- ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
- সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৫
হিরণবালা । পর্ব ২১
ঘোঁতনের ঘুমন্ত মুখ দেখে বড্ড মায়া হয় হিরণের। মায়া কি? নাকি স্নেহ? স্নেহ নাকি আদর? ঠিক বুঝে উঠতে পারে না হিরণ। তবে মনে হয় ওর শরীর, মন কেমন যেন কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠছে। মনে হয় ওর শরীর থেকে, মন থেকে আনন্দ উথলে যেন ছড়িয়ে পড়ছে পৃথিবীতে...তারপর
৩৭
কমিউনিস্ট পার্টি দু-ভাগ হয়ে গেছে। জ্যোতি বসুরা আলাদা দল করেছেন। চিনের সঙ্গে যুদ্ধে ভারত হেরেই গিয়েছিল। সেই সময় যারা চিনকে সমর্থন দিচ্ছিল, কমিউনিস্ট পার্টির সেই সমস্ত কর্মীদের অনেককে জেলে পুরে দিয়েছিল কেন্দ্র সরকার। পার্টির মধ্যে মতবিরোধ ক্রমশই বাড়ছিল। সেই মতবিরোধের আগুনে ঘি পড়ে কমিউনিস্ট পার্টির একটা অংশ অন্য অংশের কর্মীদের পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেওয়ায়। শেষ পর্যন্ত ভাগই হয়ে গেছে পার্টি। এসব কথা সত্য এসে বলছে হিরণকে। ওর বিটি ট্রেনিং শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন ও রামসাগরেই থাকে। একটা সময় এত রাজনীতির কথা বলত না সত্য। এখন এত বেশি করে রাজনীতির কথা বলায় মাঝে মাঝে হিরণের সন্দেহ হচ্ছে সত্য সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছে কি না।
সত্যর সঙ্গে বসে যখন এসব গল্প করছে হিরণ, তখনই হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকল গোবিন্দ, বিশু, তিতা। তিতা বলল, কাকিমা, চাঁদা লিব।
হিরণ বলল, কীসের চাঁদা লাগব রে ?
বিশু বলল, আমরা ফুটবল টুর্নামেন্ট কঁরছি। পঞ্চাস টাকা চাঁদা লিব।
টাকার অঙ্কটা শুনে ঘাবড়ে যায় হিরণ। পঞ্চাশ টাকা তো অনেক টাকা ! কিন্তু এই ছেলেগুলোকে নিরাশ করতেও ওর মন চায় না। আপদে বিপদে ওরা সবসময় সঙ্গে সঙ্গে থাকে। ঘোঁতনের অন্নপ্রাশনের দিন কোন্ননগরে গিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিল। ও চুপ করে আছে দেখে গোবিন্দ বলল, লা করো না মা। টাকাটো দিয়ে দাও।
বন্ধুদের সঙ্গে থাকলে গোবিন্দ কথা বলে পুরো বাঁকড়িভাষায়। বন্ধুরা না-থাকলে আবার বাঙাল ভাষায় কথা বলে বাড়িতে। সত্য আবার একেবারেই বাঁকড়ি ভাষা বলতে পারে না। ওর কথাবার্তা কলকাতার বিশুদ্ধ বাংলার মতো। তবে বাঙাল ভাষা বলে অক্লেশে। হিরণের সঙ্গে কথা বলে বাঙাল ভাষাতেই।
গোবিন্দর অনুরোধের পরেও হিরণ চুপ করে আছে দেখে তিতা আবার বলল, গবাই আমাদের সেক্রেটারি। তাই পঞ্চাশ টাকা আপনাকে দিতেই হবেক কাকিমা।
‘গবা’ বলেই গোবিন্দকে ডাকে ওর বন্ধুরা। গবাই ফুটবল টুর্নামেন্টের সেক্রেটারি হওয়ায় এবার তিতাদের পঞ্চাশ টাকা চাওয়ার কারণটা বুঝল হিরণ। বলল, আমি তিরিশ টাকা দিমু। বাকিটা তোরা বাড়ি বাড়ি ঘুইর্যা তুইলা ল।
হিরণ ভেবেছিল ওর তিরিশ টাকার প্রস্তাবে বিশু, তিতা, গোবিন্দ রাজি হবে না। কিন্তু ওকে আশ্চর্য করে তিরিশ টাকা নিয়েই ওরা হইহই করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
