- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- অক্টোবর ২৬, ২০২৫
বন্ধু মিথিলেশ
আমার বন্ধু মিথিলেশ স্বয়ংপ্রভ জ্যোতিষ্ক, বহু শাখা-প্রশাখায় প্রলম্বিত এক মহীরূহ। কেউ বুঝুক-না বুঝুক, তার কলম কখনও বিশ্রাম নেয়নি
‘কবে তৃষিত এ মরু ছাড়িয়া যাইব তোমারি রসাল নন্দনে’ – রজনীকান্ত সেনের এই গানটি সম্পর্কে অন্তত মিথিলেশের আগ্রহ ছিল না কোনো। জীবনকে সে ‘তৃষিত মরু’ ভাবেনি কখনও, এমনকী জীবন-সঙ্গিনী রুবি(প্রগতি)-র চিরবিদায়ের পরেও। বরং দারুণ পীড়ার সঙ্গে যুদ্ধরত রুবির শুশ্রুষা কী অবিচলভাবে করেছে সে, আমরা দেখেছি। ২০১৬ এর নিষ্ঠুর ২৪শে এপ্রিলে জীবন-সঙ্গিনী চিরপ্রণম্য অগ্নিকে সঁপে দেওয়ার পরেও আত্মমগ্ন মিথিলেশের ধৈর্য্য ও সমাহিত রূপ আমরা দেখেছি। নয় বছর ধরে মারের সাগর সে পাড়ি দিয়েছে একা। কিন্তু নিঃসঙ্গ হয়নি। ১৯৬৭ তে সেই যে গল্পাকথার কারুকৃতি নির্মাণ শুরু হলো তার, তাতে ছেদ পড়ল না কখনও। মিথিলেশের লেখাজীবনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি আমরা ‘শতক্রতু’-র সহযাত্রীরা, উদযাপন করেছি।
‘গভীরতা’ শব্দটি যে জনপদে অচল সিকি, সেখানে মিথিলেশের ভ্রূক্ষেপহীন পথ চলা কত ব্যতিক্রমী আত্মিক ঐশ্বর্য: তা অনুভব করার অবকাশ কারও হয়নি। তবু আমার বন্ধু মিথিলেশ স্বয়ংপ্রভ জ্যোতিষ্ক, বহু শাখা-প্রশাখায় প্রলম্বিত এক মহীরূহ। কেউ বুঝুক-না বুঝুক, তার কলম কখনও বিশ্রাম নেয়নি।
মিথিলেশের গদ্যভুবনে, একমাত্র তখনই স্পষ্ট হবে এই আত্মসমাহিত কথাশিল্পীর প্রতি কতখানি সামূহিক অবিচার করা হয়েছে। এত বড়ো মাপের লিখিয়ে আমাদের দিনানুদিনের জীবন যাত্রায় মিলেমিশে ছিলেন : এই ‘অপরাধে’ তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা দিতে কুণ্ঠাবোধ করেছি; এর কি ক্ষমা আছে কোনো ?
