- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- মে ১৮, ২০২৫
বিশ্বাসভঙ্গের ক্ষত
চিত্র : সংগৃহীত
অমর উনিশের রক্তাক্ত অভিজ্ঞতার প্রত্যক্ষ স্মৃতি আমার নেই। আমার বয়স তখন কুল্লে পাঁচ। শিশু আমি পা-পা করে বড়ো হচ্ছি। পরে, অনেক পরে বুঝতে পারি, ১৯৬১ সালের ১৯ মে-র আঘাত, অভিঘাত আমাদের জীবনে, আমাদের হয়ে ওঠায়, আমাদের চিন্তা ও ভাবনায় ব্যাপক ছাপ রেখে গেছে। দেশভাগের পর, বাঙালির খণ্ডিত জাতিসত্তায় সে এক প্রবল ঘা, ঈশান বাংলায় বিশ্বাস ভঙ্গের অভূতপূর্ব ঘটনা।
উনিশের প্রেক্ষাপট অনেকেরই জানা, বৃহত্তর অসমের বাংলাভাষী ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ওপর, সরকারি ভাষা হিসাবে, অসমিয়া ভাষা চাপিয়ে দিতে চাইল চালিহা সরকার। সে চেষ্টাকে রুখতে মরিয়া হয়ে উঠল বহুভাষিকের প্রতিনিধি বরাক-বাংলার বঙ্গভাষী এবং মণিপুরি-সহ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গণসত্তা। সঙ্কল্প দিবস পালিত হল বরাক জুড়ে, আমার জন্মশহর হাইলাকান্দিও আ-মরি বাংলাভাষা কণ্ঠে তুলে রাস্তায় নামল, মাঠে আর ময়দানে আছড়ে পড়ল জনরোষ। হরতালে সামিল শহর, তেমনি গঞ্জ। ১৯ মে-র নারকীয় হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে হাইলাকান্দির ঘরে ঘরে অরন্ধন পালিত হল, সে উত্তেজনার প্রহরে নিতান্ত বালক আমি লক্ষ্য করলাম মর্মান্তিক ছায়া আমাদের পরিবারেও দীর্ঘ, দীর্ঘতর হয়ে উঠছে।
স্বাধীনতা-পূর্ব কালে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে পূর্ববঙ্গের যেসব বাঙালি অসমের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেলেন, তাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে যেমন বিভিন্ন সরকারি পদে সম্মানের সঙ্গে কাজ করেছেন, তেমনি ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার অসমিয়ারাও প্রবল আগ্রহ নিয়ে বাংলা সাহিত্য পড়েছেন । এই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধের উপর গড়ে উঠতে পারত যে-সংস্কৃতি, তার মূলে কুঠারাঘাত করেছে সরকারের আধিপত্যবাদী সিদ্ধান্ত। ১৯ মের ভাষা আন্দোলনে বরাক উপত্যকার প্রতিবাদ ছিল সে অবিমৃশ্যকারিতার বিরুদ্ধে ।
শিশু বয়সের কোনো কোনো স্মৃতি হয়তো তীব্রতার কারণেই মনে গেঁথে যায়। আপাত-অসম্ভবটি কীভাবে ঘটে, তা একমাত্র মনস্তাত্ত্বিকেরাই বলতে পারবেন। তেমন একটি ছবি আমার মনে স্পষ্ট জেগে আছে। আমি এখনো দেখতে পাই, আমার ঠাকুমা ঠাকুরঘরে বসে আছেন, তাঁর সামনে মেঝেতে হাঁটু গেঁড়ে বসে থাকলেন কয়েকজন যুবতী। আমি বড়ো হয়ে ঠাকুমাকে আমৃত্যু ঘরের মধ্যে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখেছি। শুনেছি, শহরের কয়েকজন মহিলা আমার ঠাকুমাকে পরদিন প্রতিবাদ মিছিলে যোগ দিতে অনুরোধ করতে এসেছিলেন। সকালবেলা বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে তাড়াহুড়োয় বাড়ির পুকুরের বাঁধানো ঘাটে পড়ে গিয়ে ঠাকুমার কোমর ভেঙে যায়। এরকম ছোটখাটো ঘটনা সে সময় বরাক উপত্যকার অনেক পরিবারেই হয়তো ঘটেছে, কিন্তু আমাদের পারিবারিক ইতিহাসে ভাষা-আন্দোলনের স্মৃতিটি এখনো অমলিন দুঃখ হয়ে মিশে আছে।
কেন বিশ্বাসভঙ্গের কথা বলছিলাম, সে কথাটি একটু বুঝিয়ে বলি। স্বাধীনতা-পূর্ব কালে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে পূর্ববঙ্গের যেসব বাঙালি অসমের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেলেন, তাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে কেউ সরকারি স্কুলের প্রধান হিসেবে, কেউ সরকারি দফতরের আধিকারিক হিসেবে, আমাদের সেবা করে গেছেন। রাজ্যের স্কুলে কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছেন তাঁদের সন্তানদের। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার অসমিয়ারাও প্রবল আগ্রহ নিয়ে বাংলা সাহিত্য পড়েছেন। এই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধের উপর গড়ে উঠতে পারত যে-সংস্কৃতি, তার মূলে কুঠারাঘাত করেছে সরকারের আধিপত্যবাদী সিদ্ধান্ত। বরাক উপত্যকার প্রতিবাদ ছিল সে অবিমৃশ্যকারিতার বিরুদ্ধে। প্ররোচিত গুলিবর্ষণে শান্তিপূর্ণ প্রতিবেশীর বিশ্বাসের ওপর শক্তিমানের তাচ্ছিল্য পরাক্রান্ত হয়ে উঠল।
আরো একটি বিশ্বাসভঙ্গের কথা বলা দরকার। সেটিও অত্যন্ত দুঃখজনক। প্রতিবাদী আন্দোলনকে ব্যর্থ করতে প্রশাসনিক আধিকারিকরা ব্রিটিশ সরকারের বস্তাপচা ডিভাইড অ্যান্ড রুল কৌশলটিই প্রয়োগ করলেন। সাম্প্রদায়িকতার বিষ জেগে উঠল সমাজের শরীরে। সাম্প্রদায়িক হানাহানির সম্ভাবনা প্রবল চেহারা ধারণ করল। আমার বাবা তখন ওকালতি পেশায় সংযুক্ত। ভাষা আন্দোলনে থাকার কারণে তাঁর মক্কেলদের এক বড়ো অংশের কাছে তিনি ব্রাত্য হয়ে পড়লেন। বাধ্য হয়েই ওকালতি ছেড়ে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিলেন স্থানীয় কলেজে। আমি বড়ো হয়ে তাঁকে সর্বজনমান্য অধ্যাপক হিসেবেই দেখেছি। তবু বিশ্বাসভঙ্গের ক্ষতটি স্থায়ী হয়ে রইল পরিবারের স্মৃতিতে।
♦•♦♦•♦♦•♦♦•♦♦•♦♦•♦
❤ Support Us







