- গ | ল্প
- ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২২
লর্ড
চিত্র: দেব সরকার ।
—এখন ক’দিন আর এসো না। বোগেনভিলিয়া বড় হয়ে পাঁচিল ছাপিয়ে রাস্তায় নেমে পড়লে এসো। রাখি তাহলে?
সে প্রতিদিন বারান্দায় বসে গাছের দিকে তাকিয়ে থাকে আর ভাবে এই গাছের নাম নিশ্চিতভাবে বিরহ। হাওয়া আসে, পাতারা দুলে ওঠে। প্রজাপতি আসে না।
রান্নাঘরে চলে যায় সে। একা মানুষ। একার রান্না। ভাতে ভাত করে খাবে যতদিন না এই গাছ বড় হয়ে পাঁচিল ছাপিয়ে রাস্তায় গিয়ে পড়ে। তারপর রেহানা আসবে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাড়িটির দিকে সম্ভ্রম নিয়ে তাকিয়ে থাকার পর গেটে এসে টিনের তোরণ টোকা দিয়ে বলবে, জুলু বাড়ি আছে? সেদিন তারা মৌরলা মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খাবে।
ফোন বাজতে শুরু করে।
সে ফোন ধরতে ওপার থেকে সোহিনীর গলা শোনা যায়। সোহিনী তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের গল্প। সোহিনী বলে, জুলু একটা ফোন নম্বর জোগাড় করে দিতে পারবি? আমার এক বন্ধুর গবেষণার কাজে লাগবে।
—কার নম্বর বল।
—সন্দীপ মিত্রের। ওঁর সংগ্রহশালা কবে খুলবে জানাটা খুব দরকার।
—দেখছি।
সোহিনী ফোন রেখে দেয়। তার বর ব্যাঙ্কের বড় কর্তা। অফিসে বেরবেন। তদারক করতে হবে সোহিনীকে। খাওয়া থেকে তাঁর জামা, টাই বেছে দেওয়া, সবই তো সোহিনীর দায়িত্ব। তাছাড়া, এই কাজ সে করতে ভালোই বাসে।
পাবদা মাছের ঝোল হয়েছে। বরকে সবচেয়ে বড় মাছটা তুলে দিতে দিতে সোহিনী বলে, কী গো, রান্না ঠিক আছে?জুলু সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। অধ্যাপক নলিনী হালদারের কাছে থাকতে পারে সন্দীপবাবুর নম্বর। দুর্গাপুজো হয়ে গেছে। শরৎ পেরিয়ে হেমন্তের খুকু শীতের দিন। সে সাইকেলের প্যাডেল ঘুরিয়ে যায়। ২৫ মিনিটের পথ। তা হোক। যেতে তো তাকে হবেই। সোহিনী বলেছে।
অধ্যাপক নলিনী বাড়িতে নেই। কোনও এক বন্ধুর বাড়িতে চলে গিয়েছেন সকালেই। ফিরবেন রাতে। অধ্যাপকের প্রাসাদের মতো বাড়ির বাইরে একটা বেশ মোটা মাদী কুকুর পাতলা রোদে গা এলিয়ে দিয়ে শুয়ে রয়েছে। দুধের ভারে তার স্তন ফুলে রয়েছে বড় জাতের পদ্মফুলের কুঁড়ির মতো। কুকুরছানারা অদূরে প্লাস্টিকের খালি প্যাকেট নিয়ে খেলা করছে। ভুলে গেছে জননীর কথা। কোথা থেকে একটা রোগাসোগা বেড়াল এসে আধঘুমন্ত কুক্কুরীর বাঁটে মুখ দিয়ে দুধ পান করছে। চোখ মেলে সেই কুকুর একবার দেখল কে তার সন্তানের খাদ্যে ভাগ বসায়। ভালো করে দেখল বেড়ালকে। এই ছবি আগে দেখিনি, চোখ বন্ধ করে আবার ঘুমিয়ে পড়ার মতো শুয়েই থাকল কুকুরটা। ব্যবহৃত হতে