- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- জুন ১, ২০২৫
স্বপ্ন হলেও সত্যি
অলঙ্করণ : দেব সরকার
ফুরিয়ে যাওয়ার আগে ফুড়ুৎ হয়ে যাওয়াটা অপচয়। রিসোর্স যতক্ষণ, ততক্ষণই তার অনুভব থাকাটা খুব দরকার। তুমি বেঁচে আছো এবং সুস্থ শরীরে বেঁচে আছো, এটাই যে চরম মূল্যবান, তা তোমার জানার দরকার। পলাশ এটা খুব ভালোমতো বোঝে। তবুও এই কণামাত্র আনন্দকে নিয়ে মেতে থাকতে পারে না। খুবই স্বাভাবিক। ধরুন সুস্থ জীবন নিয়ে আপনি বেড়ে উঠছেন, ভাত কাপড়ের মারাত্মক কোনো অনটন নেই, দুবেলা পেট ভরে খাচ্ছেন, রাতে ঘুমোচ্ছেন, কিছু একটা কেরানিমার্কা কাজ করছেন, দেশ ও দশের টুকটাক খবর রাখছেন এবং একটি একটি করে বছর আপনার জীবন থেকে চলে যাচ্ছে। আপনি এতে খুশি থাকতেই পারেন, আবার নাও পারেন। বলতেই পারেন, ‘নষ্ট জীবন’। পলাশ ঠিক এরকম একটা ‘নষ্ট জীবন’ টাইপ অনভূতি নিয়ে বেঁচে আছে। সে জীবনে একটা গতি চায়। একটা বাঁক চায়, একটা মোক্ষম মোচড় চায়, যা তার জীবনটাকে উল্টে পাল্টে দেবে এবং এক সময় পিছনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে সে বলতে পারবে, কোথা থেকে কী যে হয়ে যায়!
আসলে পলাশ খুবই অনুভূতিপ্রবণ। কিছুটা কল্পনাবিলাসীও বলা চলে। পুরনো গল্প উপন্যাস পড়তে ভালোবাসে। হিন্দি বাংলা সিনেমা দেখতে ভালোবাসে। একটা গল্প কীভাবে গল্প হয়ে উঠল, সে-ম্যাজিক মুহূর্ত নিয়ে ভাবে। নিজের সঙ্গে নিজেই কথা বলে, আলোচনা করে। গৌরী তো সংসার নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকে। পলাশ নিজের মতো অবসর সময় কাটায় সিনেমা দেখে, রূপকথার গল্প পড়ে, ডায়েরি লেখে। কিছু না হলে সে আঁকতে বসে যায়। তার ছবি রূপকথার মতো ডানা মেলে কথা বলে আকাশের সঙ্গে।
নির্ঝঞ্ঝাট একটি প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করে পলাশ। সেকারণেই হয়তো হাতে ওটুকু সময় থাকে। ঘরে স্ত্রী আর সাত বছরের মেয়েকে নিয়ে তার এক টুকরো গোছানো মধ্যবিত্ত জীবন। মা বাবা দিল্লিতে বড়ো দাদার কাছে থাকে। দাদা বৌদি দুজনেই চাকরি করে বলে ওদের ছেলেমেয়ে দুটির ভার মা বাবার উপরেই ন্যস্ত। ছুটিছাটায় ওরা কলকাতায় আসেন, কখনো পলাশরা যায়। জীবনে কোথাও তেমন কোনো অসঙ্গতি নেই। সবকিছুই জুটে গেছে সময়মতো। যেখানে যতটুকু কমা, দাঁড়ি প্রয়োজন, তাও যেন সাজানো। তবুও পলাশের কেমন যেন একটা নেই নেই ভাব। কী যেন নেই তার। কোথাও যেন কীসের একটা অভাব। সে খুঁজে পায় না কী করে তার জীবনের এই ফাঁকা