- ব | ই | চ | র্যা রোব-e-বর্ণ
- জুলাই ৯, ২০২৩
‘বিদ্রোহী’-র শতবর্ষে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ।আলোচনার প্রেক্ষিতে জাতিসত্তার ইতিকথা
মইনুল হাসান ভালো লেখেন।লেখায় খুব যত্নবান। তাঁর লেখা অনুসন্ধান ও গবেষণাভিত্তিক।কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার শতবর্ষ নিয়ে লিখতে গিয়ে তাঁকে ৭৪ টি পুস্তক আর ১৫ টি পত্রিকার সাহায্য নিতে হয়েছে।কঠিন কাজ।
মইনুল হাসান শুধু “বিদ্রোহী” কবিতার মর্মকথা লেখেন নি, বাঙালির ইতিহাস,ভূগোল, বিজ্ঞান ও রসসন্ধানের যাবতীয় তথ্য লিপিবদ্ধ করেছেন। তাই দীর্ঘায়াতনের ধারণা বহন করে গ্রন্থটি হয়ে উঠেছে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার উপর আবিষ্ট বা ভাবাবিষ্ট গবেষণাভিত্তিক বিশ্লেষণ।
বইটি বাংলার সংক্ষিপ্ত এক ঐতিহাসিক দলিল। পলাশীর যুদ্ধে সিরাজ উদ দৌলার পরাজয়, জগৎ শেঠের শঠতা, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা থেকে শুরু করে কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা, রামমোহনের সতীদাহ বিরোধী আন্দোলন, বিদ্যাসাগরের নারীশিক্ষা ও বিধবা বিবাহ প্রবর্তন, ডিরোজিওর উৎসাহে ‘ইয়ং বেঙ্গল’ গোষ্ঠীর উদ্ভব ইত্যাদির পুনর্মূল্যায়নে ‘বিদ্রোহী’-র পরিপ্রেক্ষিতের ব্যাখ্যা সমৃদ্ধ করবে পাঠককে।
সাহিত্যে নবজাগরণের সূচনা— রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন, দীনবন্ধু মিত্র—বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ—রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলী’-র বিশ্লেষণ সহ নক্ষত্রবিচ্যুত এক উল্কাপিণ্ডের মতো নজরুলের একক বিদ্রোহের আগুন নিয়ে মইনুল হাসানের ভাবনা তাঁর মননশীলতাকে সুচিহ্নিত করে দেয়।
নজরুলের পূর্ণাঙ্গ জীবনী-জন্ম, শিক্ষা,কর্ম,সাহিত্য থেকে আমৃত্যু বিবরণে যেমন আছেন- কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মুজফফর আহমেদ, নজরুল বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের, তেমনই দুঃসময়ের বন্ধু সওগাত পত্রিকার সম্পাদক মহম্মদ নাসিরুদ্দিন। সঙ্গে অচিন্ত্য সেনগুপ্ত, জগদীশ গুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র, প্রমথ চৌধুরী, মোহিতলাল মজুমদার, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত সর্বোপরি রবীন্দ্রনাথের স্নেহাশিস। রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে বলেছিলেন- “ওরে উন্মাদ, তোর জীবনে ভীষণ ট্রাজেডি আছে।” এ এক অমোঘ আশীর্বাদ।
‘বিদ্রোহী’-কবিকে অনেক অনেক বিদ্রোহের মধ্য দিয়েই এগোতে হয়েছে, যা সাহিত্যের ইতিহাসে বিরল।একটি কবিতাই তাঁকে খ্যাতির চরম পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে আর সে খ্যাতিতে পরে সংযোজিত হয়েছে অসংখ্য গান-কবিতা আর অফুরন্ত প্রাণ চাঞ্চল্য।
‘বিদ্রোহী’ কবিতার বিপক্ষে যত চিঠি, প্রবন্ধ,কবিতা প্যারোডি রচনা হয়েছে- সেও এক বিরল দৃষ্টান্ত।বিরোধিতার তালিকা এত দীর্ঘ যে, তারই একটা গ্রন্থ হতে পারে। বিরোধিতা অশ্লীলতার পর্যায়ে নেমে এসেছিল কখনো। কবি আঘাত পেয়েছিলেন, ভেঙ্গে পড়েননি।হতাশার আঁস্তাকুড়ে চলে যাননি। বরং বলেছেন,’দে গরুর গা ধুইয়ে। তাঁকে কেউ কাফের বলতো, কেউ বলতো নেড়ে। এরকম আবহে কাজী নজরুল ইসলামের প্রধান শক্তি ছিল অবিভক্ত বাংলার তরুণ যুবক, আর মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসার অনিঃশেষ বর্ম।
‘বিদ্রোহী’ দেশ-বিদেশের বহু ভাষায় অনুদিত হয়েছে। হিন্দিতে তর্জমা করেছেন জলজ ভাদুড়ী। তাঁর তর্জমায় কোথাও কোথাও ভুল শব্দের প্রয়োগ হয়েছে, তা চোখে আঙুল রেখে দেখিয়ে দিয়েছেন মইনুল হাসান। যেমন “বিশ্ববিধাত্রী”, “টর্নেডো” ইত্যাদি অনেক শব্দের অনুবাদে গলদ আছে। এরকম ভুলের উল্লেখ দেখে আমরা বুঝতে পারি, লেখক কত যত্ন নিয়ে বহু ভাষায় ‘বিদ্রোহী’-র অনুবাদিত ভাষ্য পড়েছেন।
বলা অত্যুক্তি হবে না, নজরুলের খ্যাতির সূচনায় জড়িয়ে আছে ‘বিদ্রোহী’। মইনুল লিখেছেন,”নজরুলের ‘বিদ্রোহী’-তে রচিত হয়েছে কবির অলঙ্কারচাঞ্চল্যের একটি অনুদুনিয়— কোথায় যৌগিক শব্দ, কোথাও অনুপ্রাসের নজির, ত্রিপংক্তির অন্তমিল এবং শব্দের উপর্যুপরি প্রয়োগ। প্রকৃতি, দেবতা, জন্তু, ব্যক্তি, প্রতীক ইত্যাদির সমাহার বেছে বেছে লেখক তুলে ধরেছেন, তার ফিরিস্তিও দিয়েছেন। একটি কবিতা নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বই, বাংলায় সম্ভবত এই প্রথম। মনোযোগ দিয়ে পড়ার মতো বিশ্লেষণ। নজরুলকে নিয়ে ভবিষ্যতের গবেষনাকে অবশ্যই আলোকিত করবে মইনুল হাসানের ধৈর্যশীল পরিশ্রম।
বিদ্রোহ কবিতার শতবর্ষ: কিছু প্রামাণ্য তথ্য / মইনুল হাসান। প্রকাশক, সূত্রধর
♦—♦♦—♦♦—♦
লেখক: বিশিষ্ট চিত্রকর ও নির্মাণ শিল্পী
❤ Support Us







