Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • জুলাই ৯, ২০২৩

যুক্তির সন্ত্রাস এবং তসলিমা

যুক্তিবাদের ওপর চিন্তার সন্ত্রাস চাপিয়ে দিয়ে সংস্কারকে নির্মূল করা যায় না, বিবেক আর বাস্তবোধকে সঙ্গে রাখতে হয়, এই দৃষ্টান্ত, বিশ শতকের গোড়ায় আমাদের সামনে খাড়া করেছেন আরেক মহান বাঙালি। বেগম রোকেয়া

বাহার উদ্দিন
যুক্তির সন্ত্রাস এবং তসলিমা

চিত্র: সংগৃহীত

শরিয়ত বদলের দাবি!

 
ভারতে অভিন্ন দেওয়ানি আইন চালু করতে,সংসদে শীঘ্রই বিল পেশ করবে সরকার। এরকম আগ্রহ এই প্রথম নয়। বারবার দাবি উঠেছে। বিভিন্ন সম্প্রদায় ও জনগোষ্ঠী রাজি হয়নি। এবারও গড়ে  উঠছে বহু রৈখিক  বিরুদ্ধ জনমত। অনেকের আশঙ্কা, সরকার বহুত্ববাদী ভারতে একমাত্রিক আইন চাপিয়ে দিতে পারে। অমর্ত্য সেনের মতো প্রাজ্ঞ অর্থনীতিবিদ আর সমাজ বিজ্ঞানী সরকারের অভিপ্রায় নিয়ে নিঃসংশয় নন। একসময় কোরান-শরিয়তের পরিবর্তন দাবি করে অহেতুক বিতর্ক জুড়ে দিয়েছিলেন তসলিমা নাসরিন। তাঁর বিতর্ক প্রবণতাকে  মেনে নিতে  পারেনি বৃহত্তর সমাজ। ভারতে অভিন্ন দেওয়ানি আইন  প্রণয়নের  সুনির্দিষ্ট প্রস্তুতি পর্বে তসলিমা মানস খতিয়ে দেখার সামান্য চেষ্টা রইল এখানে।
 

মে ১৯৯৪।  আমাদের সামনে, কলকাতার এক হোটলে তসলিমা একজন সাংবাদিককে বলেছিলেন তাঁর পরবর্তী বইয়ের নাম ‘কোরানের নারী’। বইটি বাংলায় নয়। বের হবে ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায়, একই সঙ্গে নিউইয়র্ক ও প্যারিস থেকে। বইয়ের বিষয়, কোরানে নারীর অবস্থান অর্থাৎ কোরান নারীকে কতটা মূল্য দিয়েছে, বা কীভাবে ‘হেয়’ করেছে, ইত্যাদি ইত্যাদি তাঁর কলমের গন্তব্য।
 
কোরানের নারীকে নিয়ে তসলিমাব বিক্ষিপ্ত মন্তব্য আমরা তাঁর নির্বাচিত কলমেও পড়েছি, এর আগে আনন্দ-পুরস্কারের অনুষ্ঠানেও তাঁর তীক্ষ্ণতা আর বিদ্রুপ শুনেছি, নিজের আমিত্বময় আত্মবৃত্তান্তেও চিত্তজয়ী পয়গম্বরকে নিয়ে, মুসলিমদের নিয়ে, অশ্রাব্য,অশালীন মন্তব্য করেছেন।
 
তসলিমা নিশ্চিত—কোরান নারীকে মানুষের মর্যাদা দেয়নি, পুরুষের সামনে তাকে ‘অবাধ শস্যক্ষেত্রের মতো বিছিয়ে রেখেছে’ (নির্বাচিত কলম দ্রষ্টব্য)। এই বিষয় এবং এসব মনোভাবই, আমাদের অনুমান, আরও বিশদভাবে বিচারক আর বিশ্লেষকের আসন থেকে খতিয়ে দেখার যখন অঙ্গীকার করেছিলেন তসলিমা, স্বাভাবিক কারণে আমাদের আশঙ্কা হয়েছিল যে, তাঁর মূল্যায়ন সাধারণ মানুষ মেনে নেবেন না, বইটি কলকাতা কিংবা ঢাকার প্রকাশকরা বের করার সাহস পাবেন না। বিদেশের মাটি এর প্রকাশের যোগ্য জমিন, বিদেশি ভাষাও উপযুক্ত মাধ্যম। তখন,  সুইডেনের সুরক্ষিত ও সুরম্য জীবনে স্বনির্বাসিত তসলিমা ফোনে ঢাকার প্রিয়জনদের বইলেখার সুখবর রপ্তানি করে বলেছিলেন, ‘কোরানের নারী লেখা শেষ। শিগরিরি বের হবে।’
 
বইটি কি শেষ পর্যন্ত অক্ষরে ভূমিষ্ট হয়েছিল? কিংবা আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় বিতর্ক-প্রবণ লেখককে অধিকতর বিতর্কিত হবার রসদ যুগিয়েছিল কতটা? এসব প্রশ্নের উত্তর অবশ্য আড়ালেই পড়ে রইল।
 
