- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- আগস্ট ৩১, ২০২৫
ময়নাগড়ের ময়নাতদন্ত
এবছর (২০২৫) দু’বার এলাম ময়না-য়। প্রাক্তন ক্রিকেটার অশোক দিন্ডার বিধানসভা। একবার আসি উত্তর চংরাচকে নেতাজির জন্মজয়ন্তী এবং তিন দিনের বার্ষিক ক্রিড়াপ্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উদ্বোধন উপলক্ষে, দ্বিতীয়বার আসি অগস্টের প্রথমে দক্ষিণ চংরাচকে স্মরণসভা অনুষ্ঠানে । দুটো ভিন্ন জায়গার বাসস্টপ কিন্তু একই: অন্নপূর্ণা মোড়। পেরিয়ে আসতে হয় একদা রাজা লাউসেনের গড় এবং প্রাচীন রাজধানী ছাড়িয়ে। অন্নপূর্ণা মোড়ের উত্তরে উত্তর চংরাচক বিবেকানন্দ সংঘের অনুষ্ঠান পথপ্রদর্শক শিল্পপতি রতন টাটা স্মৃতি পল্লী পুলিনবিহারী স্মৃতি মঞ্চে। এখানকার যুবকগণ খুবই শ্রদ্ধার চোখে দেখেন রতন টাটার শিল্পবোধ ও সমাজমনস্কতাকে। তিন দিনের বিরাট আয়োজন অথচ কী আন্তরিক এবং কোলাহলহীন বিশ্বজিৎ মালের উদ্যোগে। উদ্বোধন এবং খাওয়া দাওয়ার পরই কথামতো আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় পূর্ব মেদিনীপুর সীমান্তে বলাইপন্ডায় চন্ডিয়া নদীর ধারে। যে ব্রিজে দাঁড়িয়ে দেখছি সেটা পেরোলে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সবং অঞ্চল। নদীতে জল নেই, নদীচর ভরে আছে নানা শাক সব্জির চাষে। চন্ডিয়া নদীর উৎস এই জেলারই পূর্ব চিল্কার একটি জলাশয় থেকে। মিলিত হয়েছে দক্ষিণে কেলেঘাই নদীতে। এমনিতে চন্ডীয়া খুবই নিরীহ কিন্তু ভরাবর্ষায় তাকে পায় কে?
পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় অনেক জায়গায় এখন চিনে বাদাম চাষ হয়। অগাস্টের জলে ভেজা মায়াবী আবহাওয়ায় মেচেদার সকালের হাট থেকে এক কেজি ঝকঝকে কাঁচা বাদাম কিনে তমলুক কোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর উত্তরসখার বেরার নতুন গাড়িতে তাঁর বোন শুচিস্মিতা এবং আমার ভায়রা যার মাধ্যমে তিমিরবাবুর সঙ্গে আমার যোগাযোগ সেই অপূর্বসহ ঠিক সময়ে পৌঁছে যাই দক্ষিণ চংরাচকে সদ্য প্রয়াত তিমির বরণ বেরার স্মরণ সভায়। তখন তাঁর গ্রামের বাড়িতে জোর কদমে শুরু হয়ে গেছে শ্রাদ্ধ উপলক্ষে দুপুরের ভোজন পর্ব। ভোজনের সব কিছুই স্থানীয় কাঁচা মাল। সুতরাং খাবার দাবারের স্বাদ যে অকৃত্রিম হবে সেটা স্বাভাবিক। ‘কব্জি ডুবিয়ে’ শব্দ মানায় না শ্রাদ্ধ বাসরে তবু লক্ষ্য করি অনেকে সেভাবেই তৃপ্তি ভরে খেয়ে আনন্দ পেলেন আর হবে নাই বা কেন? আজীবন তিমিরবাবু সবাইকে তো আনন্দ দিয়েই গেছেন, পাশে থেকেছেন। উত্তর চংরাচক বিবেকানন্দ সংঘের মাঠেও দেখেছি পাড়ার সবাই নিমন্ত্রিত দুপুরের ভোজনে। জেলার অনেক জায়গায় একসঙ্গে খাওয়া দাওয়ার পাঠ উঠে গেলেও ময়না অঞ্চলে বজায় আছে। ইংরেজির অধ্যাপক এবং লেখক হীরক বেরার বাড়িতে খানিক বিশ্রাম। বিশ্রাম কি নেওয়া যায়? আছড়ে পড়ছে স্মৃতিকথা