Advertisement
  • গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
  • ডিসেম্বর ২৪, ২০২৩

পুকা ভগবান

মন্ত্র পড়া পর্যন্ত যায়নি তারা, দিব্যি গড়ে নিয়েছে সংসার। বিয়ে ব্যাপারটা তাদের কাছে শুধু বাহুল্য নয়, বিলাসিতা

অমিত মুখোপাধ্যায়
পুকা ভগবান

অলঙ্করন: দেব সরকার

 

এই নদী তেমন বড়ো নয়, বন্যাও বাঁধভাঙা নয়। এর নাম গোয়ালফেলানি-ই বলে দেয় বড়ো জোর এক  দুর্বল গোয়াল ফেলে দেবার ক্ষমতা ধরে সে। তবু এক ঘোর বর্ষায় বাড়তি জল পেয়ে পিরখি-কে তুলে নিয়েছিল। নদীর ধারে ঢালের মুখে থাকা ঝুপড়িতে তুলে দেয় শেষ অবধি সামলাতে না পেরে। নাকি জ্ঞান ফিরে পাবার পরে পিরখি কাছেই ওঠার মতো অবস্থা দেখে মরিয়া হয়ে হাঁচড়ে ডাঙায় উঠে এসেছিল। ধুপু ধাঙড় রেখে দেয় তাকে।

 

ধুপু নিজেও বেশি দিন আগে গোয়ালফেলানির ধারে আসেনি। সেও অন্য ভাবে ভেসে ভেসে এসেছে। জমি থেকে, বসত থেকে, জীবিকা থেকে। একের পর এক পেশা পাল্টেও যখন টিকতে পারেনি, এই প্রত্যন্ত মফস্বলে পালিয়ে এসে ঘাপটি মেরে আছে। শেষ আঘাত সে অবশ্য সইতে পারেনি বলে বিশ্বাসঘাতক শয়তানটিকে মেরে পুঁতে রেখে এসেছে।

 

সকালে নালা সাফাই করার ডাক এলে বেরোনোর আগে পিরখির কাছে জেনে নেয় আনাজ কী আনতে হবে। কাজে নামলে অনেকেই তাকে খেয়াল করে। তার কোদাল যেমন জব্বর, তাগড়াই লাঠির মাথায় ঝাড়ু তেমন মজবুত। বালতির ভেতরে আরও কি সব ছোটখাটো অস্ত্র রাখে, তেমন কেউ দেখেনি। অথচ সে সব কাজে লেগে যায় কোন ভাবে আটকে গেলে। ল্যাঙট পরে প্রবল পরাক্রমে যখন ময়লা সরিয়ে দেয়, লোকে ধুপুর হাত পায়ের পাকিয়ে ওঠা পেশি দেখতে থাকে। মাংস কম হতে পারে, কিন্তু দড়িদড়ার পাক প্রচুর ! কাঁধ ফুলে নাচতে থাকে। তার চওড়া বুক ঘামে চকচক করে আর কোমর যেন আরও সরু লোহার নলের মতো দেখায়। বাবরি চুলের গোছ কোন দিকে ঝুঁকবে ঠাহর  করতে না পেরে দশ দিকে কাঁপে।

 

তুমুল জলের সময় কয়েক দিন একসঙ্গে থাকাটা কেমন আশ্চর্য নীরব অথচ সহজ ছিল। মন্ত্র পড়া পর্যন্ত যায়নি তারা, দিব্যি গড়ে নিয়েছে সংসার। বিয়ে ব্যাপারটা তাদের কাছে শুধু বাহুল্য নয়, বিলাসিতা। অতীতও বা এই পড়তি জীবনে কী কাজে আসে? হয়ত ভয় ছিল ধুপুর, সামান্য খ্যাঁদা হলেও বেশ মনিষ্যি পিরখি, হাতে এসেও চলে না যায়

 

