Advertisement
  • খাস-কলম পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • জুলাই ২০, ২০২৫

ভয়ের কবলে বাঙালি, আবার উচ্ছেদ অভিযান অসমে

প্রদীপ দত্ত রায়
ভয়ের কবলে বাঙালি, আবার উচ্ছেদ অভিযান অসমে


ষড়যন্ত্র গভীর

অসমে বনাঞ্চলের ‘বেদখল জমিতে’ উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে। যারা উচ্ছেদের শিকার, তাঁদের, বাংলাদেশি বলে অভিহিত করা হচ্ছে। ৫০-৬০ বছরের স্থায়ী বসবাসকারীদের ঘরবাড়ি তছনছ করে তাঁদের বাংলাদেশি বাসিন্দা ভেবে তোপ দাগছে প্রশাসন। বিদ্বেষাচ্ছন্ন মনোভাব নিয়েই প্রকাশ্যে এটা করা হচ্ছে। একইভাবে গুজরাট, ওড়িষা, দিল্লি, মহারাষ্ট্র-সহ বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাদেশি উৎখাতের নামে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকরা হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে সত্য যে, দেশের ভেতরে ভাষিক দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে জাতিগত বিদ্বেষের বীজ বপন করে যাচ্ছেন সমাজের একাংশ। এখনকার শাসকের উদ্দেশ্য কী, এ নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে ২৮ কোটি বাঙালি রয়েছেন তেমনি ভারতবর্ষে তাঁদের সংখ্যা প্রায় ১৪ কোটিরও বেশি। এই বিশাল আমজনতা বাংলাভাষায় কথা বলেন, এটা কি কোনো অপরাধ?

ভারতে বসবাসকারী বাংলাভাষীরা বাংলাদেশি হতে যাবেন কেন ? ভারতীয় বাঙালি নাগরিকদের উপর বাংলাদেশি তকমা সেঁটে দেওয়া, যেমন অসাংবিধানিক, তেমনি অমানবিক। বাঙালিকে কোণঠাসা করে রাজনীতির ময়দান দখল করে রাখার যে গভীর ষড়যন্ত্রের বীজ, স্বাধীনতার পর থেকে বপন করা হয়েছিল, ধীরে ধীরে তা আরও প্রকট হয়ে উঠছে।

কেউ যদি বাংলা ভাষায় কথা বলে তাহলে তাকেই বাংলাদেশি হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। অসমে বসবাসকারী শহর ও সমতলের বাঙালির বড়ো অংশ বরাবর লিখে এসেছেন, তাঁদের মাতৃভাষা বাংলা। এবারও একথা লিখাবেন, সন্দেহ নেই। প্রশ্ন হল, বাংলা বললেই বা বাঙালি পরিচয় দিলেই তাদের পরিচিতিতে বাংলাদেশি তকমা সেটে দেওয়ার বিপজ্জনক প্রবণতা কেন? এর পিছনে কী লক্ষ্য নিহিত?

পরিযায়ী শ্রমিকদের দেশের অন্যান্য রাজ্যে হেনস্তা রোধ করতে বাংলার মুখ্য সচিবকে সদর্থক পদক্ষেপ নেবার কড়া নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। এতেই বোঝা যায়, দেশজুড়ে বাঙালিকে হেনস্থা করা নিয়ে সামাজিক ন্যায়ের স্তম্ভ স্তম্ভিত। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ বিষয়ে সরব হয়েছেন। কেন্দ্রে একটি শক্তিশালী সরকার থাকার পরেও, এ ধরনের ঘটনাকে ঘিরে সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি হচ্ছে কীভাবে ! ওড়িষায় বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর যে ধরনের আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে বহু মানুষ প্রতিবাদ মুখর হয়েছেন। তাঁরাই প্রশ্ন তুলছেন, পশ্চিমবঙ্গে যেসব ওড়িয়া রান্নাবান্না বা ক্যাটারিং-এর কাজে যুক্ত, অথবা পাইপ মিস্ত্রির কাজ করেন, তাঁদের তো কখনো কোনো ধরনের হেনস্থা করা হয় না। তাহলে উড়িষায় বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের কেন হয়রানি করা হবে ? দিল্লি বা গুজরাটে বাঙালিবস্তি উচ্ছেদ করে, ঢালাও প্রচার করা হচ্ছে যে, এরা বাংলাদেশি। এসব ঘৃণাজনিত ঘটনাবলীর পেছনের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র নিঃসন্দেহে খুবই গভীর।