এবং গল্পের ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ। বেরা পাড়ায় প্রায় সবাই উচ্চ শিক্ষিত এবং মননে আধুনিক। পাড়ায় ডাক্তারের ছড়াছড়ি। এবারের নিট পরীক্ষায়ও সুযোগ পেল হীরকবাবুর নাতনি। অনেকেই ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক, শিক্ষক, এবং সরকারি অফিসার । চংরাচক হাইস্কুল, সুকান্ত হাইস্কুল, পূর্ব চিল্কা ইত্যাদি নামের স্কুলগুলিতে শিক্ষা দেওয়ার মান খুবই উন্নত। মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিকের শেষ পরীক্ষায় ফলও হয় তেমনি অতি চমৎকার । চংরাচক সুকান্ত হাইস্কুলের শিক্ষক ছিলেন সদ্য প্রয়াত তিমিরবাবু। ছাত্রবৎসল অত্যন্ত দরদী ও অভিজ্ঞ শিক্ষক। ৬৯ বছর বয়সী তিমিরবাবু বরাবরই ছিলেন উদ্যোগী ও উদ্যোমী মানুষ। অবসর নিয়েও ছাত্র পড়িয়েছেন,গাইড করেছেন। স্মরণ সভার প্রারম্ভে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানান তাঁর গানের ক্লাসের ছাত্র গুরুকে নিয়ে লেখা গানে । প্রারম্ভিক বক্তব্যে পারিবারিক বিষয়টা তুলে ধরেছি: আশা করা যায় তাঁর সুযোগ্য সহধর্মিণী কখনোই একা হয়ে যাবেন না। তাঁদের দুই উচ্চ শিক্ষিত ছেলে ভিনরাজ্যে চাকুরিরত হলেও রুচিবান দুই রাঙা টুটটুকে বউমা চাকরি করে এই রাজ্যের হলদিয়া এবং কলকাতায়। অনেকেই তিমিরবাবুর অশেষ গুণাবলির বর্ণনা দিয়ে স্মৃতি রক্ষার নানা প্রস্তাব দেন। সা-রে-গা-মা-পা, আকাশ এইট ইত্যাদি চ্যানেলে সুযোগ পাওয়া তরুণ গায়ক এবং আলিপুর কোর্টের আইনজীবী উৎসব বেরার গাওয়া একটি মর্মস্পর্শী গান শোনানো হয় রের্কডে। ইদানিং তমলুকে তিমিরবাবুর কাছের মানুষ অপূর্ব মাইতি পড়লেন মেয়ের লেখা চিঠি কতোটা স্নেহ ভালোবাসা পেয়েছে তিমির জ্যেঠুর কাছে। দুই ছেলে বলল বাবার কথা। বিকেল পৌনে তিনটেতে শুরু হয়ে রাত পৌঁনে আটটায় কোনোওরকমে সমাপ্তি ঘোষণা হয় স্মরণ সভার। অনেকেরই চোখের জল বাঁধা মানেনি। এতো বিপুল সংখ্যায় এসেছিলেন তিমিরবাবুর গুণমুগ্ধরা যে মাঠ পেরিয়ে রাস্তায় ঢল নামে তাঁদের। বহু গুণের সমাবেশ ঘটেছিল তাঁর মধ্যে। কবি ও লেখক সত্তার সঙ্গে তিনি ছিলেন খেলোয়াড়, গায়ক, নাট্যকার, যাত্রাপ্রেমী, সমাজসেবক, সংস্কৃতিপ্রেমী, সংগঠক, সম্পাদক, প্রকাশক এবং কী নন তবে দাদা তুহিন বেরা বাম বিধায়ক থাকা সত্ত্বেও তিনি সরাসরি রাজনীতি করেননি। তাঁর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা তাঁর সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা ‘বোধন লগ্ন-এ লেখা প্রকাশের মাধ্যমে। হতে পারে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের বিখ্যাত কবিতা ‘বোধন’ থেকে নেওয়া কিন্তু বাধ সাজে রেজিষ্ট্রেশন করতে গিয়ে। তখন যোগ হয় ‘লগ্ন’। লগ্নই বটে। কি কবিতা গল্প প্রবন্ধ নিবন্ধ, কথকতা বা ভ্রমণ সবর্দা তিমিরবাবু আঞ্চলিক ভাষায় লিখে গেছেন যা