Advertisement
  • গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
  • অক্টোবর ১২, ২০২৫

সুধাময়ের সুখ

নিতাই ভট্টাচার্য
সুধাময়ের সুখ

অলঙ্করণ : দেব সরকার

 
সবে তন্দ্রাটুকু এসেছিল। কিসের একটা শব্দ কানে আসে। ঘুম ভেঙে যায় মলয়ের। উঠে বসে বিছানায়। মোবাইলে সময় দেখে। রাত একটা দশ, খানিক আগেই সুধাময়কে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে এসে শুয়েছে সে। আবারও খুটখাট শব্দে শুনতে পায়। ঘর থেকে ড্রয়িং-এ আসে তাড়াতাড়ি। আবছা অন্ধকারে কে যেন বসে রয়েছে সোফায়। ভয় পায়, আলো জ্বালে মলয়। দেখে সুধাময় ! খালি গা, বসে রয়েছে সোফায় ! বড়ো একটা শ্বাস ছাড়ে মলয় । বুকটা ধকধক করছে। বাবা এই দূরত্বটুকু নিজের টাল নিজে সামলে এলো কি ভাবে ! ক্যাথিটার স্যাকের ক্যাপ খুলে গেছে মেঝের সঙ্গে ঘষা খেয়ে । গোটা ডাইনিং ড্রয়িংরুম ভাসছে প্রস্রাবে । সেদিকে কোনো হুস নেই তাঁর, দিব্যি বসে রয়েছে সামনের দরজার দিকে চেয়ে, যেনো এখুনি কোথাও যাবে । উনি কোনো ভাবে মেঝেতে পড়ে গেলে ভীষন বড় বিপদ হতে পারত । কথাটা ভাবতেই মাথাটা এক চক্কর ঘুরে যায় মলয়ের, দেওয়ালে ঠেস দিয়ে সামলে নেয় নিজেকে। বোধহীন দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে থাকে বাবার দিকে বেশ কিছুক্ষণ। ভীষন অসহায় মনে হয় নিজেকে। নীরবতা ভাঙ্গে সুধাময় নিজে। এইরে, তুই এখানে কোথা থেকে এলি ?– মলয়কে দেখে জিজ্ঞাসা করে সুধাময় । মুখে পরিচিত হাসি ।
 
তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে এলাম যে । ঘুমাও নি ! এখানে নিজে এসে বসেছো ? মা কোথায় ? – একরাশ বিস্ময় নিয়ে কোনো রকমে কথাগুলো বলে মলয়।
 
মাকে এখানে কোথায় পাবি ? সে তো কবে থেকেই কল্যানীতে তোর বাড়িতে রয়েছে । গ্রামে তো আমি একাই থাকি । তুই সব ভুলে যাচ্ছিস নাকি ।– বলে সুধাময় ।
 
মলয় দেখতে থাকে বাবাকে । বুকটা হুহু করে ওঠে মানুষটাকে দেখে । কি কর্মঠ মানুষ ছিল সুধাময় । অফিস, বাড়ির কাজ, দোকান, বাজার, রেশন, গৃহদেবীর পুজো সব একা হাতে সামলাত । মলয় সাহায্য করতে চাইলে সুধাময় বলতো, তুই তোর শিক্ষকতায় মন দে খোকা । দাদুভাইকে মানুষ কর । বউমার অফিস থাকে । তোরা সবাই বাইরে থাকিস আমার চিন্তা হয় । আমাকে নিয়ে ভাবিস না । আমি একাই একশ । মা বলতো তোদের বাবা রেসের ঘোড়া । থামতে শেখেনি জীবনে । ছুটেই চলে শুধু ।
 

মাস পাঁচেক অসুস্থতা নিয়ে কল্যাণীতে ছেলের ফ্ল্যাটে রয়েছে সুধাময় । তারপর থেকে দিনে দিনে হাজার রোগ পেয়ে বসেছে । বেশ কয়েক দিন হলো স্থানকাল পাত্রের বোধ হারিয়েছে । ভাবে গ্রামের বাড়িতেই রয়েছে আজও । দিন রাতের তফাৎ বোঝে না ইদানিং । দিনেরবেলায় বলে ঘরের আলো সব অফ করে দে খোকা, অনেক রাত হলো ।