জায়গাটা ভরিয়ে তোলা সম্ভব। এমনিতে সে খুব শান্ত নিরীহ ধরনের। বন্ধুবান্ধব বা আড্ডার মধ্যে খুব বেশি যায় না। স্বভাবগতভাবে আবার একটু লাজুক বলে সমবয়সি অনেকেই তাকে মেয়েলি বলে খেপায়। যদিও এটা পলাশের একদম পছন্দ নয়। স্ত্রী গৌরী পর্যন্ত ঝগড়া হলে তাকে মেনিমুখো বলে গাল দেয়। প্রচণ্ড রাগ হয় তার। অন্যসব কিছু ঠিক আছে, কিন্তু ‘মেয়েলি’ কথাটা সে একদম বরদাস্ত করতে পারে না। তবে তেমন গুরুত্ব দেয় না। নিজের মতো করে এড়িয়ে যায় এইসব। ছোটোবেলায় সে খুব তৎপর ছিল এ দুর্নাম ঘোচানোর জন্য। স্কুলে কলেজে মাঝেমধ্যে বীরত্ব দেখানোর চেষ্টা করত। ফল হতো উলটো। পরের দিকে তার এই হীনমন্যতা অনেকটা কমে যায় শুভদীপের সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়ার পর। শুভদীপ ওর মাথায় ঢোকায় যে, নিজের মতন করে বাঁচার নামই জীবন। কে কী বলছে, তাতে প্ররোচিত হয়ে জীবনশৈলী বদলানোর চেষ্টা করাটা নিছক বোকামি। সেই শুভদীপ এখন কানাডায়। মাঝেমধ্যে অনলাইনে কথা হয় এইটুকুই উভয়ের সম্পর্ক। শুভদীপের জীবনটা আবার খুব ঘটনাপ্রবণ। পড়াশোনায় তুখোড়। কলেজে থাকাকালীন বেশ কয়েকটা ক্রাশ, প্রেম, ব্রেক-আপের পর শেষপর্যন্ত নিজের থেকে ছ’বছরের বড়ো আইভিকে বিয়ে করা, কানাডায় গিয়ে আজ এই হাইকিং, কাল ওই হাইকিং, সব মিলিয়ে দুরন্ত।
ভারি সুন্দর স্বপ্ন দেখল সে। দেখল ঘন জঙ্গলে সে পথ হারিয়ে ফেলেছে। ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা এসে লাগছিল তার চোখে-মুখে। শুকনো পাতার মর্মর শব্দ, পাতায় পাতার ঘষে যাওয়ার খসখস শব্দ। তারপর মনে হলো, যেন কেউ এসে তার হাত ধরল। নরম স্পর্শ। সে হাওয়ায় ভাসতে লাগল। অদ্ভুত কচি সবুজ রঙের মধ্যে দিয়ে একটা হাত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, মুখে-চোখে নরম রোদে ভেজা পাতার আদরের স্পর্শ পেল সে
শুভদীপের জন্য খুশি বোধ হলেও নিজের জন্য দুঃখ হয় পলাশের। জীবনে কোনো অ্যাডভেঞ্চার নেই, কোনো চমক নেই, কখনো কোনো বড়ো ধরণের পরিবর্তন নেই। শুধু গতানুগতিক পথ চলা আর বেঁচে থাকা। বড়ো একঘেয়ে লাগে। সে অন্যরকম জীবন চেয়েছিল। চেয়েছিল একটা রূপকথার মতো জীবন হবে তার। সে তলোয়ার নিয়ে বুক ফুলিয়ে ঘুমন্ত পুরীতে পৌঁছবে রাজ্য এবং রাজকন্যাকে জিতে নিতে। তো সে আর হলো কোথায় ! ছোটোবেলার গল্পের বইগুলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পড়তে থাকে পলাশ আর মাঝেমধ্যে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
