- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- মে ১৮, ২০২৫
উনিশের সম্ভাব্য এপিটাফ
১৯৬১ সালের ১৯ মে প্রথম এবং শেষবারের মতো জেগে উঠেছিল অবিভক্ত কাছাড় অর্থাৎ আজকের বরাক উপত্যকার বাঙালি । তারপর জাগিবার গাঢ় বেদনার ভার বইতে বইতে ৬৪ বছর সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত ও আত্মবিস্মৃত হয়ে গেল তারাই । যতই বলি ১৯শের কৃষ্ণচূড়া আমাদের চেতনারই রঙ ছড়িয়ে দিচ্ছে– একেই বলে আত্মপ্রতারণার ভণিতা । এবছর ১৯ মে উদযাপিত হচ্ছে এমন একটা পরিবেশে যখন বাঙালি হওয়ার অপরাধে উৎসবমুখর এবং উৎসব থেকে বহুদূরে নিরাপদ পরিসরে সরে থাকা জনেরা একইরকম ভাবে সমস্ত অধিকার হারানোর সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে। শহরের দিগগজ অধিবাসীরা নিশ্চিন্ত; তাঁদের কাছে সময়ের বিশেষ কোনো মানে নেই । ভাষা ও অস্তিত্ব নিয়ে যাঁরা উদ্বিগ্ন, সেসব ঝামেলাবাজ প্রতিবাদী জনদের প্রতি পুরোপুরি উদাসীন থেকে তাঁরা শিলচরের নতুন নতুন ঝাঁ-চকচকে মলে নিয়মিত পাড়ি জমায় । ঘরের ছেলেমেয়েরা মাতৃভাষা ভুলে ইংরেজিতে আপ্লুত থাকলে, তাঁরা আহ্লাদে আটখানা হয়ে যান। ১৯ মে কোনো বার্তাই নিয়ে আসে না তাঁদের কাছে। বরং নাগরিক পঞ্জিতে নবায়নের নামে যত্রতত্র হাজিরা দেওয়ার হুকুমনামাকে তাঁরা কার্নিভালের আমোদ উপভোগ করেছেন, কয়েকবছর আগে ।
ভারতে একদিকে চিরস্থায়ী হয়েছে আর্যাবর্তের আধিপত্য অর্থাৎ অন্ধকারজীবী পিতৃতন্ত্রের দৌরাত্ম্য, বর্ণবাদের সাঁড়াশি আক্রমণ , যুক্তিহীন কুসংস্কারের নৈরাজ্য এবং অন্যদিকে সর্বত্রব্যাপ্ত বাঙালি বিদ্বেষ। উনিশে মে পালন করার সময় আমরা কখনও এইসব নিদারুণ সত্য সম্পর্কে মনোযোগী হইনি। উনিশ মে কে সামনে রেখে আমরা ভারত জুড়ে ছিন্নমূল বাঙালির মধ্যে, উজ্জীবনের প্রেরণা সঞ্চারিত করতে পারতাম। তা করিনি, বরং শস্যের ভেতর ভূত ঢুকে পড়েছে বিনা বাধায়
আধিপত্যবাদীরা হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান নীতির প্রবক্তাদের যোগসাজশে আসামের বাঙালিদের কার্যত কাঠগড়ায় ঠেলে দিয়েছে। সভ্যতার সমস্ত নিয়মকে পদদলিত করে এবং ইতিহাসের তথ্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রকাশ্যে বাঙালির জনপদে কোনো হেলদোল দেখা যায় না। আত্মসম্মানবোধ এতটাই তলানিতে পৌঁছেছে যে, সরকারি দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভর করে টিঁকে থাকতে চাইছি আমরা। মানুষের মতো বেঁচে থাকার তাৎপর্যও হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। তার ওপর বিষফোঁড়ার মতো উৎকট ভাবে দেখা দিয়েছে বিভাজনের বজরুক আস্ফালন। রাজনীতির ক্ষমতামত্ত ব্যবসায়ীরা অজগর সাপের ঐক্যনীতি অনুযায়ী বাঙালিত্বকে শুষে নিচ্ছে, কেন না ভাষিক জাতীয়তাকে বিনষ্ট করাই তাদের ঘোষিত লক্ষ্য। আসু-অগপ এর সঙ্গে গোপন বোঝাপড়ার সূত্রে বাঙালির বড়ো অংশ বাঙালিত্ব বিসর্জন দিয়ে সাম্প্রদায়িক পরিচয়কে ভাবছেন খেয়া পারানির কড়ি । তাঁদের ধারণা, বরাক উপত্যকা সহ সর্বত্র তারাই আদি বাসিন্দা, বাঙালির অন্য অংশ অবাঞ্ছিত, আগন্তুক মাত্র ।