 
সত্যিই তাই । জ্ঞান হওয়া থেকে কয়েক মাস আগে পর্যন্ত বাবাকে একই রকম দেখে এসেছে মলয়। সমস্ত কাজ একাই করত। আর নিজে যেটা ঠিক বলে ভেবেছে সেটাই করেছে। গুরুদেব আর গৃহদেবীর চরণ ছাড়া কোথাও কোনোদিন মাথা নিচু করেনি। সংসারের দারিদ্রতার সঙ্গে চোখে চোখ রেখে পাঞ্জা লড়ে স্ত্রী ছেলে মেয়েদের নিয়ে সামনে এগিয়েছে সুধাময় । ভয় পায়নি কোনোদিন । ওই সামান্য টাকা বেতন । কি করে সংসার চলতো এখন ভাবলে অবাক হয় মলয় । তিন দিদি, মলয়, প্রতিমা আর সুধাময় নিজে। সংসারে ছয় ছয়টা মানুষ । তাদের পেট ভরানো । ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া শেখানো। খরচ কি কম ! এখানেই শেষ নয় । তিন মেয়ের ভালো ঘরে বিয়ে দেওয়া। সব কিছুই করেছে সুধাময় একা । আত্মীয়দের কাছে কখন কোনো সাহায্য পায়নি । তারপর জ্ঞাতি বিরোধ ছিল । নিজের ভাইদের সঙ্গে তীব্র কলহ। সম্পর্কের তিক্ততা । কোনো কিছুই থামাতে পারেনি মানুষটাকে। প্রতিমা বলতো গুরুদেব আর মাকালীর আশীর্বাদ আছে তাই সব বিপদ পেরিয়ে এসেছে তোর বাবা। ছেলেবেলা থেকেই বাবাকে বড্ড ভরসা করত মলয়। চাকরি পাবার পর বাড়ি থেকে রোজ রোজ স্কুল যাতায়াত অসম্ভব হয়ে পড়ে। পড়াশোনা করবার সময় পেতো না। ছেলে আর স্ত্রীকে নিয়ে যখন কল্যানী চলে আসবে বলে ভেবে ছিল মলয়, মা রাজি ছিল না। সংসার দু টুকরো হতে চলেছে ভেবে কান্নাকাটি করত রোজ। শেষে সিদ্ধান্ত বদলের কথা ভেবে ছিল মলয় । সেই দিনও মলয়ের পাশে ছিল সুধাময়। তোর কষ্ট, বউমার অফিস যেতে সাত সকালে রওনা দিতে হয়। দাদুভাইকে মানুষের মত মানুষ করতে হবে। দিনকাল বদলেছে। এই গ্রামে থেকে কিছু হবে না খোকা। তুই বরং কল্যানীতেই থাক। আমি তো আছি এখানে, কোনো চিন্তা নেই । সেই ‘আমি তো আছি ‘ বলা মানুষটা কেমন হঠাৎ করে হারিয়ে গেলো মলয়ের চোখের সামনে ।
 

শরীরের সমস্ত স্নায়ু শিথিল হয়ে আসবে । ধীরে ধীরে ফুরিয়ে যাবে সুধাময় । হায় ভগবান ! ইদানিং নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হয় মলয়ের । অবশ্য মার সামনে নিজেকে সামলে রাখে, যাতে ওর মনে চাপ না পড়ে । রিনো দাদুর রোগের ব্যাপারে সব জানে

 
আজ মাস পাঁচেক অসুস্থতা নিয়ে কল্যাণীতে ছেলের ফ্ল্যাটে রয়েছে সুধাময় । তারপর থেকে দিনে দিনে হাজার রোগ পেয়ে বসেছে । বেশ কয়েক দিন হলো স্থানকাল পাত্রের বোধ হারিয়েছে । ভাবে গ্রামের বাড়িতেই রয়েছে আজও । দিন রাতের তফাৎ বোঝে না ইদানিং । দিনেরবেলায় বলে ঘরের আলো সব অফ করে দে খোকা, অনেক রাত হলো । তোর মা ঘুমাবে । তোরাও সব শুয়ে পড় । কখনো বলে, খোকা আমাকে একটা ব্যাগ দে তো বাজার নিয়ে আসি । আবার কখনো রাতের বেলায় বলে তোর সাইকেলটা ঠিক আছে খোকা আমি একবার ব্যাংকে যাবো । স্বামীর মুখে এইসব কথা শুনে ভীষন বিরক্ত হয় প্রতিমা । বলে, হ্যাঁ তুমি ব্যাংকে যাও । ম্যানেজার কাউন্টার খুলে বসে রয়েছে তোমার জন্য । মলয় মাকে নানা কথায় বোঝানোর চেষ্টা করে । প্রতিমা বলে, সারাদিন সব সময় ওই সব শুনছি । আর কত ভালো লাগে বলতো খোকা । পই পই করে বলি তুমি কল্যানীতে রয়েছ, গ্রামে নয় । এই শোনে আবার এই ভুলে যায় । আড়ালে মলয়ের চোখে জল আসে বাবার কথা ভেবে । সুধাময় কি সুস্থ হবে না কোনোদিন ? জিজ্ঞাসা করেছিল ডাক্তারবাবুকে ।
 