দেয় নিজেকে, গতজন্মের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে, করুণা করে নিজেকে। সেই লোকের গল্প মনে পড়ে, যে প্রতি রাতে মদ খেয়ে বাড়িতে এসে বউকে বলতো ‘আমাকে পেটাও’ ‘আমার মুক্তি নেই’ ‘আমি জাহান্নামের গন্ধ পাচ্ছি’। সে যত এই ধরনের দাবি করত তত আদর করে ভাত মেখে মুখে ঠুসে দিত তার বউ। এক পর্যায়ে বউকে মা সম্বোধন করে সেই লোক ঘুমিয়ে পড়ত। এই গল্প কেন মনে পড়ল বোঝা যাচ্ছে না।
সেখান থেকে সাইকেল নিয়ে সে কবি সর্বজিতের বাড়ির দিকে রওনা হয়। আধঘন্টার পথ। তা হোক। যেতে তো তাকে হবেই। সোহিনী চেয়েছে।
বাড়িতে মৌরলা মাছ আছে। খেতে ইচ্ছে করছে না জুলুর। সে এবার শাকাহারী হয়ে যেতে পারে যে-কোনও দিন। কুকুরের দুধ খাবে শীর্ণ বেড়ালের মতো হয়ে।
সোহিনীর বর তৃপ্তিভরে খেয়ে উঠে বিছানায় একটু আরাম করছেন। সোহিনী তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, বিলি কেটে দিচ্ছে চুলে, কপালে একটা দুটো চুমু খাচ্ছে। এসি কমানোই রয়েছে। কয়েক মিনিট পরে বর বললেন, আজ আর তিনি অফিসে যাবেন না। বলেই সোহিনীকে জড়িয়ে ধরে উপুড় হলেন। এসি কমানোই।
কবির বাড়িতে কলিং বেল দিতে বেরিয়ে এলেন তিনি, আরে জুলু, এসো এসো। কতদিন পরে এলে।
জুলুকে নিয়ে গিয়ে বসালেন সোফায়। তারপর বললেন, এখনও লিখছো ? কোনও পত্রিকায় আর তোমার কবিতা দেখি না।
—সর্বজিৎদা, আরেকদিন এসে গল্প করব, আজ আমার একটা নম্বর দরকার। খুবই দরকার।
—কার নম্বর গো?
—সন্দীপ মিত্রের। আছে?
—ডায়েরিতে দেখতে হবে। আচ্ছা, তুমি একটু বসো, আমি ডায়েরিতে খুঁজে দেখি। আর হ্যাঁ, বসেই যখন থাকবে তখন আমার এই দীর্ঘ কবিতাটা একটু কপি করে দাও না। এক সম্পাদক চেয়েছেন। কি, পারবে না?
—করে দিচ্ছি, আপনি দেখুন।
৫ পাতার একটা কবিতা কপি করতে থাকে জুলু।
রতিক্লান্ত সোহিনী বরের বুকে মাথা রেখে শুয়ে শুয়ে আদুরে গলায় বলে, তুমি কিন্তু খুব দুষ্টু হয়ে যাচ্ছ দিন দিন। আমার ব্যথা করে না বুঝি ? অত জোরে চাপ দেয় ? নতুন হেল্থ ড্রিঙ্কটা খেয়ে তোমার জোর বেড়ে গেছে। হাত সরাও, উঠি। শাড়ি ঠিক করতে হবে। কাজের মেয়ে এসে যাবে। কী হল, সরাও।
বিছানা থেকে উঠে কম্পিউটারে গান চালিয়ে দেয় সোহিনী। তার ভীষণ ভালো লাগছে এই সময়টা। ভাত বেড়ে পাবদার ঝোল মেখে খেতে খেতে গান শোনে সোহিনী।
—না গো জুলু, আমার কাছে সন্দীপ মিত্রের নম্বর নেই।
—আচ্ছা।
—তোমাকে দু’জনের নম্বর দিচ্ছি। কল করে দেখো। এদের কাছে থাকলেও থাকতে পারে।
সেই দু’জনের নম্বর আনতে আবার তিনি ভেতরে চলে গেলেন। ফিরলেন প্রায় ২০ মিনিট পর।
—এই নাও, এই কাগজে নম্বর দুটো লিখে দিলাম।
—অনেক ধন্যবাদ।
—কবিতাটা কপি করা হয়ে গেছে?