মিথিলেশের পাঠক মাত্রেই অবহিত জীবনানন্দ দাশের কবিতায় আনখশির নিমজ্জিত তিনি। তার অনেক ছোটগল্পই কার্যত কবি জীবনানন্দের ভাবনার সম্প্রসারণ কিংবা সম্ভাব্য আখ্যান ভাষ্য। ‘জগৎ পারাবারের তীরে’ পড়ুন কিংবা ‘নদীর নাম লোভাতুর’ অথবা ‘কক্ষপথ’ বা ‘আট বছর আগের একদিন’— ছোটগল্পের এমন একটি ভিন্ন ধরন নজরে পড়বে, যার জুড়ি মেলা ভার। কিন্তু অভ্যস্ত আলোচনার গণ্ডিতে রুদ্ধ থাকল খনিগর্ভে প্রচ্ছন্ন হীরের নাগাল পাওয়া যাবে না। এই একই গল্পকার পরিণত বয়সে যে নতুন ধরনের হদিশ দিয়েছেন, তার প্রকৃত তাৎপর্যও অধরা থেকে যাবে। কথাকার মিথিলেশের যে সৃজনীবিশ্ব পলে-অনুপলে রচিত হয়েছে, নিবিড় পাঠ ছাড়া তার প্রতি সুবিচার করা অসম্ভব। ভরসা করি, অদূর ভবিষ্যতে এই প্রক্রিয়া শুরু হবে। নানা দিক থেকে যখন আলো এসে পড়বে মিথিলেশের গদ্যভুবনে, একমাত্র তখনই স্পষ্ট হবে এই আত্মসমাহিত কথাশিল্পীর প্রতি কতখানি সামূহিক অবিচার করা হয়েছে। এত বড়ো মাপের লিখিয়ে আমাদের দিনানুদিনের জীবন যাত্রায় মিলেমিশে ছিলেন : এই ‘অপরাধে’ তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা দিতে কুণ্ঠাবোধ করেছি; এর কি ক্ষমা আছে কোনো ? মনে-প্রাণে অপ্রাতিষ্ঠানিক এই লিখিয়ে লেখাকর্মী ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে সামাজিকতায় আগ্রহী ছিলেন না— সম্ভবত এইজন্যে তাঁর চিরবিদায়ের পরে মরদেহের দখল নিয়েছে যারা ‘লেখা’, ‘সাহিত্য’, ‘মর্যাদা’ সম্পর্কে বিন্দুবিসর্গ জানে না। ৫৯ বছরের বন্ধু আমি, শেষ দেখার সুযোগই পেলাম না। পায়নি মিথিলেশের অনুরাগী কোনো লেখাকর্মী, এমনকি তার প্রতিবেশীরাও। জীবনে-মরণে নিজের অপ্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান প্রমাণ করে গেল আমার বন্ধু মিথিলেশ।
এই বয়ানে তার গল্পকৃতি নিয়ে মন্তব্য করব না। অন্য কোনো প্রতিবেদন সেইজন্যে নির্দিষ্ট রইল। এইটুকুই শুধু লিখব, নানা তথ্যানুষঙ্গ থেকে বুঝতে পারছি, বেশ কিছু ইঙ্গিত সে রেখে গেছে তার নিভৃত প্রস্তুতির, অমোঘ এক মুহূর্তের জন্যে। তবে উদাররমণীয় জীবন-পরিধি তার নিজস্ব রচনা। অকপট, অপ্রত্যাশী, উদাসীন, কস্তুরীমৃগের মতো আপনি বিভোর মিথিলেশ কখনও গোপন পাটিগণিতে অমূল্য সময় খরচ করেনি। গত ৫৯ বছরের অনুপম অন্তরঙ্গ স্মৃতিবলয় থেকে অমল হৃদয় মিথিলেশের অনুষঙ্গ ঘাই দিচ্ছে মনে। ঠিক মিথিলেশের জীবনানন্দীয় প্রিয় শব্দ ‘ঘাই হরিণী’-র মতো। আমি যে অনুভব নিয়ে লিখছি, সেই অনুভব থেকেই হয়তো লিখতে পারে ‘শতক্রুতু’-র রণবীর পুরকায়স্থও। তবে সঙ্গত কারণে তাঁর বয়ান হবে তাঁরই মতনই। বিচিত্র সমাপতনে আমার ও রণবীরের সহপাঠী ঝণ্টু (মহীতোষ)-র দাদামণি মিথিলেশ হলো আমাদের অভিন্নহৃদয় বন্ধু, সাহিত্যের নিবিড় পথে