ডাক্তারবাবুর বলেছিল, এ এক দুরারোগ্য ব্যাধি । শরীরের সমস্ত স্নায়ু শিথিল হয়ে আসবে । ধীরে ধীরে ফুরিয়ে যাবে সুধাময় । হায় ভগবান ! ইদানিং নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হয় মলয়ের । অবশ্য মার সামনে নিজেকে সামলে রাখে, যাতে ওর মনে চাপ না পড়ে । রিনো দাদুর রোগের ব্যাপারে সব জানে । মলয়-ই বলেছে । সব দেখে শুনে মাঝে মাঝে রিনো বলে, অত টেনসন করো না বাবা । আমাদের হাতে তো কিছুই নেই বলো । ঈশ্বরের উপর ভরসা রেখে একটা একটা করে দিন চলে যেতে দাও । যা হবার সে তো হবেই । ছেলের মুখে এমন দার্শনিক কথা শুনে অবাক হয় মলয় । এক্কেবারে সুধাময়ের মত হয়েছে রিনো । বাস্তবকে কত সহজে মেনে নিতে শিখেছে এই বয়সে । সত্যিই অন্য রকম ছেলে । ছেলের কথা ভেবে আনন্দ হয় মলয়ের । সামনেই ক্লাস টুয়েলভের বোর্ডের পরীক্ষা । পড়াশোনা সামলে সুধাময়ের খেয়াল রাখে রিনো । এই বয়সে বেশ চাপ নিতে পারে ।
 
সুধাময়ের এমন অবস্থা দেখে এক অদ্ভুত ব্যবস্থা করেছে রিনো । বেশ কয়েকটি কাগজের টুকরোতে বড়ো বড়ো হরফে ‘কল্যানী’ লিখে সুধাময়ের বিছানার চারপাশের দেওয়ালে আটকে দিয়েছে । যাতে যেদিকেই নজর যায় লেখাটা চোখে পড়ে । ভুলে-যাওয়া কথা বারবার দাদুর কানের পাশে বলে রিনো । নাতির কাণ্ড দেখে হাসে সুধাময় । বলে, তুই কি আমাকে বাচ্চা পেয়েছিস দাদুভাই ! আমার কি বোধ বুদ্ধি নেই ! প্রতিমা পাশে বসে বলে, হায় ভগবান কার মুখে কি কথা শুনি । রিনো ঠাকুমাকে বলে, দাদুর সামনে অমন কথা বলো না । সব ঠিক হবে একদিন । নাতির কথা শুনে মাথা নামিয়ে দুই চোখ বন্ধ করে বসে থাকে প্রতিমা, ভোঁতা হয়ে আসা ঈশ্বর বিশ্বাসে ভরসা রাখতে চায় আবার ।
 
সেদিন রাতের বেলায় ওই দেওয়াল লিখনগুলো দেখিয়ে সুধাময় বলে, হ্যাঁগো এই সব লিখে দেওয়াল গুলো নষ্ট করলো কে বলতো । এই তো কয়দিন আগে মহাদেব মিস্ত্রি এসে রং করে দিয়ে গেলো । আবার রং মিস্ত্রি ডাকতে হবে । ইস, আমার বাড়িটাকে সবাই মিলে নষ্ট করে দেবে । প্রতিমা বলে, তুমি সারা রাত ওইসব ভাবো । আমাকে ঘুমাতে দাও । স্ত্রীর কথা শুনে রেগে ওঠে সুধাময় । তোমার কেবল ঘুম আর ঘুম । এই দিন দুপুরে ঘুমাবে, যত্তসব । বেশ তুমি জেগে থাকো । সারা রাত নিজের মনে বকর বকর করো কোনো অসুবিধা নেই । আমাকে দয়া করে ঘুমাতে দাও। বলে প্রতিমা ।
 
