Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • মে ১৮, ২০২৫

ধারাবাহিক: একদিন প্রতিদিন । পর্ব ৯

সোমা দত্ত
ধারাবাহিক: একদিন প্রতিদিন । পর্ব ৯

অলঙ্করণ : দেব সরকার

 
কমলা ছাদে ভেজা কাপড় শুকোতে দিতে এলেন। মাথার উপরে গ্রীষ্মের চওড়া রোদ। মেজাজটা মোটেই ভালো নেই। সকাল থেকে বাড়িতে বিচিত্রবাবু চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করেছেন। সঙ্গে যোগ দিয়েছে মেয়ে সেনোরিটা। বাড়িটা রাজনৈতিক আখড়া হয়ে উঠেছে।পাশের বাড়ির চক্কোত্তিবাবুও এসে যোগ দিয়েছেন। দুবার দুবার চা, জলখাবার বানানো একধরণের হয়রানি। হুকুমের পর হুকুম। একজনের এই চাই তো, অন্যজনের ওই। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছেন তিনি, সংসারে যারা তর্ক করে মরে, তারা সম্মুখ সমরে যায় না। ঘরে কাপের পর কাপ চা আর লুচি তরকারি সাঁটিয়ে বিপ্লব করে অথবা বিপ্লব খেদায়। কমলার মাতৃদেবী গত হবার আগে তাঁকে একটি উপদেশ দিয়ে গেছেন, মনে রাখিস কমলা, প্রতিটি পুরুষ মানুষই পেটের পূজারী। তাদের বুদ্ধি, দার্শনিকতা, রাজনৈতিক আদর্শ, বাস্তববোধ সবকটাকতেই পাকস্থলীর নিয়ন্ত্রণ। পেটই তাদের চেতনা জাগায়, পেটই তাদের অর্ধচেতন রেখে ডুবিয়ে দেয়। সরলমতী পুরুষরা তা বুঝতে পারে না। এ কথাটি মনে রাখলে সংসারে যত্ন, সম্মান, আপ্যায়ন সবই পাবে,  আর মন থেকে সরিয়ে দিলে, চিরকাল হায় হায় করতে হবে। কমলা সেকথা গণ্য করেও খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি। তাঁর মাতৃদেবী যেকথাটি বলতে ভুলে গেছিলেন, সেটি হল, যে গুণের জন্য সংসার তোমার উপর নির্ভরশীল, তাকে সবসময় রয়ে সয়ে ব্যবহার করো, সহজলভ্য করে দিও না। তাই কমলা উজাড় করে ঢেলে সংসারে ফতুর হওয়ার দুঃখ বিলিয়ে যাচ্ছেন।

 

কমলার কানে কানে মন্ত্র দিয়ে তাঁর বালতির জামা কাপড়গুলো এক এক করে মেলে দিলেন দড়িতে। তারপর সুললিত সুদর্শন চক্র তুলে দিলেন হাতে। বললেন, মনে রেখো বৎসে এই সুদর্শন চক্র তোমাকে দেখাইবার নিমিত্ত দেওয়া হইল, ব্যবহার করিবার নিমিত্ত দেওয়া হয় নাই। অতএব পরমহংস মহারাজের মতো ফোঁস করিয়া উঠিতে তোমার বাধা নাই, কিন্তু ছোবল মারিবার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্তরের সমস্যা রহিয়াছে

 
 এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে কাপড় দড়িতে মেলতে মেলতে হঠাৎ তাঁর চোখে রোদের ঝিল্লি ধরে গেল। সমুখে রোদের কণাগুলো দানা বাঁধতে শুরু করল। প্রবল হাওয়া, ধুলোঝড়। কমলা দুহাতে চোখ ঢাকলেন, আর দু আঙুলের ফাঁক দিয়ে দেখলেন, মেঘ আর রৌদ্রের অপূর্ব সমাবেশ ঘনীভূত হয়ে এক কী সুন্দর নীলাভকান্তি অবয়ব ক্রমশ মূর্ত হচ্ছে, চোখ রগড়ে ভালো করে দেখার চেষ্টা করলেন। না কোনো ভুল নেই ইনিই সেই শ্যাম। ইনিই সেই বংশীবাদক, যিনি যুগে যুগে আবির্ভূত হয়ে ধর্মযুদ্ধ থামিয়ে দেন। কমলা প্রায় মুর্চ্ছা যাচ্ছিলেন, কিন্তু শ্যাম তাঁকে সামলে নিলেন। কমলার কানে কানে মন্ত্র দিয়ে তাঁর বালতির জামা কাপড়গুলো এক এক করে মেলে দিলেন দড়িতে। তারপর সুললিত সুদর্শন চক্র তুলে দিলেন হাতে। বললেন, মনে রেখো বৎসে এই সুদর্শন চক্র তোমাকে দেখাইবার নিমিত্ত দেওয়া হইল, ব্যবহার করিবার নিমিত্ত দেওয়া হয় নাই। অতএব পরমহংস মহারাজের মতো ফোঁস করিয়া উঠিতে তোমার বাধা নাই, কিন্তু ছোবল মারিবার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্তরের সমস্যা রহিয়াছে। তুমি এই অস্ত্র দেখাইয়া যুদ্ধ জয় নিশ্চিত করিতে পারো কিন্তু যত্রতত্ৰ এর প্রয়োগ করিতে পারো না। কমলা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনলেন এবং শ্যামকে বন্দনা করে খালি বালতি নিয়ে নিচে নেমেই দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করলেন। 
 
