- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- ডিসেম্বর ২১, ২০২৫
দন্দিরহাটের নাট্যমগ্ন কিশোর
জীবনের দর্শন অনুসন্ধান আর অনুধাবন ছিল তাঁর কর্মে আর মর্মে । শব্দ, সময় এবং প্রকৃতি । এই তিনের ভিন্নতর খোঁজই প্রতিবিম্বিত হয়েছে মনোজ মিত্রের যাপনে,অভিনয়, শিক্ষকজীবনে, নাট্যরচনায় । প্রয়াত নাট্যকার এবং অভিনেতার ৮৬ তম জন্মদিনের প্রাকমুহুর্তে, বাংলাদেশের ধুলিহর গ্রাম থেকে এসে এপাড়ের দন্দিরহাটে তাঁর কৈশোরবেলা, হয়ে ওঠার চিত্রপট, ফিরে দেখলেন স্বদেশ ভট্টাচার্য
ধুলিহর থেকে দন্ডিরহাট। নিজভূমি থেকে অন্যদেশ, পরবাসে। ১৯৫০ সাল। দন্ডিরহাট নগেন্দ্রকুমার উচ্চ শিক্ষা নিকেতনের ক্লাস সেভেনে এসে যে ছেলেটি ভর্তি হলো, সে সপ্রতিভ। ‘বাপ পিতেমো’–র ভিটে ছেড়ে নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ, নতুন স্কুল আর নতুন বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে সহজেই মিশে গেল সে। স্কুলের শিক্ষক থেকে সহপাঠী সবার মন জয় করে নিল মনোজ। মনোজ মিত্র। বাংলা নাটকের মহীরুহ। যাঁর মনে নাটকের বীজ বপন হয়েছিল হয়তো বা দন্ডিরহাট গ্রাম থেকেই। মনোজ মিত্রের বহু স্মৃতি জড়িয়ে আছে দন্ডিরহাটে। মনোজ মিত্রের ভাই অমর মিত্রের একটি লেখায় ধুলিহরের বর্ণনা পাওয়া যায় এমনভাবে —
‘ধুলিহরের ডাক নাম ধুরোল। ধুলিহর তখন ছিল পূর্ব পাকিস্তানের খুলনা জেলায়, অধুনা বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলায়। সে গ্রাম সাতক্ষীরা শহর থেকে দু-আড়াই কিলোমিটারের বেশি হবে না। ধুলিহরে সাত পুরুষের ভিটে ছিল।’
দেশভাগের পর সাতক্ষীরা থেকে বসিরহাটের দন্ডিরহাট গ্রামে একান্নবর্তী সংসার পাতে মিত্র পরিবার। দন্ডিরহাট বসিরহাট শহর থেকে সাড়ে চার কিলোমিটার দূরের গ্রাম। বসিরহাট পৌরসভার অন্তর্গত। সে গ্রামে সপ্তম শ্রেণীতে এসে ভর্তি হলেন কিশোর মনোজ।

নগেন্দ্রকুমার উচ্চ শিক্ষা নিকেতনে, এই স্কুলেই পড়তেন নাট্যকার
স্কুলের প্রধান শিক্ষক অমরনাথ ভট্টাচার্য। স্কুলের দেওয়াল পত্রিকা বের হয়। তাতে লেখে মনোজ। স্কুলে নাটক হয়, তাতেও অংশ নেয় বাস্তুচ্যুত ছেলেটি। আবৃত্তি, হাস্যকৌতুকেও সে সাবলীল। রোগাটে চেহারার ভদ্র, শান্ত অথচ মিশুকে মনোজের সবার প্রিয় হয়ে উঠতে সময় লাগেনি। দেশভাগের পর, ধূলিহরের পাট চুকিয়ে উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটের দন্ডিরহাটের চৌধুরিপাড়ায় জমিজমা কেনেন মনোজ মিত্রের বাবা, কাকারা। সে জমিতেই