Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • মার্চ ৩১, ২০২৬

স্কুল-হোস্টেলে চলছে ক্লাস, নেই স্থায়ী শিক্ষক : বাংলার নতুন ১১ বিশ্ববিদ্যালয় গভীর সংকটে

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
স্কুল-হোস্টেলে চলছে ক্লাস, নেই স্থায়ী শিক্ষক : বাংলার নতুন ১১ বিশ্ববিদ্যালয় গভীর সংকটে

সরকারি ঘোষণায় ছিল বিশ্বমানের স্বপ্নবাস্তবে অস্থায়ী ঘরে টিকে থাকার লড়াই। রাজ্যের নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলির এমনই সকরুণ ছবি। দুলতে থাকা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের গল্প। টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাস নেইএকটিতেও স্থায়ী শিক্ষক নেইঅধিকাংশ জায়গায় গেস্ট লেকচারারদের উপর ভরসা, এমনই অবস্থা রাজ্যের ১১টি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের।

২০১৭-১৮ সালে একের পর এক নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বলেছিলেনবাংলার ছাত্রদের আর শিকাগো বা হার্ভার্ডে’ ছুটতে হবে নাএ রাজ্যেই তৈরি হবে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়।  লক্ষ্য ছিল উচ্চশিক্ষার প্রসারজেলার ছাত্রছাত্রীদের সুযোগ বৃদ্ধি এবং বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। কিন্তু প্রায়  বছর পর, সে স্বপ্ন ভেঙে পড়ছে তাসের ঘরের মতো। দার্জিলিং থেকে বীরভূমহাওড়া থেকে ঝাড়গ্রাম জেলাগুলিতে চালু হওয়া ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশই এখনো নিজস্ব জমিতে দাঁড়াতে পারেনি

দেখা গিয়েছেএই ১১টির মধ্যে টি বিশ্ববিদ্যালয় এখনো চলছে অস্থায়ী ঠিকানায়— কখনো স্কুলের ঘরেকখনো কলেজের বারান্দায়আবার কোথাও বা হোস্টেলের পরিত্যক্ত কক্ষে। কোথাও স্থায়ী ক্যাম্পাসের কাজ শুরুই হয়নিকোথাও বা শুরু হয়ে থমকে রয়েছে।  সবচেয়ে বড় সংকট শিক্ষক নিয়োগে। একটিও বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী অধ্যাপক নেই। সমস্ত শিক্ষাব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে গেস্ট লেকচারারদের উপরযাঁরা ইউজিসি নির্ধারিত ক্লাসপিছু ৫০০ টাকায় পড়ান। ফলে একদিকে যেমন শিক্ষার ধারাবাহিকতা প্রশ্নের মুখেঅন্যদিকে গবেষণা, অ্যাকাডেমিক পরিকল্পনা বা দীর্ঘমেয়াদি পাঠক্রম গড়ে ওঠার পরিবেশই তৈরি হচ্ছে না।

দক্ষিণ দিনাজপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি দগদগে ঘায়ের মতো। ২০২১ সালে যাত্রা শুরু। প্রথমে ভাড়া বাড়িপরে কলেজতারপর হোস্টেলএভাবেই জায়গা বদল করে চলছে ক্লাস। টি বিষয়ে স্নাতকোত্তর পাঠক্রম থাকলেও ছাত্রসংখ্যা ক্রমশ কমছে। ড্রপআউটের হারও উদ্বেগজনক। নির্দিষ্ট ক্যাম্পাসের জন্য জমি থাকলেও সেখানে এখন গরু চরছেঅভিযোগ স্থানীয়দের। উত্তর ২৪ পরগনার ঠাকুরনগরে হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থাও প্রায় একই। স্কুল ও কলেজের ঘরেই চলছে পাঠদান। লাইব্রেরি বা গবেষণাগারের অভাব স্পষ্ট। ছাত্রদের অভিযোগপরিকাঠামোর সীমাবদ্ধতায় শিক্ষা কার্যত ম্যানেজ’ করেই এগোতে হচ্ছে।