একদিন একটা সামান্য অন্যরকম ঘটনা ঘটল পলাশের জীবনে। তেমন কিছু নয় একটা স্বপ্নমাত্র। একটা ভারি সুন্দর স্বপ্ন দেখল সে। দেখল ঘন জঙ্গলে সে পথ হারিয়ে ফেলেছে। কাকে যেন খুঁজতে এসেছে সে, তারপর সে খোঁজ থেমে গেছে নিজের নিয়মে। তার ভালো লাগতে শুরু করল। ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা এসে লাগছিল তার চোখে-মুখে। শুকনো পাতার মর্মর শব্দ, পাতায় পাতার ঘষে যাওয়ার খসখস শব্দ। প্রথমে মনে হচ্ছিল সে হাঁটছে। তারপর মনে হলো, যেন কেউ এসে তার হাত ধরল। নরম স্পর্শ। সে হাওয়ায় ভাসতে লাগল। অদ্ভুত কচি সবুজ রঙের মধ্যে দিয়ে একটা হাত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, মুখে-চোখে নরম রোদে ভেজা পাতার আদরের স্পর্শ পেল সে। কার হাত? তাকে দেখা যায় না কেন ? আজন্ম অপেক্ষা ছিল তার অমন একটি হাতের জন্য।
ঘুম ভাঙার পর অদ্ভুত ভালো লাগল পলাশের। অদ্ভুত এক পরিপূর্ণতা। একটা ভরা ভরা ভাব। সারাটা দিন যেমন কাটে, তেমনই কাটল অথচ একটা নতুন রং লেগে গেল তার ভেতরে ও বাইরে। একটা নতুন স্পর্শ। নিজের হাতখানা সে বারবার নিজের গালে, গলায় ছোঁয়াতে লাগল।
এই হাত ছুঁয়েছিল তাকে…
পলাশ অকারণে খুশি হয়ে উঠল, ক্লাস নিতে গিয়ে পেছনের বেঞ্চে বসা সন্টুকে কোলে তুলে নেয়। সহশিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে একটু বেশিই হাসতে থাকল, মেয়ের সঙ্গে অনেকক্ষণ খেলা করল, গৌরীকে আলতো করে চুমু খেল সন্ধেবেলা। একঘেয়ে সংসারটা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকল পলাশের দিকে।
রাতে গৌরীকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ আদর করার পর গত রাতের স্বপ্নটাকে ভাবতে ভাবতে আবার ঘুমিয়ে পড়ল পলাশ। তারপর চোখের উপরে আবার এক রূপকথা জেগে উঠল। সে-রূপকথার মেঘে ভাসতে ভাসতে পলাশ ছোটো এক পাহাড়ি গ্রামে এসে পৌঁছল। একটা সরু, নাম না জানা নদী বয়ে যাচ্ছে। ঠান্ডা নদীর জলে ডুব দিল সে। তারপর ফের সেই হাতছানি। কেউ যেন ছুঁয়ে আছে তাকে। কারো কোমল স্পর্শ বারবার তার শরীর স্পর্শ করছে। পেলব উষ্ণতা, গাঢ় নিঃশ্বাসের শব্দ তার ঘাড়ের ওপর। এক অপরূপ নিসর্গের ভিতরে কেউ যেন তাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে আছে। অপূর্ব উষ্ণতায় তার শরীর শিউরে উঠল।
এই অদ্ভুত অলৌকিক আনন্দ পলাশের জীবনটাকে বদলে দিল কয়েকদিনের মধ্যে। সারাদিন আনন্দে মন ভরে থাকে তার। সবসময় এক অদ্ভুত খুশি খুশি ভাব। সবকিছুতেই প্রগাঢ় উচ্ছ্বাস। প্রতিটা দিন অসম্ভব এক ফুর্তিতে মেতে ওঠে। শেক্সপিয়র লিখেছেন, “ইফ মিউজিক বি দ্য ফুড অফ লাভ, প্লে অন।”