একটা ব্যাপার দেখে হিরণ বড়ো শান্তি পায়। এ গ্রামে গোবিন্দর বন্ধু হয়েছে প্রচুর। সত্যর আবার একেবারেই বন্ধু নেই। এ গ্রামেও নেই, গ্রামের বাইরেও নেই। বিটি কলেজে পড়তে গিয়ে ওর মাত্র দু-টি বন্ধু হয়েছে যাদের কথা মাঝে মাঝেই সত্য বলে। একজন বাণীব্রত। সে থাকে বিষ্ণুপুরে। আরেকজন গোরাচাঁদ। তার বাড়ি বেলিয়াতোড়ে। এই দু-জন বন্ধু ছাড়া আর কোনো বন্ধুর গল্প সত্যর মুখে হিরণ কখনোই শোনে না। সত্য বরং বলে রাজনীতির কথা। সেজন্যই হিরণের ভয় হয়। চিন্তা হয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছে কি না সত্য, তা নিয়ে। দিনকাল একদমই ভালো নয়। ওর মনে হয় ওদের মতো পরিবারের কারোরই রাজনীতিতে জড়ানো উচিত নয়। রাজনীতির জগৎটা থেকে বরং যত দূরে থাকা যায় ততই ভালো। সত্যর এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত যে কোনোভাবেই হোক একটা চাকরি জোগাড় করা।
গোবিন্দরা বেরিয়ে যেতেই সত্য আবার রাজনীতির কথা বলতে থাকে। বলে যে, বিধানচন্দ্র রায় মারা যাওয়ার পর নাকি সেই ভাবে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা হিন্দু উদ্বাস্তুদের নিয়ে কংগ্রেসের আর মাথাব্যথা নেই। অথচ ওপার বঙ্গ থেকে মানুষের ঢল এসেই চলেছে এ বঙ্গে। উদ্বাস্তুদের অনেকেই শিয়ালদা স্টেশনে নামা মাত্রই নাকি তাদের নেহেরুর সরকার সোজা পাঠিয়ে দিচ্ছে দণ্ডকারণ্যে। সে জায়গা নাকি ঊষর মরুভূমির মতো। বাঁকুড়ায় তো তবু কিছু কিছু চাষাবাদ হয়ে থাকে। দণ্ডকারণ্যে চাষ করার কোনো সুযোগই নেই। বৃষ্টিই নাকি হয় না সেখানে! জল নেই। চাষের জমি নেই।
হিরণ ভাবে, ছোটোবেলা থেকে জল আর মাঠ ভরতি ধান দেখে কেটেছে ওর জীবন। যারা আজ দেশ ছেড়ে আসছে তারাও তো একইভাবে কাটিয়েছে জীবনের অনেকটা সময়। দণ্ডকারণ্যের মতো মরুভূমিতে তাদের ছেড়ে দিলে তারা বাঁচবে কী করে?
তবে সত্য এত কিছু নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে দেখে ওর ভারি আশ্চর্য লাগে। ছেলেটা এক-দেড় বছরের মধ্যেই অনেকখানি পালটে গেছে মনে হচ্ছে। ও সত্যকে জিজ্ঞেস করে, তুই এত সব খবর রাখিস ক্যান? কী কাম এসব খবরে?
সত্য বলে, কাম কিসুই নাই। তবে ইতিহাস লইয়্যা পড়সি তো, চোখের সামনে এত কিসু পরিবর্তন দেইখ্যা আশ্চর্য লাগে। ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ দেখতাসি আমরা। পরে বুঝবা এর মহিমা।
হিরণ বুঝতে পারে, এই সত্য আর আগের সত্য এক নয়। এ এক নতুন সত্য। নানা বিষয়ে তার নির্দিষ্ট মতামত তৈরি হচ্ছে। সে আর হিরণের খোকাটি নেই।
৩৮
গীতার আবার ছেলেই হল। এবার আর কোন্ননগরে যায়নি হিরণ। যাবেই বা কী করে! সারাদিন তো ওকে সামলাতে হয় ঘোঁতনকে। এমনকি এখন হাসপাতালেও ঘোঁতনকে নিয়ে চলে যায় হিরণ। কারণ, বাড়িতে রাখলে ওকে দেখবে কে? ঘোঁতনকে নিয়েই মাত্র এক দিনই গীতার ছেলেকে দেখতে গিয়েছিল হিরণ। সঙ্গে সত্যও ছিল। চমৎকার দেখতে হয়েছে ঘোঁতনের ভাই। ওর ডাকনাম দিয়েছে সত্য। চেহারায় একটু ছোটোখাটো হয়েছে বলে ওর নাম রেখেছে কুট্টি।
