Advertisement
  • খাস-কলম পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ স | হ | জ | পা | ঠ
  • মে ৫, ২০২৪

বিজ্ঞানচর্চায় রাজনীতির অনুপ্রবেশ

অমিত বর্ধন
বিজ্ঞানচর্চায় রাজনীতির অনুপ্রবেশ

বিজ্ঞানের অপব্যাখা কীভাবে সঙ্কট ডেকে আনে ? পরপর তার দৃষ্টান্ত এঁকেছেন লেখক। গণেশের মূর্তি কি প্রমাণ করে প্রাচীন ভারতে প্লাস্টিক সার্জারি করা হত? উড়ো জাহাজের উৎস পুষ্পক রথ ! নানা তত্ব বিশ্লেষণ করে প্রশ্ন তুলেছেন বিজ্ঞান গবেষক অমিত বর্ধন

‘জিন’ শব্দটির সঙ্গে এখন সবাই পরিচিত। রাজনীতিকদের পরিচয় আরো গাঢ়। এ পরিচয়ে কোনো অসুবিধা ছিল না। কিন্তু, ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে ব্যবহার সম্পূর্ণ অন্য ব্যপার। আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেমন – মিনেসোটায় এক নির্বাচনী প্রচারে বলে বসলেন, ‘ইউ হ্যাভ গুড জিনস ইন মিনেসোটা’। মন্তব্য নিয়ে জল ঘোলা হয়েছিল বিস্তর। কেননা, মিনেসোটার শ্বেতাঙ্গ (রাজ্যটির পচাত্তর শতাংশের বেশি শ্বেতাঙ্গ) জনগোষ্ঠীকে ট্রাম্প একটি বার্তা দিয়েছিলেন। ‘শ্বেতাঙ্গরাই শ্রেষ্ঠ,’ এই অহংবোধকে ধূপধুনো দিতে চেয়েছিলেন ট্রাম্প—নিজেকে শ্বেতাঙ্গদের মসিহা বলে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। আমাদের দেশের মন্ত্রীসান্ত্রীরাও কম যান না। গণতন্ত্র নিয়ে কোনরকম বেয়াড়া প্রশ্ন উঠলেই প্রধানমন্ত্রী বলে থাকেন, ‘গণতন্ত্র আমাদের ডিএনএ-তে।’ বিজ্ঞানের অপব্যাখ্যার উদাহরণ আরো আছে। ‘হিন্দুরাই শ্রেষ্ঠ’ এই অহংবোধকে প্রশ্রয় দেওয়ার জন্য বলা হয়ে থাকে, ‘গণেশের মূর্তি্ প্রমাণ করে যে, বহুকাল আগেই ভারতে প্লাস্টিক সার্জারি করা হত;’ বা ‘পুষ্পক রথ প্রমাণ করে যে, অতীতে ভারতবর্ষে উড়োজাহাজ ছিল।’ প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীর মতো কেউ যখন এধরণের কথা বলেন, স্বাভাবিকভাবে জনতার এক বড় অংশ প্রভাবিত হন। কে না নিজেকে? গুরুত্বপূর্ণ, ভাবতে ভালবাসে?

গর্ভ‍সংস্কার নামক ‘গবেষণায়’ ভ্রূণকে শিক্ষিত করে তোলার জন্য গর্ভবতী মহিলাদের হিন্দুশাস্ত্র শোনানো হচ্ছে। ‘গবেষণাকে’ বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দেওয়ার তাগিদে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সভায় একজন বক্তা দাবি করেছেন, ‘গর্ভ‘ সংস্কার ভ্রূণের ডিএনএ-তে ‘সদর্থক পরিবর্তন’ ঘটায়।’ কি ‘সদর্থক পরিবর্তন’? তার থেকেও বড় প্রশ্ন, কীভাবে আরো ‘সদর্থক পরিবর্তন’ ঘটে ?