পলাশের মনে হয় “ইফ ড্রিম বি দ্য ফুড অফ লাভ, ড্রিম অন।”
গৌরী তো সেদিন প্রশ্নই করে বসে, তোমার কী ব্যাপার বলো তো ? হঠাৎ তোমার বয়স দশ বছর কমে গেছে এমন মনে হচ্ছে। সবসময় এত খুশি খুশি ভাব ! উত্তর না দিয়ে পলাশ গৌরীর গাল টিপে দেয়। গৌরী আরো অবাক। এমনকি পলাশের সাত বছরের মেয়েও একটু থমকে যায় শুরুতে, বাবার নাচানাচি দেখে। তবুও এই আশ্চর্যবোধের মধ্যেই আগামী কয়েকদিনে ব্যাপারটা সবার গা সওয়া হয়ে গেল। বরং অসুবিধা হলো, পলাশের নিজেরই। সে দিনকাল, স্থান, পাত্র ভুলে, স্বপ্নের মধ্যেই বিভোর থাকতে চায়। ঘুমানোর জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। সকালে ঘুম ভেঙে উঠতে চায় না। শনি রবিবার হলে দুপুরবেলায়ও সাত তাড়াতাড়ি ঘুমানোর ফিকির খোঁজে। কখনো কখনো এরকমও হয়, স্কুলে ক্লাস নেওয়ার ফাঁকেও সে ঘুমাতে থাকে। এ যেন স্বপ্ন দেখার নেশা, যাকে বারবার ফিরে পাওয়ার জন্য সাধনা করতে হয়। প্রথম প্রথম ব্যাপারটা যতটা মধুর ছিল, পরের দিকে ততটা মধুর আর থাকে না। সবাই পলাশের মধ্যে এই বিচিত্র পরিবর্তন লক্ষ্য করে আশ্চর্য হতে থাকে। জেগে থাকা মুহূর্তেও যেন সে জেগে নেই। বলা ভালো, জেগে থাকার বিষয়ে কোনো আগ্রহই নেই তার। সে যেন বহুদূরে কোথাও রয়েছে। তার চোখ দৃষ্টির সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর চলে গেছে।
পলাশ অমনোযোগী হয়ে পড়ল রোজকার দায়িত্ব পালনে। স্কুলে ক্লাস নেওয়ার বিষয়ে মনোযোগ নেই, কারো সঙ্গে কথাবার্তা বলবার তেমন আগ্রহ নেই, বাড়ির বাজারহাট করতে চায় না। এর মধ্যে একদিন তো বাজারের ব্যাগ ট্যাগ নিয়ে বেরিয়ে সে বাড়ি ফেরে না। বেলা বেড়ে গেলে, গৌরী ফোনাফুনি শুরু করে একে তাকে। আশেপাশের বাড়িতেও খোঁজ করে, ইস্কুলের কয়েকজনকে ফোন করল, কোথাও কোনো হদিস নেই। শেষে পাড়ার ক্লাবের ছেলে রাজু খবর দেয় কোনো এক খেলার মাঠে নাকি পড়ে আছে পলাশ। লোকজন সব মিলে যায় সেখানে, অসুস্থ হয়ে পড়ল কিনা ছেলেটা। কোথায় কিসের অসুস্থতা! পলাশ মাঝমাঠে হাত পা ছড়িয়ে ঘুমাচ্ছে।
এক দীর্ঘ ঘুমের মধ্যে দেখা স্বপ্নে সে বাগানে ফুল ফোটায়, সবজি চাষ করে, বাজার যায়, মানুষের মুখ আর মন পড়তে থাকে, স্কুলে যায়, ছোটো ছেলেমেয়েদের ইতিহাস পড়াতে পড়াতে স্বপ্নের মধ্যে আরো নতুন স্বপ্ন তৈরি করে। বাড়িতে ফিরে গৌরী আর মেয়ের সঙ্গে সংসারের রঙ্গমঞ্চকে নতুন করে তোলে