ইদানিং ঘুম নেই সুধাময়ের চোখে । সারা রাত জেগে থাকে । নিজের মনে অসংলগ্ন কথা বলে । কিছুদিন আগে লিভারের ইনফেকশন হয়েছিল, নার্সিংহোমে ভর্তি ছিল সুধাময় । যে কয়দিন ছিল সেখানে রাতের বেলায় ভীষন উৎপাত করেছে নার্সদের । মলয় বাবাকে দেখতে যেত । দুই একজন নার্স জিজ্ঞাসা করত, আচ্ছা আপনার বাবার বড়ো মা, ছোটো মা, বাড়ির মা এরা কারা ? সারা রাত শুধু মায়েদের কাছে যেতে চেয়ে ব্যস্ত করে তোলেন সকলকে।
 
বাড়িতেও সেই এক অবস্থা । রোজ রাতে সুধাময় প্রতিমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে বলে, চলো বড়ো মাকালীর চাতাল থেকে ঘুরে আসি । বিরক্ত হয় প্রতিমা । সেদিন থাকতে না পেরে মলয়কে ঘুম থেকে তুলে আনে । কাঁদতে কাঁদতে বলে, আমি অসুস্থ হয়ে পড়ছি খোকা । কিছু একটা কর যাতে আমি একটু ঘুমাতে পারি । তোর বাবা…। প্রতিমার সারা দিনের পরিশ্রম । টুকটাক সংসারের কাজ । তারপর সুধাময়কে দেখা শোনা করা । এরপর রাতেও যদি ঘুমাতে না পায় কার মেজাজ ঠিক থাকে ! মাঝে মধ্যেই প্রতিমা মালয়কে বলে, আমাকে ঘুমের ওষুধ দে খোকা । তোর বাবা সারা রাত যা ইচ্ছে যায় করুক । কয়দিন ধরে মাকে ঘুমের ওষুধ দেয় মলয় । ঘণ্টা খানেক গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে । ওদিকে সুধাময় বকেই চলে নিজের সঙ্গে । বাবার এমন অবস্থার কথা ডাক্তারকে জানিয়েছিল মলয় ।
 
দেখুন ওনার যা ওষুধ চলছে এরপর ঘুমের ওষুধ দেওয়া রিস্ক হয়ে যাবে । অন্য ভাবে ম্যানেজ করুন ।- ডাক্তার বাবুর পরামর্শ ।
 
তারপর থেকে রোজ রাতে সুধাময়ের গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বাবাকে ঘুম পাড়ায় মলয় । রাতে বেশ কয়েক বার এঘরে এসে দেখে যায় সুধাময়কে । আজও খানিক আগেই উঠে এসেছে বাবার কাছ থেকে আর তারপরেই…।
 
তুমি এখানে বসে থেকে কি করবে ? চলো বিছানায় শোবে চল ।- সুধাময়কে ধরে ঘরে নিয়ে যেতে চায় মলয় ।
 
হো হো করে হেসে ওঠে সুধাময় । বলে, তুই বলিস ভালো । বিছানা কোথায় পাবি এখানে ? দেখছিস না বেহুলা নদীর ওপারে যাবো বলে বসে আছি । ছোটো মা কালীর মন্দিরে যাবো । রাস্তায়…।
 
মলয়ের গ্রামের মধ্যিখান দিয়ে বয়ে গেছে বেহুলা নদী । সরু বাঁশের সাঁকোর উপর দিয়ে মানুষ জনের পারাপার চলে । নদীর ওপারে ছোট মা কালীর মন্দির । যখন সুস্থ ছিল সুধাময় মাঝে মধ্যে প্রণাম করতে যেত মায়ের মন্দিরে । মলয়ের ফ্ল্যাটে বসে এই মুহূর্তে সুধাময় নদীর ওপারে যেতে চায় ! নড়বড়ে সরু বাঁশের সেতু, একা পাড় হতে পারবে না তাই কেউ যদি হাত ধরে পাড় করে দেয় সেই আশায় বসে রয়েছে সুধাময় ।
 
চলো বাবা, শোবে চল । তুমি তো এখন কল্যানীতে রয়েছ । বলে মলয় ।
 
চুপ থাকে সুধাময় । কি যেনো ভাবে । বলে, বেশ তাই চল । তুইও কিন্তু ওদের মত আমাকে মা কালীর সামনে যেতে দিবি না মনে হচ্ছে । এটা কি ভালো হচ্ছে খোকা । আমি পুজো করবো না !
 
