- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- জুলাই ২০, ২০২৫
পথ ভুবনের দিনলিপি। শেষ পর্ব
তাবাকোশী
জীবন নিয়ে হয়ত ভাবি না আমরা ৷ যত্নই বা নিতে পারি কতটুকু ! বুঝতে চাই না মৃত্যুকেও ৷ আমরা আসলে দেখতে চাই জীবন মৃত্যুর প্রেমকাল৷ আমাদের সীমায়িত দৃষ্টি কেবলই খুঁজে যায় জীবন থেকে মরণে মানুষের চলে যাবার পথটুকুকে ৷
আজ বেলা এগোরাটা নাগাদ যখন পাহাড়ের গায়ে লেখা সূর্যটাকে ছেড়ে গ্রামীন স্কুলগুলো দেখার জন্য তাবাকোশী গ্রামের পথ ধরেছিলাম তখন অবাক হয়ে দেখেছিলাম, মেঘের গায়ে চাঁদের রঙ লেগেছে ৷ মেঘের ছায়া দেখতেই অভ্যস্ত আমাদের চোখ ৷ মেঘ যে আলো দিতে পারে, সেই আলোয় লম্বা লম্বা পাইন গাছগুলোর কালচে সবুজ যে নিমেষে টিয়াপাখি হয়ে যেতে পারে, কখনো — বিশ্বাস করুন, কখনো এমন দেখিনি ৷ পাইনের এক একটি পাতা যেন একটা একটা বাচ্চা টিয়া ৷ চারদিক থেকে আমাকে ছেঁকে ধরছিল পাইনটিয়ার দল ৷ ফেলে আসা সূর্যটাকে আর ভাবতেই পারছিলাম না ৷ জোর করে কল্পিত রঙডালি থেকে মনটাকে যতবার সরাতে যাচ্ছিলাম, হচ্ছিল আর না ৷ ওই বিচিত্র আলো আমায় প্রথমবার মৃত্যুবোধ দিল ৷ মনে হচ্ছিল, জীবন ছেড়ে নতুন জগতে এসেছি আমি ৷ এই জগতেই যেন আমি স্বচ্ছন্দ সুখী থাকব ৷ জীবনের মতো মৃত্যুর জগতেও বাঁচার পূর্ণ হক আছে আমার ৷ আগের জগত ভুল ছিল আমার জন্য ৷ জানেন, পাহাড়ের গায়ে যে সূর্যকে একটু আগে এত উজ্জ্বল লাগছিল, তাকে মনে হচ্ছিল একটি চ্যাটচ্যাটে আলোর কুপি ৷ কী সাংঘাতিক লোভ জাগছিল মৃত্যুকে দেখতে ! থাকি — থাকি না একটু মৃত্যুর আলো মেখে !
আমার মুখে কি বিকট অসম্ভব কিছু কাতর ভাব জেগেছিল ৷ বৌদ্ধ ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে বললেন, আপনি কি কিছু দেখতে চাইছেন ? ইচ্ছে হলে জায়গাটা ঘুরে দেখুন ৷ ওই দেখুন — পাহাড়ের নীচের ওই ধাপটায় দুটো ঘর ৷ ওগুলো আমাদের শ্মশান ৷ কিন্তু আমরা গাঁয়ের মানুষ ওখানে মানুষ পোড়াই না ৷ নীচের দিকের গাছগুলোর ফাঁকে একটা চওড়া জায়গা খুঁজে বার করি আর তারপর নিজের পছন্দের জায়গায় নিজের মানুষ পোড়াই ৷ মানুষ মরণে যাবে আকাশ গাছ দেখতে দেখতে ৷ শ্মশানঘরের দেওয়াল দেখতে দেখতে তাকে যেতে দেব কেন !
শ্লথ শরীরে ফের চলছি ৷ নিস্তব্ধ পথে দু একটি মানুষ দেখা গেল ৷ কাঁধের পিছনে বেতের ঝুড়ি, তার মধ্যে জ্বালানী কাঠ ভরা ৷ দেখলাম, অতখানি ভার বওয়ায় ভারসাম্য রাখার জন্য প্রত্যেকে মাথার পিছনে ত্রিভূজ আকারে হাত রেখে চলেছেন ৷ গায়ে তাঁদের সেই অচেনা মেঘমাখা শশীকলা ৷ হা হা — যাত্রা এত্ত সুন্দর -এত সৎগন্ধ মাখা !
পৃথিবী আজ চোখের সামনে শত চন্দ্রে টুকরো হয়ে গেল ৷ হয়ত তার কোনো এক টুকরো আমি ৷ ভগবান বুদ্ধের এক সাধারণ শিষ্য আমায় বুঝিয়ে দিতে লাগলেন, মরণেরও জীবন আছে ৷
গ্রামের বউরা তখন পথের ধারে পোয়াতী পাখিকে রান্না করা ডাল ভাত খাওয়াতে বসেছে ৷ দুমাস রান্না খাবার খেলে ডিমের স্বাস্থ্য ভাল হয় ৷ পাখির প্রজাতি বিলুপ্ত হয় না ৷
♦·♦–♦·♦♦·♦–♦·♦
আগের পর্ব পড়ুন: পথ ভুবনের দিনলিপি । পর্ব ১২
❤ Support Us