পাড়ার নালার কাজে পয়সা মন্দ জোটে না। বাজারে যাবার পথে আরও দু’এক বাড়ি থেকে ডাকে। বাইরের ছোট নর্দমা, বাথরুম বা কারও পায়খানা সাফ করতে হয়। তবে সব গৃহস্থ সমান নয়, ঠকাতে পেলে ছাড়ে না। তাই আজকাল দরদাম না করে কাজে সে হাত দেয় না। বেলা নাগাদ গেলেও সে সেদিন ভালই আনাজ নিতে পারে, এমনকি একটা মাঝারি বোয়াল পর্যন্ত আধা দামে পেয়ে যায়। জীবনে প্রথম রিকশা চড়ে কাজের আর সংসারের মাল আনতে হয়। নিজেকে রাজা বলে মনে লাগে ধুপুর। বেমানান যাতে না লাগে, বাবুদের মতো ভালো করে বসতে গিয়ে পা ছড়ায়, দুই পায়ের মাঝে মাল যত্নে সাজিয়ে রাখে, কখনো সোজা করে হাঁটুজোড়া। তবে কনুই কেমন ভাবে রাখলে ঠিক হবে কিছুতে বুঝতে পারে না। এবার রিকশা-চড়া বাবুদের খেয়াল করতে হবে।

 

বাড়িতে সেই দুপুরে খাতির বেড়ে যায় ধুপুর। পিরখির রান্না যতই আনাড়ির মতো হোক, অনেক পদের খাবার যত্নের ছোঁয়া পেয়ে ভোজের মজা নিয়ে আসে। সে কখনো জানতে চায়নি কোথা থেকে এসেছে পিরখি, বা তার পরিবার কী ছিল। তুমুল জলের সময় কয়েক দিন একসঙ্গে থাকাটা কেমন আশ্চর্য নীরব অথচ সহজ ছিল। মন্ত্র পড়া পর্যন্ত যায়নি তারা, দিব্যি গড়ে নিয়েছে সংসার। বিয়ে ব্যাপারটা তাদের কাছে শুধু বাহুল্য নয়, বিলাসিতা। অতীতও বা এই পড়তি জীবনে কী কাজে আসে? হয়ত ভয় ছিল ধুপুর, সামান্য খ্যাঁদা হলেও বেশ মনিষ্যি পিরখি, হাতে এসেও চলে না যায়। মেয়েলোক নেবার উপায় তো ছিল না এত দিন ! ভয়ে পুরনো দিন নিয়ে কথা না তুলেও আন্দাজে বুঝেছে ওরাও দুখী ছিল বটে। তাই কোনও অভাবে বিকার নেই, কষ্টে পরোয়া নেই মনে হয়। চুপ মনিষ্যি বলে তাকে বুঝতে আরও বেশি অসুবিধা হয়। আরেক সময় তাই নিয়ে গরবে ভরে যায় ধুপুর ছাতি। নেই নেই করে এমন কপাল ছিল তার! তার থাকা খাওয়া পরা চলা বলা সবই যেন কিছু করে বদল হয়ে গেছে। কেউ ছিল না সে, এখন যেন কিছু হয়েছে, লোকে ওজন দেয় তাকে।

 

।।।।

কিছু বাড়ি আছে ডাকতে চায় না ধুপুকে। কেউ নিজেরা নর্দমা বা পায়খানা সাফ করে নেয়। কেউ ময়লাই রেখে দেয়, ঝামেলায় পড়লে তবে হাত দেয়, ছেলেপুলেকে বকেঝকে করায়। একেবারে হাতের বাইরে গেলে তখন তাকে ডাকে। এসব বাড়ির সামনে তার চাপা হেঁড়ে গলায় “ময়…য়লাআ …সাফাই” শোনা যায় না। পা চালিয়ে বেরিয়ে যায়। নববাবুর বাড়ির পুরোনো কাঠামো ভেঙে নতুন উঠছে। পাশে কেবল একটা ঘর বাকি রেখে সেখানে কোনোমতে আছে। প্রথম যখন এদিকে এসে এই কাজ শুরু করে, পয়সা দেওয়া নিয়ে ঝামেলা করেছিল নববাবু। সেই থেকে এখানে সে কাজ করে না। আজ সামনে দিয়ে যাবার সময় ডাক শোনে সে। না শোনার ভান করে চলে যায়। এখন তার অনেক চাহিদা।  ফালতু অশান্তি সে মোটে চায় না।

 

