- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- জুলাই ২৭, ২০২৫
মা
বাঁশঝাড়ের তলায় যেখানে পাটকাঠির পালাটা আছে সেখানেই ঘুরঘুর করছে সারমেয়টি। গায়ের রং লাল। গলার কাছে কিছুটা খয়েরি ভাব। পিঠের শিরদাঁড়ায় আর লেজে কামড়ের দাগ। পেট ফুলে যে দুধের পালানটা নেমেছিল সেটা এখন কিছুটা চুপসেছে। পাশেই গহমার ঝাড়। আদু সেখের ভুঁই। গহমার পাতা বিক্রির জন্য জমির কোণে গহমার চাষ করেছে আদু। ঝাড়টা পাটকাঠির পালাটাকে কিছুটা আড়াল করে রেখেছে। বাকি জমিতে করলার আবাদ। বাঁশ-কঞ্চির মাচাতে করলার লতিগুলো ঝুলছে। মাচার ফাঁকে তাকালে আদুকে দেখা যায়। হাঁটুমুড়ে দ হয়ে ভুঁই নিড়াচ্ছে। যেন মানুষ নয়, এক দলা মাটি বসে আছে ! এই জায়গাটাতেই সুন্দরী বিল জুবুথুবু করে যখন শীত এসেছিল তখন বাচ্চাটার জন্ম হয়েছিল। সময়টা ছিল পৌষের রাত। পাড়ে-পগারে হাড়হিম করা জাড় দাঁত-নখ বের করে দাঁড়িয়েছিল। সে রাতে শুধুমাত্র এই বাচ্চাটির একার জন্ম হয়নি। সঙ্গে তার আরও তিনটে ভাই আর দুটো বোনের জন্ম হয়েছিল। জাড়ে বাচ্চাগুলো সারারাত কুঁই-কুঁই করত। যেন জাড় বাচ্চাগুলোর দেহ থেকে জান বের করত ! বাচ্চাগুলো একে একে হয় অনাহারে আর না হয় শিয়ালের পেটে যেতে যেতে শেষপর্যন্ত এই বাচ্চাটি একা বেঁচে আছে। বেশ নাদুসনুদুস হয়ে উঠেছে। গোল গোল চোখগুলো রাতের বেলায় জ্বলজ্বল করে। গায়ের রং-ও পেয়েছে মায়ের গায়ের রং। তাকেই খুঁজে পাচ্ছে না মা সারমেয়টি। ভোর থেকেই তার কান্নার ডাক কানে আসছিল। পাটকাঠির পালার ভিতরে ঢুকছে আর বের হচ্ছে। আর গলা উঁচিয়ে ডাকছে। সে ডাক বড়ই করুণ। কষ্ট মেশানো। কিন্তু বাচ্চাটির কোনো সাড়াশব্দ নেই। ও গেল কোথায় ? এত সকাল-সকাল তো কোথাও যায় না। মায়ের সঙ্গে খেলে। খুনসুটি করে। এদিক-ওদিক কাছেপিঠে মায়ের সঙ্গে খাবারের সন্ধানে যায়। তবে কি গতরাতে কোথাও গিয়ে আর ফিরতে পারেনি ? পথ ভুলে গেল ! মা সারমেয়টির ছটফট দেখে মনে হচ্ছে, সেটা হলেও হতে পারে। মা সারমেয়টি মাটি শুঁকছে আর গলা উঁচিয়ে ডাকছে। মাঝেমধ্যে বিলের ধারেও ছুটে যাচ্ছে। সেখানকার ঝোপঝাড়, পাড়-পগারে হন্যে হয়ে খুঁজছে। কিন্তু কোত্থাও বাচ্চাটির খোঁজ নেই !