ঘোঁতনকে বড়ো করতে করতে আবার যেন নিজের প্রথম মা হওয়ার দিনগুলোতে ফিরে যাচ্ছে হিরণ। যেভাবে ধীরে ধীরে গীতাকে ও বড়ো করেছিল একসময়, সেভাবেই ঘোঁতনকে বড়ো করছে। শুধু গীতার বেলায় ওর মা অনেকখানি দায়িত্ব নিত। এবার হিরণ একা। ঘোঁতনও এক আশ্চর্য ছেলে। মাকে ছেড়ে যে দিদার সঙ্গে আছে, তা দেখে বোঝাই যায় না। ওর কোলের কাছে চুপটি করে শুয়ে থাকে। গল্প শুনতে বড্ড ভালোবাসে। আরও একটা জিনিস করে ও। হিরণের স্তন্যপান করে। বুকে তো দুধ নেই হিরণের। শুকনো বোঁটাই মুখে নিয়ে চুষতে থাকে ঘোঁতন। কেমন যে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয় তখন হিরণের ! সারা শরীরে শিরশিরে এক স্রোত বইতে থাকে। নিজের তিন ছেলেমেয়েকে স্তন্যপান করানোর সময় এমন অনুভূতি হিরণের হয়নি। ওই মানুষটা যখন ওর বুকে মুখ দিত, তখনো এমন অনুভূতি হিরণের হয়নি। এক অন্য অনুভূতি, যা ও কিছুতেই ব্যাখ্যা করে উঠতে পারে না।
পুটপুট করে এখন নানা প্রশ্নও জিজ্ঞেস করে ঘোঁতন। সব সময় সেসব প্রশ্নের উত্তর হিরণ দিয়ে উঠতে পারে না। আজই যেমন সাত ভাই চম্পার গল্পটা ঘোঁতনকে বলছিল হিরণ। এ গল্প হিরণ শুনেছিল ওর মায়ের মুখে। একবার নয়, বহুবার। একই গল্প বারবার মাকে বলতে হত হিরণকে।
মায়ের মুখে শোনা সব গল্পগুলোই এভাবে মুখস্থ হয়ে গেছে হিরণের। সেই গল্পগুলোই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ঘোঁতনকে বলে। একই গল্প বারবার বলে। সাত ভাই চম্পার গল্পটা আজ দ্বিতীয় বারের জন্য ঘোঁতনকে বলছিল হিরণ। তখনই ঘোঁতন ওকে জিজ্ঞেস করে, মানুষ কি ফুল হতে পারে দিদা?
এ-প্রশ্ন শুনে ঘাবড়ে গিয়েছিল হিরণ। এতবার এই গল্প ও শুনেছে, এতবার এই গল্প বলেছে গীতা, সত্য, গোবিন্দকে, কিন্তু, কেউ কোনোদিন ওকে এই প্রশ্ন করেনি। ঘোঁতনের এই প্রশ্ন শুনে হিরণের মনে হয় দিন যত যাচ্ছে ততই কি বাচ্চাদের বুদ্ধি বেড়ে যাচ্ছে ? নাকি বিশ্বাসের যে-সহজ পৃথিবীতে আগে নিশ্চিন্তে, অতি সহজেই প্রবেশ করত শিশুরা, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সেই পৃথিবী ? তাই ঘোঁতনের এই অবিশ্বাস ? তাই ও মেনেই নিতে পারছে না যে, মানুষ কখনো ফুল হয়ে যেতে পারে ? ও চুপ করে আছে দেখে, ঘোঁতন আবার জিজ্ঞেস করে, মানুষ কি সত্যিই ফুল হয়ে যেতে পারে দিদা ?
হিরণ কী বলবে বুঝে উঠতে না পেরে হঠাৎ বলে বসে, অয় বৈকি। মানসেই তো ফুল হয়।
ঘোঁতন এবার বলে, তুমি যে-টগর গাছটা থেকে ফুল তোলো, সেই গাছের ফুলগুলো কি তাহলে সবাই মানুষ ?
হিরণ বলে, হক্কলে ফুল হয় না। মানসের মধ্যে যারা খুব ভালো মানসি, তারাই ফুল হয়।
গৌতম এবার বলে, আমি যদি খুব ভালো মানুষ হতে পারি, তাহলে আমি ফুল হতে পারব তো ?
ঘোঁতনের এই প্রশ্ন শুনে বুক ছ্যাঁৎ করে ওঠে হিরণের। ও বলে, তুমি ফুল হতে যাবা কোন দুঃখে? তুমি আমার মানিক। তুমি আমার বুকের মধ্যি থাকবা।
বলে হিরণ ওর বুকের ভেতরে আরও জড়িয়ে ধরে ঘোঁতনকে। ওর বুকের স্পর্শ পেয়ে আবার স্তন্যপান করতে শুরু করে ঘোঁতন। শরীর শিরশির করে ওঠে হিরণের। মনে হয় এতখানি শান্তি পৃথিবীতে আর কোনো কাজে নেই।
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
ক্রমশ..
আগের পর্ব পড়ুন: হিরণবালা । পর্ব ২০
❤ Support Us