রান্না ইত্যাদির সময় বেঁচে যাওয়ায় আজকাল কাজে বেশি সময় দেয় বলে আয়ও বেড়েছে। নতুন পাড়ায় যাবার ফুরসতও মিলে যায়। সেদিকের লোক জমি কিনেছে, পয়সা আছে। বেশি দরাদরি করে না। উপরি খেতেও বলে। সেটাও আজকাল পিরখির কথা মাথায় রেখে রাজি হতে হয়। কাছাকাছি থাকলে সে ঘরে ফিরেই খায়। দু’এক দিন বেলা করে ফেরার সময় খেয়াল করেছে গোয়ালফেলানির ধার নয়ত রাস্তার কোণ থেকে কেউ যেন উঁকিঝুঁকি মারার ধান্দায় ঘুরঘুর করছে। ধু ধু পথে যেখানে বেলার দিকে সুনসান থাকে, সেখানে এই সব কারা ? মেয়েলোক দেখলেই ছুঁকছুকানি বেড়ে যায় নাকি! পিরখিকে বলে রেখেছে সে থাকার সময় বাইরের কাজ সেরে নিতে। ফিরলে ফের অন্য বাইরের কাজ যেন করে। বাইরে না খাবার সেটাও আরেক কারণ। বাবুদের ঘরের বিয়ে করা বউ নয় যে সে নিশ্চিন্তে থাকতে পারে। তার জীবন কত পলকা সে তা বেবাক জানে। কিইবা বা দিয়ে সে বেঁধে রাখতে পারে ! অবশ্য পিরখিকে অন্য রকম মনে হয়, যেন কৃতজ্ঞ, যেন ভালও বাসে।

 

ফেরার সময় ছেলেকে দৌড় করিয়ে ধুপুকে ধরে নব। নতুন বাড়ির কাজ এক পর্ব খতম। তার কিছু রাবিশ পড়ে নর্দমা দম ধরে আছে। নব দর করে না, আসলে তেমন কিছু চায়নি ধুপু। বাড়তি কথার সুযোগ দিতে সে চায় না। বেশ খেটে সব মাল সরাতে হয়। সব মিলে জমে এঁটে গেছে। অবশ্য গতিক দেখে বালতি করে জল ঢেলে দেয় ছেলেটা। ঘরে ঘরে ঘুরে ছেলে বাপের কত তফাত দেখে সে। কেউ বাপের ছাপছবি, কেউ বেশ আলাদা, নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে চলতে জানে। তা বাড়িটা মন্দ উঠছে না। ঘুপচি পুরনো বসত থেকে খোলামেলা বাড়িতে উঠে যদি মন একটু খোলে লোকটার, দেখা যাক। বউটা কিন্তু মন্দ নয়, একদিন ভালো খেতে দিয়েছিল। মায়ের ধাত পেয়েছে ছেলে।

 

।।।।

গোয়ালফেলানির ওপরে সেতু তৈরি হবে। তা বেশ, কিন্তু ঠিক ধুপুর ডেরার ওপর দিয়েই করতে হবে?  এপার ওপার ক্ষমতার বাবুদের দোস্তি হয়েছে। দুই দলেরই নাফা, আর এদিকে করলে ভদ্দরলোকদের তেমন সরাতে হবে না। ওদিকে ফাঁকায় খোঁড়া শুরু হতে ভারিক্কি বাবুরা এসে মিষ্টি জবানে সরে যেতে বলে। সে নিজের বুদ্ধিমতো বড় বাবুদের মুরুব্বিকে ধরে। মুরুব্বি তার বাড়িতে ধুপুর কাজে খুশি থাকে। দু’দফায় কথা হয়। তবু লাভ হয় না। একটু সরে ফের ছাউনি দিয়ে নিতে বলে সে। ধুপু কিছুতে মেনে নিতে পারে না। অত খরচা, কত বাড়তি কাজ, কে ফের ওই ঝামেলা নেবে? তখন পরিবার ছিল না, রোজগারের পরোয়াও ছিল না। ফের বসত গড়তে গেলে রুজি বন্ধ হবে। আর কত বার বাস্তু হারাবে সে? এত বড় দুনিয়াতে তার জন্যে এক রত্তি ভুঁই বরাদ্দ নেই কোথাও?