এই চত্বরে লালরঙের এই মাদি কুকুরটিই একমাত্র সন্তান প্রসব করেছিল। তার আগে তাকে অনেকজনের সঙ্গে রীতিমতো লড়াই করতে হয়েছিল। লড়াইটা একখানা বিশ্বযুদ্ধের চেয়েও কম কিছু নয়। অনেক মদ্দা কুকুরই চেয়েছিল তার সন্তানের বাবা হতে। সন্তানের মায়ের দখল নিতে তাদের মধ্যে কামড়াকামড়ি, পাড়াপাড়ি কি না হয়েছিল ! শেষে কামড় খেয়ে, রক্তারক্তি হয়ে, ছাই রঙের হামড়াচোমড়া মদ্দাটা জিতেছিল। বাবা হওয়ার সুযোগ সে পেয়েছিল। লাল রঙের মাদিটা যখন সন্তানের জন্ম দিল তখন তার মনে হয়েছিল, এ পৃথিবীতে তার জন্মগ্রহণ সার্থক। তখন পাটকাঠির পালার নীচে অন্য এক পৃথিবী। সে পৃথিবী স্নেহ, আদর আর বাৎসল্যের। আদুর বউ তো এমন করে পাটকাঠির পালা থেকে পাটকাঠি টানে যাতে করে বাচ্চাগুলোর কোনো অসুবিধা না হয়। বাচ্চাগুলো যখন পালার নিচ থেকে বেরিয়ে বাঁশঝাড়ের তলায় খেলত তখন মনে হতো এ পৃথিবীটা শুধু তাদের একার। তাদের সঙ্গে নিয়াজের মাওর ছেলে-মেয়েগুলোও খেলত। পাড়ার লোকে ওদের নিষেধ করত, কুকুরের বাচ্চা নাড়িস নে, ওদের মা কামড়ে দেবে। নিয়াজের ছেলে-মেয়েরা ওসব কথা পাত্তা দিত না। তাদের কি আর অত বুদ্ধি হয়েছে ? তারা খেলত। কুকুরের বাচ্চাগুলোকে এক-আধবার কোলে নিত। আদর করত। আনন্দ পেত। আদুর বউ আশমিনারও কুকুরের বাচ্চাগুলোর ওপর একটা মায়া পড়ে গেছিল। বাড়ির কান্টার দিকে এলেই বাচ্চাগুলোর একবার খোঁজ নিত। এঁটো খাবার দিত। কিন্তু মাঠেঘাটে শিয়ালের যা বাড়বাড়ন্ত, তাতে বাচ্চাগুলোকে আর বাঁচিয়ে রাখতে পারল না মা সারমেয়টি। এত পাহারা দিয়ে, এত তোখিদ করেও বাঁচাতে পারল না। মাঝেমধ্যে শিয়ালের দল এসে একটা একটা করে তুলে নিয়ে যেতে থাকল। জন্ম দেওয়া ছাই রঙের মদ্দা কুকুরটির অবশ্য খোঁজ নেই। সে কবেই কোথাও চলে গেছে। তবে লাল রঙের মদ্দা কুকুরটি অবশ্য আশপাশেই থাকে। মাঝেমধ্যেই মা সারমেয়টিকে তার সঙ্গে মারামারি করতে দেখা যায়। কখনো খাবার নিয়ে মারামারি তো কখনো জায়গা দখল নিয়ে মারামারি। দুজন দুজনকে দেখলেই ফুঁসে ওঠে। দাঁত ভেংচায়। যেন দুজন দুজনের চিরশত্রু।
না, সারাদিন চলে গেল কিন্তু বাচ্চাটির কোনো হদিশ পাওয়া গেল না ! মা সারমেয়টি সারাদিন কুই কুই করল। হন্যে হয়ে খুঁজল। পাড়ার ভিতরে এরাস্তা ওরাস্তা, এগলি ওগলি খুঁজল। কত করে ডাকল। কিন্তু কোত্থাও খুঁজে পাওয়া গেল না! আদু বলল, ‘অ শিয়ালে লিয়ে গেচে।‘ আদুর বউ আশমিনা বলল, ‘কুকুরডা টের পেল না ! কোলের কাছ থেকে শিয়ালে তুলে লিয়ে গেল!’
‘তখুন হয়তো কুকুরডা পালার ভিতরে ছিল না।‘
‘ছিল না তো কুণ্ঠে গেছিল ? বাচ্চা থুয়ে চরতে গেছিল!’ রেগে উঠল আশমিনা। যেন মা সারমেয়টিকে বলতে চাইল, তুমি কেমন মা হে, যে বাচ্চাদের বিপদের মধ্যে ফেলে রেখে কোথাও চলে যাও। সেও তো একজন মা। দুই সন্তানের জননী। সন্তানকে একা ফেলে রেখে মায়েরা যে কোথাও যেতে পারে না। আশমিনা নিজেও এদিক-ওদিক খোঁজ করেছে। কিছুটা দূরের গিয়াসের পুকুরে গিয়েও একবার দেখে এসেছে, বাচ্চাটা জলে ডুবে গেছে কি না। আদুও বিলের ধারে গেছিল। ঝোপঝাড় দেখে এসেছে। কিন্তু কোত্থাও বাচ্চাটির দেখা পাওয়া যায়নি। আশমিনা বলল, ‘কোথাও কি কুনু ঠ্যাং বা নাড়িভুঁড়ি পড়ে থাকতে দেখিচ?’