গত বেশ কিছু সময় ধরে আমাদের দেশে অতীত সম্পর্কে মিথ্যা মোহ নির্মাণ করতে গিয়ে বিজ্ঞানের অপব্যবহার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শুরু হয়ে গেছে। যেমন, বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাশাস্ত্র বিভাগে ‘গর্ভ সংস্কার’ নামের ‘গবেষণা’ প্রকল্প চালু হয়েছে। সেই ‘গবেষণা’ প্রকল্পের প্রধান বলেছেন, ‘মহাভারতে প্রমাণ আছে যে গর্ভ্স্থ ভ্রূণকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় শিক্ষিত করে তোলা সম্ভব।’ কি সে প্রমাণ ? না, মায়ের গর্ভে থাকাকালীনই অভিমন্যু অর্জুনের কাছ থেকে যুদ্ধের কলাকৌশল আয়ত্ত করেছিলেন। (স্পষ্টত, ‘গবেষণা’ প্রকল্পের প্রধান মহাভারতকে কেবল একটি মহাকাব্য মনে না করে, বিশেষ এক ঘরানার রাজনীতি মেনেই, ইতিহাস বলে ধরে নিয়েছেন।) নানা ইন্টারনেট সাইটে এমনও দাবি করা হচ্ছে: ‘বিজ্ঞান দেখিয়েছে যে গর্ভের শিশুরা প্রাথমিক পর্যায়ে গর্ভসংস্কার থেকে উপকৃত হবে’। (কী সেই ‘বিজ্ঞান’? না, গর্ভ উপনিষদ – উইকিপিডিয়া (wikipedia.org)।) গর্ভ‍সংস্কার নামক ‘গবেষণায়’ ভ্রূণকে শিক্ষিত করে তোলার জন্য গর্ভবতী মহিলাদের হিন্দুশাস্ত্র শোনানো হচ্ছে। ‘গবেষণাকে’ বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দেওয়ার তাগিদে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সভায় একজন বক্তা দাবি করেছেন, ‘গর্ভ‘ সংস্কার ভ্রূণের ডিএনএ-তে ‘সদর্থক পরিবর্তন’ ঘটায়।’ কি ‘সদর্থক পরিবর্তন’? তার থেকেও বড় প্রশ্ন, কীভাবে আরো ‘সদর্থক পরিবর্তন’ ঘটে ? বক্তা, সঙ্গত কারণেই, কিছু বলার প্রয়োজন মনে করেননি।

বিজ্ঞানের ওপর সরাসরি আঘাতের আরো এক বিপজ্জনক নিদর্শন: বিশ্বজোড়া যে অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থা, যা নিরন্তর গবেষণার ফসল, তাকে, কোন কারণ না দেখিয়েই, সরাসরি ভ্রান্ত বলে গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়। দীর্ঘ সময় জুড়ে চলা এই প্রচার করে একটি আয়ুর্বেদ সংস্থা। সংস্থাটি একটি হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। সরকারি নিয়ামক সংস্থা সেই অপ-প্রচার বন্ধ করার ব্যবস্থা নেয়নি, শেষ পর্যন্ত দেশের উচ্চতম বিচারালয়কে হস্তক্ষেপ করতে হয়। বিচারালয়ের নির্দেশ সত্ত্বেও প্রচারটি চলতে থাকে।

এসবের পাশাপাশি, বিজ্ঞানশিক্ষা যে-যুক্তিবোধের প্রসার ঘটায় তার মূলে আঘাত করার জন্যে যেন বিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকা থেকে বিবর্তনবাদ, রাসায়নিক পর্যায়সারণী ইত্যাদি বাতিল করা হয়েছে।এরকম পরিস্থিতিতে, যখন কল্পকাহিনী দেশের বিজ্ঞান গবেষণাকে বিপজ্জনকভাবে প্রভাবিত করতে শুরু করেছে, যখন রাজনৈতিক শক্তি বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদের বিলোপ ঘটানোর চেষ্টা চালাচ্ছে, একবার ফিরে দেখা ভাল যে বিজ্ঞান-ভাবনার মূলে কুঠারাঘাত একটি দেশকে কোন অন্ধকারে নিয়ে গিয়েছিল।

তার আগে কিছু প্রাসঙ্গিক কথা মনে রাখা জরুরি।

‘জিন’ নিয়ে কিছু কথা:

‘জিন’ শব্দটা প্রথম ব্যবহার করলেন ডেনমার্কের উদ্ভিদ বিজ্ঞানী, উইলহেম জোহানসেন। সেটা ছিল ১৯০৯ সাল। ন’বছর আগে পুনরাবিষ্কৃত হয়েছে ‘ফাদার অফ জেনেটিক্স’ গ্রেগর জোহান মেন্ডেলের কাজ। মেন্ডেলই প্রথম বলেছিলেন, সমস্ত শারীরিক বৈশিষ্ট্য বংশপরম্পরায় বয়ে চলে তাদের মূলে আছে কিছু বস্তুকণা। তখন মেন্ডেলের কথাকে কেউ খুব একটা আমল দেননি। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর চৌত্রিশ বছর পর বোঝা গেল, মেন্ডেল ঠিকই বলেছিলেন। মেন্ডেলের বস্তুকণাকেই জোহানসেন নাম দিলেন, জিন। কাকের বাসায় কোকিলের ডিম ফুটে কোকিলই বেরোয়, কাক নয়, তার কারণ জিন। আবার, ঘোড়া আর গাধার মিলনে যার জন্ম হয় তা ঘোড়া বা গাধা কোনটাই নয়, বংশবিস্তার করতে অক্ষম এক সঙ্কর প্রাণী —তারও কারণ জিন।

পরবর্তীকালে জিনের স্বরূপ বোঝার জন্য পৃথিবী জুড়ে গবেষণা হল। গবেষণা থেকে জানা গেল যে রাসায়নিকভাবে জিন হল ডিএনএ (ডিঅক্সি রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড)। ক্রমে এ-ও জানা গেল যে জিন কী করে। আমাদের শরীরে হাজারখানেকেরও বেশি-ধরণের যেসব প্রোটিন আছে — যারা প্রতি মুহূর্তো নানা কাজ করছে— জিন সমস্ত প্রোটিন তৈরি করতে সাহায্য করে।

এ-হেন বস্তু সম্পর্কে একজন স্বঘোষিত কৃষিবিজ্ঞানী বলেছিলেন, ‘জিন বলে কিছু নেই।’ বিজ্ঞানীর নাম, ট্রফিম লাইসেঙ্কো। পূর্বিতন সোভিয়েত রাশিয়ার বাসিন্দা।

বিজ্ঞানের নামে ভ্রান্ত (মতান্তরে, স্বার্থিসিদ্ধির) গবেষণা: সেটা ছিল যোসেফ স্তালিনের সময়কার সোভিয়েত ইউনিয়ন। তার আগে (১৯২৪-এ) ভ্লাদিমির লেনিনের মৃত্যু হয়েছে। লেনিনের আমলে সোভিয়েতের বিজ্ঞানচর্চার ধারা অব্যাহত ছিল। তাঁর মৃত্যুর পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে পুরনো বুদ্ধিজীবীদের সরিয়ে দিয়ে নিয়ে আসা হচ্ছে এমনসব ব্যক্তিদের, যাঁরা উঠে এসেছেন কৃষক বা শ্রমিক পরিবার থেকে। বছরখানেক আগে ইউক্রেন, রাশিয়া আর কাজাখস্তান জুড়ে দেখা দেয় বিরাট দুর্ভিক্ষ। মারা গেছেন কয়েক লক্ষ মানুষ। স্তালিন খুব তাড়াতাড়ি দেশে শস্যের উৎপাদন বাড়াতে চাইছেন, চাপ তৈরি করছেন বিজ্ঞানীদের ওপর। এইরকম পরিস্থিতিতে ট্রফিম লাইসেঙ্কো এক দাবি করলেন। বললেন, তিনি এমন এক পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন যা অল্প সময়েই প্রচুর পরিমাণে শস্য উৎপাদন করতে পারবে। নিজের বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য লাইসেঙ্কো বললেন, তাঁর উদ্ভাবিত পদ্ধতির পেছনে আছে ইভান মিচুরিনের গবেষণা।

কে এই ইভান মিচুরিন? ‘অর্ডার অফ লেনিন’ খেতাব-ভূষিত উদ্যানবিদ। সোভিয়েত কম্যুনিস্ট পার্টির ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে এ’কথা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, ইভান মিচুরিনের বিশেষ যোগ্যতা ছিল না। তাঁর প্রধান কাজের যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছিল। তিনি বিভিন্ন উদ্ভিদের ঘনিষ্ঠ-প্রজাতির সফল সংকরায়ন ঘটিয়ে উচ্চ ফলনশীল প্রজাতি তৈরি করেছিলেন। আবার , কম্যুনিস্ট পার্টি্র ঘনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও ইভান মিচুরিন বাতিল-হয়ে-যাওয়া একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের পূজারীও ছিলেন। বাতিল তত্ত্বের জন্মদাতা ছিলেন জ্যঁ ব্যাপ্তিস্ত ল্যামার্কর নামের ফরাসি বিজ্ঞানী।