 

গোয়ালফেলানির কপাল ফেরে। এই জায়গাটুকুতে তাকে শাড়ি পরানো হয়, পাড়ের বাহার জাগে। শরীরে ঢল নেই, তবু সুন্দর এক ঢাল তৈরি হয়। মালপত্তর ডাঁই হয়, মজুর বাড়ে, হল্লা মচে থাকে। মেজাজ খারাপ হয়ে থাকে ধুপুর। পিরখির দিকে চোরা তাকায়, বুঝতে পারে না সে কেমন করে দিব্যি ঠিক থাকে। চুপ করে কাজ করে চলে, কিন্তু একটু কি বেশি স্থির লাগে না! কে জানে।

 

কাজ এগোয়, তবু ধাঙড় পরিবার নড়ে না দেখে বাবুরা ফের বলে, এবার আর ভালো সুরে নয়। তবে মুরুব্বি কিছু বলেছে কিনা কে জানে, ওরা কিছু টাকা দেয়, কী যেন খ-পূরন না কী বলতে থাকে। ওদিকে কোন দিকে ঝামেলা বেধেছে পাসনালা নিয়ে। গোয়ালফেলানির ধারের মাটি কেটে পাসনালা করে এই সুযোগে শ্যালো চালিয়ে বাড়তি জল নেবার ধান্দা করেছে। ওই পাড়ার নাকি চেনাশোনা বেশি, তাই জোরও দেখায়। অন্যেরা ক্ষেপে যায়, তাদের ভাগের সেচের জল কমে যাবে। মারপিট বেধে যায়। কয়েক দিন সব কাজ বন্ধ থাকে পুলিশের কথায়। পঞ্চাত বসে, ঝগড়া চলতে থাকে।

 

একা থাকার সময় হাবিজাবি পশু মেরে খেত। কত … কত দিন পরে যে পাঁঠা পাতে পড়বে ! দু’জনে মিলে হাজার কথা বলার মাঝে রান্নায় লাগে। তেল পেঁয়াজ আদা রসুন কম, তাতে কী, গন্ধে মাতোয়ারা ধুপু ! পাঁচমেশালি সবজির সঙ্গে মাংস সাজিয়ে বেলা করে খেতে বসে যখন, ওদের মনে হয়, একসঙ্গে থাকার পরে এত ভালো খায়নি তারা

 

রুজি কমতে থাকে ধুপুর। সব দিকে যেতে পারে না। নতুন পাড়া দূরে বলে সেটাও বাদ রেখেছে। ওদিকে মারপিট, এদিকে উটকো লোকের সঙ্গে তার ডেরার পানে দু’এক বাবুর চাহনিও ভালো লাগে না। সুখ এলেই কি শালা পাছু পাছুতে অশান্তি পোঙা নাড়াতে শুরু করে ? ওপারে সেই পাসনালা নিয়ে খোলা বন্ধ করতে পাড়ার নিকাশি ঠিকমত হচ্ছে না। ধুপুর ডাক পড়ে। শুনতে পেয়ে এপারের লোক কিছুতে তাকে সে কাজে যেতে দেবে না। জ্বালার ওপরে ফোঁড়া !

 

শেষে ধুপুর যাওয়া না-যাওয়া নিয়ে দুই পাড়, তিন দল, গাদা মনিষ্যির কুরুক্ষেত্তর বেধে যায়। পাসনালা কেটে জল হাতিয়ে নেওয়া নাকি বড়ো রোগ। যার যেখানে খ্যামতা বেশি সে চুপেচুপে চাষ বাড়িয়ে নেয়। যেখানে দুশমন আছে, অনেক সময় সারা রাত জল টেনে পাসনালা বুজিয়ে পাম্প সরিয়ে নিয়ে যায়। গ্রামদেশের অনেক নদীর মতো গোয়ালফেলানির অনেক জায়গায় এমন চুরি হয়। এদিকে বেশি গোল বেধেছে সেতু হচ্ছে বলে। শালা মনিষ্যির বদগন্ধ ময়লার থিকে ঢের বেশি ! তারই সব গেল, আর শালারা এমন ভাব করে যেন ধুপুই গোল করেছে ! একবার ভাবে ফের ভেসে পড়বে, কিন্তু না, কোথাও তার ভেতরে বলে, এবার থামতে শেখো, থিতু হও। পিরখিরও বুঝি তাই মত, সরতে চায় না। কম বেরোয় ধুপু, ঘরের কাজে হাত লাগায়। সেও আরেক জ্বালা, না বেরোলে তার বদন টনটন করতে লাগে।