ওই সময়, স্টেটসম্যান পত্রিকায় প্রকাশিত  যে-সাক্ষাৎকারকে ঘিরে তাঁর ওপর যে নগ্ন আক্রমণ আমরা দেখেছি, এর কারণ সম্ভবত কেবল তসলিমার কোরান বিষয়ক বিবৃতি নয়, তাঁর তথাকথিত আপসহীনতা, তাঁর উসকানিও কারও কারও তাণ্ডবের অন্যতম উৎস হয়ে ওঠে।
 
কোরান ও হাদিসের প্রতি তসলিমার একরোখা অবস্থান কারও অজানা নয়। ঘোষিত ধর্মদ্রোহী মহিলা। অনুশাসিত নারীর গলার ফাঁস কলমের জোরে ছিন্ন করতে তিনি বদ্ধপরিকর। ধর্মের প্রাথমিক সূত্রকে নাগালের বাইরে রেখেই, আমাদের নজরে এসেছে, তিনি যথাসম্ভব হোমওয়ার্ক ও নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। এতে তাঁর কিছুটা সুবিধা হয়, অসুবিধাও  দেখা দেয়। সুবিধার দিকটা হচ্ছে, ধর্মতত্ত্বের মেহনতি ছাত্রের মতো তাঁর সময় খরচের বালাই নেই। বই-টইয়ের পাতা ঘাঁটতে হয় না, অনুষঙ্গহীন একটি দুটি অনুবাদই যথেষ্ট, আবেগতাড়িত লেখা তরতর করে এগিয়ে যায় পূর্বকল্পিত সিদ্ধান্তে। আর অসুবিধার দিকটি হচ্ছে, প্রাথমিক সূত্র ও ধর্ম—যা অনুশাসনের প্রেক্ষাপট, তা তাঁর পরিচয়ের বাইরে থেকে যায় বলে, কখনো কখনো তিনি গণ্ডগোল পাকিয়ে বসেন। পরস্পরবিরোধিতার শিকার হয়ে পড়েন। সামান্য একটি উদাহরণ এ প্রসঙ্গে যথেষ্ট। এই যেমন যে সাক্ষাৎকারকে ঘিরে তিনি এত সমালোচিত, আক্রান্ত এবং কোনো কোনো মহলে দুঃসাহসী বলে সম্মানিত হয়েছিলেন, সেই সাক্ষাৎকারেও তসলিমার বিভ্রান্তি ও স্ববিরোধ খুবই পীড়াদায়ক। সাক্ষাৎকাররত তসলিমার বয়ানে বেরিয়ে গেল যে, তিনি কোরানের আমূল পরিবর্তন চান। পরদিনই পালটা বিবৃতি দিয়ে চিঠি লিখলেন, কোরান অপরিবর্তনীয়। শরিয়তেরই সংশোধন চেয়েছেন তিনি। কলকাতা আর ঢাকার অতি উৎসাহীরা অবশ্য তাঁর ওই কৈফিয়ৎকে আমল দেননি, তাঁরা গোঁ ধরে বসে থাকলেন, কাগজে প্রকাশিত চিঠির ব্যাখ্যা নয়, তসলিমার প্রথম বিবৃতিই সত্য। ঢাকায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হবার পরও, গোপন আস্তানা থেকে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদকে, দেশে-বিদেশের খবরের কাগজকেও বিতর্কপ্রবণ লেখক পত্রযোগে জানিয়েছিলেন, কোরান নয়, তিনি শরিয়তের সংশোধন চেয়েছেন। কাগজের সাংবাদিক, যিনি অল্পবয়সি মহিলা, যিনি কোরান-শরিয়তের তফাৎ জানেন না, তিনিই নাকি তাঁর বয়ান বিকৃত করেছেন।
 