গৃহদেবীর সেবায় অক্লান্ত ছিল সুধাময় । রোজ ভোরে উঠে গৃহদেবীর পুজো করে অফিস যেত । আবার সন্ধেয় বাড়ি ফিরে আরতি করত । প্রত্যেক অমাবস্যায় মা কালীর সামনে পরিবারের সবার মঙ্গল কামনায় হোম করত । অফিস আর ঠাকুর ঘর, এই ছিল সুধাময়ের পৃথিবী । এর বাইরে কখনও কোথাও যেতে দেখেনি বাবাকে । গৃহদেবী যেনো শুধু সুধাময়ের হাতেই সেবা নেবেন, ভাবনা এমনই ছিল মানুষটার । সুধাময়ের ঈশ্বর ভক্তি, পুজোর নিষ্টার কথা গ্রামের সবাই বলতো । সেই পুজো করা নিয়েও অপমানিতও হয়েছে সুধাময়, নিজের ভাইদের কাছেই । আসলে পারিবারিক অশান্তির জের । যন্ত্রণা বুকে চেপে রেখে বলেছিল সুধাময় । তারপর থেকে বেশ কিছুদিন গুমরে ছিল মনে মনে ।
 
বাবাকে ধরে ঘরের দিকে নিয়ে চলে মলয় । নিচের দিকে তাকাও । সাবধানে পা ফেলো নয়তো…, বলে মলয় ।
 
এই রে ! এত জল এলো কোথা থেকে ? দেখ দেখ খোকা বৃষ্টি হয়ে গেছে রে । সুধাময়ের প্রস্রাবে ভাসছে ড্রয়িং ডাইনিং এর মেঝে । তাই দেখে সুধাময়ের মনে হয়েছে বৃষ্টি হয়ে গেছে ।
 
তুই ছাতা এনেছিস খোকা ? মেঘটা অন্য রকম লাগছে । আবার বৃষ্টি নামবে । ভিজে যাবি । তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যা । আমি ঠিক চলে যাবো । বলে সুধাময়।
 
বেশ, তুমি ঠিক করে পা ফেলো ।
 
ভিজলে তোর জ্বর আসবে রে । আমার কিছু হবে না । মলয়ের জ্বর আসবে ভেবে উদ্বিগ্ন সুধাময় । বুকটা কেঁপে ওঠে মলয়ের । বাবার হাতটা আরো শক্ত করে ধরে । মানুষটার এই রকম শারিরীক অবস্থাতেও মলয়ের কথা ভেবে ব্যস্ত হয়ে উঠছে । সংসারে বাবা বুঝি এমনই হয় ।
 
বাবাকে কোনো দিন ছাতা ব্যবহার করতে দেখেনি মলয় । বর্ষায় ভিজে ভিজেই যাতায়াত করত । প্রতিমা বলতো, কত দিকে কত টাকা যায় নিজের জন্য একটা ছাতা কিনতে পারো না । সুধাময় হেসে বলতো, আর ছাতা ! এই তো কয়টা দিন মাত্র বর্ষা । দেখতে দেখতে পেরিয়ে যাবে । বড়ো আজব মানুষ সুধাময় । এক জোড়া ধুতি পাঞ্জাবি আর নীল রংয়ের শক্ত হওয়াই চটিতেই জীবন কাটিয়ে দিল । নিজের সখ বলে কিছু ছিল না । প্রতিমা কত কিছুই বলতো। সে সব কথা হেসে উড়িয়ে দিত সুধাময় । সামান্য কেরানি সুধাময় । কত টাকাই বা বেতন পায় । সংসার, ছেলে মেয়েদের পড়াশোনা এইসব সামলে মাস শেষ হবার আগেই পকেট ফাঁকা । তবুও ছেলে মেয়েদের ভালো রাখতে চেষ্টার ত্রুটি ছিল না । মলয় চাকরি পাওয়ার পর থেকে জোর করে ভালো জুতো, জামা কাপড় পড়তে বাধ্য করেছে সুধাময়কে । তখন হাসতে হাসতে বলতো সুধাময়, তুই আমাকে জমিদার বানিয়ে দিবি মনে হচ্ছে খোকা । লোকে কি বলবে এইবার । প্রতিমা তখন বলতো, অনেক কষ্ট করেছ জীবনে । এইবার একটু সুখ ভোগ করো । স্ত্রীর কথা শুনে স্মিত হেসে সুধাময় বলতো, আর সুখ ! এই তো বেশ সুখেই রয়েছি ।
 

