- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- জুলাই ৬, ২০২৫
পথ ভুবনের দিনলিপি। পর্ব ১১
লেপচা জগত
পাহাড়ের মানুষরা ফুল ভালোবাসেন ভালোবাসার খুশিতে ৷ দেবতার পায়ে নিবেদন করে আত্মস্বার্থ চরিতার্থ করার আশায় ফুলগাছ বোধহয় পোঁতেন না তাঁরা ৷ তাই তাঁদের ফুলপ্রীতির জোর বেশি, ফুলের প্রতি যত্ন ও আগ্রহও বেশি ৷ যতবার পাহাড়ে গিয়েছি , সেখানকার গৃহস্থের ঘরদোরের থাকে থাকে সাজানো ফুলের গাছ দেখে এমনটাই মনে হয়েছে আমার ৷ পাহাড়িদের বসতিতে ফুল থোকা হয়ে দোলে ৷ কেউ ছেঁড়ে না ৷ সময় পুরোলে ঝরে যায় ৷ রাস্তায় পড়ে থাকা ফুল মানুষ দলে না–এ আমি কতবার দেখেছি ! এখানের ফুল মানুষের জন্য ৷
এবারে যখন লেপচা জগত গেলাম, ইচ্ছে করেই একেবারে গায়ে গায়ে লেগে থাকা বাড়িঘরের মাঝেই একটি হোমস্টে ভাড়া নিয়েছিলাম ৷ কেবল রান্নাঘরে নামার সিঁড়ির মুখ থেকে পাহাড় দেখা যায় ৷ যুবক মালিক অবাক হয়ে বললেন–
পাশেরটাও আমাদের ৷ পাহাড়ের ভিউ ভালো পাবেন ৷ এখানে আপনার ঘরের পাশে দোতলা বাড়ি ৷ দুপুরের সামান্য রোদও পাবেন না ৷
ঠিক করুন -কোনটা নেবেন ৷
আমি তাকে বলেছিলাম, লোকের মাঝেই থাকব ৷ লোকের সংসার দেখব ৷ লোক ছাড়া পাহাড় আকাশের তফাত শুধু উচ্চতায় ৷
কম কথা বলা যুবকটি বড় দুটো চোখ মেলে রেখেছিল ৷ পাহাড়ের মানুষ বড্ড কম কথা বলে ৷
দুপুরে ঘরের বিছানা থেকে দেখলাম, রঙিন কাপড়কে টুপির মতো করে পরেছেন বছর সত্তরের এক মহিলা ৷ তাঁর বাড়ির ছাদ দিয়ে একটা ঢালু রাস্তা একদম নীচে নেমে গেছে ৷ একটা কলের কাছে এসে থেমেছে ৷ সিঁড়িহীন ওই স্লিপ রাস্তার থামে পরপর ফুলের গাছ ৷ আর ছাদেও প্রচুর ৷ বাহারী টব, তবে দামি কিছু নয় ৷ একটু পরেই সূর্য চলে যাবে ৷ বৃদ্ধা নীচ থেকে জল টেনে টেনে আনছিলেন ওপরে ৷ তখনো গাছে জল দেওয়া শেষ হয়নি ৷ বিকেল গড়াতে দেখলাম, এক বৃদ্ধ দ্রুত হাতে কাগজের ছোট্ট ছোট্ট টোপর বানাচ্ছেন আর সেগুলো এক একটি ফুটন্ত ফুলের গায়ে পরিয়ে দিচ্ছেন ৷ ছেলেবেলায় পুতুলের বিয়েতে বরপুতুলগুলোকে যে সাইজের টুপি পরাতাম, ওইরকম ৷ আমাদের হোমস্টের রাঁধুনী একটি লাল টোপা গালের কিশোর মেয়ে ৷ এত বব চুল ,কোট পরে যখন সে দৌড়ে দৌড়ে টুরিস্টদের চা খাবার দিচ্ছিল বাচ্চা ছেলে বলে মনে হচ্ছিল ৷ গিয়েই তার গাল বেশ কয়েকবার টিপেছিলাম আমি ৷ সেই আমায় বলল– রাতে কুয়াশায় ফুল মরে যায় ৷ তাই টোপর পরিয়ে রাখতে হয় ৷ রোদ এলে টোপর খুলে ফুল বাইরে আনতে হয় ৷ আমি বললাম, টোপর তো বিয়ে শেষ হলে বর খোলে ৷ এখানে কি তবে ফুলের সঙ্গে চাঁদের বিয়ে হয় ? এতগুলো ফুলবরের একটা চাঁদবউ ?
টোপাগাল ভালো ইংরেজি জানত ৷ আমার কথায় ফিক করে হাসল ৷ তারপর চিৎকার করে ছাদের বুড়ো বুড়িকে কী যেন বলল ৷ বর ও বউ আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন এবং হাত নাড়লেন ৷ দেখলাম, মানুষের সঙ্গে কথা বলতে বলতেও ফুল বাঁচানোয় ইচ্ছের তীব্রতা কমছে না তাঁদের ৷ কথা বলছেন আমার সঙ্গে ৷ আঙুল আদর দিচ্ছে ফুলকে ৷ আধেক হৃদয় সবসময় ফুলরাজ্যে ৷
রাতে ঘুমের মাঝে সামান্য গোলমাল শুনেছিলাম ৷ সকালে উঠেই পাহাড়ী পথে হাঁটতে চলে গিয়েছিলাম ৷ এইসময় আমি খুব মগ্ন থাকি ও লোক এড়াই ৷
ফিরেছি ৷ তখন কটা হবে ? এই দশটা সাড়ে দশটা ৷ ঘর থেকে দেখলাম, ঝলমলে রোদে ফুলের টোপর খুলছেন বুড়ি ৷ আর ঠাণ্ডামাখা সূর্যে ফুল নতুন জন্ম পাচ্ছে ৷ এতক্ষণ চোখের আড়ালে ছিল বলেই রঙে রঙে পৃথিবীর চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছিল বুড়োবুড়ির ফুল ৷ কী রঙ কী রঙ ! বুড়ির চোখ নিবিড় হয়ে ফুলে ডুবে আছে ৷
ফোঁপানীর শব্দে মুখ ফেরালাম ৷ টোপা গাল কাঁদছে যে !
– দিদি রাতে বুড়োর বুকে ব্যথা হচ্ছিল ৷ শিলিগুড়ির হাসপাতালে ওই রাতেই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ৷ কিছু আগে খবর এল…!
আজ থেকে মাঝরাতে কুয়াশা পড়লে বুড়োর সঙ্গে ফুলের বিয়ে হবে ৷ আমি নিশ্চিত,পাটরাণী রোজ সে বিয়ের আসর সাজাবে ৷
ও বিবিজানেরা, মোর কাছে শুনে নাও গো
ফুল প্রেমলিঙ্গ –
জনমে তার যৌবন
মরণে মহাযৌবন ৷
♦·♦–♦·♦♦·♦–♦·♦
ক্রমশ..
আগের পর্ব পড়ুন: পথ ভুবনের দিনলিপি । পর্ব ১০
❤ Support Us