বিস্ময়ের সঙ্গে দেখেছি, ঢাকার কিছুসংখ্যক  প্রতিষ্ঠানও তসলিমার এসব আত্মসাফাইকে বিন্দুমাত্র আমল দেননি, বয়ানের মিথ্যাকে সম্বল করে ‘রাস্তা-বিপ্লব’ গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর মাথার দাম চড়ালেন, আত্মীয়-স্বজনকেও হত্যার হুমকি দিলেন। আমরা ধরে নিচ্ছি, স্টেটসম্যান পত্রিকার প্রতিনিধি কোরান ও শরিয়তের তফাৎ কী, তা জানেন না। না জেনেই শরিয়তের জায়গায় ‘কোরান’ জুড়ে দিয়ে প্রচার প্রবণ লেখককে কঠিন বিপদ ও বিতর্কের মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন। আবার এ কথাও মাথায় রাখতে হচ্ছে যে, তসলিমা নাসরিন, যিনি জন্মসূত্রে মুসলিম, একজন লেখক, একজন স্পষ্টবাদী এবং সংশয়হীনভাবে মুক্তচিন্তার প্রবক্তা, তাঁর কাছে কোরান ও শরিয়তের তফাৎ রহস্যহীন হাসির মতোই পরিষ্কার থাকার কথা। কিন্তু যাঁরা ইসলামের বিষয়-আশয়ের মামুলি কিংবা অতলস্পর্শী ছাত্র, তাঁরা কি মেনে নেবেন তসলিমার এরকম সরলীকরণ? না তাঁরা বলবেন, কোরান ও শরিয়ত অভিন্ন, শরিয়তের রদবদল মানেই কোরানি নির্দেশের সংশোধন? যাঁরা নিরীহ, যাঁরা সরল ধর্ম বিশ্বাসী, অনুশাসনের অভ্যাসে আটক, বা যে-সব প্রশ্নহীন মানুষ অনুশাসিত নির্দেশকে ইহকাল ও পরকালের মুক্তির একমাত্র পথ ভেবে যুক্তি ও বুদ্ধির মুক্তিক্র অবরুদ্ধ করে রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, বা যে-পড়শি ইসলামের ন্যায়-নীতির বিন্যাস সম্পর্কে আদপে ওয়াকিবহাল নন, তাঁরা যদি কোরান ও শরিয়তকে আলাদা দুই প্রান্ত থেকে বিচার করেন, তাহলে এ বিচারের ক্ষুদ্র গলদ খুব একটা গ্রহণযোগ্য নয়, মারাত্মকও নয়। কেননা, এতে কোনো ঝুঁকি নেই, দ্বিতীয়ত আমরা সবাই  জানি, সাধারণের বিদ্যার দৌড় সাধারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু যিনি তাঁর সমস্ত শক্তি নিয়ে ধর্মের ‘নিশ্চল বোঝাকে’ সরাতে একক যুদ্ধে অবতীর্ণ, যাঁর সামনে স্পষ্ট ও বিঘোষিত যুদ্ধজয়ের স্বপ্ন, তিনি কেন সমাজ-বিজ্ঞানের নিখুঁত ছাত্রের মতো খতিয়ে দেখবেন না কোরান আর শরিয়তের দূরত্ব কিংবা নৈকট্য?
 
তসলিমা বলে থাকেন, তাঁর ধর্মের নাম মানবধর্ম। এই ধর্ম ঈশ্বর, প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত পয়গম্বরের বা কোনো ‘পবিত্র গ্রন্থের’ নির্দেশ মানে না। এ বিষয়ে আমরা মনে করি, আধুনিক চিন্তার ভিত হবে আবেগ, যুক্তি, বুদ্ধি ও বিবেকের সমন্বয়। অনুশাসন কখনও মানুষের নিয়ন্ত্রক হওয়া উচিত নয়।   এক্ষেত্রে মধ্যযুগের সাধু-সন্তদের মানবধর্মের সরল ও লৌকিক ব্যাখ্যাও যেন বুদ্ধির একমাত্র চালিকা শক্তি নয়। ব্যাখ্যা ও ভাবাবেগ দিয়ে ধর্মপ্রাণকে সাময়িকভাবে ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িক ধর্মের আগ্রাসন থেকে আগলে রাখার অনুশীলন রয়েছে, একারণে ঘোর দুর্দিনে উন্মাদনায় পড়ে মানবধর্মের সরল আবেদন তৃণখণ্ডের মতোই ভেসে যায়, মানুষ অবচেতন পার্থক্যবোধে আক্রান্ত আর রক্তাক্ত । বিদ্বেষ ও গুজবে সংশয়াচ্ছন্ন মন পরস্পরবিরোধী শিবিরে খণ্ডিত ও উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে। এ জন্যই ধর্মের বিরুদ্ধে মানবতার নিছক স্লোগান নয়, চাই যুক্তি ও বিবেকের লড়াই, চাই ধর্মের সমস্ত আটঘাটকে জেনে বুদ্ধির সংগঠিত বিস্তার।
 
ভিত্তিহীন স্বাতন্ত্র্যবোধে যাঁরা বিশ্বাসী, সাংগঠনিক ঐক্যের প্রতি তাঁদের অনাস্থা এক্ষেত্রে একটি সমস্যা। তাঁরা হৃদয়ের নির্মল তাড়নায় ধর্মকে উড়িয়ে দেন। তাঁদের প্রধান অস্ত্র যুক্তি নয়,আবেগ। বুদ্ধি ও যুক্তির ঘর নির্মাণের দীর্ঘ প্রস্তুতি নয়, তাৎক্ষণিক উদয়েই তাঁরা আবিষ্কার করে বসেন মধ্যাহ্নের সূর্যকে। অনুশাসন নামক যে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তাঁদের যুদ্ধ, তার উত্থান ও বিস্তার একদিনে হয়নি। হাজার হাজার বছর ধরে সে তার হাত-পা বড়ো করেছে। তার বিধিকে স্তরে স্তরে সে স্ফীত করেছে। এই ধরনের বিশ্বাসকে সংস্কার করতে হলে, তার দুর্গের বিস্তর সংবাদ জানা দরকার। প্রয়োজন যথাযথ রণকৌশল ও সংগঠিত মোকাবিলা। মেঘলা আকাশে হঠাৎ উদিত সূর্য কি একা লড়তে পারে নিম্নচাপের বিরুদ্ধে? লড়তে হলে সঙ্গে চাই অনুকূল আবহাওয়ার সমর্থন এবং নিম্নচাপের অধোগতি।
 