সহযাত্রী। বহুদিন রঞ্জু (রণবীর) মিথিলেশকে রগড়ের ভঙ্গিতে ‘মণ্টু দা’ বলেও ডেকেছে। কিন্তু অবধারিতই ছিল তপোধীর-রণবীর-মিথিলেশের ত্রয়ী। অনুজ শেখর সেই ত্রয়ীর সহযোগী, সে কথাটি লেখা দরকার, মিথিলেশের আশ্চর্য লেখাজীবন অলক্ষ্যে আমাদের উপরও ছায়াপাত করেছে। লেখার মধ্যেই আমরা নিঃশ্বাস নিই, বেঁচে থাকার পাঠ নিই, নন্দনের প্রকরণ শিখে নিই। তবে মিথিলেশের মতো এত নিসর্গলীন আমিও কী হতে পেরেছি ! যদিও কবিতা আমার প্রথম প্রেম। মিথিলেশের গদ্য কবিতার লাবণ্যে ঝলমল করে সদা-সর্বদা।
লক্ষ্য করে বোঝা যায়, সেই গদ্য তাঁর স্বভাবজাত; মৃদ্যু স্বর, অন্তর্লীন, স্বপ্নাতুর। মিথিলেশের গল্পসংকলনগুলির নাম লক্ষ্য করুন; ‘কক্ষপথ’, ‘চৈত্রপবনে’, ‘স্বপ্ন পুরাণ’, ‘প্রান্তজনের কথা’, ‘দেশভাগের গল্প’…। মনে হয় না কি, প্রতিটি ইশারাগর্ভ। শুধু তাই নয়, এগুলি পরস্পর বিনিময়যোগ্য। অর্থাৎ তার নামগুলি আসলে সর্বনাম। কথাটা আমি মিথিলেশকে বলেও ছিলাম। তার মানে তার গল্প নদীর মতো, স্রোতস্বিনী এবং সুপেয়। কেন ভেবেছি এমন, পরবর্তী কোনো বয়ানের জন্য সেই ব্যাখ্যা স্থগিত থাক। এখন ভাষ্যের সময় নয়, অনুভবে লীন হয়ে থাকার সময়। শ্যামলেন্দু চক্রবর্তী, শক্তিপদ ব্রহ্মচারী, বিজিৎকুমার ভট্টাচার্য, বিমল চৌধুরী, জীতেন নাগ, রুচিরা শ্যাম, দীপঙ্কর নাথ, অরুণকুমার চন্দ, ময়নুল হক বড়ভুঁইয়াদের নক্ষত্র সমাবেশে সদ্য যোগ দিয়েছে আমার বন্ধু মিথিলেশ। রাতের কল্লোল কী বলে যাচ্ছে, তাই শুনব কান পেতে। আমার মনে পড়ে যাচ্ছে, কবি মোহাম্মদ সাদিকের কিছু স্মরণীয় পংক্তি:
‘ মানুষ জন্মগ্রহণ করে কারণ নদী হওয়া ছাড়া তার
ভিন্ন কোনো বাসনা নেই
মানুষ জন্মগ্রহণ করে, কারণ মাটি হওয়া ছাড়া আর তার অন্য
কোনো নিয়তি নেই । ’
‘নদীর নাম লোভাতুর’ লিখেছিল যে মিথিলেশ, সে আজ বড়াইলপারের নদী বরাক-কুশিয়ারার জলধারায়। আর, সেই জলে প্রতিবিম্বিত আকাশে, ধুলোয়, মাটিতে, হাওয়ায়, আলোয় মিশে গেছে সে। তাঁর একটি ছোটগল্পের কথা মনে পড়ছে যাতে প্রগাঢ় দার্শনিক-বোধের উচ্চারণ রয়েছে; ‘সিগারেটের আগুনে আমি আছি। আছি এই রোদেও, ছায়ায়, হাওয়ায়, বৃষ্টি কণায়।’ হ্যাঁ, মিথিলেশ, তুই আছিস এবং থাকবি চিরদিন। শুধুই আমাদের স্মৃতির অনুসঙ্গ হয়ে নয়। আমার, রণবীরের তুই বন্ধুগোলাপ। ‘শতক্রুতু’-র সুরভিত অস্তিত্বে তুই। যখন পরছে না তোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে, তারার পানে চেয়ে চেয়ে তখনও খুঁজে নেবো তোকে।
রণবীরের প্রিয় শব্দাবলী ‘অতীত ছাড়া কাল নেই’ তো তুই জানিস। সেখানে তুই, মিথিলেশ, চিরজীবী এবং আমাদের বর্তমানেও। অশ্রুনদীর সুদূর পারে যে-ঘাট উদ্ভাসিত আজ, তাঁরই নাম মিথিলেশ…
♦–♦•♦–♦•♦–♦•♦–♦
❤ Support Us