ইটের পাঁজা পুড়িয়ে একতলা বাড়িও তৈরি হয়। ওই বাড়িতেই কাটে মনোজ মিত্রের বাল্যকাল, কৈশোর। ১৯৫৪ সালে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষায় বসেন। মার্টিন কোম্পানির রেলে চেপে বসিরহাট হাইস্কুলে পরীক্ষা দিতে যেতেন তাঁরা। বাবার বদলির চাকরির সুবাদে স্কুল ফাইনাল পাশ করে কলকাতায় চলে যান মনোজরা। তার পরেও, দন্ডিরহাট গ্রামের সঙ্গে আত্মার সে যোগাযোগ চিরঅক্ষয় হয়ে থাকে।
বড়ো বড়ো বাগান ঘেরা দন্ডিরহাট আর তার আশপাশ। যুগের নিয়মে অনেকটা পাল্টে গেছে ঠিকই, তবু আজও শহরের আঁচ তেমনটা লাগেনি। আম, জাম, জামরুল, নারকেল, সবেদা, ফলসা, বাতাবি লেবুর গাছে গাছে বাবলা, দোয়েল, টিয়া, ন্যাজঝোলা পাখির দল আজও খেলা করে, গান গায়। ঠিক যেন ‘বাঞ্ছারামের বাগান’-এর আত্মা। যা থাকে চিরটাকাল, অক্ষয়, অভঙ্গুর
বসিরহাট শহর থেকে কিছু দূরে দন্ডিরহাট, নলকোঁড়া, ধলতিথা। তিনটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম। শিক্ষা, সংস্কৃতিতে আলোর পথযাত্রী। তিন গ্রামেই নাটকের চর্চা হতো। বালকবেলা থেকেই মনোজের নাটকের প্রতি প্রবল আকর্ষণ। নাটক পাগল বলতে যা বোঝায় আরকি ! স্কুলের সামনে ‘ধনাদা’–র ছোট্ট দোকান। স্কুলের ছেলেমেয়েরাই ‘ধনাদা’র দোকানের খদ্দের। ঘুগনি, আলুর দম, পাউরুটি, লজেন্স, বিস্কুট, ছোলা, বাদাম ভাজা, আচার। নারকেল পাতার কাঠিতে আলুর টুকরো গেঁথে খাওয়া। ধনাদার সেই আলুর দমের গন্ধ, স্বাদ এখনো দন্ডিরহাট, নলকোঁড়া গ্রামে প্রবীণদের মুখে লেগে আছে।
ধনাদার দোকানে বসার জায়গা ছিল বাঁশের চটা দিয়ে তৈরি ধরাট (বেঞ্চ)। সেখানে বসে চলত আড্ডা। ধনাদার দোকান নিয়ে ছাত্র মনোজ লিখেছিলেন নাটক ‘ধনাদার ধরাট’। স্কুলে সেটা অভিনয়ও করেছিলেন সহপাঠীদের নিয়ে।
স্কুলের সামনে বসু বাড়ির পুজোর দালানের সামনে মঞ্চ বেঁধে নাটক হতো । তখন এ তল্লাটে বিদ্যুৎ আসেনি, পেট্রম্যাক্সের আলোয় চলতো অভিনয় । সে আমলের মাস্টারমশাই ক্ষেত্রদাস বিশ্বাস ছিলেন মঞ্চের ব্যাপারে সর্বেসর্বা । আর ছিলেন রামপ্রসাদ প্রামানিক । বাড়ি বাড়ি ক্ষৌরকর্ম করতেন অর্থাৎ পেশায় নাপিত । রাতের বেলায় তিনি হ্যারিকেন হাতে নিয়ে ছেলেদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ডেকে নাটকের রিহার্সালে নিয়ে যেতেন । গ্রামে ‘শাজাহান’ নাটকে দিলদার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন মনোজ মিত্র । ‘সাবিত্রী সত্যবান’ নাটকে ‘ফিমেল’ রোল সাবিত্রীও করেন মনোজ ।