‘বিজ্ঞান ও প্রেমমনস্ক’ তসলিমার দুঃসাহস নিয়ে আমাদের প্রশ্ন আছে। তাঁর লড়াইয়ের কৌশল, আত্মপ্রচারের ডঙ্কা এবং ধর্মবিদ্যার ফাঁক নিয়েই আমাদের জিজ্ঞাসা বাড়িয়ে দেয়। ধর্মের বাড়াবাড়িকে কাবু করতে হলে, বৃত্তান্ত জানতে হবে অনুশাসনকে কব্জা করে। ধর্মের মানুষের মধ্যে মুক্তবুদ্ধির চাষবাস করতে হলে, বিধিনিষেধ গড়ে ওঠার প্রেক্ষাপটের পরিমিত, যুক্তিনির্ভর জ্ঞান থাকা দরকার। না হলে, বিপদ শুধু ব্যক্তির নয়। বিপদ সমষ্টির। ধর্মের তথ্যবিমুখ ব্যাখ্যা বিরুদ্ধ শিবিরকেই শক্তি যোগায়। যিনি মৌলবাদী নন, যিনি নিছক সরল ধর্মবিশ্বাসী, যুক্তির পথে এখনও  যাঁর হাঁটি হাঁটি পা, তিনি আচমকা যুক্তিবাদীর শৃঙ্খলাহীন বিন্যাসে ভড়কে গিয়ে পিছু হাঁটতে শুরু করবেন। তসলিমা অবিকশিত সমাজে মুক্ত চিন্তার সম্ভাবনাময় একটি ক্ষুদ্র বলয়ে, অপ্রস্তুত মাটিতে দাঁড়িয়ে—হঠাৎ বিপ্লবের শোরগোল তুলে নিজের চারপাশে যে অবরোধ, যে আবহ তৈরি করেছেন, তার চাইতে অনেক বড়ো প্রাচীর তিনি সম্ভবত নিজের অজান্তে গড়ে তুলছেন নির্ণীয়মান যুক্তিবোধের বিরুদ্ধে। ভেবে দেখলে ভালো হত, এতে, উপকার শুধু তাঁর নয়, উপকার আমাদের সকলের, গোটা উপমহাদেশের।
 

কোরান মানুষকে গোষ্ঠী, জাতি কিংবা লিঙ্গ ভেদে বিচার করেনি। কোরানের ঈশ্বরের জাত নেই। গোষ্ঠী নেই, তাঁর লিঙ্গের পরিচয়ও নেই, প্রকৃতির মতোই তিনি সর্বত্র বিরাজমান।  ঈশ্বরের চোখে নারী-পুরুষ দুপক্ষই বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী— এই দুই শ্রেণিতেই বিচার্য। তাঁর বিধান নারীপুরুষ উভয়ের জন্য প্রযোজ্য। উভয়ের জন্য ইসলাম পৃথক পৃথক আইন তৈরি করেনি। পার্থক্য তৈরি হয়েছে পুরুষতান্ত্রিক ভাষ্যে, পরবর্তী সময়ে

 
সত্তরের দশকে, বাংলাদেশের ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রনীতির জন্মলগ্নে ভূমিহীন, যুক্তিহীন কবি দাউদ হায়দর হজরত মহম্মদ(সঃ), যিশু ও বুদ্ধকে নিয়ে অপ্রয়োজনীয় কটুক্তি করে বিশেষ কোনো চিন্তাবিপ্লব ঘটাতে পারেননি। দাউদ বিদ্রোহী সেজেছিলেন, জন্মেই আজন্ম পাপ দেখেছিলেন তিনি, প্রতিবেশী ভারতে ভিসাহীন অতিথির ভবঘুরে যৌবন উপহার পেয়েছিলেন। শেষপর্যন্ত উদার জার্মানি তাঁকে আশ্রয় দিয়েছে। আক্ষেপের বিষয়, লোকায়াত রাষ্ট্রনীতির নাজুক প্রভাতের ওই ধাক্কা আজও ভুলতে পারেনি বাংলাদেশ। সলমান রুশদির ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ও তেমনি অচলায়তনকে সরাতে পারেনি। রুশদি আজও অবরুদ্ধ, পাশাপাশি প্রাচ্যপ্রতীচ্যের বহু দেশে স্বাধীন চিন্তাও অতি উগ্রদের হুঙ্কারের দাপটে গৃহবন্দি।
 

স্বেচ্ছাচার নয়, দরকার বিদ্যাসাগরীয় কৌশলের সূক্ষতা

 
উনিশ শতকের কলকাতায়, ইয়ং বেঙ্গলের অতি উৎসাহী সদস্যরা মুখের জোরে গো মাংস খাবি, গো মাংস খাবি-র স্লোগান হাঁকিয়ে, মদের ড্রামে কখনো কখনো হাত চুবিয়ে, ধর্মের সংস্কার ভাঙতে চেয়েছিলেন। তাঁদের আবেগ ছিল, উদ্যম ছিল, স্বাধীনতাবোধও ছিল। স্বেচ্ছাচারিতা রোখার মতো সাংগঠনিক স্থিরতা ও শৃঙ্খলা তাঁদের ছিল না। ঐতিহ্যময় অনুসন্ধানঅ ছিল না। তাই ইয়ং বেঙ্গলের প্রায় সব নায়ক প্রতিভার অপচয়েই ফুরিয়ে গেলেন। তাঁদের যুববিপ্লবে অচিরে নেমে এল অকাল মৃত্যু।
 
