Advertisement
  • বি। দে । শ
  • জুলাই ২৯, ২০২৬

‘টেলিগ্রাম’ প্রতিষ্ঠাতা পাভেল দুরভের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসে সহায়তার অভিযোগ, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি রাশিয়ার

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
‘টেলিগ্রাম’ প্রতিষ্ঠাতা পাভেল দুরভের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসে সহায়তার অভিযোগ, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি রাশিয়ার

ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই তথ্য আদানপ্রদানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ টেলিগ্রাম। সে প্রেক্ষাপটেই এবার নজিরবিহীন পদক্ষেপ করল রাশিয়া। মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম টেলিগ্রাম’-এর প্রতিষ্ঠাতা পাভেল দুরভের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে সহায়তার অভিযোগ এনে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছে রাশিয়ার ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিস (এফএসবি)। শুধু তাই নয়দুরভের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। মস্কোর দাবি, ‘টেলিগ্রাম দীর্ঘদিন ধরে এমন অসংখ্য চ্যানেল, ‘চ্যাট ও বট সক্রিয় রেখেছেযেগুলি ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা সংস্থাসন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী এবং চরমপন্থী সংগঠনগুলি রাশিয়ার বিরুদ্ধে নাশকতা ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপের পরিকল্পনা এবং সমন্বয়ের কাজে ব্যবহার করেছে।  

বুধবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এফএসবি অভিযোগ করেছেটেলিগ্রামের প্রশাসন বহুবার সতর্ক করা সত্ত্বেও তারা আমল  দেয়নি। সংস্থার দাবিওই সমস্ত চ্যানেল ও বট ব্যবহার করে রাশিয়ার অভ্যন্তরে নাশকতা, জঙ্গি হামলাগণহত্যা  ও সাইবার জালিয়াতির মতো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এফএসবি’-র বক্তব্য, এসব কর্মকাণ্ডের জেরে নারী ও শিশু-সহ বহু মানুষের মৃত্যু ঘটেছে, বিপুল আর্থিক ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে।

রাশিয়ায় জন্ম নেওয়া পাভেল দুরভ বহু বছর আগেই বিদেশে বসবাস শুরু করেন। বর্তমানে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরশাহি   ফ্রান্স— দুদেশেরই নাগরিক। রুশ সামাজিক মাধ্যম ভিকনতাকতে (ভিকে)-র প্রতিষ্ঠাতা দুরভ ২০১৩ সালে তাঁর ভাই নিকোলাই দুরভকে সঙ্গে নিয়ে টেলিগ্রাম চালু করেন। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ১০০ কোটিরও বেশি ব্যবহারকারী রয়েছে এই এনক্রিপ্টেড মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম’-এর। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দুই পক্ষের সেনাসাংবাদিকসাধারণ নাগরিক এবং সরকারি সংস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগমাধ্যমে পরিণত হয়েছে টেলিগ্রাম। তবে এই জনপ্রিয়তাই এখন দুরভের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্যতম ভিত্তি। রুশ গোয়েন্দা সংস্থার দাবি, ‘টেলিগ্রাম’-এর মাধ্যমে ইউক্রেনীয় বিশেষ বাহিনী রাশিয়ার অভ্যন্তরে হামলার পরিকল্পনা করেছে, সেগুলির সমন্বয় করেছে। এফএসবি বলছেশুধু ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা সংস্থাই নয়বিভিন্ন জঙ্গি ও চরমপন্থী সংগঠনও প্ল্যাটফর্মটিকে ব্যবহার করেছে। অথচ সংস্থা সে সমস্ত অ্যাকাউন্টচ্যানেল বা বট বন্ধ করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে না

টেলিগ্রাম’-এর পক্ষ থেকে এই অভিযোগের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে এর আগে চলতি বছরের শুরুতেই দুরভ জানিয়েছিলেনরাশিয়ার কর্তৃপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি তদন্ত শুরু করেছে। সে সময় তিনি অভিযোগ করেছিলেন, ‘টেলিগ্রাম’-এর ওপর আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্যই কৃত্রিম অজুহাত তৈরি করছে মস্কো। তাঁর দাবি,  পদক্ষেপ মূলত নাগরিকদের গোপনীয়তা আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমনের একটি রাজনৈতিক প্রচেষ্টা। রাশিয়ায় ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকারের অবস্থান নতুন নয়। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের আমলে ধাপে ধাপে কঠোর হয়েছে ডিজিটাল নীতি। বিশেষ করে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে সে প্রক্রিয়া আরও দ্রুত এগিয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সামাজিক মাধ্যম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর একের পর এক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে রুশ সরকার। ফেসবুক’, ‘ইনস্টাগ্রাম এবং এক্স (সাবেক টুইটার) ইতিমধ্যেই রাশিয়ায় নিষিদ্ধ। ইউটিউব’-এর পরিষেবাও সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। সিগন্যাল ও ভাইবার’-এর মতো মেসেজিং অ্যাপ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপ এবং টেলিগ্রাম’-এর ওপরও নানা ধরনের প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক বিধিনিষেধ চাপানো হয়েছে।