এই মনোভঙ্গির প্রভাবে নাগরিক অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে এঁরা অন্তরালবর্তী হয়ে থাকছেন। আধিপত্যবাদের একমাত্র উদ্দেশ্য যে, নির্বিশেষের সমস্ত বাঙালিকে রোহিঙ্গাদের মতো রাষ্ট্রহীন ভাসমান জনগোষ্ঠীতে পরিণত করা। এই মৌলিক সত্য তাঁরা বুঝতে চাইছেন না । তার ওপর ইদানীং সরকারপন্থী কিছু ভাষাবিদ্বেষী লোকজন (মূলত মুখ্যমন্ত্রীর এবং ত্রিপুরার স্বজাতিদ্রোহী রাজ্যপাটের বক্তব্যে উৎসাহিত হয়ে ) বেপরোয়া ভাবে বাঙালিদের অসমমিয়া হয়ে যাওয়ার কথা বলছে। ১৯শে মে যদি সত্যিই জাগ্রত হয়ে থাকত, তাহলে এইসব অপশক্তি কি এতটাই দুঃসাহস দেখাতে পারত ? ১৯ মে আমাদের জানিয়েছিল ( প্রাক্তন পূর্ব পাকিস্তানের ২১ ফেব্রুয়ারির মতো ) বাঙালির কোনো ধর্মভাগ হয় না । বাঙালি শুধুই বাঙালি । ধর্মীয় বিশ্বাস তার জাতিসত্তাকে গৌণ করতে পারে না । কিন্তু এনআরসির নামে ধেয়ে আসা আঁধিভরা দুঃসময়ে, প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে চলছে প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের জায়গা দখলের লড়াই ।
উনিশ মে কে সামনে রেখে আমরা ভারত জুড়ে ছিন্নমূল বাঙালির মধ্যে, উজ্জীবনের প্রেরণা সঞ্চারিত করতে পারতাম। তা করিনি, বরং শস্যের ভেতর ভূত ঢুকে পড়েছে বিনা বাধায়। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিষক্রিয়ায় উনিশের আবহ কুলষিত। আমাদের পায়ের নিচে থেকে মাটি সরে যাচ্ছে প্রতিটি মুহূর্তে, অথচ ভ্রুক্ষেপ নেই আপন ভাষার জন্যে, সংস্কৃতির জন্যে, অস্তিত্বের জন্যে
১৯ মে তাহলে কী দিয়েছে আমাদের ? কেন আমাদের উনিশ চর্চা জীবনবোধের উদ্ভাসনে পরিণত হল না ? কেন নিয়মমাফিক কিছু অনুষ্ঠান আয়োজন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে গেল উনিশ ? কোন হাতে গোনা দু-তিনটে ব্যতিক্রম ছাড়া বাঙালির একাংশকে ১৯ মের চর্চায় দেখা যায় না ? তার মানে কি এই যে, আমাদের অগোচরেই ১৯ মে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল শহুরে কিছু বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক কর্মীর নিষ্প্রাণ অভ্যাসে ? ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে সংস্রবহীন ১৯ মে কে আমরা প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি । পারিনি যে তার প্রমাণ আমাদের কোনো নববর্ষ পালনের পরম্পরা তৈরি হয়নি, যেখানে বাঙালির অখন্ড সত্তা অংশগ্রহণ করতে পারে, যেখানে বিনা দ্বিধায় আমরা কথায় সুরে, খেলা ধূলায়- খাদ্যাভাসে- পোষাকে ও শিল্পকৃতির উপস্থাপনায় নিজেদের অবিভাজ্য ও অখন্ড বাঙালি সত্তার অংশীদার হিসেবে বুঝে নিতে পারি। যারা জাতিসত্তার চূড়ান্ত পরীক্ষার মুহূর্তে, বিভাজনের অভিযোজনকে মেনে নিয়ে মধ্যযুগীয় আবহে তৈরি করতে চায়, ১৯ মে তাদের প্রতিষেধক হোক। তা যদি না হয়, তবে কেন ১৯ মে? কেনই বা তার দশদিন আগে চিরনূতনের দিল ডাক ২৫ শে বৈশাখ বলে বানিয়ে তোলা বিহ্বলতা? কেনই বা ১৯ মে র দিনসাতেক পরে নজরুল কণ্ঠের চর্চা– ‘হিন্দু না ওর মুসলিম ঐ জিজ্ঞাসে কোনজন্ ? কান্ডারী বলো ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার’ – এই উচ্চারণ কি তবে নিছক আবৃত্তি বা গানের জন্য ? ১৯ মে তে যে ১১ জন মৃত্যুজিৎ শহিদের নামে আমরা জয়ধ্বনি দিই নিয়ম মাফিক, তা কিসের জন্য ? তাঁরা তো ক্ষুদ্র পরিচয়ে বিভক্ত, পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত বাঙালির জন্য আত্মদান করেননি । আমরা ব্যর্থ হয়েছি তাদের তাৎপর্য বুঝতে এবং ১৯ মের বার্তা ব্রক্ষপুত্র উপত্যকার বাঙালির কাছে পৌঁছে দিতে পারিনি । অথচ এ বার্তা পশ্চিমবঙ্গ সহ ভারতের সমস্ত বঙ্গভাষীজনের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল আমাদের। ঝাড়খন্ড, বিহার, ওড়িষা, উত্তরপ্রদেশ উত্তরাখন্ড, ছত্তিশগড়ে আন্দামানে বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতি যখন হিন্দির আগ্রাসনে বিপন্ন, উনিশের চেতনা তাদের বৈশল্যকরণী হতে পারত। হল না কেন, এর জবাবদিহি করতে হবে আমাদেরই। মহাবিনাশের গোধূলিপর্বে উনিশের চেতনার পুনরুজ্জীবন জরুরি। চাই অনুশাসিত চিন্তার চোরাবালি থেকে মুক্তি। নইলে কেন উনিশ ?
ভারত নামক খন্ডিত দেশে একদিকে চিরস্থায়ী হয়েছে আর্যাবর্তের আধিপত্য অর্থাৎ অন্ধকারজীবী পিতৃতন্ত্রের দৌরাত্ম্য, বর্ণবাদের সাঁড়াশি আক্রমণ , যুক্তিহীন কুসংস্কারের নৈরাজ্য এবং অন্যদিকে সর্বত্রব্যাপ্ত বাঙালি বিদ্বেষ। উনিশে মে পালন করার সময় আমরা কখনও এইসব নিদারুণ সত্য সম্পর্কে মনোযোগী হইনি। উনিশ মে কে সামনে রেখে আমরা ভারত জুড়ে ছিন্নমূল বাঙালির মধ্যে, উজ্জীবনের প্রেরণা সঞ্চারিত করতে পারতাম। তা করিনি, বরং শস্যের ভেতর ভূত ঢুকে পড়েছে বিনা বাধায়। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিষক্রিয়ায় উনিশের আবহ কুলষিত। আমাদের পায়ের নিচে থেকে মাটি সরে যাচ্ছে প্রতিটি মুহূর্তে, অথচ ভ্রুক্ষেপ নেই আপন ভাষার জন্যে, সংস্কৃতির জন্যে, অস্তিত্বের জন্যে ।
এই উনিশ তবে কার, কিসের প্রয়োজনে ? নাকি আত্মবিস্মৃত, আত্মঘাতী বাঙালি বরাক উপত্যকায় সংঘবদ্ধ মূঢ়তা ও কদর্য সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির বর্শে, বাংলাদেশে পুনঃপাকিস্তানীকরণ প্রক্রিয়ার কাছে আত্মসমর্পণ করে, পশ্চিমবঙ্গে রেনেসাঁসের যাবতীয় অর্জন ভুলে গিয়ে, ব্রক্ষ্মপুত্র উপত্যকায় অসমিয়া আধিপত্যবাদের লেজুড়বৃত্তি দিয়ে আপন জাতির নিশ্চিহ্ন হওয়াকে ত্বরান্বিত করে একুশে ফেব্রুয়ারি ও উনিশে মের শববাহক হয়ে উঠেছে ? কোথায় গেল … অনুভবের গর্বে দৃপ্ত বাঙালি– মীমাংসাহীন এই প্রশ্নে ক্রমাগত বিদ্ধ হচ্ছি। আমরা আহত, বিবেক আমাদের স্তম্ভিত, ঝরে পড়ছে গৌরব আর অর্জনের পলেস্তারা। জাতিসত্তার ভেতরেও অদ্ভূত ঘুনপোকার হামলা।
♦•♦♦•♦♦•♦♦•♦♦•♦♦•♦♦•♦♦•♦♦•♦
❤ Support Us