সহপাঠী বরুণ ভট্টাচার্য ছিলেন মনোজের খুব কাছের বন্ধু। বরুণবাবু এখন মনোজ মিত্রের কাকার অংশ কিনে বসবাস করছেন। একই দেওয়ালের ওপাশেই মনোজ মিত্রদের অংশে থাকেন মুরারীমোহন মিত্র পরিবার নিয়ে। বাড়িটি চেহারা অনেকখানি বদলে গেছে। সামনের বারান্দা ঢাকা পড়েছে। মনোজ মিত্রের সহপাঠী বরুণবাবু স্মৃতিতে ভাসেন। উঠে আসে মণিমুক্ত। বলেন, ‘নাটকের প্রতি ওর ছিল উৎসাহ প্রবল। বরাবরই ভাবুক প্রকৃতির। এজন্যই বোধহয় ‘দর্শন’ ছিল মেধাবী মনোজের প্রিয় বিষয়। মানুষকে খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে দেখেছি ওকে। গাঁয়ের মানুষের চলা ফেরা, কথা বলা , চাউনি এসব আত্মস্থ করতে পারত সহজেই। গ্রামে তখন ‘বালক কীর্তন’ হতো। সে সব দেখার আগ্রহ ছিল খুব।’ তিনি বলেন, স্কুলের সামনে বসু বাড়ির পুজোর দালানের সামনে মঞ্চ বেঁধে নাটক হতো। তখন এ তল্লাটে বিদ্যুৎ আসেনি বা জেনারেটরের চলন হয়নি। পেট্রম্যাক্সের আলোয় অভিনয়। সে আমলের মাস্টারমশাই ক্ষেত্রদাস বিশ্বাস ছিলেন মঞ্চের ব্যাপারে সর্বেসর্বা। মঞ্চের খুঁটিনাটি, পেট্রম্যাক্সে তেল ভরা, পাম্প দেওয়া সবই নিজের হাতে ‘কন্ট্রোল’ করতেন ক্ষেত্রবাবু। আর ছিলেন রামপ্রসাদ প্রামানিক। বাড়ি বাড়ি ক্ষৌরকর্ম করতেন অর্থাৎ পেশায় নাপিত। রাতের বেলায় তিনি হ্যারিকেন হাতে নিয়ে ছেলেদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ডেকে নাটকের রিহার্সালে নিয়ে যেতেন। গ্রামে ‘শাজাহান’ নাটকে দিলদার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন মনোজ মিত্র। ‘সাবিত্রী সত্যবান’ নাটকে ‘ফিমেল’ রোল সাবিত্রীও করেন মনোজ। সেই প্রথম পেট্রম্যাক্সের বদলে জেনারেটরের আলোয় আলোকিত দন্ডিরহাট গ্রাম। সাবিত্রী চরিত্রে মনোজের অভিনয় নজর কেড়েছিল। নাটকের বাইরে, মনোজের আরেকটা ব্যাপারেও খুব আগ্রহ ছিল। সপ্তাহে দু-দিন বসতো ফকিরহাট, আর ইটিন্ডার মোড়লের হাট। এ তল্লাটের মানুষের কাছে হাটের গুরুত্ব ছিল খুব। হাটবারে গ্রামের নানা লোকের আনাগোনা ছিল সেখানে। মনোজকে প্রায়ই দেখা যেত চুপিচুপি হাটে যেতে।

দন্ডিরহাট গ্রামে মনোজ মিত্রের পৈত্রিক বাড়ি
সুশীল চ্যাটার্জি, বরুণ ভট্টাচার্য, সুরথ বসু, বিমলেশ ভট্টাচার্য প্রমুখের সঙ্গে হৃদ্যতা আমৃত্যু। দন্ডিরহাটের কবি জয়ন্তী চ্যাটার্জির কাছে শোনা, একবার পাড়ায় ‘রোগের চিকিৎসা’ নাটকে একটা জ্যান্ত হাঁস জামার ভেতরে নিয়ে মঞ্চে উঠেছিলেন মনোজ। অভিনয়ের শেষে দেখা গেল হাঁসের নখের আঁচড়ে তাঁর পেট ও বুক ক্ষতবিক্ষত, রক্ত ঝড়ছে অনর্গল।