 

আরেক দফা মারপিট হয়, দু’তিন জন জখম হয়ে হাসপাতালে যায়। সব পাসনালা বন্ধ হয়ে যায়। রাজা উজির আসে। পুলিস আর দুই পাড়ার লোক মিলে পাহারা দিয়ে সেতুর কাজ চালু করায়। সরতেই হয় ধুপুকে। তবে ওরা কিছু শ্রমিক দিয়ে পাশে সুবিধেমতো কোণে নতুন ঝুপড়ি বানাতে সাহায্য করে। মোটে ভালো না লাগলেও একটু দূরে বলে ঝুটঝামেলা আর যন্ত্রপাতির শব্দ কম, লোকও। সেটুকু সুবিধে পেয়েই মানিয়ে নেয় ওরা। ফের কাজ শুরু করে ধুপু।

 

এই সব ঘটনা ধুপুর গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। ওপারে কাজ করতে না-যাওয়া আর কষ্ট ভোগ করা তার কদর খাতির বাড়ানোর সঙ্গে টাকা রোজগারেও কাজে লাগতে থাকে। সবচেয়ে বেশি সুবিধে পায় বাজারে, সবজি মাছ কম দামে মেলে। পাঁঠার নাড়ি, মুণ্ড আর সেই সঙ্গে এক ছিটে মাংসও মাগনায় জুটে যায়। একা থাকার সময় হাবিজাবি পশু মেরে খেত। কত … কত দিন পরে যে পাঁঠা পাতে পড়বে ! দু’জনে মিলে হাজার কথা বলার মাঝে রান্নায় লাগে। তেল পেঁয়াজ আদা রসুন কম, তাতে কী, গন্ধে মাতোয়ারা ধুপু ! পাঁচমেশালি সবজির সঙ্গে মাংস সাজিয়ে বেলা করে খেতে বসে যখন, ওদের মনে হয়, একসঙ্গে থাকার পরে এত ভালো খায়নি তারা।

 

।।।।

সেতুর কাজ চলে, তবে নতুন আস্তানায় মানিয়ে নিলেও ধুপু-পিরখির চালচলন আগেকার মতো থাকতে পায় না। মালপত্তর এখন এদিকে সরে আসে। মজুরদের আনাগোনা বাড়ে। ঝুপড়ি ঘরে ওদের গোপনীয়তা যেন আদুল হয়ে যায়। রাতে পাহারার নাম করেও কেউ কেউ আসে, দরমার ফাঁকফোকর দিয়ে নজর চালাবার চেষ্টা করে। এক দিন ধুপু মাথা গরম করে বেরিয়ে এসেছিল। ধরতে যাচ্ছিল লোকটাকে। পেলে হয়ত দিত গোয়ালফেলানির গায়ে কোথাও পুঁতে! অত্যাচার সইতে সইতে আগে একবার সে যেমন করেছে। সেই থেকে নিজেকে সে অন্য চোখে দেখে। তার জাত শালা মহাভারতের থিকে পুরানা, শিকার, চাষ, কারিগরের তৈয়ারি, সব আদত কাম করেছে। কারো চেয়ে কম নাকি ! উঁচু জাতগুলান তাদিগে নিচুতে নামাইয়েও ছাড়েনি, জঙ্গল ছাড়্যে সব ঠাঁই থিকে নাড়া দিয়া ভাগাইতে চায় ! নিজের গাঁয়ে সে কিছু কইরতে পারে নাই, জোতদারকে হাতে জবাব দিলে সিখানে থাইকতে পারত না। চেনা মুলুকে ধরা পড়ার লেগ্যে সরে এসেছে। তার পর থিক্যে জায়গা ছাড়তে আর ভয় নাই। লোকটাকে মারলে ফের সরে যেত। পিরখি তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। তার তাগদও ধুপু টের পায় সেদিন।

 

জানোয়ারকে বশ করার মন্তর জানে লোকটা। গোয়ালফেলানির সবচেয়ে খেঁকুরে থেকে শুরু করে  বদরাগী কুকুরটাও কিছু বলে না ওকে, দিব্যি লেজ নাড়ায়। সেদিন এক পাল হনুমান এসে লণ্ডভণ্ড করছিল, অন্যদের মতো না লুকিয়ে ধুপু ওদের সামনে দিয়েই ফেরে। ওরা হাঁ করে দেখেছে ধুপুকে, কী মনে হতে সদলে চলেও গেছে

