- ধা | রা | বা | হি | ক পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- মে ১১, ২০২৫
ধারাবাহিক: একদিন প্রতিদিন । পর্ব ৮
ঝগড়া শেষ হলে, দুই বান্দাই সম্মিলিত চুক্তিতে বাকি সবাইকে আউট করে দেবেন। এ যেন রাজ্য আর কেন্দ্রের সংঘর্ষ। মিডিয়া হাইপের জন্য তুঙ্গে, বাকি সময় মুখে ওম শান্তি ওম শান্তি
ধম্ম বনাম জিরাফের গপ্প
সকাল ছ’টা বেজেছে কি বাজেনি। বীর বিচিত্র রীতিমতো শোরগোল বাঁধিয়ে দিলেন। কারণ কী, যুদ্ধকালীন সতর্কতা সম্পর্কে সবাইকে অবহিত করতে হবে। দেশের উপর দুর্যোগ হানা দিলে, একজন সৎ নাগরিককে কীরকম দায়িত্ব পালন করতে হবে, সে বিষয়ে সচেতনতা জাগানোর বার্তা দিয়ে বাড়ি বাড়ি, পাড়ায় পাড়ায় রীতিমতো ব্রিগেড চলো কলরব তুলতে হবে। বীর বিচিত্রের স্ত্রী কমলা তখন সবেমাত্র ফ্রিজ থেকে থোড়খানা বের করে বটিতে কুচোতে বসেছেন। গ্যাসে চা-এর জল ফুটছে। কন্যা সেনোরিটা বাবার চিৎকার চেঁচামেচি থেকে রেহাই পেতে কানে বালিশচাপা দিয়ে শুয়ে আছে। বিচিত্রবাবু বললেন, বুঝলে কমলা সেক্যুলার জনগণ দেশটার বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে। এবার জেগে ওঠার সময় এসেছে। কমলা হাত থেকে থোড়ের আঁশ ছাড়াতে ছাড়াতে বললেন, হ্যাঁ গো সেদিন বুলটির বাবাও এইকথাখান বলছিল। তো, এই ছেকুলার কারে কয় গো ? বিচিত্র খবরের কাগজের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বললেন, আরে সেক্যুলার জানো না ? শোন কথা ! ওই যাদের জাত ধম্ম কিছু নেই, নিজেও পৈতা পরে না, আবার অন্যের পৈতা ধরে টান মারে, তারা হল সেক্যুলার। ওরা না আছে ধর্মে, না আছে জিরাফে। কমলা থোড় কোটা বন্ধ করে বললেন, কী যে বলো, ছাইভস্ম বুঝিনা। ধম্মে নেই না হয় বুঝলাম। জিরাফেও নেই আবার কেমন কথা ? মরতে জিরাফ কোথা থেকে এল ? একী চিড়িয়াখানার হালহকিকত বলছ ? বিচিত্র বললেন, ওগো কমলা সারাজীবন হাতে থোড়ের আঁশ জড়িয়ে রাখলে জিরাফ বুঝবে কী করে ? ওঠো, জাগো, দেখো মেয়েরা অপারেশন সিন্দুর সাকসেসফুল করে তুলছে আর তুমি গলায় জিরাফ আটকে রেখে বিষম খাচ্ছ। জিরাফ একটি সিম্বল। নিজেকে যে বদলাতে হয় তাগিদ এলে, জিরাফ তার নমুনা। ওর লম্বা গলা কি একদিনে হয়েছে ? খাদ্য জোগাড়ের প্রয়োজনে সে গলা বাড়িয়েছে। এই