পত্রিকার অমূল্য সম্পদ হয় রইল। সমরেশ দাস, জটায়ুসহ অনেককেই আঞ্চলিক বিষয়ে লিখতে উদ্বুদ্ধ করে গেছেন যা-র প্রতি আমার আগ্রহ বরাবর। যখনই বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন সুকান্ত বিদ্যাপীঠে বা তমলুকের কোনও হলে আমাকে আসতে হয়েছে তিমিরবাবুর আন্তরিক ডাকে। একবার তমলুকে গানের একটি অনুষ্ঠানে হাজির করিয়েছিলেন স্বর্ণালী কাঞ্জিলাল, তমলুকের প্রখ্যাত মৃৎশিল্পী ও চিত্রশিল্পী,কবি ও ছড়াকারের সঙ্গে আমাকেও, সংবর্ধনা দেবেন । চংরাচকের সুকান্ত বিদাপীঠেও একবার আয়োজন করেছিলেন বিশাল সাহিত্য বাসর, গ্রন্থ প্রকাশ এবং সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান। গত দোল পূর্ণিমায় গ্রামের বাড়ির উঠোনে হয়ে গেল নিজের লেখা নাটকের অভিনয় এবং দোল উৎসব। বিশ্বের যে যেখানে আছেন বংশের, হাজির করিয়েছিলেন। ধুমধাম সহকারে উদযাপন করে মহাআনন্দে কেটে যায় কয়েকদিন। তারপরই আসে সেই খারাপ খবরটি: দুরারোধ্য কর্কট রোগ। তাঁর প্রাণাধিক বিষয় ‘বোধন লগ্ন’ পত্রিকার ৩৯ তম সংখ্যা প্রস্তুতি পর্বের ঠিক আগেই সকলকে কাঁদিয়ে ভাসিয়ে চলে গেলেন। তাঁর আর একটি বড় উদ্যোগ করোনাকালে আন্তর্জালে (অন লাইনে) ‘বোধন লগ্ন’ পূজাবার্ষিকীর জমজমাট উদ্বোধন পর্ব। স্থানীয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলা, বাংলাদেশ এবং আমেরিকায় থাকা লেখককুলকেও একসঙ্গে সামিল করে উদ্বোধনী গান, নাচ, কবিতা পাঠ, লেখার নেপথ্যকথা, স্মৃতিকথা, বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য রাখা, লেখার মান ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা শুরু করেন এবং এই পদ্ধতি চালিয়ে যান গতবছর পর্যন্ত। নিজের পত্রিকার মাধ্যমে তিনি বেশ কয়েকজন গল্পকার এবং প্রবন্ধকার তুলে আনেন যেমন অনুপম খালুয়া, অনিন্দিতা ভৌমিক, রবীন্দ্রনাথ বেরা, সুবলচন্দ্র পাল প্রমুখ । পত্রিকার সম্পাদকীয় কলমও ছিল মূল্যবান। যেমন গতবছরের কলমে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় প্রতিবাদ করেছেন রাশিয়া -ইউক্রেন যুদ্ধ, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন, মণিপুর রাজ্যে হিংসা, আরজিকর হাসপাতালে অভয়াকান্ড ইত্যাদি নিয়ে।
ময়নার মাঝপথে আছে লাউসেনের সম্মানার্থে তোরণ। মধ্যযুগে ময়নাগড়ের রাজা ছিলেন লাউসেন। তাঁর রাজ্য ছিল বীরভূম থেকে দক্ষিণে ময়নাগড়। তাঁর উপাস্য দেবতা ছিলেন ধর্মঠাকুর। অন্যান্য ধর্মমঙ্গলের প্রধান চরিত্র যেখানে দেবী তখন ঘনরাম চক্রবর্তীর এই ধর্মমঙ্গলের প্রধান চরিত্র পুরুষ ধর্মদেবতা। যখনই বিপদে পড়েছেন রাজা, রক্ষা করেছেন এই ধর্মঠাকুর। কথিত আছে লাউসেনের স্বর্গলাভ হওয়ার পর ছেলে চিত্রসেন সিংহাসনে বসেন। এই রাজবংশের পর ময়নাগড় এবং পাশ্ববর্তী সবং-পিংলা দুটি পরগণা হিসেবে চলে যায় উৎকল রাজার অধীনে। ১৪০৩ খৃষ্টাব্দে