নাটকের প্রতি এমনই ছিল মনোজ মিত্রের নিবেদিত প্রাণ। কলকাতায় অভিনয়ে ব্যস্ত হয়েও বাল্যকালের গ্রামকে, এক মুহুর্তের জন্য নিজের থেকে আদালা করেননি। বহুল পরিচিতির শিখরে থেকেও গ্রামের নাটকে অভিনয় করেছেন বহুবার। একবারের ঘটনা, দন্ডিরহাটের ‘গৃহপ্রবেশ’ নাটকে অভিনয় করবেন তিনি। কিন্তু ব্যস্ততার জন্য রিহার্সালে আসতে পারবেন না। গৃহকর্ত্রীর চরিত্রে জয়ন্তী চ্যাটার্জি। মাছের ব্যবসায়ী চরিত্রে মনোজ মিত্র। অনুষ্ঠান বাড়িতে মাছ নিয়ে আসবেন তিনি। জয়ন্তী চ্যাটার্জি বললেন, ‘ওঁর সঙ্গে আমার অনেক সংলাপ আছে। কিন্তু রিহার্সালে ওনাকে পাই না। আমি ভয় পাচ্ছি দেখে উনি আমায় অভয় দিয়ে বললেন, ভয় পাসনে, আমি তোকে সংলাপ বলিয়ে নেবো। সত্যি উনি বলিয়ে নিয়েছিলেন, আমার কোন অসুবিধা হয়নি।’ আরেকবার গ্রামের ছেলেদের নিয়ে নিজের লেখা ‘চাক ভাঙা মধূ’ অভিনয় করেছিলেন।
ধূলিহর থেকে দন্ডিরহাট — শৈশব-কৈশোরের গ্রামের কথা, মানুষের মুখের ভাষার ব্যবহার তাঁর নাটকে করেছেন। ‘চাক ভাঙা মধূ’ নাটকে বাদামীর সেই সংলাপ মনে পড়ে — ‘আজ তিন দিনের মধ্যি তুমি এট্টা দানাও জোটাতি পারলে না।.... মরুক, কোন রাক্কোস এয়েছে প্যাটে– মরুক।’ অথবা সাজানো বাগান নাটকে বাঞ্ছারাম কাপালির গলায়, ‘এট্টা কথা বলি কত্তা; আমি মরতি পারব না ! আজ্ঞে বাচ্চাটার পরে বড্ড মায়া পড়ে গেছে। আমি ওরে নাড়ি কেটে ধরায় এনেছি, এখন ওরে ভাসায়ে আমি যাব কী করে ? কত্তা, আমি আর মরতি পারব না।’ আবার নয়নতারা যখন বলে, ‘দেবা ? কটা টাকা আমারে দেবা ছকুদা ? ভাইডারে চিকিচ্ছে করাতে পারি। এতখানি বয়স হলো, এখনো দু-পায়ে ভর দে দাঁড়াতি পারে না...।’ ঠিক এইরকম ভাষার টানেই তো কথা বলতে এখনো শোনা যায় দন্ডিরহাট, ধলতিথা, নলকোঁড়ার বিস্তীর্ণ জনপদে।
বড়ো বড়ো বাগান ঘেরা দন্ডিরহাট আর তার আশপাশ। যুগের নিয়মে অনেকটা পাল্টে গেছে ঠিকই, তবু আজও শহরের আঁচ তেমনটা লাগেনি। আম, জাম, জামরুল, নারকেল, সবেদা, ফলসা, বাতাবি লেবুর গাছে গাছে বাবলা, দোয়েল, টিয়া, ন্যাজঝোলা পাখির দল আজও খেলা করে, গান গায়। ঠিক যেন ‘বাঞ্ছারামের বাগান’-এর আত্মা। যা থাকে চিরটাকাল, অক্ষয়, অভঙ্গুর। বাংলা নাটকের দিকপাল, মর্মভেদী অভিনেতার কিশোরবেলা জানান দেয় ‘আছি’। সেসব দিনের অজস্র অমলিন স্মৃতি আজও ভেসে বেড়ায় ইছামতীর বাতাস লেগে। স্বজন হারানোর ব্যথায় তারা খুঁজে ফেরে প্রিয় মনোজকে।
♦•♦♦•♦♦•♦
❤ Support Us