তাঁর সপাট বর্ষণ শুরু হল, রণং দেহীর ভূমিকায় দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন, চায়ের কাপে চর্চার দিন শেষ। দেশবাসীর মুখ উজ্জ্বল করতে যদি লড়তে হয় তাহলে ঘরের বাইরে বেরিয়ে বুক চিতিয়ে লড়তে হবে। সেনোরিটা বলল, উফ্ মা হোয়াট হ্যাপেন্ড টু ইউ অল অফ আ সাডেন ? বিচিত্রবাবু বললেন, আঃ কমলা তুমি কি ক্ষেপিলা ? চক্কোত্তিবাবু বললেন, বৌদিমণির উপর অন্য কেউ কি ভর করল ?  কমলা বললেন, শাট আপ ! তারপর সুদর্শন চক্র ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন, আমি ধম্মের বরপুত্র। আমি যা বলি সবই ধম্মের জন্য। আমি খাই ধম্ম, ধম্ম বলি দিই, আমি ধম্ম নিয়ে নাচি ও নাচাই এবং দেখাই, ধম্মের কল কীরকম বাতাসে নড়ে। তাঁর ইঙ্গিতে চক্র, উপস্থিত সবাই বিভ্রান্ত, সে মুহূর্তে বাদি ও বিবাদী, বিপরীতমনস্ক লোকেরা এককাট্টা হয়ে একই দলে ঢুকে পড়লেন, তাঁদের সবাই কার্যত কমলার সুদর্শন চক্রের ধ্বংস চাইলেন। কমলা দেখলেন, এখানে টিকে থাকতে হলে শো ম্যানশিপ জরুরি। আধ্যাত্মবাদ এবং ভক্তির সারফেস লেয়ারে যে সংস্কার চালু আছে, তার উগ্র প্রকাশই অস্তিত্বের চেতনা। অতএব আক্রমণ যতই আসু্‌ক, স্বাজাত্যবোধ টিকিয়ে রাখতেই হবে। কূটনীতির আশ্রয় নিতে হবে। শক্তিশালী সম্ভাবনাকে বশীভূত করতে হবে। সেনোরিটাকে চোখ মটকালেন তিনি, সে মুহূর্তে অনুগামীর মুর্তি ধারণ করল। সে জানে, কালের ইতিহাস বদলাতে হলে, নিজের পায়ের তলার ভিত শক্ত করতে হবে। আর তা করতে গেলে, অস্ত্রধারীদের সমর্থন করতেই হবে। কাল-এর গতিকে কে দেখছে!  After seventh generation, we can no longer distinguish between history and myth. অতএব কমরেড সেনোরিটা মুকুট খুলে মাটিতে পা রাখল।  কমলার মনের জোর বাড়ল। রান্নাঘরের দরজা টেনে, শোবার ঘরে ঢুকে এসি চালিয়ে, আরাম করে খবরের কাগজ পড়তে শুরু করলেন। সেনোরিটা বলল, মা ইউ আর টু ইম্প্রেসিভ। কমলা মুচকি হাসলেন। চক্কোত্তি বললেন, কলির কত রূপ দেখব হে ভায়া। যুদ্ধ থেমে গেছে,  এ যাত্রায় খামোকা বিরোধীপক্ষ সেজে ফায়দা নেই। সামনে কোন তারিখ আসছে বলো দিকি ? বিচিত্রবাবু বললেন, উনিশে মে। চক্কোত্তি বললেন, চলো তবে শান্তি মিছিলে যোগ দিয়ে বাংলা ভাষার বন্দনা শুরু করি।
 

♦•♦♦•♦♦•♦♦•♦♦•♦

ক্রমশ..
 
আগের পর্ব পড়ুন: ধারাবাহিক: একদিন প্রতিদিন । পর্ব ৮

ধারাবাহিক: একদিন প্রতিদিন । পর্ব ৮


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!