- এই মুহূর্তে দে । শ
- মে ২১, ২০২৫
মুর্শিদাবাদ হিংসা নিয়ে আদালত নিযুক্ত কমিটির রিপোর্ট পেশ, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন
মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানে, সংশোধিত ওয়াকফ বিলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ঘটা সহিংসার ঘটনায় কলকাতা হাইকোর্টের নিযুক্ত ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটির রিপোর্ট ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে । রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১১ এপ্রিল ধুলিয়ানে দুষ্কৃতী হামলার সময় ‘স্থানীয় পুলিশ সম্পূর্ণরূপে নিষ্ক্রিয় এবং অনুপস্থিত’ ছিল । শুধু তাই নয়, রিপোর্টে স্থানীয় তৃণমূল কাউন্সিলর মেহবুব আলমের নাম সরাসরি উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘এই হামলা পরিচালনা করেছিলেন স্থানীয় কাউন্সিলর মেহবুব আলম ।’ এমনকি তিনি নিজে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে, মুখ ঢাকা একদল মানুষ নিয়ে হামলায় অংশ নেন ।
রিপোর্ট অনুযায়ী, ১১ এপ্রিল বিকেলে ধুলিয়ানে একাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দোকানে হামলা চালানো হয় । ঘোষপাড়ার ২৯টি দোকান ভাঙচুর হয়, একটি শপিং মল পুরোপুরি লুট করা হয়, বন্ধ করে দেওয়া হয় । একটি দোকান ভেঙে ১২,০০০ থেকে ১৩,০০০ টাকা লুট করা হয় । হামলার সময় এলাকার বিধায়কও সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে । তবে তিনি শুধু ঘটনাস্থল দেখে চলে যান, কোনোরকম হস্তক্ষেপ করেননি। ১২ এপ্রিল, শনিবারেও একইরকম হামলা চলেছিল । আতঙ্কগ্রস্ত মানুষজন পুলিশকে ফোন করেও কোনো সহায়তা পাননি বলে অভিযোগ ।
চাঞ্চল্যকর এ রিপোর্ট হাইকোর্টে জমা দিয়েছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের রেজিস্ট্রার জগিন্দর সিং, পশ্চিমবঙ্গ আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষের সদস্য সচিব সত্য অর্ণব ঘোষাল ও পশ্চিমবঙ্গ বিচার বিভাগীয় পরিষেবার রেজিস্টার সৌগত চক্রবর্তী-এর সমন্বয়ে গঠিত কমিটি । গত ১৭ এপ্রিল বিচারপতি সৌমেন সেন ও বিচারপতি রাজা বসু চৌধুরীর ডিভিশন বেঞ্চ এই কমিটি গঠন করেন । মঙ্গলবার রিপোর্ট হাতে পাবার পর আদালত জানায়,’কমিটি তার রিপোর্টে বলেছে যে, রাজ্যসরকার রাজ্যের একাংশ নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে । এই পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র প্রশিক্ষিত মূল্যায়ন বিশেষজ্ঞদের নিযুক্ত করাই এখন একমাত্র কার্যকর সমাধান ।’ হিংসায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার জন্য এই কমিটি বিশেষ ভূমিকা নিতে পারে বলে মত বিচারকদের । ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে গত সপ্তাহে ওই রিপোর্ট আদালতে জমা দিয়েছে কমিটির সদস্যরা । এদিন, হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ‘ক্ষতিগ্রস্তদের স্থাবর-স্থাবর সম্পত্তি ও জীবনযাপনের স্বাভাবিকতায় যে ক্ষতি হয়েছে, তা যেন যথাযথভাবে পূরণ করা হয় ।’ আদালতের পর্যবেক্ষণ, ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্পে প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ১.২০ লক্ষ টাকা দেওয়া হলেও সবক্ষেত্রে তা ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নাও হতে পারে । কারণ ক্ষতির পরিমাণ একধরণের নয় ।
হাইকোর্টের বিচারপতি সৌমেন সেন আর বিচারপতি রাজা বসু চৌধুরীর ডিভিশন বেঞ্চ, নির্দেশে আরো বলেছেন, স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী ওই অঞ্চলে একটি স্থায়ী বিএসএফ শিবির স্থাপন নিয়ে রাজ্য সরকার যেন বিবেচনা করে । পাশাপাশি, ঘটনার নেপথ্যে থাকা অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি আনতে স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিমকে তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে । এই রিপোর্ট সম্পর্কে তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র জয় প্রকাশ মজুমদার বলেন, ‘আমরা এ ধরনের কোনো রিপোর্টের কথা জানি না । সুতরাং এই বিষয়ে আমি কোনোরকম মন্তব্য করতে চাই না ।’
অন্যদিকে, একটি পৃথক রিপোর্টে পশ্চিমবঙ্গ সরকার জানিয়েছে, ৪ এপ্রিল থেকে জঙ্গিপুর পুলিশ জেলার সব থানা এলাকায় ওয়াকফ সংশোধনী আইন নিয়ে প্রতিবাদ শুরু হয় । ৮ এপ্রিল থেকে তা হিংসার রূপ নেয় । ৮ থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত চলা সহিংস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ১১ এপ্রিল সামসেরগঞ্জে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়, ১২ এপ্রিল হাইকোর্টের নির্দেশে আরো সিএপএফ পাঠানো হয় । মুর্শিদাবাদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাসক-বিরোধী রাজনৈতিক চাপানউতোর তীব্র । সিপিআইএম-এর রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম ও কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়েছেন, দুর্গতদের সাথে কথা বলেছেন । সরকার ও পুলিশ-প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তাঁরা । তাঁদের অভিযোগ, এই হামলা পূর্ব-পরিকল্পিত এবং প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবেই নিষ্ক্রিয় ছিল । রাজনৈতিক অভিযোগের মধ্যে, বিশেষ কমিটির তদন্ত রিপোর্ট ও আদালতের পর্যবেক্ষণ, রাজ্য প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তুলছে । রাজ্য সরকার কিংবা প্রশাসন আদৌ সঠিক পথে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে পারবে কি না, তা সময়ই বলবে ।
উল্লেখ্য, ৮ থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর মহকুমায় সংশোধিত ওয়াকফ বিলের প্রতিবাদ ঘিরে হিংসা ছড়িয়ে পড়ে । ৩ জন নিহত হন, যার মধ্যে ১২ এপ্রিল সামসেরগঞ্জের জাফরাবাদে এক মর্মান্তিক ঘটনার খবর পাওয়া যায় । ‘জনতা’র আক্রমণে প্রাণ হারান হরগোবিন্দ দাস ও তাঁর ছেলে চন্দন দাস । পরিবার জানিয়েছে, পুলিশ প্রথমে ফোন ধরেনি, পরে এলেও কার্যত কিছু করেনি । এই রিপোর্টে বাবা-ছেলের খুনের পিছনে ‘উন্মত্ত জনতা’ আর ‘দুষ্কৃতীদের’ দায়ী করা হয়েছে । এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ বিষয়ে রাজ্য সরকার বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি ।
❤ Support Us