গৌরী সেদিন কেঁদেই ফেলল – কী হয়েছে গো তোমার ? তুমি এমনধারা অদ্ভুত ব্যবহার কেন করছ ? পলাশের উত্তর নেই। সে নিজেও জানে না, সে কেন এমন করছে। নিজেকে সংযত করবে, এমন জোর সে খুঁজে পাচ্ছে না। ওইসব স্বপ্নের মোহে ঘুম না এলে ঘুমের ওষুধ কিনে খাওয়া শুরু করল। তারপর সারাটা দিন অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে কাটিয়ে দিচ্ছে। চেনা জানা সকলে গৌরীকে বলছে, পলাশের মানসিক চিকিৎসা করাতে। স্বয়ং হেডমাস্টার একদিন বাড়ি বয়ে এসে পলাশকে বোঝালেন যে, এখন কাউন্সেলিং করে কত গুরুতর মানসিক সমস্যার সমাধান হয়ে যাচ্ছে।
পলাশ নিজেও অস্বস্তিবোধ করতে থাকে। জীবনের এই একমাত্র উত্তেজক আনন্দকে সে কিছুতেই ছাড়তে পারে না অথচ এ উত্তেজনার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় যা কিছু হতে থাকে সেটাকেও কন্ট্রোল করা তার আয়ত্তে নেই। ভাবতে ভাবতে সময় চলে যায়, সে আবার স্বপ্নের মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। একদিন শুভদীপের সঙ্গে এই নিয়ে বিস্তর আলোচনা করে। শুভদীপ প্রথমে হেসে উড়িয়ে দেয়। বলে, তুই একটা প্রেম কর পলাশ। স্বপ্ন দেখার চেয়ে এতে বেশি সুবিধা হবে, তারপরে ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে পারে। সে পলাশকে বোঝায় যে নিজের বাতিক থেকে নিজেকেই মুক্ত করতে হবে, নয়তো কোনো মানসিক চিকিৎসকের সাহায্য নিতে হলে তেমন কোনো ক্ষতিও নেই। সবার বিস্তর জ্ঞান উপদেশ শোনার পর অনেক ভেবেচিন্তে পলাশ মানসিক চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা গ্রহণ করে।
ঠিক এইসময়ে একদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠেই তার মাথায় অন্য একটা বুদ্ধি আসে। সে ভাবে নিজের ভাবনাটাকেই যদি বদলে দেওয়া হয়, কেমন হবে ? ব্যাপারটা হতে হবে এইরকম যে সকালে ঘুম ভাঙবার পর পলাশকে ভাবতে হবে সে স্বপ্ন দেখছে। এবং যে অচেনা উত্তেজনা, আনন্দ, রোমহর্ষক অনুভব সে রাতে দেখা স্বপ্নের কাছ থেকে পায়, সেটাই তাকে অনুভব করবার চেষ্টা করতে হবে। যদি তাই হয়, তাহলে সে দিনের যাপনের মধ্যেও রাতের স্বপ্নজীবনের মতোই সজাগ, সচেতন থাকবে। ফলে যে সব বিভ্রাট ঘটছে সেগুলো বন্ধ হবে।