—হ্যাঁ, দাদা।
আবার সাইকেল। আবার বাড়ি ফিরে আসা। হেমন্তকাল তাকে অনেকটা ঘাম উপহার দিয়েছে। ঘেমো হাতে সে ফোন করতে থাকে এক এক করে। প্রথমজনের কাছে সন্দীপবাবুর নম্বর নেই। ৩ বার ডায়াল করার পর দ্বিতীয়জন কল রিসিভ করলেন। তাঁর কাছে নম্বর আছে। খুব আনন্দ হল জুলুর। সোহিনীকে তাহলে সে শেষ পর্যন্ত হেল্প করতে পারবে। বাহ্, এই তো জীবন।
কিছুক্ষণ পরে নম্বরটি দিয়ে তিনি বললেন, এই নম্বর অনেকদিন আগে সন্দীপদা ব্যবহার করতেন। এখন নম্বর পাল্টেছেন কিনা তাঁর জানা নেই। একবার কল করে দেখে নিলে ভালো।
‘আচ্ছা, ধন্যবাদ ‘, বলে ফোন রাখল সে।আজ তো অফিসে গেলে না, শপিংয়ে গেলে কেমন হয়? বরের গলা জড়িয়ে ধরে সোহিনী। তার মেকাপের জিনিস ফুরিয়ে এসেছে, নতুন ম্যাক্সির বিজ্ঞাপন তার চোখ টেনেছে খুব, গোটা দুয়েক লেগিংস কেনা দরকার, ফর্দ তৈরি হতে থাকে সোহিনীর মুখে মুখে। তার মুখটা দুই হাত দিয়ে উঁচু করে ধরে ঠোঁটে গভীর করে একটা চুমু খেয়ে বর বলেন, সব হবে। রেডি হয়ে নাও। গাড়ি বের করতে হবে।
স্নানঘরে ঢোকে সোহিনী। শাওয়ার ছেড়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে তার দিকে মুখ তুলে রাখে। শান্তি, কী শান্তি! এই তো জীবন।
স্নান সেরে বেরিয়ে মেকাপে বসে সোহিনী। ফোন বেজে ওঠে।
জুলুর ফোন।
—পেয়েছিস নম্বরটা?
—হ্যাঁ, লিখে নে।
—খুব চিন্তায় ছিলাম রে। কী যে বলি তোকে!
—রাখছি তাহলে।বোগেনভিলিয়ায় বেশি জল দিতে হয় না। ভাঙা বালতিতে বসানোর সময় নিচে হাফ ইঞ্চি নুড়িপাথর দিতে হয়েছে যাতে জল না জমে। তার ওপর মাটির পাতলা লেয়ার, তার ওপর গাছ। চারধারে মাটি। শেকড়ের কথাও তো ভাবতে হবে। এই গাছ একদিন বড় হয়ে রাস্তায় চলে যাবে। সে তখন সবার হয়ে যাবে। কেবলমাত্র তার আর থাকবে না। তবে সে সুন্দর হয়ে ছড়িয়ে পড়লে রেহানা আসবে। ভাতে ভাত করে খেয়ে চলে যাবে রেহানা, যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহিনী ছেড়ে চলে গিয়েছে তাকে।
বাড়িতে মৌরলা মাছ আছে। খেতে ইচ্ছে করছে না জুলুর। সে এবার শাকাহারী হয়ে যেতে পারে যে-কোনও দিন। কুকুরের দুধ খাবে শীর্ণ বেড়ালের মতো হয়ে।
যে বন্ধু বোগেনভিলিয়ার চারা দিয়েছিল সে বলেছিল, এই গাছ পাতায় পাতায় ভরে যাবে, কিন্তু ফুল হবে না।
ফুল ফোটানোর যোগ্যতা সবার থাকে না, যেমন জুলুর নেই।
ফোন বাজছে। রেহানার ফোন।
—তুমি আর কখনও আসতে পারবে না, তাই তো?