অভিযোজন যারা বোঝে না, যারা প্রয়োজনের তাগিদে নিজেদের বদলায় না, তাদেরই জিরাফের সঙ্গে তুলনা করা হয়, বুঝেছ ? কমলা এতক্ষণ তাকিয়ে ছিলেন অবাক চোখে। স্বামী কত জানেন। এজন্যই তিনি প্রতিদিন স্বামীতে আচ্ছন্ন, মুগ্ধ। পরক্ষণেই আবার থোড়ের বাকি অংশের দিকে তাকিয়ে তাড়াতাড়ি কাজ মনে দিয়ে বললেন, তাহলে তো তোমা ধম্ম আর জিরাফ সবই ঠিক আছে। চায়ের পাতাটা জলে দিয়ে একটু ভিজিয়ে দাও না, দেখছ না আমার দু জাত জোড়া রয়েছে। বিচিত্রবাবু সম্ভবত শুনতে পেলেন না। তিনি অপেক্ষাকৃত গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত। বারান্দায় খবরের কাগজ পড়তে পড়তে বাইরে বাজারের থলি হাতে চক্রবর্তীবাবুকে দেখে হাঁক ছাড়লেন, কী হে চক্কোত্তি, কেমন খেলা দেখালাম ! ব্যাটারা সব চুপসে গেছে ! চক্কোত্তি বললেন, তোমরা ওই আনন্দেই থাকো। আন্তর্জাতিক রাজনীতির কায়দা বুঝলে বজ্রবেগে এত আনন্দ পেতে না। বিচিত্রবাবু হুঙ্কার দিলেন, তোমার হলে গদ্দার, বুঝেছ চক্কোত্তি ! তোমরা হলে দেশের শত্তুর। চক্কোত্তি মুখ ঘুরিয়ে বাজারের ব্যাগ দুলিয়ে হন্টন দিলেন। এই ঝগড়ার কোনো শেষ নেই, দু-পক্ষই অবহিত। আবার ঝগড়া শেষ হলে, দুই বান্দাই সম্মিলিত চুক্তিতে বাকি সবাইকে আউট করে দেবেন। এ যেন রাজ্য আর কেন্দ্রের সংঘর্ষ। মিডিয়া হাইপের জন্য তুঙ্গে, বাকি সময় মুখে ওম শান্তি ওম শান্তি।
কমলা বাকি থোড় কুচোতে কুচোতে হাঁক পাড়লেন, সিনু, সেনোরিটা মা আমার, একটু চায়ের জলটা দেখো না সোনা ! সেনোরিটা কানের উপর থেকে বালিশ সরিয়ে খুব রেগে দুম দুম করে পা ফেলতে ফেলতে শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল, হোয়াই বাপি ইজ শাউটিং মা ? সকালবেলাই যুদ্ধ যুদ্ধ শুরু করেছে। কমলা বললেন, জানিনে বাপু, তোমার বাবার কথার আমি তল খুঁজে পাইনে। ধম্ম জিরাফ কতকিছু বলতে থাকে, কিন্তু ঘরের ছোট্ট কাজে কুটো নেড়ে সাহায্য করার জো নেই।
সেনোরিটা বলল, কাম অন মা, বাবা সব বুলশিট বলতে থাকে, আর তুমি গিলতে থাকো। একটু নিজের চোখ কান খোলা রাখলেও তো পারো। সকাল সকাল সেক্যুলারদের গুষ্টির চচ্চড়ি করছে, ডাজ হি নো হোয়াট কনস্টিটিউশন সে’জ ? ডাজ হি নোজ, হি ইজ গোয়িং টু সাপোর্ট আ সিস্টেম দ্যাট প্রভোকস অ্যা লট ?
