- এই মুহূর্তে স | হ | জ | পা | ঠ
- এপ্রিল ২১, ২০২৫
‘ওলো’ নতুন রং-এর অনুসন্ধান মার্কিন গবেষকদের
কয়েক লক্ষ বছর ধরে পৃথিবীতে বিচরণ করে, মানুষ হয়তো ভেবেছে যে তারা সবকিছুই দেখে ফেলেছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একদল বিজ্ঞানীর মতে, এমন এক রং-এর অস্তিত্ব আছে, যা মানব চোখ আগে কখনোই দেখেনি। নতুন রং-এর তাঁরা নাম রেখেছেন ‘ওলো’। ১৮ এপ্রিল ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ পত্রিকায় এই গবেষণার ব্যপারে বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ, এ পর্যন্ত মাত্র ৫ জন মানুষের ওই রংটি দেখবার সুযোগ ঘটেছে। ওই পরীক্ষায় গবেষকদের চোখে লেজার রশ্মি ছোড়া হয়। তাঁদের দাবি, নির্দিষ্ট কোষগুলিকে উদ্দীপ্ত করে, এই লেজার মানুষের স্বাভাবিক দৃষ্টির সীমা অতিক্রম করে ফেলে। অভিজ্ঞতাকারীরা নতুন রংকে ময়ূরের পালকের নীল বা টিল [প্রায় নীলাভ] রং-এর মতো বলে বর্ণনা করেছেন। তবে তারা উল্লেখ করেছেন, এই রং-এর স্যাচুরেশন বা ঘনত্ব ছিল ‘সীমার বাইরে’। তাঁরা বলেন, এই বর্ণনা আসল অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণতাকে কোনোভাবেই প্রকাশ করতে পারে না।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার রেন এনজি বলেছেন, ‘শুরু থেকেই অনুমান করেছিলাম এটি এক অভূতপূর্ব রং সংকেতের মতো হবে, কিন্তু মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে, তা জানতাম না। অভিজ্ঞতা ছিল একেবারে চমকে দেওয়ার মতো। এটি অবিশ্বাস্য রকম স্যাচুরেটেড।’ গবেষকরা চমকপ্রদ অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে, একটি ফিরোজা রং-এর স্কোয়ার ছবি শেয়ার করেছেন, যা এই নতুন রং ‘ওলো’র কাছাকাছি বলে মনে করা হচ্ছে। তবে তাঁরা জোর দিয়ে বলেছেন, এই রং শুধুমাত্র রেটিনাকে লেজার দ্বারা উদ্দীপিত করলেই অনুভব করা সম্ভব। গবেষণা দলের সাথে যুক্ত আরেক বিজ্ঞানী, অস্টিন রূরডা বলেন, ‘এই রং কোনো জিনিসে বা মনিটরে বোঝানো সম্ভব নয়। ব্যাপারটা হচ্ছে, এই রং আমরা সাধারণত যেটা দেখি, তেমনটা নয়। আমরা যেটা দেখি সেটা হলো এর একধরণের সংস্করণ, কিন্তু তা আসল অভিজ্ঞতার তুলনায় একেবারেই ফিকে।’
মানুষের চোখ রেটিনার রঙ-সংবেদনশীল কোষ ‘কন’-এর মাধ্যমে লাখ লাখ রং-এর শেড আলাদা করতে পারে। এই কোষ প্রধাণত তিন ধরনের হয়; এল বা লং, এম বা মিডিয়াম আর এস বা শর্ট, যারা যথাক্রমে দীর্ঘ, মধ্য এবং স্বল্প তরঙ্গদৈর্ঘ্যের প্রতি সংবেদনশীল। লাল আলো প্রধানত ‘এল’ কনকে উদ্দীপ্ত করে আর নীল আলো এস কনকে। ‘এম’ কনগুলো রেটিনার মাঝখানে থাকে। এমন কোনো প্রাকৃতিক আলো নেই যা কেবলমাত্র ‘এম’ কনকে উদ্দীপ্ত করতে পারে। এই পরীক্ষায়, গবেষকরা স্বেচ্ছাসেবীদের রেটিনা স্ক্যান করে প্রথমে তাঁদের ‘এম’ কনগুলোর অবস্থান চিহ্নিত করেন। এরপর একটি লেজারের সাহায্যে সেই কনগুলিতে সরাসরি আলোর ঝলকানি নিক্ষেপ করা হয়। যখন লেজার একটি ‘এম’ কনের উপর পৌঁছায় তখন সেটি ক্ষুদ্র আলোর সংকেত পাঠায়, এরপর সেটি পরবর্তী কনের দিকে এগোয়।
‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবেষনায় দেখা দেখা গেছে, পরীক্ষা চলাকালীন চোখের দৃষ্টিক্ষেত্রে পূর্ণিমার চাঁদের দ্বিগুণ আকারের একটি রঙিন প্যাচ তৈরি হয়। এই রংটি প্রাকৃতিক আলোর সীমার বাইরে, কারণ এটি শুধু ‘এম’ কনকে উদ্দীপ্ত করে, যা প্রাকৃতিক আলোতে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বিজ্ঞানীদের দেওয়া ‘ওলো’ নামটি এসেছে বিভাজন কোড ০১০ থেকে, যার মানে ‘এল’ এবং ‘এস’ বন্ধ, শুধু ‘এম’ সক্রিয়। তবে বিজ্ঞানীদের ওই পরীক্ষা আর চমকপ্রদ ফলাফলের দাবি সবাইকে সন্তুষ্ট করতে পারে নি। লন্ডনের সিটি সেন্টার সেন্ট জর্জ ইউনিভার্সিটির দৃষ্টি বিজ্ঞানী জন বারবার বলেছেন, ‘এটা কোনো নতুন রংই নয়। এটা কেবল অতিমাত্রার ঘনত্ব সম্পন্ন সবুজ, যা শুধুমাত্র ‘এম’ কন উদ্দীপ্ত হলে তৈরি হয়।’
গবেষকরা জানান, ‘ওজ ভিশন’ নামক একটি প্রযুক্তির সাহায্যে এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে দৃষ্টির সঙ্গে জড়িত মৌলিক প্রশ্নগুলির উত্তর দিতে সাহায্য করতে পারে। এই প্রযুক্তি চোখের নির্দিষ্ট কোষকে উদ্দীপ্ত করে অন্ধত্ব বা রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসার মতো রোগ নিয়ে নতুন গবেষণার দরজা খুলে দিতে পারে। তাঁদের যখন প্রশ্ন করা হয়, মানুষ কি দৈনন্দিন জীবনে এই রং দেখতে পারবে? গবেষকদের উত্তর ছিল স্পষ্ট ‘না’। তাঁরা বলেন, ‘এটা একটা মৌলিক গবেষণা, আমরা এই রংকে কোনো স্মার্টফোন বা টিভি স্ক্রিনে দেখতে পাব না। কারণ এটা বর্তমান ভার্চুয়াল রিয়েলিটি প্রযুক্তির অনেক, অনেক এগিয়ে থাকার বিষয়, নাগালের বাইরের বিষয়।’
❤ Support Us