যুক্তির নৌকা যেখানে নড়বড়ে আর স্পর্শকাতর, সেখানে মাঝি এবং সমুদ্র পাড়ির সংগঠককে সতর্কতার সঙ্গে হাল ধরতে হয়। তখন যাত্রীদের অহেতুক ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেওয়া চলে না। এই মুহূর্তে, এই উপমহাদেশে ইয়ং বেঙ্গলের আদর্শ নয়, দরকার বিদ্যাসাগরের সূক্ষ্মতা। ধর্মকে জেনে, শাস্ত্রের আপাতবিরোধ তলিয়ে দেখে জরুরি তার অন্তঃসারশূন্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা।  বিদ্যাসাগরের নিঃশব্দ বিপ্লব আজ আরো বেশি প্রাসঙ্গিক। ওই মহান বাঙালির কলমে ফাঁপা আওয়াজ ছিল না। চমক ছিল না। প্রতিটি পদক্ষেপে হিসেব ছিল নির্ভুল। ইয়ং বেঙ্গলের স্বেচ্ছাচারিতার যথার্থ উত্তর ছিল বিদ্যাসাগরের কাজে আর স্বাধীন প্রজ্ঞায়।
 
যুক্তিবাদের ওপর চিন্তার সন্ত্রাস চাপিয়ে দিয়ে সংস্কারকে নির্মূল করা যায় না, বিবেক আর বাস্তবোধকে সঙ্গে রাখতে হয়, এই দৃষ্টান্ত, বিশ শতকের গোড়ায় আমাদের সামনে খাড়া করেছেন আরেক মহান বাঙালি। বেগম রোকেয়া। ধর্মের অবরোধ অতিক্রম করে; নিজের ভেতরে এবং বাইরেও তৈরি করেছিলেন স্বাধীন পৃথিবী, ওই পৃথিবীর আলো হাওয়ায় ইদানীং ফুরফুর করে ঘুরে বেড়ান বাংলাদেশের মহিলারা। তসলিমাও তাঁদের একজন। রোকেয়া ধর্মগ্রন্থের অপৌরুষেয়তাকে আমল দেননি। অবতারতত্ত্বের পুরুষতন্ত্রকে উড়িয়ে দিতে দ্বিধা করেননি। তাঁর যুক্তির বিন্যাস অকাট্য। বিস্মিত নই, তবে বলতে বাধ্য হচ্ছি যে,তসলিমার আবেগসর্বস্বতায় আমরা আহত, তাঁর চিন্তায় রোকেয়ার উত্তরাধিকার নেই, বিদ্যাসাগরীয় অনুশীলনও নেই। এঁদের আদর্শে সম্ভবত তাঁর আস্থাও নেই। তাহলে কোথায়? ধর্ষণের জবাবে পালটা ধর্ষণে? অযুক্তির উত্তরে যুক্তির সন্ত্রাসে? বুদ্ধির নির্মাণ নয়, যুক্তির শিলান্যাসও নয়, আমাদের আশঙ্কা, তসলিমার ‘কোরানের নারী’ বের হলে তা আরও বেশি শক্তি যোগাত দুনিয়াজোড়া আতঙ্কবাদের উল্লাসে।

 

শরিয়তের মৌল কাঠামো

 
ইসলামি আইনের ধর্মীয় নাম ‘শরিয়ত’। শরিয়তের মূল উৎস কোরান। দ্বিতীয় উৎস হাদিস  (হজরত মহম্মদের মৌখিক উপদেশ)। তৃতীয় উৎস সুন্নাহ (মুহাম্মদের আদর্শ)। এছাড়াও, মহাম্মদের (সঃ) সমসাময়িক অনুগামীদের (সাহাবা) মুখের বয়ান ও আচার-আচরণও তৈরি করেছে শরিয়তের মৌল কাঠামো। বিধিবদ্ধ শরিয়ত গড়ে তুলতে বিস্তর সময় লেগেছে। বহু আলোচিত বিষয়, তবু পুনরাবৃত্তি করতে হচ্ছে যে, মহাম্মদ(দঃ) তাঁর জীবদ্দশায় যেমন কোরান কিংবা হাদিসের লিখিত আদল রেখে যাননি, ঠিক তেমনি শরিযতের দেহনির্মাণও তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। কোরান ও হাদিসের বিভিন্ন পাঠ সংগ্রহ করে বিধান তৈরি হয়েছে তাঁর মৃত্যুর অনেক অনেক পরে। শরিয়তও সুচিহ্নিত ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে উঠেছে শাস্ত্রকারদের বিদ্যা ও অনুশাসনকে ঘিরে, আরও কয়েক যুগ পেরিয়ে এসে। পূর্বাঞ্চলীয়  খ্রিষ্ট তাত্ত্বিকদের  লিখিত ও সুগঠিত আইনের সঙ্গে পরিচিত হবার পরই ইসলামের অনুগামীদের মাথায় ধর্মের আইন তৈরির চিন্তা এল। এই চিন্তায় অনেক সময় শাস্ত্রকারদের ব্যক্তিক বিবেক ও বুদ্ধি গুরুত্ব পেয়েছে, ইহুদিদের শাস্ত্র-ব্যাখ্যার প্রভাবও অনুপ্রবেশ করেছে।
 