রুশ গবেষক ট্রফিম লাইসেঙ্কো

ইভান মিচুরিনের মতো স্তালিন নিজেও বিশ্বাস করতেন যে জীবদ্দশায় অর্জিত গুণাবলী পরর্বতী প্রজন্মে বর্তায় । কম্যুনিস্ট পার্টির উচ্চতম মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে লাইসেঙ্কোর পদোন্নতি হতে লাগল বিদ্যুৎগতিতে । তিনি দাবি করতে শুরু করলেন জিন বলে কিছু নেই । পরিবেশের বদল ঘটিয়ে উদ্ভিদের বংশগতিকে রূপান্তরিত করা যায় ।

ল্যামার্কের দাবি : জীবদ্দশায় আমরা যে শারীরিক বৈশিষ্ট্য অর্জন করি সেগুলি আমাদের সন্তানসন্ততিতে বাহিত হয়। যেমন, যদি কেউ শারীরিক কসরত করে তাঁর বাইসেপ্স ২৫ ইঞ্চি করে ফেলেন, সেই অ-স্বাভাবিক বৃদ্ধি তাঁর অর্জিত। ল্যামার্কের তত্ত্ব অনুযায়ী, তাঁর সন্তান, বিনা আয়াসেই, ২৫ ইঞ্চি বাইসেপ্স পাবে। সে যদি চেষ্টা করে সেটাকে ২৮ ইঞ্চি করে তাহলে তাঁর সন্তান, বিনা পরিশ্রমেই, ২৮ ইঞ্চি বাইসেপ্স পাবে। (কেউ ভাবতে পারেন যে, মানুষের কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য—যেমন সঙ্গীত— কোনো কোনো পরিবারে বেশি দেখা যায়। ল্যামার্কোর তত্ত্ব অনুযায়ী, একজন সঙ্গীতজ্ঞের সন্তান বিনা পরিশ্রমেই সঙ্গীতজ্ঞ হয়ে উঠবেন।

পরবর্তী্কালে অ্যালফ্রেড ওয়ালেস ও চার্লশ ডারউইন বিবর্ততনের বিশদ বস্তুভিত্তিক ব্যাখ্যা দিলে, এবং জিনের কর্ম পদ্ধতি আবিষ্কৃত হলে ল্যামার্কেলর তত্ত্ব সম্পূর্ণিভাবে গ্রহণযোগ্যতা হারাল। বোঝা গেল, চেষ্টার দ্বারা জিনের কাজকর্মে প্রভাবিত করা যায় না। চেষ্টার দ্বারা অর্জিত বৈশিষ্ট্য বংশানুক্রমিক হতে পারে না।

অপ-বিজ্ঞান এবং রাজনীতি:

ট্রফিম লাইসেঙ্কো তাঁর হাতের তাস ভালোভাবেই খেললেন। কৃষক পরিবারের সন্তান তিনি। তার ওপর ইভান মিচুরিনের নাম ব্যবহার করেছেন। লাইসেঙ্কো যোসেফ স্তালিনের সমর্থন পেলেন। ইভান মিচুরিনের মতো স্তালিন নিজেও বিশ্বাস করতেন যে (মানুষের) জীবদ্দশায় অর্জিত গুণাবলী পরর্বতী প্রজন্মে বর্তায়। কম্যুনিস্ট পার্টির উচ্চতম মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে লাইসেঙ্কোর পদোন্নতি হতে লাগল বিদ্যুৎগতিতে। তিনি দাবি করতে শুরু করলেন জিন বলে কিছু নেই। পরিবেশের বদল ঘটিয়ে উদ্ভিদের বংশগতিকে রূপান্তরিত করা যায়। এক সময়ে লাইসেঙ্কো ‘জিন মিথ্যা’ বলে দাবি করছেন? জিন আবিষ্কারের পঞ্চাশ বছরের পর।