‘না।’
‘শিয়ালে খেলে পরে তো সেসব কিছু পড়ে থাকতোস।’
‘বিলের ওপারেও লিয়ি চলি যাতে পারে। শিয়ালকে তো কুনুকিছুতে বিশ্বাস নাই।’
‘শিয়ালের খুব বাড়বাড়ন্ত বেড়েচে যে। দিনে-দুপুরে সবসময় ঘুরে বেড়াচ্চে। ওরা খায় কী। পাল পাল শিয়ালের সংখ্যা বাড়চে!’
‘সে তুলনায় কুকুরের সংখ্যা দিনের দিন কমছে।’
‘বাচ্চা বড়ো হতে দিলে তো সংখ্যা বাড়বে। বাচ্চা পালার সঙ্গে সঙ্গে শিয়ালের পেটে চলে যাচ্চে। এতে কি মানুষের দোষ নাই ভাবচ। মানুষেরও দোষ আছে। মানুষ কুকুর দেখলেই হল, ছেই ছেই করে তাড়াবে। কুকুরটা কিছু সারাদিনে খেতে পেয়েচে কি না তার ঠিক নেই। চাট্টে খাবার দেওয়ার মুরোদ নাই, আর দেখলেই লাঠি লিয়ে তাড়া করে। মেরে ঠাংঠুং ভেঙে দেয়।’ গমগম করে বেজে উঠল আশমিনা। আদু বলল, ‘আর ক-দিন বাদ দেখবা, শিয়ালে মানুষকেও খাতে শুরু করবে।’
‘ঠিকই করবে। এখুনই দেখচ না, শিয়ালের অত্যাচারে হাঁস-মুরগি পোষা যাচ্চে না। ধরে ধরে খেয়ে নিচ্চে! এখুন মানুষকে কামড়াচ্চে এরপর মানুষকে খাবে। শিয়ালের আর বাঘ-সিংহ হয়ে উঠতে দেরি নাই।’ আশমিনা কথাগুলো মিথ্যা কিছু বলছে না। এই তো গতমাসে বিলপাড়ার ছবকত শেখকে শিয়ালে কামড়েছে। কবরে লাশ রেখে আসার সঙ্গে সঙ্গে শিয়াল ঘুরছে। কবর খুঁড়ে লাশ তোলার চেষ্টা করছে। আর সেখানে ফাঁকাতে পরে থাকা কুকুরের বাচ্চাকে কি আর তারা বাড়তে দিবে ? কুকুর হলো তাদের চিরশত্রু। কুকুরের বংশ কমলে তাদের সুবিধা। লোকালয়ে ঢুকতে বাধা কম পাবে। হাঁস-মুরগি খাওয়া সুবিধা হবে। কুকুরের বাচ্চাটাকে কোনো শিয়ালই হয়তো তুলেই নিয়ে গেছে।
বিকেলের দিকে আপ্তান আলি খবর দিল। ডিহির মাঠে কুকুরের বাচ্চাটাকে নাকি দেখা গেছে। আদুর পাশের বাড়ি আপ্তানদের । শুধু পাড়শিই নয়, আদুর করলার ভুঁইয়ের পাশের ঢেঁড়সের ভুঁইয়ের মালিকও সে। তার জমিতেই সারি সারি তালগাছ। যেগুলো বিলের দিকে হেলে আছে। দূর থেকে দেখে মনে হয়, কতকগুলো ধনুক দাঁড়িয়ে ! আপ্তান আলির শরীরের গঠনখানাও তাল গাছের মতো। লম্বা হিলহিলে। যেন হালকাপাতলা ঝড় গায়ে লাগলেই গাখানা দুমড়ে যাবে ! চিকন গলা। ঠ্যাং ঠেঙে পা। বুকের বাতিও বিত্তির মতো চিরচিরে। তালগাছগুলোর পাশে দাঁড়ালে দূর থেকে তাকেও একখানা তাল গাছ মনে হয়। তুলনায় আদু বেঁটে। গায়ের রং-ও বেশ তামাটে। গায়ে মাংস কম থাকলেও গিঁটের হাড়গুলো বেশ শক্তপোক্ত। যেন ইস্পাতের দলা ! তবে দুজনের চোখগুলো একই। খুঁটল চোখ। টিপটিপ করে তাকায়। মাথার চুলেও দুজনের মিল আছে। দুজনের মাথাতেই উসকোখুসকো ফেঁসো চুল। তালগাছের গোড়ার জঙ্গলগুলোও খোঁজ করেছে আদু। ঢোলকলমি আর বুনকচুর জঙ্গল। বিলের দিকে নামলে কচুরিপানা ঝোপ হয়ে আছে। কথাটা শুনে আশমিনার মনে আনন্দ এল। সে মনে মনে বলল, যাক, বেঁচে তো আছে। ঠিকই ফিরে আসবে। আবার মনে মনে খটকাও হলো, বাচ্চাটা একা একা অতদূর কী করে গেল ! আর গেল তো গেল, তার মাও কিছু টের পেল না ! সেই কতক্ষণ ধরে কাঁদছে। আশমিনার মনে কষ্ট হলো। সে আদুকে বলল, ‘একবার ডিহির মাঠে গিয়ে দেখে আসো তো, বাচ্চাটা কোথাও আটকে গেল কি না।’
মা সারমেয়টি কীভাবে তার বাচ্চাকে হারিয়ে কাঁদছে। নাজনিন ভাবল, তার মাও কি এভাবে তাদের জন্য কাঁদছে ? কতদিন হয়ে গেল মায়ের সঙ্গে তাদের দেখা নেই ! কতদিন হয়ে গেল, তারা ‘মা’ বলে ডাকেনি! কতদিন হয়ে গেল, তাদের মা তাদেরকে খাইয়ে দেয়নি! ঘুম পাড়িয়ে দেয়নি !
‘ওদিকে গেলে খোঁজ করব।’ আদু বলল। কিন্তু কথাটা কেমন হালকাপাতলা মনে হল। যেন গেলে খোঁজ নেবে, না গেলে নয়, এমন হাবভাব। আশমিনা ওতেই খুশি হল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হল। আদুও ডিহির মাঠে গেল না, ডিহির মাঠ থেকে কুকুরের বাচ্চাটাও ফিরে এল না। মা সারমেয়টি কেঁদে কেঁদে গলা ভেঙে ফেলল। শুধু এদিক-ওদিক ছুটছে, আর গলা তুলে ডাকছে। আর ঘুরে ঘুরে আসছে পাটকাঠির পালাটার কাছে। একবার ভিতরে ঢুকছে একবার বাইরে বের হচ্ছে। আকাশে চাঁদ আলো করে রাত এল। রুটির মতো গোল চাঁদখানা সুন্দরী বিলের ওপর ঝুলে আছে। আর জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে চরাচর। চাঁদের সে আলোতে বিলের জল রুপোর মতো চিকচিক করছে। জলে ফুটে থাকা বেগুনি রঙের কচুরিপানা ফুলগুলো চাঁদের আলোয় খিলখিল করছে। যেন কেউ বিলের জলে অমূল্য রত্ন ছড়িয়ে দিয়েছে ! জ্যোৎস্নাভরা রাতখানাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিতে লাগল মা সারমেয়টির করুণ কান্না। মাঝেমধ্যে বিলের পাড় থেকে ভেসে আসছে শিয়ালের হুক্কা-হুয়া। সারমেয়টির গলা ভাঙা কান্নার জন্য আশমিনার ঘুম আসতে আসতে অনেক রাত হয়ে গেল। আদু অবশ্য রাতের শেষ বিড়িটা ফুঁকেই ঘুমের মধ্যে চলে গেছে। খাটাখাটুনির শরীর। বিছানার ছোঁয়া পেতেই খপ করে জাপটে ধরে ঘুম। আদু নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। ভোরের দিকে যখন ঘুম ভাঙল আদুর তখনো তার কানে এল সারমেয়টির কান্নার করুণ আওয়াজ। ফজরের আজান আর সারমেয়টির কান্না মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। ‘কুকুরটা এখনো বাচ্চাটিকে খুঁজে পায়নি!’ মনে মনে আফশোশ করল আদু। যখন বিল-মাঠ-ঘাট হলুদ করে সূর্য উঠল আকাশে তখন আশমিনা রাতের এঁটো খাবার সারমেয়টিকে দিতে গিয়ে একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলো, সারমেয়টি খাবার খেল না ! একবার-দুবার শুঁকল। কিন্তু খেল না। আশমিনা লক্ষ্য করল, কেঁদে কেঁদে সারমেয়টি চোখ-মুখ ফুলিয়ে ফেলেছে ! গলা দিয়ে আর স্বর বের হচ্ছে না ! কেমন একটা ঢ্যাসঢেসে খ্যাসখেসে স্বর। অথচ পাড়ায় শিয়াল ঢুকলে এই সারমেয়টি যখন ঘেউ ঘেউ করত গলা একেবারে টনটন করে বাজত ! যেন গলার ভিতরে কেউ হাতুড়ি পিটছে! সারমেয়টির পেট পরে গেছে। যেন মনে হচ্ছে, দুখানা ছেঁড়া কাঁথার টুকরো কিংবা দুখানা পাটের বস্তা দুদিক থেকে সেলায় করে ঝোলান আছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আশমিনা একটা ব্যাপার দেখে তাজ্জব হয়ে গেল, যে লাল রঙের কুকুরটির সঙ্গে সারমেয়টির কখনই বনিবনা হতো না, সেই লাল রঙের কুকুরটি মা সারমেয়টির সঙ্গে এক হয়ে বিলের পাড়ে, মাঠের আলে, বনে-বাদাড়ে বাচ্চাটিকে খুঁজছে ! আজ তাদের মধ্যে কোনো দুশমনি নেই ! মারামারি ঝগড়াঝাঁটি নেই ! যেন দুজন দুজনের পরম বন্ধু ! আশমিনা মনে মনে বলল, মানুষ হলে নিশ্চয় এরকম করত না। মনে মনে আরো ক্ষতি চাইত। একজনের ক্ষতিতে অপরজন পিছন থেকে হাসত। ঠিক যেমন করে তার জায়েরা। একটুখানি উন্নতি করতে দেখলেই হিংসেই মরে যায়। আবার বিপদে পড়লে হাসে। মনে মনে বদদোয়া দেয়। আদুর সঙ্গে তার ভায়েদেরও কি জমিজমা ভাগাভাগি নিয়ে কম ঠেঙাঠেঙি হল ! থানা-কোর্টও হলো ! এখন তো আবার কথা বলাবলিও বন্ধ। বাকি শুধু উঠোনটায় বেড়া বসতে। একখানা উঠোনে তিন তিনখানা বেড়া উঠলে সে বাড়ি কি আর বাড়ি থাকে ? জাহান্নাম হয়ে যায় ! আদুর তিন ভাইয়ের তিনখানা বেড়া ! আজও সারাদিন চলে গেল, না সারমেয়টি না মানুষ কেউ কোত্থাও হারিয়ে যাওয়া বাচ্চাটির হদিশ পেল না ! আশমিনা ভাবল, সারমেয়টি নিশ্চয় এবার শান্ত হবে। নিশ্চয় সে মেনে নিতে বাধ্য হবে যে তার বাচ্চাটি মারা গেছে। কিন্তু না, সেটা হলো না। সারমেয়টি আজও সারাদিন সারারাত তার বাচ্চার খোঁজ করল এবং ভাঙা গলায় কাঁদল। পাড়ার লোকে সতর্ক হলো, সারমেয়টি পাগলা হয়ে গেছে, কামড়ে দিতে পারে। তারা বাচ্চাদের সতর্ক করল। বলল, কেউ যেন পাটকাঠির পালার কাছে না যায়। পাড়ার লোকের সবচেয়ে বেশি চিন্তা হলো, নিয়াজের মা হারা ছেলে-মেয়েগুলোকে নিয়ে। ওরা তো সারাদিন আন্টায়-কান্টায় ঘুরে বেড়ায়। রাগের মাথায় সারমেয়টি হয়তো ওদেরকে কামড়ে দেবে। আশমিনা একবার দুবার ওদেরকে সাবধান করল। বলল, ‘তোরা কুকুরটার কাছে যাসনে, কামড়ে দেবে। বাচ্চা হারিয়ে কুকুরটা পাগলা হয়ে গেচে।’ নিয়াজের মা হারা বাচ্চাগুলো আশমিনার কথাগুলো শুনল বলে মনে হলো না। তারা পাটকাঠির পালার আশেপাশেই খেলতে লাগল। আশমিনা একবার ধমকাল। ছেলে-মেয়েগুলো সে ধমকানি শুনে বাড়ির দিকে পালাল। কিন্তু সে আর কতক্ষণ ? যেই আশমিনা বাড়ির ভিতরে ঢুকল অমনি ছেলে-মেয়েগুলো আবারও বাঁশরায় চলে এল। তারা কিতকিত খেলছে। নিয়াজের দুই মেয়ে এক ছেলে। ছেলেটা ছোট। বয়স তিন সাড়ে তিন বছর হবে। নাম করিম। তার বয়স যখন আড়াই বছর তখন তাদের মা আজমিরা তাদেরকে ফেলে রেখে কাহারপাড়ার মুকাজুদ্দির সঙ্গে পালিয়ে গেছে। বড় মেয়ে নাজনিন খাতুন। ছোট মেয়ে আফসানা। সবগুলো নামই নাকি তাদের ভেগে যাওয়া মা রেখেছিল ! ছেলে-মেয়েগুলোর তখিদ করার কেউ নেই। বাপ নিয়াজউদ্দিন নতুন বউয়ের খোঁজে ব্যস্ত। আবার বিয়ে করবে। সেই আনন্দে সে ডগমগ করছে। ইতিমধ্যে দু-দুটো মেয়ে দেখা হয়ে গেছে। মনের ভিতরের সম্পূর্ণ জায়গাটা ওই নতুন বউয়ের জন্য আগলে রেখেছে। মা হারা ছেলে-মেয়েগুলোর দিকে কোনো নজর নেই। তারা খেতে পেল কি পেল না, পরতে পেল কি পেল না, কোনো খেয়াল নেই। একেবারে নতুন বউয়ে মজে আছে। আশমিনার কথায়, ‘ছেলে-মেয়েগুলো এখন সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর হেফাজতে। তা না হলে কবেই কুকুর-শিয়ালের পেটে চলে যেত। ‘করিমদের দাদি(ঠাকুরমা) আছেন। কিন্তু তিনিও তো অথর্ব। চলতে-ফিরতে অত পারেন না। ছেলে-মেয়েগুলোর যত্ন-আত্তির বলে কিচ্ছু নেই। আফসানার মাথার চুল এমন উসকোখুসকো, আশমিনা বলে, শালিকের বাসা ! নাজনিন কিছুটা বাহার দেওয়া শিখেছে। চুল আঁচড়ায়। তবে চুলে ঠিকমতো তেল পড়ে না। তেল পাবে কোথায় যে দেবে ? আফসানা এক বদনা জলেই স্নান সারে। স্নানের সে জল পিঠে পড়ে তো পেটে পড়ে না। চুল ভেজে তো মুখ ভেজে না। কেউ এক বদনা দু-বদনা জল টিপে স্নানটাও করিয়ে দেয় না। গায়ের জামাকাপড়গুলো এত ময়লা যে বিটকেল গন্ধ বের হয়। কাচার মানুষও সেই একজন, বড়ো মেয়ে নাজনিন। বাপের জামাকাপড়ও কাচে, ভাই-বোনদের জামাকাপড়ও কাচে। হাতের ময়লা বুকে, তো বুকের ময়লা পিঠে দলা হয়ে থেকে যায়। কলারের ময়লা যেমন তেমন থেকেই যায়। বাপের বকুনি খেয়ে তাকে মাঝেমধ্যে ঘর-দুয়ারও মুছতে হয়। জ্বালান কুড়িয়ে আনে। এই সাত বছর বয়সে সে যেন এ বাড়ির বড়ো গিন্নি ! কিন্তু সে গিন্নি থাকতে চায় না। সে শিশু শিশুই থাকতে চায়। সেজন্য সে দিনের বেশিরভাগ সময় ভাই-বোন, পাড়াপড়শিদের সঙ্গে খেলে। এখন যেমন সারমেয়টির কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেখছে, মা সারমেয়টি কীভাবে তার বাচ্চাকে হারিয়ে কাঁদছে। নাজনিন ভাবল, তার মাও কি এভাবে তাদের জন্য কাঁদছে? কতদিন হয়ে গেল মায়ের সঙ্গে তাদের দেখা নেই ! কতদিন হয়ে গেল, তারা ‘মা’ বলে ডাকেনি! কতদিন হয়ে গেল, তাদের মা তাদেরকে খাইয়ে দেয়নি! ঘুম পাড়িয়ে দেয়নি !
