- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- মে ২১, ২০২৩
মাটির তলার হলঘরের দেওয়ালই অনুপ্রেরণা আমনের
কাজাখস্থানের তাসখন্দে অনুষ্ঠিত এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে পুরুষদের ৫৭ কেজি বিভাগে সোনা জিতেছেন ১৯ বছর বয়সী আমন সেহরাওয়াত
দিল্লির ছত্রসাল স্টেডিয়ামে একটা বিশাল ভূগর্ভস্থ হলঘর আছে। আগে এই বিশাল ভূগর্ভস্থ হলঘরকে আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং হল হিসেবে ব্যবহার করা হত। এখন সেখানে শিক্ষানবীশ কুস্তিগীরদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেই হলঘরের দেওয়াল হল ভারতীয় কুস্তিগীরদের কাছে স্বপ্নের মতো। ম্যাটের পাশাপাশি এই হলঘরের দেওয়াল তরুণ কুস্তিগীরদের কাছে অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করে। উত্তর দিল্লির কুস্তি প্রতিষ্ঠানের হলঘরের দেওয়ালে বেশকিছু কৃতি কুস্তিগীরের ছবি ফ্রেমবন্দী করা আছে। এদের বেশিরভাগই বিশ্ব পদকজয়ী।আছেন এক প্রাক্তন অলিম্পিক পদক জয়ীও।
একদিন ছত্রসাল স্টেডিয়ামের এই বিশাল হলঘরে আমন সেহরাওয়াতকে নিয়ে গিয়ে দেওয়ালের ছবিগুলো দেখাচ্ছিলেন সেখানকার কোচ পরভীন সিং। আর বলছিলেন, ‘এই দেওয়ালে ছবি তোলা সহজ নয়। এখানে নিজের ছবি দেখতে হলে অলিম্পিককে কিংবা বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে পদক জিততে হবে। অথবা অর্জুন পুরস্কার পেতে হবে। যদি এই দেওয়ালে ছবি তুলতে চাও, এই তিনটে শর্ত পূরণ করে এসো।’ পরভীনের কথা শুনে সেদিনও আমন সেহরাওয়াত প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, দেওয়ালে ছবি তুলবেনই। সেই জেদই এগিয়ে নিয়ে গেছে ভারতের এই তরুণ কুস্তিগীরকে।
হলঘরের দেওয়ালে কার কার ছবি আছে জানেন? দু’বারের অলিম্পিক পদক বিজয়ী সুশীল কুমার, অলিম্পিক ব্রোঞ্জ পদক বিজয়ী যোগেশ্বর দত্ত, চারবারের বিশ্ব পদক বিজয়ী বজরং পুনিয়া, অমিত দাহিয়া, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে পদক পাওয়া সর্বকনিষ্ঠ ভারতীয় এবং সম্প্রতি টোকিও অলিম্পিকে রুপোজয়ী রবি দাহিয়ার। অনুশীলনের সময় যাদের মুখ প্রশিক্ষনার্থীদের চোখের সামনে সবসময় ভাসে। আর এদের ছবি দেখেই উদ্বুদ্ধ হয়।
ছত্রশাল স্টেডিয়ামের ট্রেনিং হলের দেওয়ালে এখনও আমনের ছবি নেই। তবে খুব বেশিদিন দেওয়ালে তাঁর ছবি ওঠা থেকে আটকে রাখা যাবে না। ২০২২ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহন। স্পেনে অনুষ্ঠিত সেই অনুর্ধ্ব ২৩ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ইতিহাস সৃষ্টি করে প্রথম ভারতীয় হিসেবে সোনা জেতেন। ভেঙে দিয়েছিলেন অলিম্পিক এবং বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে পদকজয়ী বজরং পুনিয়া এবং রবি দাহিয়ার রেকর্ড। দুজনেই অনূর্ধ্ব ২৩ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে রুপো জিতেছিলেন। স্পেনে অনুর্ধ্ব ২৩ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে নামার আগে দু’দুবার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন আমন সেহরাওয়াত।
বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতার গন্ডি পেরিয়ে এবার সিনিয়রদের দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করেছেন হরিয়ানার এই তরুণ কুস্তিগীর। এবছর কাজাখস্থানের তাসখন্দে অনুষ্ঠিত এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে পুরুষদের ৫৭ কেজি বিভাগে সোনা জিতেছেন ১৯ বছর বয়সী আমন সেহরাওয়াত। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক পদক ঘরে তুলেছেন। ২০২২ সালে অনূর্ধ্ব ২৩ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ৫৭ কেজি বিভাগে ব্রোঞ্জ ছাড়াও রয়েছে ওই বছর তিউনিসিয়া র্যাঙ্কিং সিরিজে ৫৭ কেজি বিভাগে রুপো। এছাড়া জাতীয় স্তরে পদক জিতেছেন ২০২০ ও ২০২১ জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা। এশিয়া পর্যায়ে সোনা জেতার পর আমন সেহরাওয়াতের লভ্য এবার ইউরোপ, আমেরিকা মহাদেশের প্রতিযোগীদের বিরুদ্ধে সাফল্য। এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জেতার পর আমন বলেন, ‘সিনিয়র পর্যায়ে আমার সোনার পদক এশিয়ান পর্যায়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং ইউরোপে আরও শক্তিশালী কুস্তিগীর রয়েছে। এবার আমাকে তাদের বিরুদ্ধে সাফল্য পেতে হবে।’

কাজাখস্থানের তাসখন্দে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে
হরিয়ানার ঝাজ্জরের ছোট গ্রকাম বিরোহরে কৃষক পরিবারে জন্ম আমন সেহরাওয়াতের। বাবা সোমবীর সেহরাওয়াত ছিলেন দরিদ্র কৃষক। মা কমলেশ গৃহিণী। আমনের একটা ছোট বোনও রয়েছে। মাত্র ১১ বছর বয়সে বাবা–মাকে হারিয়েছিলেন ওই উঠতি কৃতি কুস্তিগীর । বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর ঠাকুরদা মঙ্গেরাম সেহরাওয়াতই দেখাশোনা করেন দুই ভাই–বোনকে।
১০ বছব বয়সে বাবার হাত ধরে ছত্রসাল স্টেডিয়ামে প্রবেশ আমন সেহরাওয়াতের। বাবা–মা মারা যাওয়ার পরে, ছত্রসাল স্টেডিয়ামই হয়ে ওঠে আমনের ঘরবাড়ি।অবসর সময়েও খুব একটা স্টেডিয়াম ছেড়ে বার হন না। আমনের কথায়, ‘ছত্রসাল স্টেডিয়াম আমার শুধুমাত্র প্রশিক্ষণের জায়গা নয়, আমার বাড়িও। এখানকার কুস্তিগীররা আমার পরিবার। যদি কেউ এসে আমাকে কোথাও যেতে বলে, আমি তাদের স্পষ্ট বলে দিই, কিছু সময়ের জন্য হলেও ছত্রশাল ছাড়ছি না। সবাই জানে আমার মানসিকতা। আমি দিল্লির আশেপাশে ঘুরতেও পছন্দ করি না।’
আমনের মানসিকতা ছত্রশাল স্টেডিয়ামে তাঁর ঘরে বিছানার পাশে লেখা একটা উদ্ধৃতিতেই ফুটে উঠেছে। হাতে আঁকা অলিম্পিক রিংয়ের নিচে লেখা আছে, ‘যদি এটা সহজ হত, তাহলে সবাই এটা করত।’ কেন এই কথাটা লিখে রেখেছেন ? আমনের ব্যাখ্যা, ‘এমন কিছু কিছু দিন আসে, যখন আমার মনে হয় একটু বেশি ঘুমাই। এবং সকাল ৫ টায় অনুশীলনে যেতে ইচ্ছে করে না। সেদিন আমার মুখের পাশের ওই লেখাটা দেখি। তখন জেদ চেপে যায়। আমাকে উঠতে হয়।’ নির্ধারিত সময় ছাড়াও আরো বেশি সময় ধরে অনুশীলন করেন আমন। তাঁর কাছে বিশ্রামের দিন নেই। যেদিন শরীরের ঘাম ঝড়াতে না পারেন, ঘুমাতে পারেন না। সবসময় আমনের চোখের সামনে ভাসে যোগেশ্বর দত্ত, বজরং পুনিয়াদের ছবি। ছত্রসাল স্টেডিয়ামের ভূগর্ভস্থ হলঘরের দেওয়ালে নিজের ছবি তোলার স্বপ্ন যে এখনও তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে আমন সেহরাওয়াতকে।
♦–♦–♦
❤ Support Us