লাইসেঙ্কোর তথাকথিত গবেষণা

সোভিয়েতের অন্যতম প্রধান খাদ্যশস্য ছিল গম। লাইসেঙ্কো দাবি করলেন, শীতকালে যে গম চাষ করা হয় (যা তীব্র তুষারপাতের জন্য মাঝেমাঝেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়) তার বীজকে কম তাপমাত্রায় সঞ্চিত রেখে পরের বসন্তে রোপন করা হলে, উৎপাদন প্রচুর পরিমাণে বৃদ্ধি পাবে; এই পদ্ধতি গমের বৃদ্ধি-প্রক্রিয়াকে ‘নতুনভাবে শিক্ষিত’ করে তোলে। সাম্প্রতিক অতীতের খাদ্যসঙ্কটের কথা মনে রেখে সোভিয়েত সরকার পদ্ধতিটিকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে চাইল। সরকারের আগ্রহ দেখে কয়েকজন কৃষিবিদ লাইসেঙ্কোর দাবির সঙ্গে সহমত হলেন; এ-ও বললেন যে, ব্যপকভাবে কৃষিতে প্রয়োগ করার আগে পদ্ধতিটাকে সীমিত পরিসরে ব্যবহার করে দেখা উচিত। সে কথা নস্যাৎ করে ১৯৩১-এ বিশাল বিশাল এলাকা জুড়ে এই পদ্ধতির প্রয়োগ করা হল। পরিণতিতে গমের উৎপাদন বৃদ্ধির পরিবর্তে তা কমে গেল।

বিজ্ঞানী লাইসেঙ্কোর ব্যর্থতা এবং রাজনীতিক লাইসেঙ্কোর ক্রূরতা: ১৯৩২-’৩৩-এ খাদ্যসঙ্কটে আনুমানিক চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ লক্ষ লোকের মৃত্যু হল। (এই খাদ্যসঙ্কটের কারণ ছিল একাধিক, যার মধ্যে শস্যের উৎপাদন হ্রাস ছিল অন্যতম।) ব্যর্থতা সত্ত্বেও লাইসেঙ্কো কম্যুনিস্ট পার্টি র সমর্থন হারালেন না। উলটে তিনি তাঁর ব্যর্থতার দায় চাপালেন বিরোধীপক্ষের ওপর। বললেন, ‘জেনেটিক্সের নাম করে অনেক বিজ্ঞানী সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজ্ঞান তথা কৃষির ক্ষতি করছেন।’ লাইসেঙ্কোর অভিযোগে অনেক জেনেটিসিস্ট কাজ হারালেন। অনেকে গ্রেপ্তার হলেন। কেউ কেউ জেলে থাকাকালীন প্রাণ হারালেন। বিজ্ঞানীমহলে লাইসেঙ্কোর বিরোধীরা সংখ্যায় বাড়ছিল। ক্রমবর্ধমান বিরোধিতার মুখে স্তালিনকে লেখা এক চিঠিতে লাইসেঙ্কো লিখলেন, ‘পশ্চিমি ধনতান্ত্রিক দেশগুলিতে মেন্ডেলিজম-এর’ উদ্ভব কৃষির জন্য হয়নি, হয়েছে প্রতিবিপ্লবীদের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য। কৃষিব্যবস্থার সঙ্গে বুর্জোরয়া জেনেটিক্সের তত্ত্বের কোন সম্পর্ক নেই।’

লাইসেঙ্কোর সঙ্গে সহমত ব্যক্ত করে স্তালিন তাঁকে সমর্থেনের আশ্বাস দিলেন। লিখলেন, ‘আমি মনে করি জীববিজ্ঞানের তত্ত্বের মধ্যে একমাত্র ইভান মিচুরিনের তত্ত্বই বিজ্ঞানসম্মত। যাঁরা অর্জি ত বৈশিষ্ট্যের বংশগতি অস্বীকার করে তাঁদের কথা ভেবে সময় নষ্ট করে লাভ নেই।’
(সেই জমানায়, স্বাভাবিকভাবেই, যোসেফ স্তালিনের থেকে বেশি জ্ঞানগম্ম্যি আর কারোর ছিল না। সম্পূর্ণ বিশ্বের না হলেও তিনি ছিলেন অর্ধেক বিশ্বের গুরু। একটি অসমর্থিমত সূত্রের দাবি: স্তালিন একবার মন্তব্য করেছিলেন, ‘ইভান মিচুরিন বিজ্ঞান ব্যপারটা আমার থেকেও ভাল বোঝেন’। উক্তিটির সত্যিমিথ্যা যাচাই করা মুশকিল। তবে কিনা, রাষ্ট্রের চূড়ান্ত ক্ষমতাশালী মানুষটি যে সর্বাজ্ঞ হবেন, তা নিয়ে দ্বিমত থাকার কোন কারণ নেই। ‘গণেশের মূর্তি প্রমাণ করে তো এটাই…’ ইত্যাদি।)