কোরান-হদিসের মৌলিক নির্দেশকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শরিয়তের পৃথিবী। সংবিধান ও রাষ্ট্রের আইনের মধ্যে যে তফাত আমরা দেখি, কোরান ও শরিয়তের মাঝখানেও সে তফাত রয়েছে।
 
আইনের সংশোধন মানেই সংবিধানেরও সংশোধন। ঠিক একইভাবে, শরিয়তের পরিবর্তনের দাবি তুললে কোরান পরিবর্তনের প্রসঙ্গ চলে আসে। আর এ পরিবর্তন আঙ্গিক নয়, শব্দ, ভাষা বা প্রতীকের নয়, পরিবর্তন চিন্তার। কোরানের ভাষা বা চিন্তার পরিবর্তন সাধারণ বিশ্বাসীর পক্ষে মেনে নেওয়া কি সম্ভব? এরকম দাবি তোলা কি যুক্তিসঙ্গত? ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী কোরানের অঙ্গ আর চিন্তা দুটোই অবিনশ্বর।
 
গ্রিক চিন্তার প্রভাবে, মুতজলিরা মনে করতেন, মানব-দেহের মতো কোরানের শরীরও নশ্বর।  তার চিন্তা চিরস্থায়ী। রক্ষণশীল শাস্ত্রকাররা মুতজলিদের এ ব্যাখ্যা মেনে নেননি। পরে তাঁদেরই জয় হয়েছে। ধর্মবিশ্বাসী, প্রতিটি মুসলিমের ধারণা, ঈশ্বর যেমন চিরস্থায়ী ও অবিনশ্বর, ঠিক তাঁর বাণীর আকার ও চিন্তার মৃত্যু নেই। এ বাণীকে ঘিরে যে অনুশাসনের জন্ম হয়েছে, তাও একইভাবে অনড়, অব্যয়।
 
যুক্তি-বিজ্ঞানে যাঁর আস্থা, তাঁর পক্ষে এই বিশ্বাসের অনুগামী হওয়া সম্ভব নয়। তাঁর কাছে দেহ মানেই এক সময় মৃত্যু এবং চিন্তাও চিরস্থির নয়,পরিবর্তনশীল।
 
যুক্তিবাদী কোনো স্রোতহীন অনুশাসনের পরিবর্তন বা সংশোধন কেন চাইবেন? তিনি বড়োজোর বলতে পারেন, ধর্মে আমার আস্থা নেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই বিশ্বাসের ধার ধারি না। কিংবা এ কথাও বলার তাঁর অধিকার আছে যে, হাজার দুহাজার বা তিনহাজার বছর আগে তৈরি ধর্মগ্রন্থের ফরমান আজ আর চলে না। চিন্তা ও সভ্যতা বহু প্রাচীন অতীতকে পেরিয়ে এসেছে, যে অতীত মৃত। স্মৃতির পৃথিবী আর জীবিতের পৃথিবী এক নয়। জীবিতের পৃথিবীতে জীবন্ত আইন দরকার। দরকার প্রাসঙ্গিক এবং অভিন্ন আইনকানুন। যা কোনো গোষ্ঠীর নয়। সম্প্রদায়ের নয়। যা হবে, হওয়া উচিত সকল মানুষের।
 
তসলিমা নাসরিন স্ব-তৈরি বিতর্কের ফাঁদে পড়ে যখন কৈফিয়ৎ দিলেন যে, গীতা কোরান বা বাইবেল আজ আর প্রাসঙ্গিক নয়, তখন তাঁর ভাষায় আধুনিক মানুষের যুক্তি খুঁজে পাই, কিন্তু এই তসলিমা একই বয়ানে যখন বলতে থাকেন, কোরান নয়, শরিয়তি আইনেরই সংশোধন চাইছি, তখন তাঁর বিবৃতিতে পরস্পরবিরোধিতা কি প্রকট হয়ে ওঠে না? যে কোরান শরিয়তের উৎস, সে কোরান অচল হলে শরিয়ত সচল হয় কী করে? সমস্যাটা এখানেই। উপকথার দশ অন্ধের হস্তিদর্শনের মতো কোরান-শরিয়তের নির্মাণের ইতিহাস তসলিমার জানা নেই। জানা থাকলে, আশা করি বলতেন না, কোরান নয়, শরিয়তের সংশোধন চাইছি। যিনি ধর্মের বাইরে গড়তে চান একটি সুন্দর, স্বাস্থ্যময় মতভেদের জগৎ, যিনি অচল করতে চান কুযুক্তিকে, তিনি কেন হাতে নেবেন স্বল্পজ্ঞানী কলম? ধর্মকে যথাযত জেনে নিয়েই তাকে নাকচ কিংবা গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয় নয় কি?
 