দুই চোখে জলের আভাস নিয়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায় মলয় । পুরোনো দিনের হাজার কথা ভেসে আসে মনে । বাবার সেই তেজি টগবগে চেহারাটা ফুটে ওঠে চোখের সামনে । সারা জীবন লড়াই-ই করেই গেল মানুষটা । চাওয়া পাওয়ার হিসাব চায়নি কখনই । ঘাত প্রতিঘাত অপমান গঞ্জনা কত কিছুই সয়ে গেলো মুখ বুজে । জীবনের প্রতি কোনো অভিযোগ ছিল না

 
সুধাময়কে বিছানায় শুইয়ে দেয় মলয় । এই দুপুর বেলায় তুই আর কোথায় যাবি । আয় আমার পাশে শুয়ে পড়, আয় খোকা আয় । বলে সুধাময়। বাবার মুখের দিকে চেয়ে থাকে মলয় । নাইট ল্যাম্পের হলদে আলোয় সুধাময়কে কেমন যেনো রক্তশূন্য অচেনা মানুষ বলে মনে হয় । মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় মলয় । আহ্, বলে সুধাময় । আরাম লাগছে বাবা ? তুমি চোখ বন্ধ করো, দেখো ঘুম আসবে । সুধাময় তাকিয়ে থাকে ঘরের সিলিং এর দিকে । ‘বাবা’, ডাকে মলয় । উত্তর দেয় না সুধাময় । হঠাৎ করে নিজের মনে হেসে ওঠে ।
 
হাসছো কেনো ? জিজ্ঞাসা করে মলয় ।
 
ওই মেয়ে গুলো খুব দুষ্টু । বলে সুধাময় ।
 
কোন মেয়ে গুলো ? জিজ্ঞাসা করে মলয় ।
 
বেশ কিছুক্ষণ নিরুত্তর থেকে সুধাময় বলে, অতো বলতে পারছি না । কত বক বক করি বলতো । তোর মা কোথায় গেলো ?
 
মলয় বোঝে কিছু একটা ভাবার চেষ্টা করছিল সুধাময় । খেই হারিয়ে ফেলেছে । তারপর মুখে যা এসেছে তাই বলছে । মা ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমাচ্ছে অঘোরে ।
 
ওই দেখো মা কেমন ঘুমিয়ে গেছে । বলে মলয় ।
 
ঘাড় ঘুরিয়ে প্রতিমাকে দেখে সুধাময় । বলে, ও তোর মা এখানে ! আর আমি সারাদিন খুঁজে মরছি । বাবার বুকে হাত বুলিয়ে দেয় মলয় । চুপ থাকে সুধাময়। কিছু ভাবছে হয়তো । উৎকট গন্ধ নাকে আসে মলয়ের । প্যাম্পর্স নোংরা করে ফেলেছে বাবা ।
 
পেটে ব্যাথা হচ্ছে বাবা ? জিজ্ঞাসা করে মলয় ।
 
না না ব্যথা হবে কেনো ! আমার কোনো অসুবিধা নেই খোকা । বলে সুধাময় ।
 
বাবার প্যাম্পার্স বদলে দেয় মলয় । ভালো করে পরিষ্কার করে পাউডার মাখিয়ে দেয় শরীরে ।
 
কি করছিস বলতো আমাকে নিয়ে ? বলে সুধাময় ।
 
তুমি বুঝতে পারনি কি করেছ ? শান্ত গলায় বলে মলয় । চুপ থাকে সুধাময় । পরে বলে, অ অতো বুঝিনি, কখন হয়ে গেছে । প্রস্রাব পায়খানার উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই সুধাময়ের ।
 
খোকা, ডাকে সুধাময় ।
 
বলো বাবা ।
 
তোর কত পরিশ্রম ! শুয়ে পড় ।
 
বেশ, আগে তুমি ঘুমাও ।
 
মলয়ের হাতের পরশে ঘুম আসে সুধাময়ের । কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে যায় । এক টুকরো কাপড় নিয়ে ড্রয়িংরুমে আসে মলয় । দেখে রিনো ঘর পরিষ্কার করে দিয়েছে ।
 