 

গোয়ালফেলানি বাজারের ধারে সার্কাস বসে। মুরুব্বির ঘরে কাজ ছিল। সে জানে বসত ভাঙা ঠেকাতে পারেনি বলে ধুপু অসন্তুষ্ট হয়ে আছে। কাজের পয়সা মিটিয়ে সে দুটো কার্ড এনে দেয়, যা জরু-কে নিয়ে সার্কাস দেখে আয় মাগনায়। সামনে বসতে পাবি রে ! তা সে দেখার সময় তাঁবুর পাছুতে হাতি বিক্রমমল্ল ক্ষেপে ওঠে। মাহুত মানাতে পারে না। কত যে চিৎকার! লোকে ছোটাছুটি লাগায়। শিকল ছিঁড়ল বলে। দূর থেকে হাতির চোখের পাশে কালো জল গড়ানো দেখে তার মস্ত হওয়া বোঝে ধুপু। মাহুত আর কয়েক জন লোকের সঙ্গে সে বড় মোটা কাছি-দড়ি দিয়ে বড় মোটা শাল গাছটায় বাঁধে। ধুপু মাহুতকে বলে দেয় দিন সাতেক খাবার দেওয়া যাবে না। শুধু খানিক জল আর কিছু শেকড়বাকড়ের সুলুকসন্ধান দেয়। ও নাকি আগে কোথায় হাতির সহকারির কাজ করেছে, তাই জানে। গোয়ালফেলানির ছোটো চৌহদ্দি পার হয়ে ছোটে ধুপুর কথা। আর তার চেহারা চুলের সঙ্গে মিলিয়ে নানা গপ্পো গজাতে থাকে।

 

দিন দিন বিক্রমমল্ল স্বাভাবিক হয়ে উঠতে থাকে। চার দিনের মাথায় ম্যানেজারের হাত দিয়ে কিছু টাকা পাঠিয়ে দেয় মালিক, সঙ্গে ফের জোড়া পাস, সেদিন যে সার্কাস দেখা হয়নি ওদের ! লোকে বলে জানোয়ারকে বশ করার মন্তর জানে লোকটা। গোয়ালফেলানির সবচেয়ে খেঁকুরে থেকে শুরু করে  বড্ড বদরাগী কুকুরটাও কিছু বলে না ওকে, দিব্যি লেজ নাড়ায়। অথচ ওই ধরণের ময়লা কাপড়ের লোক দেখলে পেছন ছাড়ে না। সেদিন এক পাল হনুমান এসে লণ্ডভণ্ড করছিল, অন্যদের মতো না লুকিয়ে ধুপু ওদের সামনে দিয়েই ফেরে। ওরা হাঁ করে দেখেছে ধুপুকে, কী মনে হতে সদলে চলেও গেছে!

 

এক সময় সেতুর কাজ শেষ হয়, নাটক করে দু’বার উদ্বোধনও হয়ে যায়। পিরখির সঙ্গে শলা করে ধুপু মাতব্বরের সঙ্গে দেখা করে। তাকে খুব বুদ্ধি করে বোঝায় যে এতে কারো ক্ষেতি নেই, বরং তার এখনকার ডেরার জায়গাও খালি হয়ে যাবে। মাতব্বর ভেবে নিজের মনে তা স্বীকার করে। তা ছাড়া অন্তত একটা কথা শুনে ধুপুকে খুশি করা লাগে। পরে কখন কী কাজে দরকার হয়! লোকটার এলেম আছে, যত দেখে তত অবাক হয়।

 

।।।।

গোয়ালফেলানির লোক অবাক হয়ে একদিন দেখে নিপাত্তা হয়ে গেছে ধাঙড় পরিবার ! কী হলো ! এত কিছু করে শেষে লোকটা পালাল কেন? নাকি রাজনীতির দালালরা তাড়াল তাকে ! যেমন সাহস ছিল, তেমনি কাজে জব্বর ছিল যে ! ওর বদলি পেতে তো কালঘাম ছুটে যাবে ! আজকাল নিচু জাতের লোকও ওই সব কাজ করতে চায় না ! খেটে খাবার বদলে সহজে আট দশ হাজারের নানা কাজ করে ওদের ছেলেরা, কী ফাঁট তাদের ! এই কাজে সরকারি লোক নিলে আজকাল মধ্যবিত্তের লেখাপড়া জানা তরুণ ছুটে দরখাস্ত করে। তবে পেলে আর সেই কাজ করতে চায় না, অন্য ডিউটি ম্যানেজ করতে লেগে পড়ে। বাজার থেকে অফিসপাড়া এই একই চিন্তায় যেন ডুবে থাকে।