সমাজতত্ত্বের দৃষ্টিতে,কোরানের ভূগোল মক্কা ও মদিনায় সীমাবদ্ধ। তার চিন্তা সাত-শতকের প্রথমার্ধের চিন্তা, আজকের নয়। ওই সময়ের আরব জাতির উত্থান এবং তাঁদের ধর্মের নির্মাণকে সামনে রেখেই কোরানের বিষয়-আশয়ের মূল্যায়ন করতে হবে। সাম্প্রতিকতার আলো দিয়ে অনুশাসনের প্রাসঙ্গিকতার বিচার চলে না। এতে ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিকতার প্রতি অবিচার হয়। মানুষ হিসেবে হজরত মুহাম্মদকে খাটো করা হয়। মানুষকে পয়গম্বর কোন চোখে দেখেছিলেন, সময়ের প্রয়োজনে তাদের কোন পথে চলার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তা খতিয়ে দেখতে হলে খুঁজে দেখতে হবে তখনকার ঘটনা ও সামাজিক প্রেক্ষাপট। ওই প্রেক্ষাপটের চরিত্র আলাদা। এর সঙ্গে এখনকার প্রেক্ষিত ও যাপনের সাদৃশ্য নেই। তখনকার অনুশাসনের সঙ্গেও স্বভাবত আজকের অবস্থানের গরমিল অশেষ। কোরানের ভাষ্যে (তফসির) সবসময় ঘটনা ও বিধিনিষেধের বাস্তব, অবাস্তব গুরুত্ব পেয়েছে। যাঁরা ঘোর রক্ষণশীল ভাষ্যকার, তাঁরাও পরিপ্রেক্ষিতকে এড়িয়ে যাননি, এড়াতে পারেননি।

 

পান্থজনের সখা’

 
কোরান মানুষকে গোষ্ঠী, জাতি কিংবা লিঙ্গ ভেদে বিচার করেনি। আগেও আমরা বলেছি, কোরানের ঈশ্বরের জাত নেই। গোষ্ঠী নেই, তাঁর লিঙ্গের পরিচয়ও নেই, প্রকৃতির মতোই তিনি সর্বত্র বিরাজমান।  ঈশ্বরের চোখে নারী-পুরুষ দুপক্ষই বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী— এই দুই শ্রেণিতেই বিচার্য। তাঁর বিধান নারীপুরুষ উভয়ের জন্য প্রযোজ্য। উভয়ের জন্য ইসলাম পৃথক পৃথক আইন তৈরি করেনি। পার্থক্য তৈরি হয়েছে পুরুষতান্ত্রিক ভাষ্যে, পরবর্তী সময়ে।
 
পুরুষকেন্দ্রিকতা হজরত মহম্মদকে রেহাই দেয়নি । তবু মুহাম্মদ ঘরে এবং বাইরে, রাজনীতিতে, সমাজকর্মে, জাতি ও রাষ্ট্রগঠনে মেয়েদের যে মর্যাদা দিয়েছিলেন, সাত শতকের পৃথিবীতে তা একটি বিপ্লব। নবির প্রথম পরামর্শদাতা ছিলেন একজন মহিলা। তিনি তাঁর প্রথম পক্ষের বিবি খাদিজা। বয়সে এবং অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ খাদিজার আর্থিক ও নৈতিক সমর্থন নিয়েই— সামাজিক দুরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন ইসলামের সুদৃঢ় প্রবক্তা। যখন তিনি নিঃসঙ্গ, নির্মীয়মান ধর্মবোধ নিয়ে খানিকটা সংশয়াচ্ছন্ন, তখন খাদিজাই তাঁর সংশয়মুক্তির দিশারী। তাঁর মধ্য এবং শেষ জীবনেও তাঁর চিন্তা ও কর্মের শরিক একইভাবে আরও দুজন মহিলা। এঁদের একজন উম্মে সালমা। অন্যজন বিবি আয়েসা। অসাধারণ সুন্দরী, বুদ্ধিমতী যুক্তিবাদী এবং তর্কপ্রবণ উম্মে সালমার পরামর্শে এবং মৌখিক  চাপে, উত্তরাধিকারের আইন থেকে বিবাহ-বিচ্ছেদ পর্যন্ত বহু ব্যাপারে সমসাময়িক পুরুষস্বার্থের পরিপন্থী গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে পয়গম্বরকে।
 
গোড়াতে ইসলাম মহিলাদের অধিকার নিয়ে সরব ছিল না। উম্মে সালমাই প্রথম প্রশ্ন তুললেন যে, মেয়েদের ব্যাপারে ধর্মগ্রন্থ নীরব কেন? মহম্মদ তৎক্ষণাৎ এবং সরাসরি উম্মে সালমার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি। কিছুদিনের মধ্যে উত্তর এল প্রত্যাদেশের আদলে। উম্মে সালমার সামনেই মুখস্থ পড়ার মতো গড়গড় করে বলে গেলেন পয়গম্বর—‘যে-সব পুরুষ এবং মহিলা আল্লার সামনে আত্মসমর্পণ করেছে, যে-সব পুরুষ এবং মহিলা খোদার অস্তিত্বে বিশ্বাসী…তাঁদের সবার জন্যেই  ক্ষমা আর সীমাহীন পুরস্কারের রাস্তা উন্মুক্ত।’ এই প্রত্যাদেশে আমরা লক্ষ করছি যে, শুরুতে কোরানের ঈশ্বর তাঁর বান্দাদের নারী-পুরুষ হিসেবে বিচার করেননি। তাঁদের দেখেছেন বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী হিসেবে। বিশ্বাস ও অবিশ্বাসই  হজরত মহম্মদের  মানবিক মূল্যয়নের অন্যতম উৎস।
 