মেয়েরা এখন কত এগিয়ে এসে গুলি গোলা চালিয়ে যুদ্ধ করছে, প্লেন চালাচ্ছে, কমলা দেখেন, আর আনন্দ পান এই ভেবে, তার মতো মোচা, থোড় আর ডাটা চচ্চড়ি করা ছাড়াও মেয়েরা এখন গলা বাড়িয়ে জিরাফ হচ্ছে । তারা এখন যুক্তি দিয়ে বাঁচে ।
কমলা ব্যোমকে গেলেন। বাপ মেয়ের এই দ্বৈত সংঘর্ষে তিনি প্রায়শই চেপ্টে চুপসে থিতিয়ে পড়েন। কমলা সেক্যুলার বোঝেন না, তিনি বোঝেন হিন্দু মোছলমান, শিখ খ্রিস্টান যে যার ধম্ম নিয়ে সুখ ঘর করুক। কারো পায়ে পা লাগিয়ে ঝঞ্ঝাট বাঁধানোর দরকারই বা কী ! এই তো কাল ময়লা নিতে এসে সিরাজ বলল, ছেলের জন্ডিস হয়েছে, ঝাড়ফুঁক করাতে নিয়ে যাবে, ডাক্তার দেখাবে না। তা সে কী কমলা বদলাতে পারবেন, পারবেন না। তিনি বরং কয়েকখানা ফল কিনে সিরাজকে দিতে পারবেন তার সন্তানের জন্য। তিনি তাই করবেন। এই যে দশবছর ধরে তার বাড়িতে আমিনা বাসন মাজে আরতি নাম নিয়ে। কারণ আমিনার নাম আমিনা বললে, এ পাড়ায় তার অনেক কাজই চলে যাবে। বিচিত্রবাবু নিজেও জানেন না, আরতির নাম আরতি নয়, আমিনা।
কমলা ধম্ম আর জিরাফের অভিযোজন নিয়ে এতসব বোঝেন না, যুগ বদলেছে একথা ভালোই বোঝেন। ভারত পাকিস্তান বাংলাদেশের খবর জানেন, কিন্তু তিন দেশের মানুষ কেন মিলেমিশে থাকতে পারে না, সে তার মাথায় ঢোকে না। মেয়েরা এখন কত এগিয়ে এসে গুলি গোলা চালিয়ে যুদ্ধ করছে, প্লেন চালাচ্ছে, সেসব তিনিও দেখেন, আর আনন্দ পান এই ভেবে যে, তার মতো মোচা, থোড় আর ডাটা চচ্চড়ি করা ছাড়াও মেয়েরা এখন গলা বাড়িয়ে জিরাফ হচ্ছে। মেয়েকেও তিনি সে কথাই বলতে চান। দেখ মা সিনু, ওসব হিস্ট্রি জিওগ্রাফি আর দর্শন নিয়ে কচকচি যতই করিস, আসল ব্যাপার হল নিজেকে কীভাবে তৈরি করলি। ক’টা মানুষের জন্য কতটুকু কী করলি। সে তুই যতই, যা বলিস না কেন, কোনো একটা ধারণায়, কোনো একটা বিশ্বাসে আটকে গেছিস, তো ভুল করেছিস। ওইসব ইজম টিজম পড়ার বইতেই রাখো। যুক্তি দিয়ে বাঁচো। বাঁচতে শেখো। যখনকার যেমন, তখনকার তেমন। তোমার বাবা ছেকুলার বোঝেনা, তো তাকে তার ভাষাতেই বোঝাও কোনটা এখন জরুরি। তুমি ছেকুলার বোঝ, সংবিধান বোঝ, তো তুমি সেই বোঝা অনুযায়ী চলতে থাকো। অন্যকে বোঝানোর অত দরকার কী ! যে যা বোঝে, তাকে সেটা বুঝতে দিয়ে নিজের কাজটা করো দিকি বাপু। সেনোরিটা কোনো উত্তর দেয় না, কমলার অজ্ঞানতা অগ্রাহ্য করে বাথরুমে চলে যায়। গ্যাসের উপর বসানো পাত্রে চায়ের জল ততক্ষণে শুকিয়ে গেছে। কমলা কাটা থোড়ের পাত্র নিয়ে উঠে এসে আবার নতুন করে চায়ের জল চাপালেন। বিচিত্রবাবু বারান্দা থেকে হুঙ্কার ছাড়লেন, কী যে করো কমলা। বেলা বয়ে যায়, এক কাপ চা পর্যন্ত সময় মতো দিতে পারলে না। সেনোরিটা বাথরুম থেকে বেরিয়ে বলল, মা আমার ডিটক্স ওয়াটারটা দিয়েছ তো? কমলা চায়ের পাত্রে চিনি দিতে দিতে টক্সিন সরানোর জল গ্লাসে ঢালতে লাগলেন।
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
ক্রমশ..
আগের পর্ব পড়ুন: ধারাবাহিক: একদিন প্রতিদিন । পর্ব ৭
❤ Support Us