দু । ই
পরের দিন সকালে একটা বিস্ময়কর কাণ্ড দেখল সবাই ! এটা কী করে সম্ভব ! কোথাও কি কারও নজরে পড়ল না ! কুকুরটা পেল কোথায় ! সবার চোখ কপালে উঠে যাওয়ার জোগাড় হলো। চোখ বড় করে সকলে দেখল, পাটকাঠির পালার কাছে, যেখানে পালার মোটা খুঁটিটা পোঁতা আছে তার গা লাগিয়ে যে মাটির শক্ত ঢেলাটা আছে সেখানে লাশটা পড়ে আছে ! মা সারমেয়টি লাশটিকে মুখ দিয়ে স্পর্শ করছে আর কাঁদছে । শরীরের আকার আর চামড়ার রং দেখে পাড়ার লোকে বুঝতে পারল, লাশটি গত দুদিন ধরে হারিয়ে যাওয়া কুকুরের বাচ্চাটির লাশ। কিন্তু এ লাশ এল কোথা থেকে! কুকুরটিই বা পেল কোথায় ! আদু বলল, ‘কেউ মনে হয়, মেরে মাটিতে পুঁতে দিয়েছিল। কুকুরটি সেখান থেকে তুলে নিয়ে এসেছে।’ তার সন্দেহ নিয়াজের ওপর। নিয়াজ নাকি এর আগেও একবার বাচ্চাটিকে মেরেছিল। বাচ্চাটি তার ঘরে নাকি উঠে পড়ে। আপ্তান বলল, ‘শিয়ালে তুলে লিয়ে গেচিল, তারপরে মেরে কুণ্ঠে হয়তো ফেলে দিয়িছিল, কুকুরডা সেখান থেকে মুখে করে লিয়ে এসচে।’ আরো অনেকে অনেক রকম কথা বলল। কিন্তু কোনটা সত্যি তা কে বা কী করে জানবে। সারাদিন সারমেয়টি তার মৃত বাচ্চাটির আশপাশেই ঘুরঘুর করল আর ‘ঘেউউ’ ‘ঘেউউ’ করে ভাঙা কন্ঠে ডাকতে থাকল। ভাবল, এই বুঝি লাশটা জীবন্ত হয়ে উঠবে। আর ছুকছুক করে মায়ের পালানে মুখ লাগিয়ে দুধ পান করবে। এইসময় পাড়ার লোক আরো বেশি করে সাবধান হলো। তার বাচ্চা না বেঁচে ওঠায় সারমেয়টি খেপে যেতে পারে। যাকে তাকে কামড়ে দিতে পারে। কেউ কেউ তো আবার সারমেয়টিকে পিটিয়ে মেরে ফেলার কথাও বলল। আপদ বিদেয় হোক। কিন্তু সে সাহস কেউ দেখাতে পারল না। নামুপাড়ার মজ্জেম আলির এ সাহস ছিল। সে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে খ্যাপা কুকুরকে মেরে ফেলত। সে মজ্জেম আলি বেঁচে নেই। কুকুরটাকে না মেরে ফেলা হোক, মৃত বাচ্চাটাকে তো ওর চোখের সামনে থেকে সরিয়ে ফেলা হোক। কিন্তু সে কাজটা করার হিম্মতও কেউ দেখাল না। খ্যাপা কুকুরের মুখ থেকে তার বাচ্চাকে সরানো মানে তো নির্ঘাত কুকুরের কামড় খাওয়া। একবার কামড়ালে চোদ্দটা ইনজেকশন ! সেই সূঁচ নাকি আবার নাভিতে দিতে হয় !