বাঙালির ঐতিহাসিক অবদান

বাঙালি জাতির ইতিহাস প্রায় ৭ হাজার বছরের পুরোনো। ইতিহাসবেত্তা সুকুমার সেন, মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, চর্যাপদকে বাংলার আদিরূপ ধরা হলে, বাংলাভাষা হাজার–বারশো বছরের পুরনো। আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, অধ্যাপক নীহার রঞ্জন রায় ও ভাষা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তপোধীর ভট্টাচার্যের মতে, দেড় হাজার নয়, অন্তত ৪ হাজার বছর আগেই বাংলাভাষা বিকশিত হতে থাকে। বাঙালির অস্তিত্বের কথা উঠলে, বলা প্রয়োজন যে, প্রত্নইতিহাসের যাত্রা শুরু হয় খ্রিস্টপূর্ব ৭ম/৮ম শতকে, এর সমর্থনে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দুর্লভ নয়। বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের রচিত চর্যাপদে যে বাংলা-কাব্যভাষা রয়েছে, নিশ্চয় তার আগে বাংলা গদ্যের প্রচলন ছিল। এ ব্যাপারে বহুমাত্রিক অনুসন্ধান হয়েছে। প্রখ্যাত গবেষক প্রবোধ বাগচি বহুকাল আগে একটি চীনা-সংস্কৃত অভিধানের সন্ধান পান, যা সংকলিত হয় ৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে। ঐ অভিধানে অন্তত ৫০টি বাংলা শব্দের সন্ধান পাওয়া যায়।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বাঙালির অবদান অতুলনীয়। আন্দামানের সেলুলার জেলে বিপ্লবীদের তালিকায় যে-সব নাম রয়েছে, তার ৮০ শতাংশই বাঙালি। বাঙালির এই বিশাল অবদান প্রকারান্তরে চাপা দিয়ে রাখার জন্য বারবার ভিন্ন ভিন্ন চিত্রনাট্য-রচনা করা হয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জনসংখ্যার নিরিখে, যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর। আন্দামানে তিনিই প্রথম স্বাধীন ভারতের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। তিনিই দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন, এটা প্রায় সবাই ধরে নিয়েছিলেন। রহস্যজনকভাবে সুভাষচন্দ্র নিখোঁজ হয়ে যান। বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে প্রচারিত রাষ্ট্রশক্তির বয়ানে বলা হয়, তাইওয়ানে তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। প্রকৃত সত্য কী, তা আজও উন্মোচিত হয়নি। নেতাজির অন্তর্ধান রহস্য উন্মোচনে কয়েকটি কমিশন গঠন করা হলেও, কমিশনের কাজে কেবল ব্যর্থতাই সুলভ হয়ে উঠল, দুর্লভ সব সাফল্য।

১৯৩৮ । গুয়াহাটিতে নেতাজি সুভাষ

স্বাধীনতার সময় অসম-সহ গোটা উত্তর পূর্বাঞ্চল পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। তখন নেতাজি অসমে এসে জননায়ক অরুন কুমার চন্দ, সতীন্দ্রমোহন দেব এবং বৈদ্যনাথ মুখার্জির সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হয়ে লিগের মন্ত্রিসভার পতন ঘটিয়ে গোপীনাথ বরদলৈ-এর নেতৃত্বে কংগ্রেস মন্ত্রিসভা গঠনের ভিত্ গড়ে তুললেন। নেতাজি ওই সময় উদ্যোগী না হলে গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চল পাকিস্তানের উদরে চলে যেত

সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে বাঙালির অবদান, যে কোনও জাতির কাছে এক প্রকার ঈর্ষার বিষয়। হিন্দি বলয়ের বরাবর একটাই লক্ষ্য যে, বাঙালিকে কোনঠাসা করে রাখতে হবে। একসময় জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী করার জন্য বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং উঠে পড়ে লেগেছিলেন। তাতে নানা মহল থেকে বাগড়া দেওয়া হল। পরবর্তীকালে রাজীব গান্ধীর মৃত্যুর পর কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তি হিসেবে প্রণব মুখার্জির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল বিস্তর। কিন্তু তাঁকে বাদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী করা হল পি ভি নরসিংহ রাওকে। পরে আরেকবার প্রণব মুখার্জির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ তৈরি হলে, কংগ্রেস মনমোহন সিংহকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করে। প্রণববাবু যাতে ভবিষ্যতে কখনো প্রধানমন্ত্রীর দাবিদার হয়ে উঠতে না পারেন, সে জন্য তাঁকে রাষ্ট্রপতির কুরসিতে বসিয়ে রাজনীতির ময়দান থেকে চিরদিনের জন্য আলবিদা জানানো হয়।

যে বাঙালি, তার সাহিত্য-সংস্কৃতি দিয়ে গোটা বিশ্বে, ভারতকে পরিচিত করেছে, তাঁদের প্রতি এ ধরনের আচরণ কি সম্ভব? কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বন্দেমাতরম-এর স্থপতি। স্বাধীনতা আন্দোলনে বাংলার কবি-সাহিত্যিকদের অবদান ইতিহাসের পাতায় পাতায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। বাঙালির দেশপ্রেম বেনজির। ১৯৪৭-এর দেশভাগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঙালি। দেশ বিভাজনের বলি হয়েছিল বাংলা, সিন্ধু প্রদেশ এবং পাঞ্জাব, কিন্তু বাংলা ছাড়া ওই দুই প্রদেশের মানুষজন সসম্মানে ভারতের মাটিতে পুনর্বাসন পেয়েছেন। বাঙালির ক্ষেত্রে জুটেছে লাঞ্ছনা। পশ্চিমবঙ্গের মরিচ ঝাঁপিতে উদ্বাস্তু বাঙালির উপর গুলি চালায় পুলিশ। জোর করে তাঁদের দণ্ডকারণ্যে পুনর্বাসন দেওয়া হয়। স্বাধীনতার পর অসমে বাংলাভাষীদের প্রতি যে আচরণ শুরু হয়, রূপ বদল করেই তা অব্যাহত। ভূমিপুত্র এবং বহিরাগত; এরকম দুই শ্রেণিতে রাজ্যের মানুষকে বিভাজিত করে রাখার ধারাবাহিক প্রক্রিয়া ও চক্রান্ত এখনো চলছে। দেশভাগের পর পর শ্রীহট্টকে, গণভোটের নামে প্রহসনে সাজিয়ে পাকিস্তানে ঠেলে দেওয়া হল। শ্রীহট্টের অসংখ্য বাসিন্দা নিরাপত্তার প্রশ্নে বাধ্য হয়ে অসমের বিভিন্ন জেলায় আশ্রয় নিলেন। এইসব মানুষজনকে হেনস্থা করার জন্যই রচিত হয় কুটিল কৌশল। ভাষা ও শিক্ষার অধিকার হরণের মতো ষড়যন্ত্র চাঙ্গা হল। কিন্তু প্রবল প্রতিরোধে তা ভেস্তে যায়। স্বাধীনতার সময় অসম-সহ গোটা উত্তর পূর্বাঞ্চল পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। তখন নেতাজি অসমে এসে জননায়ক অরুন কুমার চন্দ, সতীন্দ্রমোহন দেব এবং বৈদ্যনাথ মুখার্জির সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হয়ে লিগের মন্ত্রিসভার পতন ঘটিয়ে গোপীনাথ বরদলৈ-এর নেতৃত্বে কংগ্রেস মন্ত্রিসভা গঠনের ভিত্ গড়ে তুললেন। নেতাজি ওই সময় উদ্যোগী না হলে গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চল পাকিস্তানের উদরে চলে যেত। ওই ইতিহাস স্মরণ করেই বাঙালির প্রতি যে ধরনের আচরণ করা উচিত, তার স্বরূপটি কখনো দেখা যায় নি। এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে!