যে প্রাথমিক সাম্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে তাঁর ধর্ম, সেখানে লিঙ্গভেদ বড়ো হয়ে ওঠেনি। পুরুষরা বিবেক ও বুদ্ধিতে বড়ো, গায়ের জোরে বড়ো, আর মেয়েরা দুর্বল, নিছক মেয়েমানুষ অথবা শয্যাসঙ্গিনী—এই পার্থক্যবোধের আবিষ্কারক পয়গম্বর নন, তাঁর হাদিসও নয়। এর আবিষ্কারক কিছু সংখ্যক শাস্ত্রকার এবং কোরান-হাদিসের বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা ও অশুদ্ধ পাঠ। ইসলামের নারী, মানুষ থেকে কীভাবে মেয়েমানুষে রূপান্তরিত হল, কোন ছলে রাজনীতি থেকেও সে নির্বাসিত, কীভাবে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হল অবগুণ্ঠন, কোরান ও হদিসকে সামনে রেখে এর একটা বিধিবদ্ধ, যুক্তিসম্মত বৃত্তান্ত নির্মাণ দরকার। মানুষ হিসেবে, কোরানের নারীর অবস্থান বুঝতে হলে, ইসলামি পরিমণ্ডলে মেয়েদের গড়ে ওঠার মূল্যায়ন ও পুর্নমূল্যায়ন খুবই জরুরি।
 
ইদানীং সমাজ আর রাষ্ট্র বিষয়টা নিয়ে ভাবছে, এটা অবশ্যই সুলক্ষণ। একে অকারণ সন্দেহের চোখে দেখা ঠিক নয়। হ্যাঁ, রাষ্ট্র যদি রাজনীতির অঙ্ক কষে ভোটের খিদে মেটাতে চায়, তাহলে প্রশ্ন তুলতেই হবে। একথাও বলতেও হবে, ফৌজদারি আইনের মতোই অভিন্ন সামাজিক আইন গড়ে উঠুক—যা মহীয়ান করবে নির্বিশেষের ছন্দ আর পছন্দকে, একমানবের চিরায়ত সাধনাকে। প্রস্তাবিত পথটি সম্ভবত দূরে নয় আর। সামনে নৌকো। ওপারে, এপারেও আলোরেখার চমৎকার বার্তা—এই হোক আমাদের অন্তরা।
 
এরকম প্রত্যায়িত প্রত্যাশা আর প্রর্থনায় কতটা ভরসা আছে তসলিমার? মনে হয় নেই। তাঁর নেই-এর পরিধি বড্ডবেশি নিনাদিত, অনালোকিত, আত্মসর্বস্ব বলেই সম্ভবত তাঁর যুক্তিহীনতা নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়, দেখা দেয় ঘোর সঙ্কট, দাঁতাল আর কবন্ধেরা ধেয়ে আসে, ঝাঁপিয়ে পড়ে সুবুদ্ধি আর বিবেকের ইমারতে। বিপন্ন বিষ্ময়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় আমাদের সবাইকে। দুপক্ষের উগ্রতা আর অন্ধতার হাত থেকে নিস্তার নেই বুঝি? আছে। রাত পোহালেই আলো ছড়ায় সূর্য, ভরসা যোগায় চরৈবেতির দর্শন—এগিয়ে যাও, এগোতে থাকো। দেখো ছড়িয়ে আছে বিদ্যা আর বিশ্বরূপের কতশত নিদর্শন— বিশ্বজুড়ে ঘুরে বেড়াও, সিরু ফিল আরজে—
 
কোরান আর উপনিষদের অভিপ্রায়কে মান্যতা দিয়ে আমরা যথাসম্ভব খুঁজে দেখলাম আফলাতুনের সন্তান সন্ততি এবং তাঁদের নাতিপুতিদের বিবর্তনমুখী, সমন্বয়বাদী, নৃত্যরত পৃথিবী;যেখানে অভিজ্ঞতা আর বোধির দ্যুতি আমাদের নিত্যসঙ্গী, যা আধুনিক বিজ্ঞানের, দর্শনের, সমাজতত্ত্বের, ইতিহাসের, পূর্ণমানবের সাধনারও অবিকল্প, বাহ্যিক ও নিগুঢ় সহচর, আবু সয়ীদ আইয়ুবের ভাষায় পান্থজনের সখা’। এই সখাকে, পরম বন্ধুকে  এড়িয়ে চলার সাধ্য কোথায়? এ ব্যাপারে সম্ভবত আমরা অনেকেই নিশ্চিত এবং মঙ্গলবোধে প্রাণিত । আশ্রিত।
 

♦—♦♦—♦

 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!