যদিও ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) ব্যবহার করে অনেকেই এখনো নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে পরিষেবা ব্যবহার করেনকিন্তু সে পথও ধীরে ধীরে বন্ধ করে দিচ্ছে রুশ প্রশাসন। একের পর এক ভিপিএন পরিষেবাও ব্লক করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। একই সঙ্গে মস্কো রাষ্ট্র-সমর্থিত ম্যাক্স’ নামে একটি নতুন মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম’-কে জনপ্রিয় করার চেষ্টা করছে। সরকারি প্রচারে এটিকে শুধু মেসেজিং অ্যাপ নয়সরকারি পরিষেবা গ্রহণঅনলাইন অর্থপ্রদান এবং অন্যান্য ডিজিটাল সুবিধার একত্রিত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। কিন্তু সমালোচকদের দাবিএটি মূলত নাগরিকদের ওপর নজরদারি চালানোর নতুন হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। কারণ প্ল্যাটফর্মটি প্রকাশ্যেই জানিয়েছেআইন প্রয়োগকারী সংস্থার অনুরোধ পেলে ব্যবহারকারীদের তথ্য সরকারের সঙ্গে ভাগ করে নেবে। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের দাবিএই পরিষেবায় এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নেই।

রাশিয়ার অভিযোগের পাশাপাশি পাভেল দুরভ বর্তমানে ইউরোপেও আইনি চাপে রয়েছেন। ২০২৪ সালে ফ্রান্সে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ফরাসি তদন্তকারীদের অভিযোগ ছিল, ‘টেলিগ্রাম  প্ল্যাটফর্মে মাদক পাচারশিশু যৌন নির্যাতনের ছবি ছড়ানো-সহ একাধিক অপরাধমূলক কার্যকলাপ রোধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার তদন্তে পর্যাপ্ত সহযোগিতাও করেনি সংস্থাটি। যদিও দুরভ সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এদিকে রাশিয়ার যোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা  রসকমনাডজর জানিয়েছে, ‘টেলিগ্রাম এখনো রুশ আইনের সমস্ত শর্ত পূরণ করেনি। তাই প্ল্যাটফর্মটির ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ আপাতত বহাল থাকবে। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সূত্র উদ্ধৃত করে রুশ সংবাদ সংস্থা ইন্টারফ্যাক্সজানিয়েছেচলতি বছরের শুরু থেকে টেলিগ্রামের বিরুদ্ধে ১০ কোটিরও বেশি রুবল জরিমানা করা হয়েছে। অভিযোগরাশিয়ায় নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন বিষয়বস্তু সরাতে ব্যর্থ হয়েছে সংস্থাটি। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানান, ‘টেলিগ্রাম’-এর ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে তাঁর দাবি, এ পর্যন্ত সংস্থার প্রতিনিধিরা রুশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় বিশেষ আগ্রহ দেখাননি।

পাভেল দুরভ দীর্ঘদিন ধরেই নিজেকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা  ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সমর্থক হিসেবে তুলে ধরেছেন। রাশিয়া ছাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবেও তিনি সরকারের কাছে ব্যবহারকারীদের তথ্য তুলে দিতে অস্বীকার করার ঘটনাকে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে, ভারত সহ বিভিন্ন দেশের সরকার ও নিরাপত্তা সংস্থার অভিযোগ, ‘টেলিগ্রাম’-এর তুলনামূলক শিথিল কনটেন্ট মডারেশন’-এর সুযোগ নিয়ে বহু জঙ্গি সংগঠনঅপরাধচক্রভুয়ো তথ্য ছড়ানো নেটওয়ার্ক   চরমপন্থী গোষ্ঠী সক্রিয়ভাবে এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে। ফলে, রাশিয়ার সাম্প্রতিক পদক্ষেপ সে বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলল। ডিজিটাল গোপনীয়তাজাতীয় নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে বিশ্বজুড়ে যে সংঘাত ক্রমশ গভীর হচ্ছেপাভেল দুরভ এবং টেলিগ্রাম’-কে ঘিরে নতুন আইনি লড়াই সেই বৃহত্তর সংঘাতেরই আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!