ভয়ের কবলে অসম, আবার উচ্ছেদ অভিযান

আদালতের নির্দেশের দোহাই দিয়ে অসমের বিভিন্ন জায়গায় বনাঞ্চলের জমি থেকে উচ্ছেদ করার যে অভিযান শুরু হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে যে, এসব এলাকার বাসিন্দারা সবাই বাংলাদেশি। ১৯৮৫ সালে অসম চুক্তি স্বাক্ষরের পর অসমে অসম গণ পরিষদ সরকার গঠন করে। আঞ্চলিক দলটি নিজেকে জাতীয়তাবাদী হিসেবে তুলে ধরে। অসমে যদি এত বাংলাদেশি নাগরিক ছড়িয়ে রয়েছেন, তাহলে অসম গণপরিষদের নেতৃত্বাধীন সরকার কেন বাংলাদেশিদের চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হল? কেন ফেরত পাঠাতে পারল না তাদের অনাকাঙ্খিত বিদেশিদের? ছাত্র নেতারা সারা আসাম ছাত্র সংস্থা বা আসু এবং গণ সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন। তাঁদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল, বিদেশি খেদাও। তাহলে তাঁদের সরকারের আমলে কেন বিদেশিদের বহিষ্কার করা সম্ভব হল না, এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

আমরা চাই না, কোনও অবৈধ বিদেশি ভারতের মাটিতে থাক। প্রসঙ্গত বলা দরকার, দেশভাগের বলি হয়ে কোনও মুসলিম তো অসমে আসেননি। এঁরা তো উজান ও নিম্ন অসমে সম্ভবত ১৮৮৩ সাল থেকে বসবাস করছেন। তাঁদের বাংলাদেশি বা বঙ্গীয় মূলের নাগরিক বলে তোপ দেগে লাঞ্ছনা করা হচ্ছে কেন ? অসমের বঙ্গভাষী কৃষকদের একাংশ অসমীয়া হিসেবেই বরাবর নিজেদের মাতৃভাষা হিসাবে নথিভুক্ত করে আসছেন, তাঁদের পঠনপাঠনের ভাষাও অসমিয়া। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার হাতেগোনা কিছু ব্যবসায়ী নিজেদের মাতৃভাষা বাংলা লিখিয়ে আসছেন। এটা নতুন কোনও বিষয় নয়।

বিভ্রান্তি আর প্ররোচনার নবোদয়

এবার মাতৃভাষা কে কী লিখবে, এ নিয়ে রাজনৈতিক স্তরে চাপান উতোর শুরু হয়েছে। আদমশুমারিতে মাতৃভাষা লেখার বিষয়কে কেন্দ্র করে কোনও সংগঠন যদি মনে করে, অসমের জন-বিন্যাস পাল্টে দেওয়া সম্ভব, তাহলে তারা ভুল করছে। অসম বহুভাষিক রাজ্য। সম্প্রতি হঠাৎ গজিয়ে ওঠা এক নেতা হুমকি দিয়ে বলেছেন, অসমের চর জলাভূমি ও বনভূমিতে বসবাসকারী কৃষকরা যদি বাংলা ভাষাকে মাতৃভাষা হিসাবে ঘোষণা করে দেন, তাহলে অসমিয়ারা সংখ্যালঘু হয়ে পড়বেন। এই বিবৃতির পর, পাল্টা বিবৃতিতে, মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেছেন, মুসলমানদের অধিকাংশই তো নিজেদের মাতৃভাষা বাংলা লিখেই এসেছেন। তিনি একথাও বলেছেন, আদমসুমারিতে সমবেতভাবে অথবা কেউ কেউ যদি বাংলাকে তাঁদের মাতৃভাষা বলে দেন তাহলে বাংলাদেশিদের খুঁজে বের করতে এনআরসির প্রয়োজন পড়বে না। তাঁর এ বক্তব্য রাজনৈতিক ময়দানে আসর গরম করার জন্য যথেষ্ট। প্রকৃত অর্থে এ বক্তব্য অন্তসার শূন্য বলতে হবে। কারণ, কেউ যদি বাংলা ভাষায় কথা বলে তাহলে তাকেই বাংলাদেশি হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। অসমে বসবাসকারী শহর ও সমতলের বাঙালির বড়ো অংশ বরাবর লিখে এসেছেন, তাঁদের মাতৃভাষা বাংলা। এবারও একথা লিখাবেন, সন্দেহ নেই। প্রশ্ন হল, বাংলা বললেই বা বাঙালি পরিচয় দিলেই তাদের পরিচিতিতে বাংলাদেশি তকমা সেটে দেওয়ার বিপজ্জনক প্রবণতা কেন? এর পিছনে কী লক্ষ্য নিহিত?

