Advertisement
  • ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
  • জুলাই ২১, ২০২৪

মাটি ব্রতের আখ্যান। পর্ব ৩৫

বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সাধন মাঝে মাঝে ভারী কথা বলে থাকে। রমা ভাবতো, ব্যবসার কাজে কতরকমের মানুষের সাথে চলনবলন করতে হয় সাধনকে। সেই সব সাধুসঙ্গেই বোধহয় এমনতরো ভারিক্কি ভাব জন্মেছে...তারপর

সুধীরকুমার শর্মা
মাটি ব্রতের আখ্যান। পর্ব ৩৫

অলঙ্করণ: দেব সরকার

।। ফলকান্ড ।। 

নিশুতি রাতে

 
সন্তর্পণ আওয়াজ কাঠের পাল্লায়। কড়া ছিল, কিন্তু শব্দটা যে বাজাচ্ছে, সেটা নাড়েনি।
 
সাধন ঘুমাচ্ছিল। সারাদিন খাটনির শেষে রাতের ঘুমটা গাঢ়। লোকে বলতে পারে, বসা কাজ, পরিশ্রম কী ! সাধন জানে কতবার তাকে ভারি গাঁটরি কাঁধে চঙ্গ বেয়ে উঠতে নামতে হয়। বেশ ঝুঁকিরও। বয়সটাতো চল্লিশ পেরিয়ে সুমুখের দিকে। ছেলেটা দশক্লাসের বড়ো পরীক্ষাটায় পাশ ফেল যাই করুক, দোকানে বসিয়ে দেবে। ও হাল না ধরলে কারবারটা যে লাটে ঊঠবে। চাঁড়ালের ছেলের এর বেশি লেখাপড়ার দরকার নেই। ব্যাপারির ছেলেরও তাই। গোপাল যে একইসঙ্গে দুটোই। মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখে সাধন — দোকানটাকে বড়ো করেছে। এখন হকার্স কর্ণারে ভরা বাজার। চন্দ্র রেডিমেডের বড়ো সাইনবোর্ড, প্রোঃ- গোপালচাঁদ মন্ডল। খুড়িমার দেওয়া ছেলের নাম। খুড়িমা এ নামের মধ্যে বেঁচে আছেন। সাধন সুখস্বপ্ন দেখছিল। অবচেতনে নাক ডাকছিল জোরে। দরজার টোকা আওয়াজের চেয়ে নাসাগর্জনের প্রতাপ দড়। সাধন শুনতে পেল না।
 
রমার ঘুম পলকা। মেয়েমানুষের এমনটি নাকি রীত। রমা নারী, যে রমণীই গড়ে তোলে ঘরসংসার, তার নিজের বিশ্বভুবন, পলে পলে, তিলে তিলে। অন্যেরা যাই বলুক রমণীই জানে তার ভাঙা কুটিরে সম্পদের পরিমান অশেষ, কৌশল্যার মতো, সত্যবতীর মতো। ধনাধিকারিণী। কোনও ছুট আঘাতে তার সমৃদ্ধিভান্ডারের প্রাচীর টোল খেয়ে যেতে পারে, এই ভয় তাকে সবসময় জাগ রাখে, চেতন রাখে। রমা শুনতে পেল। ঠক ঠক। দুবার টোকা। কার দরকার পড়লো ? এই রাতে ! পড়শীদের ঘরে কারও হঠাৎ বিপদ। চোখ খোলা রাখে রমা, ভাবে, আরেকবার শব্দের ডাক পেলেই সাধনকে ডাকবে।
 

গোপালের জন্য একটা ঘর তুলতেই হতো। আর ভাঙাগড়া যখন হচ্ছেই তখন আর একটু হোক। দাওয়ার দুপাশে মাটি ফেলে বড়ো করা হয়েছে জায়গাটা, ওঠানো হলো চারচালা ঘর, বাঁশের খুঁটি ফেলে শালকাঠের খোঁটা, বেড়ার ঝাঁপ জানলার বদলে লোহার জাল,কাঠের পাল্লা, দরজায় টানা ঝাঁপটাও কাঠের দোপল্লাকে জায়গা ছেড়ে দিয়েছে। মোট তিনটে বড়ো ঘর, কর্তাগিন্নীর, গোপালের, আর তিননম্বরটি গুদামখানা, কারখানা যা বলা হোক, দোকানের গাঁটরি আর দরজি কাজের সহাবস্থান

