- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- আগস্ট ১০, ২০২৫
ভাষা ও জাতিসত্তার উপর আক্রমণ মানছি না, মানব না
আমাদের জাতীয় আদিপাপ হিসেবে ভাষা দেশভাগের ফলে বহু সমৃদ্ধ উপভাষা ও বিভাষার সমৃদ্ধি সম্পন্ন বাংলা ভাষা এবং খণ্ডিত ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে অবস্থান কারী বাংলাভাষী বাঙালি অভূতপূর্ব বিপণ্ণতার মুখোমুখি। গত কিছুদিনে প্রমাণিত হয়ে গেছে, দেশ ভাগের মতো মর্মান্তিক ট্রাজেডির ৭৮ বছর পরেও রাষ্ট্রশক্তি বাঙালি-বিদ্বেষকে অঙ্গারের মতো জ্বালিয়ে রেখেছে। বিশেষভাবে একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের মাঝামাঝি রাষ্ট্রতন্ত্র ভাষিক আধিপত্যবাদকে নিজেদের প্রধান নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে। ফলে সংবিধান অবমাননা নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহুভাষিক এইদেশে কোনো একটি ভাষা রাষ্ট্র ভাষা নির্দিষ্ট না হলেও বছরের পর বছর ধরে অপপ্রচার করে মিথ্যাকেই প্রতিষ্ঠা দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাসহ অসমীয়া – মণিপুরী – তামিল – তেলেগু – মারাঠী – মালয়ালম প্রতিটি ভাষাই রাষ্ট্রভাষা। এদের সঙ্গে গুজরাটী বা হিন্দি সহ সমস্ত ভাষাই রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পাওয়া উচিত। কিন্তু তার বদলে সুপ্রতিষ্ঠিত ইতিহাসকে পদদলিত করে রাষ্ট্রশক্তি বাঙালি বিদ্বেষকে হিংস্র ঘৃণা ও আক্রোশের গিলোটিনে পরিণত করতে চেয়েছে। তাই ভারতীয় ভাষার বিজ্ঞানসম্মত ধারণাকে জলাঞ্জলি দিয়ে শাসক দলের ঢোল বাদক এক ব্যক্তি বাংলা ভাষা ও বাঙালিকে প্রকাশ্যে আক্রমণ করেছে। বাংলাভাষী বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও ভাষা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী অবাঙালি সতেকন জনেরাও চরম ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ও স্পষ্টভাষায় প্রতিবাদ জানিয়েছেন। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য বদ্ধপরিকর বরাক উপত্যকার সমস্ত সচেতন বাংলাভাষী ও সঙ্গত কারণেই তীব্র অসহিষ্ণুতার বহিপ্রকাশকে প্রত্যাখ্যান করছেন।
বস্তুত কয়েক প্রজন্ম ধরে আমরা যে রবীন্দ্রনাথ পরিকল্পিত ধ্যানের ভারত গড়ে তুলেছি; তাকেই ধ্বংস করার চক্রান্ত এখন রাষ্ট্রতন্ত্রের প্রত্যক্ষ মদতে সাধারণ ভাবে ভাষা গণতন্ত্র এবং বিশেষ ভাবে বাংলাভাষী জনগণের পক্ষে ভয়ঙ্কর বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে আমরা একচক্ষু হরিণের ভূমিকা নিতে পারি না। মহাবিনাশের সার্বিক আয়োজন যখন চরম দুঃসময়ের বার্তা নিয়ে এসেছে, আমাদের ধ্রুবপদ হোক, বাঙালি জাতির একমাত্র গোত্র লক্ষণ তার অভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতি। শ্রীহট্টীয় সহ বিভিন্ন উপভাষা আমাদের সমৃদ্ধির প্রমাণ। সেইসঙ্গে আমরা চক্রকারীদের উদ্দেশ্যে স্পষ্টভাবে জানাচ্ছি ভাষা বিজ্ঞানের বিধি অর্থাৎ উদারণতত্ত্ব, বাক্যগঠনতত্ত্ব, শব্দার্থতত্ত্ব প্রভৃতি সম্পর্কে বিন্দু বিসর্গ না জেনে যারা আমাদের উপভাষা এবং সমৃদ্ধ ভাষিক পরিচয়কে অপমান করতে চায়, তারা প্রকৃত পক্ষে ভারতের সংহতির মূলেই কুঠারাঘাত করে। কিন্তু অসূয়া জাতি বিদ্বেষীদের হিংস্র আক্রমণ আমরা কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। তাই বিকার ও বিদূষণ সর্বস্ব অপশক্তিকে যেকোনো মূল্যে আমরা প্রতিহত করবই।