উচ্ছেদ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, ১৯৭১ সালের আগের নথি দেখাতে পারলে সরকার তাঁদের বিনামূল্যে জমি দেবে। তার মানে সরকার নিশ্চিত যে যাঁরা উচ্ছেদের বলি হয়েছেন, তাঁরা সবাই বাংলাদেশি নন। আবার মুখ্যমন্ত্রী একথাও বলেছেন, যাঁদের উচ্ছেদ করা হয়েছে, তাঁরা কেউ ভূমিহীন নন। তাঁদের অন্যত্র জমিজমা, বাড়িঘর রয়েছে।

নীরব থাকা যায় না

এসব বিষয় সরকারেরই দেখা উচিত, এ নিয়ে আমি কোনও বিশেষ মন্তব্য করতে চাই না। তবে নানা অজুহাতে বাঙালির প্রতি যে বৈষম্য করা হচ্ছে, এ বিষয়ে নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকা অসম্ভব। চাকরি-বাকরির ক্ষেত্রে বাঙালির প্রতি অন্যায় অবিচার চলছে। অসমের এক তৃতীয়াংশ বাসিন্দা বাঙালি, কিন্তু মন্ত্রিসভায় তাঁদের প্রতিনিধি কুল্লে একজন। কংগ্রেস জমানায় এতটা বৈষম্য ছিল না। বাঙালির এক বড়ো অংশ এখন বিজেপির ভোট ব্যাংক, অথচ দেখা যায়, ভোট বৈতরণী পার হওয়ার পরেই তাঁদের প্রতি সুবিচার করা হয় না। এক্ষেত্রে কৃষিজীবী বাঙালির অবস্থা আরও দুঃসহ, আরও করুণ। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় কিছুসংখ্যক নাগরিক, বাঙালির বিরুদ্ধে যে ধরনের অভব্য কথাবার্তা বলে যাচ্ছেন, তাঁদের নিয়ে সরকারের নীরবতা বিস্ময়কর। বলা বাহুল্য, অসমে আবার বাঙালি বিদ্বেষের আবহ গড়ে উঠছে। এটা সামগ্রিক স্বার্থের পরিপন্থী। প্রতিটি জনগোষ্ঠীকে তাঁদের প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া উচিত। একইভাবে সুযোগ-সুবিধাও দেওয়া সরকারের কর্তব্য। বরাকের জ্বলন্ত সমস্যা নিয়ে এ অঞ্চলের জনপ্রতিনিধিরা নির্বিকার, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় এ পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। উচ্ছেদের বিরুদ্ধে যে সব নেতা কথা বলছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের আপত্তিকর ও কুরুচিকর মন্তব্য করা হচ্ছে। সুস্থ গণতন্ত্রে এ রকম আচরণ ঘোরতর অন্যায়। গণতান্ত্রিককে কেন ঘেরাও করবে বিদ্বেষ, কেন রুগ্ণতা ঝাঁপিয়েপড়ছে সমস্ত সূর্যমুখীদের দেহে, দৃষ্টিতে, হামলা করছে বহুত্ববাদের যাবতীয় গুল বাগিচায়!

♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦

লেখক প্রাক্তন ছাত্রনেতা ও গৌহাটি হাইকোর্টের আইনজীবী।

মতামত লেখকের নিজস্ব।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!