 
রমার আগের ঘরের স্থাপত্যটা বদলেছে। অনেকদিন ধরেই স্বামীস্ত্রীতে ভাবনা চলছিল— ছেলে বড়ো হয়েছে, মা বাবার ঘরে শোওয়া ঠিক নয়।সত্যি বলতে এ প্রয়োজনটা ছিল না। হেমশশীর ঘরটা এখন ফাঁকা। তিনি মেঝেতে শুতেন, সে বিছানার কাঁথা-চাদর-সিথেন পাট পাট সাজানো বড়ো একটা কাঠের বাক্সে। ঠাকুমার কাছে গোপাল কতদিন যে রাত কাটিয়েছে ইয়ত্তা নেই। এখন গোপাল অনায়াসেই ও ঘরে যেতে পারে, ভয় ডর লাগলে ভিন্ন কথা। রমা কিছুতেই রাজি হয়নি, বলেছে — ওই ঘরটা আছরম, মায়ের নামে উচ্ছুগ্যু করছি। — ও ঘরে পাতা হয়েছে একটি ছোট চাঁদোয়া খোলা কাঠের সিংহাসন, তাতে বসানো হেমশশীর ফটোটা, শেষশয্যায় শোয়ানো ছবি থেকে কী কায়দায় অজন্তা স্টুডিওর দোকানদার ওটা বানিয়ে দিয়েছে। রোজ ভোর থাকতে উঠে রমা স্নান সেরে ওই ঘর নিকোয়, শ্বাশুড়ির ছবিতে উঠোনে ফোটা টগর, শিউলি, কলকে, পেতি গাঁদার মালা পরায়, সন্ধে বেলায় গলায় আঁচল জড়িয়ে সন্ধ্যারতি দেয়, প্রণাম করে। প্রত্যেকবছর হেমশশীর মৃত্যু তিথিতে কলোনীর যে কজন সুরে বেসুরে কীর্তন গায়, তারা খোল করতাল নিয়ে আসে, আসর বসায়। সে উৎসবে, যাই হোক, খরচ হয়, সবটা রমা নিজের ভান্ডার থেকে বহন করে। সাধনের অধিকার নেই হেঁকে দিয়েছে — তিনি আমার মা। তেনার দিবসী আমারেই করতে লাগবো। তুমার খুড়িমা। তুমি করবা ক্যান? — কাজেই গোপালের জন্য একটা ঘর তুলতেই হতো। আর ভাঙাগড়া যখন হচ্ছেই তখন আর একটু হোক। দাওয়ার দুপাশে মাটি ফেলে বড়ো করা হয়েছে জায়গাটা, ওঠানো হলো চারচালা ঘর, বাঁশের খুঁটি ফেলে শালকাঠের খোঁটা, বেড়ার ঝাঁপ জানলার বদলে লোহার জাল,কাঠের পাল্লা, দরজায় টানা ঝাঁপটাও কাঠের দোপল্লাকে জায়গা ছেড়ে দিয়েছে। মোট তিনটে বড়ো ঘর, কর্তাগিন্নীর, গোপালের, আর তিননম্বরটি গুদামখানা, কারখানা যা বলা হোক, দোকানের গাঁটরি আর দরজি কাজের সহাবস্থান। রমা সাধনকে বলেছিল — কাইল গুপালের বিয়াসাদি দিলে অর শউরবাড়ির অতিথেরা থাকবো কই, ঘাসের উপুরে ? — রমা আবার দরজায় সন্তর্পণ টোকাটি শুনতে পায়, উত্তেজনায় সে কেশে উঠলো। —রমা, এই রমা, শুনতে পাচ্ছিস না?
 