—কী আশ্চর্য! বুঝলে কী করে?
—উঠোন থেকে আমার বোগেনভিলিয়ার চারাটা চুরি হয়ে গিয়েছে।
—কে চুরি করল?
—কোনও এক সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।
—তিনি চুরি করতে যাবেন কেন তোমার গাছ?
—জানি না, হয়ত গাছটাই তাঁর সঙ্গে চলে গেছে।
—মানে?
—এর মানে জুলুরা জানে কিন্তু বলার অধিকার নেই কারণ তাদের একটা করেই বোগেনভিলিয়া থাকে আর যারা নিয়ে যায়, তাদের অনেক। জায়গাও বড়, পর্যাপ্ত জল-হাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এই গাছের জন্মই হয় একদিন সেই উদ্যানের শোভা বাড়ানোর জন্যে।
—এত বানিয়ে বানিয়ে কথা বলছ কেন?
জুলু ফোন রেখে দিয়ে দেওয়ালের পারিবারিক ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে। দিঘার সমুদ্র সৈকতের ছবি। ছোট একটা ঘোড়ায় সে বসে আছে। ঘোড়ার লাগাম হাতে একদিকে বাবা, আরেকদিকে সস্তা শাড়ি পরা মাথায় কাপড় দেওয়া মা। পেছনে সূর্যাস্ত হচ্ছে। আকাশ রক্তের সম্পর্কের মতো লাল।
পেশাদার ক্যামেরাম্যানের কথা মনে পড়ল তার। শাটার টেপার আগে বলেছিলেন, হাসুন।
জুলু কেঁদে ফেলেছিল। তখন তার বয়স কত হবে—এগারো কি বারো। বঙ্গোপসাগরের তীরে এক শিশুর ভাগ্য লেখার খেলা চলছিল হয়ত সেদিন, উদাসীনতাবশত কেউ খেয়াল করেনি।
ধীরে ধীরে সূর্য ডুবে গেলে মালিক তার ঘোড়া নিয়ে চলে যায়। ঘোড়ার পিঠে কয়েক মিনিট চাপার আনন্দে শিশুটা শুধু ভেবেছিল, ওই ঘোড়া তার।বিশাল বিপুল সমুদ্রের ধারে এমন অনেক কিছুই ঘটে থাকে। এসবের কোনও আর্কাইভাল ভ্যালু নেই। দিঘাও জানে, সমস্ত শিশুর আহ্লাদ মেটানো যায় না। অনুচ্চ ঢেউ তাই অনুচ্চ কান্নার মতো বালি-পাথরের কর্কশ মুখে আহত হয়ে ফিরে যায়। শিশুরা যুবক হয়ে একদিন তার ইশারা বুঝবে, এই আশায় প্রতি সন্ধ্যায় সূর্যকে গলাধঃকরণ করে লাল হয়ে ওঠে।
ছবি থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেয় জুলু। বারান্দায় গিয়ে লোহার গ্রিল ধরে বসে। উঠোন ফাঁকা। প্রজাপতি আসেনি, একটা গঙ্গাফড়িং লাফিয়ে লাফিয়ে কিছু খুঁজছে। তার কোনও গন্তব্য নেই। লাফিয়ে যাওয়াই ধর্ম।
♦↔♦
❤ Support Us








