দুটো সাপ ৷
 

 দু

 
– মহারাজ তো এখনো এলেন না ৷ তোমায় কী বলে গিয়েছিলেন ভোরে ? তোমার যাওয়ার আগে ফিরে আসবেন ? সুটকেশ বন্ধ করতে করতে খুরশিদ বলে ৷ দ্রুত হাতে প্যান কার্ড ,আঁধার কার্ড সব গুছিয়ে দেয় ঝিমলির পার্সে ৷
ঝিমলি বলে, কিছু বলে যাননি তো !

 
– তুমি জিজ্ঞেস করনি ?

– নাতো ৷

– মুখ দেখে কী মনে হল ?

– মুখ দেখিনি ৷ আরো ফিসফিস হয়ে গেল ঝিমলির গলা, দেখিনা অনেকদিন ৷

–  উফ ! তাহলে মুখ ফুটে জিজ্ঞেস তো করতে পারতে ?

– ভুলে গিয়েছিলাম ৷

– আরে তুমি আর কোনোদিন এখানে ফিরবে  ? তাহলে অফিসিয়াল কথাগুলো বলে নেবে না মহারাজের সঙ্গে ?

– তুমি জান ? আমি ফিরব না ৷

 
উত্তর না দিয়ে খুরশিদ দু প্লেট খাবার এনে রাখল ৷ ঝিমলির প্রিয় চিকেন চাউমিন ৷ এই প্রথম দুজনে একসঙ্গে টেবিলে বসে খাবে ৷
 
খেতে খেতে খুরশিদ হেসে ফেলল, সব ভুলে যাচ্ছ তাই না ? কুশের আসনে বসে পুজো করতে, ভাত খেতে, ফুল বাছতে, চন্দন ফন্দনও তো বাটতে ৷ পিছন ছড়ে গিয়েছিল তোমার ৷ তোমার হাঁটার ঢং বদলাতে দেখেই ওষুধ এনে দিয়েছিলাম তোমায় ৷ আমি তোমাকে আর কতভাবে জানব ঝিমলি ৷
 
বাইরে সাইকেলের ঘন্টি ৷
 
মহারাজ লোক দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন, পাহাড়ের অনেক ওপরে রোগি দেখতে গিয়েছেন তিনি ৷ গায়ত্রী যেন অপেক্ষা না করে রওনা দেয় ৷ শিলিগুড়ি নামতে চারঘন্টা লাগবে ৷ আরো লিখেছেন মহারাজ, কলকাতা গিয়ে এবার যেন গায়ত্রী সময় নিয়ে চিন্তাভাবনা করে, সবার সঙ্গে আলোচনা করে তবে এখানে ফেরে ৷ তিনি অবশ্য আশা রাখছেন, মা ডাকলে গায়ত্রী আবার ফিরবে পাহাড়ে ৷
 
খুরশিদ সুটকেশ নিয়ে গেল গাড়িতে ৷ ঠিক সেই মুহূর্তে ঝিমলি দেখল, সেই সবুজ সালোয়ারটা বিছানায় পড়ে আছে ৷ তার ওপরে একটা নতুন লিপস্টিক ৷ দৌড়ে গিয়ে লিপস্টিকের ঢাকনা খুলল ৷ পুরো স্টিকটা এক ঝটকায় বার করে ফেলল ঝিমলি ৷ নিশ্চয় খুরশিদের কাজ ৷ এত যত্নে সালোয়ারটা কেচে ইস্ত্রি করে রেখেছে, সবুজ রঙ তেমনই ঘন আছে ৷ কিন্তু এ বাবা ! কী চড়া রঙের লিপস্টিক কিনেছে রে ৷
 
আর দেরি করো না, এস ৷ এত তাড়া দিচ্ছে খুরশিদ ! যেন ঘাড় ধরে ঝিমলিকে কলকাতায় পাঠাতে পারলে সে বাঁচে ৷ ডিপ করে লিপস্টিক লাগাতে লাগল ঝিমলি, সমভূমিতে পৌঁছবার ফাইনাল টাচ ৷
 
এবার একটু মন খারাপ লাগছে ৷ যাওয়ার সময় মনে করে বারান্দায় মহারাজের কাচা গেরুয়া বসন টানটান করে মেলে দিল ৷ না শুকোলে মানুষটা ফিরে এসে পরবেন কী !
 

♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!