জলের মতো ঘটনাও নিচের দিকে গড়ায়। অন্তত, বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে। ঘটল ১৯৪৮-এর সেই ঘটনা। যার সম্পর্কো সোভিয়েত সায়েন্স অ্যাকাডেমির তৎকালীন সভাপতি সের্গেই ভ্যাভিলভ ব্যক্তিগত ডায়েরিতে লিখবেন: ‘সবকিছুই খুব দুঃখজনক, লজ্জাজনক।’ যদিও সঙ্গত কারণেই প্রকাশ্যে ভ্যাভিলভ বলবেন, ‘প্রতিক্রিয়াশীল আদর্শটবাদী জীববিজ্ঞানকে নির্মূকল করার জন্য যা যা করা দরকার তা করা হবে।’ প্রকাশ্যে বলা কথাটা নেহাতই এক ‘জুমলা’ ছিল না।

১৯৪৮-এর বিজ্ঞান সম্মেলন

আগস্ট ১৯৪৮। স্তালিনের উপস্থিতিতে ‘লেনিন অল-ইউনিয়ন অ্যাকাডেমি অফ এগ্রিকালচারাল সায়েন্সেস’-এ সাতদিনব্যাপী এক সভা অনুষ্ঠিত হল। ওখানে লাইসেঙ্কো স্তালিনকে আশ্বাস দিলেন যে এক হেক্টর জমিতে তিনি ১৫০০০ কিলোগ্রাম গম উৎপাদন করবেন। (ওই সময় প্রচলিত পদ্ধতিতে এক হেক্টর জমিতে ৭০০-৮০০ কিলোগ্রাম গম উৎপন্ন হত)। বক্তৃতায় লাইসেঙ্কো একেবারে নাম ধরে ধরে তাঁর বিরোধী বিজ্ঞানীদের একহাত নিলেন। বললেন, ‘মেন্ডেল বংশগতির কণার যে ধারণা দিয়েছেন তা প্রতিক্রিয়াশীল আর আদর্শাবাদী। এইসব ধারণা জীববিজ্ঞানকে দুটো আলাদা পৃথিবীতে ভাগ করে দিয়েছে যাদের রাজনৈতিক আদর্শত আলাদা।’ বক্তৃতার শেষে তিনি বললেন: ‘কম্যুনিস্ট পার্টিের সেন্ট্রাল কমিটি আমার প্রতিবেদন পরীক্ষা করে তা অনুমোদন করেছে।’ যেসকল বিজ্ঞানী লাইসেঙ্কোর মতবাদের বিরোধী ছিলেন তাঁরা আর বিরোধিতা করার সাহস পেলেন না।

বিজ্ঞানী জোসেফ র্যাপোপোর্ট

কিছু কিছু মানুষ থাকেন যাঁরা নিজেদের ভালমন্দ সম্পর্ক অন্যান্যদের তুলনায় বেশি উদাসীন। বিজ্ঞানী জোসেফ র্যাপোপোর্ট ছিলেন এরকম একজন মানুষ। যে-সময় সবাই ক্ষমতার সামনে ঝুঁকে পড়েছেন, বা অন্তত প্রকাশ্য-বিরোধিতা করছেন না, জিন-তত্ত্বের ওপর চূড়ান্ত আস্থা রেখে র্যাপোপোর্ট লাইসেঙ্কোর বিরোধিতা করলেন। যা ঘটার ছিল তাই ঘটল। র্যাপোপোর্ট কম্যুনিস্ট পার্টির থেকে বিতাড়িত হলেন। আর, সঙ্গত কারণেই, পরবর্তীল ন’বছর আর বিজ্ঞানের জগতে পা রাখতে পারলেন না।