কপিলেন্দ্রদেব যখন উৎকলরাজ তাঁর এক সেনাপতি কালিন্দীরাম সবং-এর বালিসীতাগড়ে একটি দুর্গ নির্মাণ করে নিজেকে স্বাধীন রাজা বলে ঘোষণা করেন। এই বংশের রাজা যখন গোবর্ধন উৎকলরাজ তাঁকে পরাস্ত করে নিয়ে যান উড়িষ্যার কারাগারে। কিন্তু উড়িষ্যা গোবর্ধনের দেবোপম চেহারা, তাঁর অসাধারণ সঙ্গীতপ্রতিভা এবং মল্লযোদ্ধার পরিচয় পেয়ে বন্ধুসুলভ মনোভাবে মুক্তি দেন। সঙ্গে দেন সিংহাসনসহ নানা উপহার এবং তিনটি উপাধি: রাজা, আনন্দ এবং বাহুবলীন্দ্র।বাহুবলীন্দ্র মানে ইন্দ্রের ন্যায় বাহুবলশালী। সেই বংশের উত্তরসুরিরা এখনো বাহুবলীন্দ্র পদবি ব্যবহার করে থাকেন। পরে ময়নাগড়কে দুটি পরিখা কেটে সুরক্ষা দেওয়া হয়। গড়ের কাছেই যে বাজার সেখানে কার্তিক পূর্ণিনায় বসে পক্ষকালব্যাপী রাস উৎসব। খ্যাতিলাভ করেছে মেলার বিশাল আকারের কদমা। তখন নৌকোবিহার করা যায় পরিখার জলে এবং দেখা যায় রাজবাড়ি। সত্যজিৎ রায় দেখে গেছেন ময়নাগড় রাজবাড়ি এবং আগন্তুক সিনেমায় এনেছেন রাজবাড়ির তৈরি গয়নাবড়ির কথা। তমলুকের বিখ্যাত গয়নার বড়ি এই ময়নাগড় রাজবাড়ি থেকেই বিস্তার পেয়েছে।
সঙ্গীতবিশারদ রাজা গোবর্ধনের সময় থেকেই ময়নায় গড়ে ওঠে নানা সঙ্গীত বিদ্যালয়। ময়নার সঙ্গীত চর্চায় যোগ হয় মহিষাদল রাজবাড়ির গর্গ রাজারা,পচেটগড়ের রাজা, বিষ্ণুপুর ঘরাণা। বিভিন্ন অংশে গড়ে ওঠে ‘গোপেশ্বর সঙ্গীত বিদ্যালয়’, ‘তানসেন সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়’, ‘জয়ন্তী সুরস্বর্গ সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়’, ‘সা-রে-গা-মা সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়’, ‘কৃষ্ণা সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়’, ‘রাগাশ্রয়ী সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়’ ইত্যাদি। এখানকার অতুল ভৌমিক আকাশবাণী কলকাতার স্বীকৃত গীতিকার ১৯৭৮ সাল থেকে। তাঁর লেখা গান গেয়েছেন সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, সনৎ সিংহ,পিন্টু ভট্টাচার্য, অসীমা মুখোপাধ্যায়, সুপ্রকাশ চাকী, ইন্দ্রানী সেন, শিবাজী চট্টোপাধ্যায়, খেয়া চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ স্বনামধন্য শিল্পীগণ।
ময়নার জমিদারগণ ছিলেন দে, নন্দী,দাস, মাইতি, মহাপাত্র,বাহুবলীন্দ্র ইত্যাদি পদবিধারীগণ। ১৯৫৫ সাল থেকে চলে গেছে জমিদারী। ৬৬ ডেসিমেলে এখানে এক বিঘা জমি। বর্তমানে চাষের জমি কমে গেছে ব্যাপকভাবে কারণ বিঘের পর বিঘে জমিতে বারমাস জল দাঁড় করিয়ে রেখে হচ্ছে উন্নত প্রথায় মাছ চাষ। এতে নাকি ধান চাষের থেকে অনেক বেশি লাভ পাওয়া যায়। ময়নার ভেতরে বেশ কিছু উড়াল পুল তৈরি হওয়ার ফলে যাতায়াত এবং ব্যবসাবানিজ্য অনেক সহজ হয়ে গেছে জেলা সদর তমলুক এবং রেল স্টেশনের কাছের জায়গায়।
❤ Support Us