 

প্রতিদিন ময়লা জমে, নিকাশি আরও আটকে যেতে থাকে, গন্ধ বাড়তে থাকে। কোথাও পথের পাশে পাহাড় গজাতে শুরু করে। সরকারি দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়, কাউন্সিলরের সামনে অভিযোগ জানানো হয়। বহু বছর পরে সকলে মিলে বিক্ষোভও দেখায়। লোকে হাসে না, বিনোদনে যায় না, কেবল মনমরা হয়ে স্বাস্থ্য মারি দুর্ভোগ নিয়েই উত্তেজিত আলোচনা করে চলে।

 

কয়েক দিন পরে নতুন ও গোপন আস্তানা গড়া সারা হলেই ধুপু যখন ফের কাজে বেরিয়ে পড়ে, লোকে চমকে যায়। কোথায় গায়েব হয়ে গেছিল এত দিন ! ধুপু কাজ করে, কিন্তু আস্তানার বিষয়ে কিছু জানতে চাইলেই কেবল হাসে। কি বিশ্রী তার হাসি, কেউ যে তাকে হাসতে দেখেনি আগে, এত দিন পরে তা আবিষ্কার করে বিরক্ত হয়, আবার ফিরেছে বলে স্বস্তিও পায় মানুষ। অনেক বেশি উৎসাহ নিয়ে অনেক ভালো কাজ করে সে। এত সাফ রাখছে সব নিকাশি, যে মশা মাছির উপদ্রব প্রায় নেই। ফলে রোগও বেশ কম। দু’জন ছেলে জুটিয়ে কাজে লাগিয়ে দিয়েছে। আরও নিয়োগ করবে নাকি সে!

 

তারপর অবশ্য বাসস্থান রহস্য বার হয়ে পড়ে আচমকাই। গোয়ালফেলানির স্রোতে এক লাশ ভেসে এসে সেতুর পাশে আটকে যায়। তাকে উদ্ধারে পুলিস আসে, সাহায্যে লাগে স্থানীয় ছেলেরা। তখনি দেখা যায় সেতুর ঠিক নিচের ঢালে এমন কায়দা করে বাসা বেঁধেছে ধুপু যে ওপর থেকে বোঝাই দায়। সেতু তাদের ছাউনির ওপরে বাড়তি ছাদ হয়ে উঠেছে। ঢাল বেয়ে একটু নেমে তবে সেখানে ঢুকতে  হয়। সেতু দিয়ে চলাফেরার পথে কারোর নজরেই পড়বে না !

 

নবর ছেলে বাবাকে বলে, মাস্টারমশায় সেদিন বলছিলেন এই নিচু জাতকে সরিয়ে রেখেছি বলেই আজ আমাদের এই দশা। ওদের সম্মান ও মূল্য দিয়ে কাজে শামিল করতে হবে আমাদের। ওদের বাদ দিয়ে গুণ্ডা বদমায়েশদের খপ্পরে পড়ছি আমরা। লুমপেন-মার্কা অত্যাচার সইতে হচ্ছে। ওদের সমাজে জুড়ে নিলে একদিন সবার জোর বাড়বে বাবা

 

সাত সকালে নব নিজে এসে সেতুর পাশ থেকে হাঁক পাড়তে থাকে। কী ! না, চলো একবার আমার বাড়ির নতুন চেহারা দেখবে, কাজও আছে। ধুপু গিয়ে ভালো করে জরিপ করে নয়া বসতের সব দিক। নাঃ, সত্যিই ভালো কাজ হয়েছে। জানতে চায় কী তাকে করতে হবে। নব বলে, নতুন ট্যাঙ্ক করেছি পায়খানার। সেখানে কী নাকি মলখেকো পোকা ছেড়ে দাও তোমরা ! আগেরটা তো বাপের আমলে হয়েছিল। অন্যদের কাছে শুনে তোমায় ডাকলাম।