আগ্রাসী রাজনীতির বিজ্ঞান-বিরোধিতা:

১৯৪৮এর আগস্টেই সোভিয়েত উচ্চশিক্ষামন্ত্রী এক নির্দেশ জারি করলেন, ‘যারা প্রগতিশীল মিচুরিনিস্ট মতবাদের বিরোধিতা করেছেন আর যুবসমাজকে সেই-নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণো শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের সবাইকে বরখাস্ত করা হচ্ছে।’ স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে মেন্ডেলিয়ান জেনেটিক্স বাতিল করে মিচুরিনিস্ট মতবাদ চালু করা হল। জেনেটিক্স আর বিবর্তবনবাদের অনেক পাঠ্যপুস্তক নষ্ট করা হল। কয়েকহাজার শিক্ষাবিদ চাকরি হারালেন। মস্কো স্টেট ইউনিভার্সি টির জেনেটিক্স অ্যান্ড ডারউইনিজম বিভাগের সমস্ত কর্মীককে বরখাস্ত করা হল। ছত্রাকবিজ্ঞানী কন্সট্যান্টিন মুরাশিন্সকি আত্মহত্যা করলেন। আরো কয়েকজন বিজ্ঞানী একই পথ বেছে নিলেন। (কেউ কেউ বলেন, আত্মহত্যা ভীরুতার নামান্তর। তবে কিনা, মৃতরা সামাজিক অসম্মানের ভয় পান না।)

ভ্রান্ত গবেষণার কুফল:

লাইসেঙ্কোর ফ্যান্টাসি কৃষির উৎপাদন বাড়াতে পারেনি। জীবনের শেষদিকে স্তালিনও লাইসেঙ্কো সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। স্তালিনের মৃত্যুর পর নিকিতা ক্রুশ্চেভ রাষ্ট্রপ্রধান হলে প্রথমদিকে তিনিও লাইসেঙ্কোর কথায় প্রভাবিত হয়েছিলেন। কিন্তু দেশের পরিস্থিতি তখন ক্রমশ বদলাচ্ছিল। পার্টির পলিটব্যুরো লাইসেঙ্কোর কাজের মূল্যায়ন শুরু করল। ক্রুশ্চেভ যে-বছর রাষ্ট্রপ্রধান হলেন সে বছরেই ডিএনএ-র গঠন জানা গেল; স্পষ্ট হয়ে গেল, লাইসেঙ্কোর ধ্যানধারণা শুধু ভুল নয়, তাঁর অ-শিক্ষিত এই ‘গবেষণা’ দেশের খাদ্যসুরক্ষার পক্ষে বিপজ্জনক। ১৯৫৫তে তিনশোর বেশি বিজ্ঞানী লাইসেঙ্কোর বিরোধিতা করে পার্টিরর সেন্ট্রাল কমিটিকে চিঠি লিখলেন। লাইসেঙ্কোর শেষের শুরু হয়ে গেছিল। ১৯৬৪তে কম্যুনিস্ট পার্টিত ক্রুশ্চেভকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লাইসেঙ্কো-যুগের অবসান ঘটল। তবে, বহু প্রাণের মূল্যে।

একটি অপ্রাসঙ্গিক কথা। আমাদের জানা নেই, গর্ভসংস্কারের’ প্রধান গবেষক লাইসেঙ্কোর দ্বারা অনুপ্রানিত হয়েছেন কি না। প্রশ্ন করা হলে তাঁর মুখমণ্ডলে যে স্মিতহাসি ফুটে ওঠে তার একাধিক অর্থ হতে পারে।

তথ্যসূত্র:
1. Lysenkoism Against Genetics: The Meeting of the Lenin All-Union Academy of Agricultural Sciences of August 1948, Its Background, Causes, and Aftermath. Svetlana A. Borinskaya, Andrei I. Ermolaev, and Eduard I. Kolchinsky

2. From the Modern Synthesis to Lysenkoism, and Back? Uwe Hossfeld and Lennart Olsson. Science 297 (5578) 2002


  • Tags:
❤ Support Us
ভেসে যায় নধরের ভেলা, ভেসে যায় বেহুলা পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
ঈশানবঙ্গের শক্তি পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
error: Content is protected !!