যদিও খুবই কঠিন এমনভাবে ভাবা, তবুও চেষ্টা তো তাকে করতেই হবে। অন্তত মানসিক চিকিৎসকের দাওয়া, বড়ি হেন তেন-র থেকে এ প্ৰচেষ্টা চালিয়ে দেখা যেতেই পারে একবার। কিছু হলে ভালো না হলে ক্ষতিও নেই অন্তত। সবথেকে বড়ো কথা, নিজেকে বোঝাতে হবে, যে অলৌকিক সুখের জন্য সে স্বপ্নের ভিতরে বেঁচে থাকতে চাইছে, তার কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই।
পলাশ বিস্তর মনঃসংযোগ করার চেষ্টা করল। নিজেকে বোঝাল যে রাতের বেলা স্বপ্নে যদি স্বর্গের উদ্যান থেকেও ঘুরে আসে, যদি রতি বা রম্ভার সঙ্গে প্রমোদবিহারও করে আসে, তবুও তা নিয়ে আর ভাবা চলবে না এবং দিনের বেলা তাকে ফের দেখার জন্য ঘুমানোর চেষ্টা করা চলবে না। আর ঘুমের ওষুধ তো পুরোপুরি সিলেবাসের বাইরে। বরং দিনের বেলার প্রতিটি ঘটনাকে স্বপ্নের মতো সুন্দর মনে করতে হবে। তার রোজকার জীবন, তার ছোটো ছোটো ঘটনা সবকিছুকেই স্বপ্নে পাওয়া ভাবতে হবে। রাতের স্বপ্নের আনন্দ দিনে তৈরি করতে হবে জেগে থাকা পৃথিবীর নিত্যতার পাশাপাশি।
পলাশ চেষ্টা করল। মন যে কী জিনিস ! সহজে কি তাকে নড়ানো যায় ? কিছুতেই দিনের বেলায় ঘটা সবকিছুকে পলাশ স্বপ্ন বলে ভাবতে পারে না। কী করে হবে ? ওই ভাসা ভাসা নরম ব্যাপারটাই নেই যে। কড়া বাস্তব। রোদ উঠছে, ঘাম হচ্ছে, অস্থির করছে শরীর। গৌরী কাপড় কাচতে কাচতে চেঁচিয়ে বলছে, হ্যাঁ গো শুনছ ! একটা ভ্যানিশ এনে দাও গো। জামার দাগগুলো ঘষে ওঠানো যায় না এমনিতে। মেয়েটা চিৎকার করে কেঁদে যাচ্ছে মেলা থেকে ওই ফুঁ দিয়ে বুদবুদ তোলা খেলনা কিনে দেয়নি বলে, বাজারে মাছের দরদাম নিয়ে বাজার করতে আসা দুই ভদ্রলোকের মধ্যে তুমুল চিৎকার চেঁচামেচি, চোখের সামনে সদ্য গোঁফ গজানো একটা ছেলে বাইক নিয়ে কায়দা করতে গিয়ে স্লিপ খেয়ে পড়ে গেল, ইস্কুলে ছেলেমেয়েগুলোকে ল.সা.গু গ.সা.গু শেখাতে জীবন বেরিয়ে গেল, দিনের শেষে গৌরী ক্লান্ত হয়ে পাড়ার বৌদির ফেসবুক রিল বানানোর গল্প জুড়ে বসল। এসব কখনো কারো স্বপ্ন হয়? নিজেকে এনতার গাল দিতে দিতে রোজই ব্যর্থ হতে লাগল পলাশ।
প্রায় আশা ছেড়ে দিয়েছে, এমন সময়ে একদিন ছোটোবেলার সেই ম্যাজিক মুহূর্ত তৈরি হলো পলাশের জীবনে। কী মনে করে, সকালে ঘুম থেকে উঠে সে বাগানে গেল। অথচ বহুদিন পলাশ বাগানে যায় না কোনো কারণ ছাড়াই। যে বাগানের সংসর্গে সে বড়ো হয়েছিল, সে বাগান গতানুগতিকতায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিল অজান্তেই। গৌরীই সব দেখভাল করত গাছগুলোর। বাগানে ঘুরতে গিয়ে সে দেখল, বসন্তের হাওয়ায় সুপুরিগাছ আর নারকেল গাছগুলো উত্তাল হয়ে দুলছে। তাদের বাড়ির পাঁচিলের পিছনের রুদ্রপলাশ গাছটা ফুলে ফুলে ভরে আছে। পাশেই