— দলবাধা কুকুরের ঘেউয়ের তরঙ্গ দরজার খুব কাছে এসে পড়েছে, মনে হল রমার। পথের কুকুর, কামড়ানোর সাহস ততটা নেই, এটুকুই ভরসা।
 
ধড়মড়িয়ে উঠে বসতেই হল। গায়ের কাঁথাটা পাশে ফেলেই রমা সাধনকে ঠেলা মারে — এই, শোনতাছো ? উঠো উঠো, আর নাক ডাকাইয়ো না।
 
সাধন চোখ মেলে, অন্ধকার, শুধু বউয়ের নিঃশ্বাস কাছে পায় — উঁ, কী হইছে?
 
— বায়রায়। কে য্যান আইছে। বিপুদাপুদ কারো হইছে মনে লয়। উঠো। আমি কুপিখান ধরাইতাছি। তুমি আলোখান ধইরো। দেইখো, আমার মুশারি ঝোলতাছে। নজর রাইখো। আমি দুয়ারে যাই।
 
— কে আসিছে?
 
— সাবুধান, রমা। হাতদাওখান নেও। বাটামখান কই গেল?
 
— ধুরঅ! ভীতুর ডিম্বা! কুপিখান তুইল্যা ধরো দেখি।
 
দরজা খুলতেই আগন্তুক দ্রুত ভিতরে ঢুকে যায়। নিজেই দরজাটা বন্ধ করে। এবার তাকে দেখে গেল।
 
— আনিছুরদাদা, তুমি ! — রমার কথা সরে না। সাধন অপলক চেয়ে থাকে আনিসুরের মুখে।
 
— আমি ভোরের আগেই চলে যাবো রে, রমা। তোদের বিপদে ফেলবো না। আর তেমন যদি হয়, — আনিসুর ঢোলা ফুলপ্যান্টের ভিতর পকেটে হাত ঢোকায়, রিভলভারটি বের করে।
 
— ওইখান থোও, আনিছুরদাদা। ওইয়ার দরকার নাই। আর তুমি ভয় পাওনের মানুষ নও, দাদা, কুনুদিনঅই। তয়? যাও, আইছিলা কই?
 
— অনিমেষের কাছে। দেখা হলো না। ওরা বোধহয় খবর পেয়ে গেছিল। নজরে রাখছিল ওকে। অনিমেষ সেফ এরিয়ায় চলে গেছে। ওরা, মনে হয়, আমাকে দেখে সন্দেহ করেছিল, পিছন পিছন আসছিল কজন। আমি তোদের কলোনিতে ঢুকে যাই। এখানে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে এমন দুটি ছেলে আছে। ওদের ঘরটা জানা নেই। তোদের ঘরে নিতাইদার হুকুমে একবার এসেছিলাম। তাই আন্দাজ করে…।
 
— আর কইতে লাগবো না। জিগাই, রাইতে কিছু খাইছো ? তোমার ভাইনজায় কড়কড়া ভাত খাইবো বায়না ধরছিল। রইছে। আর বুয়াল মাছের ঝুল। আগে খাও, খাইয়া ঘুমাও। সব বেবুস্থা করতাছি। কাইল ভুরের আগে ডাইক্যা তুলুম। তুমার বুনাই তুমারে টিরনে তুইল্যা দিবো।
 
রমা আনিসুরকে প্রথমে গুদাম ঘরে ঠেলে পাঠায়। তারপর দ্রুত হেমশশীর ঘরটি খুলে দুজনের জন্য ঢালা বিছানা পাতে, ভাতের হাঁড়ি, থালা, বাটি, গেলাস, মাটির কলসিভরা জল রেখে যায়, তারপর সাধন আর আনিসুরকে পাঠিয়ে দিয়েছে ঘরে।
 
মালা গলায় হেমশশী ঠাকুরানী দুচোখ মেলে চেয়ে দেখতে থাকেন ওদের, সর্বংসহা মা আছেন প্রহরায়।
 

♦—♦♦—♦♦—♦♦—♦

ক্রমশ…
 
আগের পর্ব পড়ুন: পর্ব ৩৪

মাটি ব্রতের আখ্যান। পর্ব ৩৪


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!