হাওড়ার হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভবন তৈরি হলেও সেখানে এখনো স্থানান্তর হয়নি। কারণরক্ষণাবেক্ষণের খরচ। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় চলছে এক পুরনোপরিত্যক্ত পুরসভার ভবনেযেখানে না রয়েছে পর্যাপ্ত নিরাপত্তানা পর্যাপ্ত সুবিধা। হুগলির সিঙ্গুরে রানি রাসমণি গ্রিন বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা নদিয়ার কন্যাশ্রী বিশ্ববিদ্যালয়দুটিতেই একই সমস্যা। জমি রয়েছেবরাদ্দও হয়েছেকিন্তু কাজ এগোয়নি। মেয়েদের জন্য বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয় হলেও কন্যাশ্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে হোস্টেল নেইফলে বহু ছাত্রীকে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে। মহিষাদলের মহাত্মা গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয়ও চলছে কলেজ ভবনের অংশে। স্থায়ী পরিকাঠামো না থাকায় নতুন বিভাগ বা গবেষণার ক্ষেত্র গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ছে। পাহাড়েও উদ্বেগের বাতাবরণ। দার্জিলিং হিল ইউনিভার্সিটিপাহাড়ে উচ্চশিক্ষার একমাত্র নতুন প্রতিষ্ঠান, ঘোষণার ৪ বছর পরেও নির্মাণের প্রাথমিক স্তরেই আটকে। আইটিআই ভবনে চলছে ক্লাস। ছাত্রসংখ্যা ওঠানামা করছেমাঝখানে এক বছর ভর্তি বন্ধও ছিল।

অবশ্য ব্যতিক্রমও রয়েছে। ঝাড়গ্রামের সাধু রামচাঁদ মুর্মু বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৭ একরের ক্যাম্পাস তৈরি হয়েছে। ক্লাসরুমহোস্টেলপ্রশাসনিক ভবনসবই রয়েছে। কিন্তু সেখানেও স্থায়ী শিক্ষক নেই। বোলপুরের বিশ্ব বাংলা বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক ভবন থাকলেও ছাত্রসংখ্যা প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। কর্তৃপক্ষ বলছেনপ্রচারের অভাব এর পিছনে কারণ। অন্যদিকেআলিপুরদুয়ার ও মুর্শিদাবাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি পুরনো কলেজ থেকে গড়ে ওঠায় কিছুটা সুবিধা পেয়েছে। যদিও সেখানেও অধ্যাপক, কর্মচারীর স্থায়ী পদ সৃষ্টি হয়নি এখনো, ফলে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা আটকে রয়েছে।

নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চরম সংকটের পিছনে প্রশাসনিক জট অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদদের একাংশ। ২০২৩-২৪ সালে রাজ্যপাল ও রাজ্য সরকারের মধ্যে সংঘাতের জেরে উপাচার্য নিয়োগ ও আইনি স্বীকৃতি প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন আটকে ছিল। পরে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে সে জট কাটলেওততদিনে অনেক কাজ থমকে যায়। বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার উপরেও চাপ বাড়ছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছেরাজ্যের সরকারি কলেজগুলিতে ৭০ শতাংশের বেশি স্নাতক আসন ফাঁকা থেকে যাচ্ছে। ছাত্রছাত্রীরা ক্রমশ অন্য রাজ্যে বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চলে যাচ্ছেযা এই নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

অর্থ বরাদ্দ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। শিক্ষাখাতে বরাদ্দ জাতীয় গড়ের কাছাকাছি হলেওসাম্প্রতিক সময়ে তার অনুপাত কমেছে। ফলে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পরিকাঠামো গড়ে তোলাস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ বা গবেষণা উন্নয়নসবই অনিশ্চয়তার মধ্যে। সব মিলিয়েকাগজে-কলমে বিশ্বমানের’ স্বপ্ন দেখানো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেশিরভাগই এখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অসম লড়াইয়ে ধুঁকছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকাঠামোশিক্ষক নিয়োগ ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতাএই তিন ক্ষেত্রে সরকারের তরফে দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া হলে হলে, বাংলায় উচ্চশিক্ষার বিস্তারের স্বপ্ন অধরাই রয়ে যাবে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!