বিশাল শিরিষ গাছভর্তি ঝুমকোলতার মতো ফুল, অন্যদিকে দেবদারু গাছগুলো এলোপাথাড়ি বেড়ে উঠেছে যেন দিক দিশাহীন। পলাশের মনে হলো, কতদিন সে নিজের বাড়ির বাগানের পরিচর্যা করে না। শুকনো পাতা পড়ে বাগানের মাটি প্রায় ঢেকে গেছে। নানান আগাছা এদিক-ওদিকে মাথা তুলেছে। ঘাসগুলো বেড়ে উঠেছে অনেকখানি। গৌরী একা হাতে কতই বা সামলাবে। পলাশ একখানা ঝাঁটা নিয়ে এসে বাগানের বেশ কিছুটা জায়গা পরিষ্কার করল। কাস্তে দিয়ে ঘাসগুলো কাটল। ধীরে ধীরে তার মনে প্রশান্তি ফিরে এল। বাগানের মধ্যে অনেকটা জায়গা খালি পড়ে আছে। সেখানে অন্তত কিছু শাক সবজির চাষ তো হতেই পারে। পাঁচিলের ধার দিয়ে লকলক করে বেড়ে ওঠা পুঁইডাটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে পলাশ দেখল, এ বাগানে অনেক কিছুই করা যাবে। সে দেখল, তার এই বাগান, নতুন ফসল আর শাক ফলানোর পরিকল্পনা, এইসব গাছপালা, বসন্তের এই বাতাস সবকিছুর মধ্যেও সেই স্বপ্ন দেখার আরাম ছড়িয়ে আছে। গাছের কচি পাতার স্পর্শ আর স্ত্রীলোকের স্পর্শের মধ্যে কী খুব বেশি পার্থক্য আছে? নেই মনে হয়।
এই তো এই তো সে ভাবতে পারছে। সে ভাবতে পারছে জেগে থাকা জীবনটাকে স্বপ্নের মতো। বিহ্বল হয়ে অনেকক্ষণ সে ওখানেই বসে থাকল। তারপর সেই স্বপ্ন পাওয়া খুশিটাকে মুঠোর মধ্যে করায়ত্ত করে বাজারে বেরোল। ঝপাঝপ আনন্দের সঙ্গে বাজার করে ফেলল। তারপর বাড়ি এসে ঝটপট রেডি হয়ে স্কুলের জন্য বেরোল। এইভাবে একদিন, দুদিন চলতে চলতে পলাশ তার জেগে থাকার মুহূর্তগুলোকে স্বপ্নের মতো করে তুলল। সে ভাবতে শুরু করল, সে ঘুমিয়ে আছে। এক দীর্ঘ ঘুমের মধ্যে দেখা স্বপ্নে সে বাগানে ফুল ফোটায়, সবজি চাষ করে, বাজার যায়, মানুষের মুখ আর মন পড়তে থাকে, স্কুলে যায়, ছোটো ছেলেমেয়েদের ইতিহাস পড়াতে পড়াতে স্বপ্নের মধ্যে আরো নতুন স্বপ্ন তৈরি করে। বাড়িতে ফিরে গৌরী আর মেয়ের সঙ্গে সংসারের রঙ্গমঞ্চকে নতুন করে তোলে।
মানুষ বেশিদিন কিছু মনে রাখে না। গৌরী থেকে শুরু করে, পাড়া প্রতিবেশী, স্কুলের সহশিক্ষকরা, ছাত্ররা এমনকি হেডমাস্টারও কদিন পরে ভুলে গেলন যে, পলাশের কী কঠিন সমস্যা হয়েছিল কিছুদিন আগে। জীবনযাত্রা আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসে। শুধু ছন্দপতন হলো একটা ঘটনার। রাতের সে আচ্ছন্ন করে দেওয়া আনন্দময় স্বপ্নগুলো পলাশের জীবন থেকে মুছে যায়। স্বপ্নহীন গভীর নিদ্রায় পলাশ এখন সারারাত জেগে থাকে।
♦•♦♦•♦♦•♦♦•♦♦•♦
❤ Support Us