বহুভাষিক এইদেশে কোনো একটি ভাষা রাষ্ট্র ভাষা নির্দিষ্ট না হলেও বছরের পর বছর ধরে অপপ্রচার করে মিথ্যাকেই প্রতিষ্ঠা দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাসহ অসমীয়া – মণিপুরী – তামিল – তেলেগু – মারাঠী – মালয়ালম প্রতিটি ভাষাই রাষ্ট্রভাষা। এদের সঙ্গে গুজরাটী বা হিন্দি সহ সমস্ত ভাষাই রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পাওয়া উচিত
এই মুহূর্তে নানা কারণে দেশ যখন বহুমুখী সংকটের মোকাবিলা করছে, সে সময় বাংলাসহ সমস্ত রাজ্যিক ভাষার মর্যাদা রক্ষা করাই হবে আমাদের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সামূহিক দায়িত্ব। অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদের দীর্ঘমেয়াদি চক্রান্তের কাছে কোনো গণতন্ত্র প্রিয় মানুষ আত্মসমর্পন করতে পারেন না। জাতিসত্তাকে প্রত্যক্ষ সত্যের মতো অনুভব করার সামর্থ্যই আমাদের মুক্তি দিতে পারে। সেইজন্যে বাংলাসহ সমস্ত ভারতীয় ভাষার সমমর্যাদার ভিত্তিতে নতুন দেশ গড়ে তোমার অঙ্গীকার আমরা গ্রহণ করছি। মনে রাখছি, বিবিধ বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ শ্রীহট্টীয় ও অন্যান্য উপভাষা কোনো কুচক্রীর উদ্ধত অপপ্রচারে যেমন মিথ্যা হয়ে যায় না – তার চেয়ে অনেক বড়ো সত্য হলো, বঙ্কিমচন্দ্র – মধুসূদন – রবীন্দ্রনাথ – নজরুল – জীবনানন্দ- অবনীন্দ্রনাথ – শহীদুল্লাহ – নীহাররঞ্জন রায় এবং বাংলা ভাষা অভিন্ন জাতিসত্তার অভিব্যক্তিতে দৈদীপ্যমান ছিল, আছে এবং থাকবে। এই ভাষাকে যারা আক্রমণ করে, তারা নিজেরাই চূর্ণ হয়ে যাবে। বাংলাদেশ এবং ভারতের নানা প্রান্তে যারা বাংলাভাষায় কথা বলেন, অজস্র স্থানিক বৈচিত্র্য সত্ত্বেও তাঁরা প্রত্যেকেই বাঙালি। ‘বাংলাদেশি’ ভাষা বলে কিছু কোথাও নেই। অজ্ঞতার সঙ্গে যখন দুরভিষন্দি যুক্ত হয় পাগলের প্রলাপ তৈরি হয়। কিন্তু সেইজন্যে একে লঘুভাবে দেখলে ভয়ানক ভুল হবে।
তাই আসুন আমরা এই সংকটের প্রহরে নতুন ভাবে বাঙালি জাতির হওয়া এবং হয়ে ওঠার ধারাবাহিক ইতিহাস খুঁজে নিই। আমাদের চেতনাকে জারিয়ে রাখার সোনার কাঠি যোগান দিক দৃঢ় ঐক্যের বোধ। একে অন্যকে আহ্বান জানাই, ‘আসুন, মায়া ছড়াই।’
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের বাণীই হোক এসময়ের সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকারঃ ‘বাঙালি বাংলায় জন্মেছে বলেই যে বাঙালি তা নয়। বাংলা ভাষার ভিতর দিয়ে মানুষের চিওলোকে যাতায়াতের ‘বিশেষ অধিকার পেয়েছে বলেই সে বাঙালি।’ (‘সাহিত্যের পথে’ রবীন্দ্র রচনাবলী – চতুর্দশ খণ্ড, পৃ ৩৭৭)
এবং ‘আমরা একই জাতি, সুখে- দুঃখে আমাদের এক দানা এবং পরস্পরকে পরমাত্মীয় বলিরা না জানিলে ও অত্যন্ত কাছে না টানিলে আমাদের কিছুতে মঙ্গল নাই।’ (‘আত্মশক্তি ও সমূহ: রবীন্দ্র রচনাবলী : দ্বাদশ খন্ড : পৃ ৮১৩)
জাতিসত্তাকে চিরজাগ্রত রেখে আমরা নতুন করে যৌথ জীবনকে স্বপ্ন করে তুলি, স্বপ্নের মধ্যে বাঁচি। এমন বাঙালি ঘাঁটি বাঙালি হয়েই সংকটগ্রস্ত ভারতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মনুষ্যত্ববোধের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরব। বাঙালির বিদ্বেষী কুচক্রীরা আমাদের যে-পরীক্ষার মুখোমুখি করেছে, বরাক উপত্যকার সংগ্রামী মানুষেরা ভাষা- ধর্ম- সম্প্রদায় নির্বিশেষে তার যোগ্য প্রত্যুত্তর দিক।
আসুন সমস্বরে বলি: ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর’…
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
❤ Support Us