তুই আবার এত রাতে উঠতে গেলি কেনো ! বলে মলয় ।
 
পড়তে বসবো বলে উঠেছি তারপর দেখি…।
 
খোকা, সুধাময় ডাকে মলয়কে ।
 

সামনের দড়িতে ছোটো ছোটো কাপড়ের টুকরো ঝুলছে । দিনের বেলায় আয়া না এলে মা একা সামলাতে পারে না সুধাময়কে । তখন সুধাময়ের কোমরে জড়িয়ে দেয় এক টুকরো কাপড় । আবার সুধাময়কে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতেও কাজে লাগে কাপড়ের টুকরো গুলো । দুটি পুরানো সুতির জামা মেলা রয়েছে দড়িতে, বেশ কয় বছর আগে সেগুলি পড়তো মলয় । এখন সুধাময়কে পড়ানো হয়

 
ঘরে আসে মলয় । সুধাময় জেগে রয়েছে । আবার উঠে পড়লে ! বলে পাশে বসে মলয় । মলয়ের হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠিতে ধরে সুধাময় । বলে, তুই আমার ভগবান খোকা ।
 
এইসব বলো না বাবা । গলা কেঁপে ওঠে মলয়ের । রিনো বুঝতে পারে দাদুর কথা শুনে ভিতরে ভিতরে অবিন্যস্ত হয়ে উঠেছে বাবা । বলে, তুমি বিশ্রাম নাও বাবা । আমি দাদুকে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছি ।
 
দুই চোখে জলের আভাস নিয়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায় মলয় । পুরোনো দিনের হাজার কথা ভেসে আসে মনে । বাবার সেই তেজি টগবগে চেহারাটা ফুটে ওঠে চোখের সামনে । সারা জীবন লড়াই-ই করেই গেল মানুষটা । চাওয়া পাওয়ার হিসাব চায়নি কখনই । ঘাত প্রতিঘাত অপমান গঞ্জনা কত কিছুই সয়ে গেলো মুখ বুজে । জীবনের প্রতি কোনো অভিযোগ ছিল না । কি পায়নি, আরোও কি কি পাওয়া উচিত ছিল সেই সব বিষয় ভাবনায় না এনে জীবনে প্রতিকূলতার ঝাপটা সামলে এগিয়ে চলাকেই বাঁচার মন্ত্র বলে জেনে ছিল সুধাময় । প্রত্যাশা করেনি কিছু কোনোদিন । বড় অদ্ভুত !
 
চেয়ারে বসে মলয় । সামনের দড়িতে ছোটো ছোটো কাপড়ের টুকরো ঝুলছে । দিনের বেলায় আয়া না এলে মা একা সামলাতে পারে না সুধাময়কে । তখন সুধাময়ের কোমরে জড়িয়ে দেয় এক টুকরো কাপড় । আবার সুধাময়কে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতেও কাজে লাগে কাপড়ের টুকরো গুলো । দুটি পুরানো সুতির জামা মেলা রয়েছে দড়িতে, বেশ কয় বছর আগে সেগুলি পড়তো মলয় । এখন সুধাময়কে পড়ানো হয় ! বাবার এমন অবস্থার কথা ভেবে ভীষন কষ্ট হয় মলয়ের । সুধাময়ের জীবনের অন্তিম পর্ব কি অন্য রকম হতে পারত না ! জ্ঞানত অন্যায় তো করেনি মানুষটা, কোনোদিন, কোথায় ।
 
তারপরেও এমন পরিণতি ! সামান্য সুখ, সেইটুকু তো পেতেই পারত । সে পাওয়ায় সুধাময়ের ঔদাসীন্যকে মান্যতা দিয়ে ঈশ্বর যেন সুধাময়কেই জিতিয়ে দিতে চান !
 
কাপড়ে টুকরো আর পুরানো জামা গুলো দেখে  বাবার সেই কথাটা মনে পড়ে মলয়ের – তুই আমাকে জমিদার বানিয়ে দিবি খোকা । লোকে…।
 
প্রতিমা সেদিন স্বামীকে বলেছিল, অনেক কষ্ট করেছ জীবনে । এইবার একটু সুখ ভোগ করো ।
 
কোথায় সুখ ! সে কপাল করেনি সুধাময় । সুখের ছোঁয়া অধরাই রয়ে গেলো । এই জীবনে সেই সুখ আর পেলো কই !
 

♦–♦♦–♦♦–♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!