 

পোকা তো নিয্যস দেবে ধুপু। কিন্তু সেই পুরনো রোগ, নব আঁতকে ওঠে দাম শুনে। ধুপু বিরক্ত হয়। শুনো বাবু, ই পুকাটো আগের মতো চট করে মিলে না এখন। তাই গু ঘেঁটেই উদিগে জুগাড় কইরতে হব্যে। উ বড় পবিতরো প্রাণী বাবু, তুমার বসতে থাকপে কলিজার পারা, ঘড়ির পারাও বটে। উ আইসবে তো টিক টিক বলো, ধক ধক বলো, ভিটা আর জীবনের চক্কর ঠিক সুরে চালু হইন যাবেক। নইলে কিছু দিনেই মালে গন্ধে ভইরে যাবেক সব।

 

ই পুকা তুচ্ছ লয় বটে ! বাস্তু আছি না, সেই নয়া বাস্তু-তন্তরের সকল বিষ খতম কইরে নিচ্চিন্তে বাঁইচতে দেয় গো ! পুকাই ই যুগের ভগবান !

 

নবর ছেলে বাপকে ভেতরে ডাকে, বলে, বাবা, মাস্টারমশায় সেদিন বলছিলেন এই নিচু জাতকে সরিয়ে রেখেছি বলেই আজ আমাদের এই দশা। ওদের সম্মান ও মূল্য দিয়ে কাজে শামিল করতে হবে আমাদের। ওদের বাদ দিয়ে গুণ্ডা বদমায়েশদের খপ্পরে পড়ছি আমরা। লুমপেন-মার্কা অত্যাচার সইতে হচ্ছে। ওদের সমাজে জুড়ে নিলে একদিন সবার জোর বাড়বে বাবা। খেয়াল করে দেখো, এই একটা লোক কিন্তু পাল্টে দিয়েছে অনেক কিছু। … যা চাইছে তা অন্যায্য নয়, দিয়ে দাও বাবা, এটা ওর প্রাপ্য। আমাদের রক্ষকরা তো কেড়ে নিচ্ছে নিত্য নতুন ফরমান করে! এরা খেটে খায় !

 

ছেলে যে নবর ভেতরে কোথায় ছুঁয়ে দেয়, কে জানে ! ধাক্কা লাগে জোর। তার কবেকার শেখা, জানা অথচ কাজে না-লাগানো স্মৃতি ভেসে ওঠে। তার মাস্টারও তো এমন কথাই বলেছিল ! বেমালুম ভুলে মেরে দিয়ে বড়ই স্বার্থপর হয়ে পড়েছে ! ভোগের অসুখে ভুগে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো হয়ে গেছে !

 

ধুপু ভাবছিল চলে যাবে কিনা। নব বেরিয়ে আসে, তা হলে কবে আনবে ?

 

♦–♦♦–♦♦–♦♦–♦♦–♦


  • Tags:

Read by:

❤ Support Us
Advertisement
homepage block Mainul Hassan and Laxman Seth
Advertisement
homepage block Mainul Hassan and Laxman Seth
Advertisement
শিবভোলার দেশ শিবখোলা স | ফ | র | না | মা

শিবভোলার দেশ শিবখোলা

শিবখোলা পৌঁছলে শিলিগুড়ির অত কাছের কোন জায়গা বলে মনে হয় না।যেন অন্তবিহীন দূরত্ব পেরিয়ে একান্ত রেহাই পাবার পরিসর মিলে গেছে।

সৌরেনি আর তার সৌন্দর্যের সই টিংলিং চূড়া স | ফ | র | না | মা

সৌরেনি আর তার সৌন্দর্যের সই টিংলিং চূড়া

সৌরেনির উঁচু শিখর থেকে এক দিকে কার্শিয়াং আর উত্তরবঙ্গের সমতল দেখা যায়। অন্য প্রান্তে মাথা তুলে থাকে নেপালের শৈলমালা, বিশেষ করে অন্তুদারার পরিচিত চূড়া দেখা যায়।

মিরিক,পাইনের লিরিকাল সুমেন্দু সফরনামা
error: Content is protected !!