নাজনিন ভেজা চোখের ঝাপসা দৃষ্টিতে কাকটির সে উড়ে যাওয়া দেখল। কাকটি দেখতে দেখতে নাজনিন ভাবল, ওই দূর আকাশের নীল সীমানার নীচে কোথাও কোনো দেশে কোনো শহরে কিংবা কোনো গঞ্জে তার মা আছে। নাজনিন চিৎকার করে কথা বলার চেষ্টা করল। কিন্তু সে কথা তার মুখ দিয়ে শব্দ হয়ে বের হলো না। বুকের ভিতর থেকে নিঃশব্দে বের হয়ে বাতাসে মিশে গেল
দিন যত বাড়তে লাগল তত দুর্গন্ধও ছড়াতে লাগল। দুর্গন্ধ আদুর বাড়ির ভিতরেও আসতে লাগল। তাদের খাবার খাওয়া দুরূহ হয়ে পড়ল। আদু ওত পেতে থাকল, কখন সারমেয়টি লাশটার কাছ থেকে দূরে যায়। দূরে কোথাও গেলেই সেই ফাঁকে লাশটাকে সরিয়ে ফেলতে হবে। এমনভাবে মাটিতে পুঁতে দিতে হবে যাতে আর তার কোনো হদিশ না পায়। সেজন্য সে সঙ্গে সবসময় কোদাল রাখল। করলার ভুঁই নিড়াচ্ছে আর তাকিয়ে দেখছে সারমেয়টি কোথাও গেল কি না। কিন্তু না, আদুর ওত পেতে থাকাই হলো। সারমেয়টি তার মৃত বাচ্চার লাশ ছেড়ে কোথাও গেল না। সে অনবরত তার মৃত বাচ্চাকে ডাকতে লাগল। এই বুঝি বাচ্চাটা বেঁচে উঠবে। সারমেয়টি মন থেকে মেনে নিতেই চাইল না যে তার বাচ্চাটি মারা গেছে। সে ভাবছে, তার বাচ্চা ঘুমিয়ে আছে। লাশের গন্ধ পেয়ে একসময় কোথা থেকে একটা কাক উড়ে এল। কালো কুচকুচে বড়সড় কাক। কাকটি মৃত কুকুরের বাচ্চাটির নাড়িভুঁড়ি খাওয়ার চেষ্টা করল। তাতে মা সারমেয়টি আরো ঘেউ ঘেউ করে উঠল। এমন করে দাঁত-মুখ ভেংচাল যেন দুষ্টু কাককে খপ করে গিলে খেয়ে নেবে। কুকুর আর কাকের সে লড়াই দূর থেকে দেখল নিয়াজের ছেলে-মেয়েরা। ছোট দুটোর বেশ আনন্দ হলো। যেন তারা একটা নতুন খেলা দেখছে। কিন্তু বড় মেয়ে নাজনিনের চোখ ছলছল করে উঠল। সে ঠাহর করল, কুকুরটা কত ভালো ! তার বাচ্চাটা মরে গেছে তবুও আগলে রেখেছে ! আর তাদের মা, তাদেরকে ফেলে রেখে কোথাও কারও সঙ্গে পালিয়ে গেছে ! এক সময় নাজনিনের গাল বেয়ে অশ্রু নামল। কানে এল, আদুর বউ আশমিনা কাকে যেন বলছে, নিয়াজ আবার বিয়ে করেছে। নতুন বউয়ের বাপের বাড়ি শিমুলপুর। আজই নতুন বউ বাড়িতে আসবে। নাজনিন ফুঁপিয়ে উঠল। কষ্টে তার ভিতরটা ফেটে যাচ্ছে। তার বাপের মনে তাদের জন্য যে সামান্যটুকু জায়গা ছিল সেটুকুও আর থাকবে না। তাদের সৎমা আসছে ! ওদিকে অনেকক্ষণ চেষ্টা করে যখন আর পারল না তখন কাকটি রণে ভঙ্গ দিল। উড়ে বিলের দিকে চলে গেল। নাজনিন ভেজা চোখের ঝাপসা দৃষ্টিতে কাকটির সে উড়ে যাওয়া দেখল। কাকটি উড়তে উড়তে আকাশের নীল সীমানায় হারিয়ে গেল। নাজনিন ভাবল, ওই দূর আকাশের নীল সীমানার নীচে কোথাও কোনো দেশে কোনো শহরে কিংবা কোনো গঞ্জে তার মা আজমিরা বিবি আছে। নাজনিন চিৎকার করে একটি কথা বলল। কিন্তু সে কথা তার মুখ দিয়ে শব্দ হয়ে বের হলো না। বুকের ভিতর থেকে নিঃশব্দে বের হয়ে বাতাসে মিশে আউরিবাউরি হয়ে দূরে কাকটির কানে পৌঁছল। কাকটি শুনল, নাজনিন বলছে, ‘ও কাকভাইয়া, আমার মাকে বলো, আমাদের বাড়ির পিছনে, পাটকাঠির পালার নীচে কুকুরের যে বাচ্চাগুলো ছিল সেগুলো সব মরে গেছে ।‘ হঠাৎ পিঠে কারও একটা হাতের স্পর্শ পেল নাজনিন ! ঘুরে তাকাল। ছলছল চোখে দেখল, বৃষ্টির মা আশমিনা ! নাজনিন দেখল, বৃষ্টির মায়ের চোখেও জল ! নাজনিন যখন আকাশের দিগন্তে উড়ে যাওয়া কাকটির দিকে তাকাল তখন সে কানে শুনল, বৃষ্টির মা আশমিনা তাকে বলছে, “তোদের যখন খিদে লাগবে আমার কাছে চলে আসবি।’
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
❤ Support Us








