- এই মুহূর্তে দে । শ
- জানুয়ারি ১৫, ২০২৬
ন্যানোর পর ফের ‘অনিচ্ছুক’ সিঙ্গুর! প্রধানমন্ত্রীর সভার জন্য সম্মতি ছাড়া জমি ব্যবহারের অভিযোগ
ইতিহাস এখানে সশব্দ, প্রায় দুই দশক আগের ক্ষত, স্মৃতি ও রাজনৈতিক অভিঘাত আবার নড়েচড়ে উঠল হুগলির সিঙ্গুরে। টাটা মোটরসের ন্যানো প্রকল্প ঘিরে যে জমি একদিন শিল্পায়ন বনাম কৃষক অধিকারের প্রতীক হয়ে উঠেছিল, সেই একই জমি আবার বিতর্কের কেন্দ্রে। এ বার কারণ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জনসভা।
আগামী ১৮ জানুয়ারি, রবিবার, সিঙ্গুরের পরিচিত ‘টাটার মাঠে’ জনসভা করার কথা প্রধানমন্ত্রীর। সভার প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই অনেক দূর এগিয়েছে। মাঠের একাংশে মাথা তুলেছে বিশাল ইস্পাতের ‘হ্যাঙার’। সারি সারি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকা দোচালা ছাউনির কাঠামো, তার উপর পুরু সাদা ত্রিপলের আচ্ছাদন। প্রধানমন্ত্রীর মঞ্চের পাশাপাশি দর্শকাসনও থাকছে সে ছাউনির নীচে। নিরাপত্তার খাতিরে বসানো হচ্ছে সিসিটিভি ক্যামেরা, তৈরি করা হচ্ছে হেলিপ্যাড। সব মিলিয়ে প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা প্রস্তুতি চোখে পড়ার মতো। কিন্তু এমন ‘যুদ্ধপ্রস্তুতি’র মাঝেই নতুন করে অস্বস্তি ছড়াল জমি সংক্রান্ত অভিযোগে। সিংহের ভেড়ি এবং গোপালনগর মৌজার একাধিক জমি মালিক অভিযোগ তুলেছেন, তাঁদের সম্মতি ছাড়াই সভার জন্য জমি ব্যবহার করা হচ্ছে। জমির মালিকদের দাবি, কোনো মৌখিক বা লিখিত অনুমতি না নিয়েই তাঁদের জমিতে সভার প্রস্তুতি চলছে। অভিযোগ জানিয়ে তাঁরা সিঙ্গুরের ব্লক উন্নয়ন আধিকারিকের কাছে লিখিত আবেদন জমা দিয়েছেন। অভিযোগপত্রে জমির দাগ ও খতিয়ান-সহ বিস্তারিত বিবরণ উল্লেখ করে তাঁরা লিখেছেন, টাটা প্রকল্পের জমিতে প্রধানমন্ত্রীর সভা অনুষ্ঠিত হতে চলেছে, অথচ জমির মালিক হিসেবে তাঁদের কাছ থেকে কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। এই বিষয়কে তাঁরা অন্যায় ও বেআইনি বলে উল্লেখ করে প্রশাসনের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে চাপানউতোর শুরু হয়েছে। সিঙ্গুরের বিধায়ক তথা রাজ্যের কৃষি বিপণনমন্ত্রী বেচারাম মান্না সরাসরি বিজেপির বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন। সিঙ্গুরে সাংবাদিক বৈঠকে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সভা হলেও জমির মালিকদের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে সে নিয়ম মানা হয়নি। তাঁর দাবি, গোপালনগর মৌজার একাধিক জমির মালিক ইতিমধ্যেই বিডিও এবং পুলিশ প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন। কৃষকদের দেওয়া অভিযোগপত্রের প্রতিলিপি সাংবাদিকদের হাতে তুলে দিয়ে তিনি বলেন, ‘সিঙ্গুর গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষের মাটি। এখানে অনেক রাজনৈতিক নেতা আসেন, সভা করেন। কিন্তু নিয়ম ভাঙার অধিকার কারও নেই, প্রধানমন্ত্রীরও নেই।’ বেচারামের বক্তব্যে সিঙ্গুরের অতীতের স্মৃতিও ফিরে আসে। তিনি বলেন, ‘এক সময় এই মাটিতেই জমি রক্ষার আন্দোলন হয়েছিল। আজ সে মাটিতে জমির সম্মতি ছাড়া সভা আয়োজনের অভিযোগ উঠছে, যা দুর্ভাগ্যজনক।’
তবে বিজেপি এই সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির তরফে প্রধানমন্ত্রীর সিঙ্গুর সভার আয়োজনের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে এসপিজি-সহ সমস্ত নিরাপত্তা সংক্রান্ত বৈঠক ইতিমধ্যেই হয়ে গিয়েছে। এটি একটি সরকারি অনুষ্ঠান এবং প্রয়োজনীয় সব অনুমতি জেলা প্রশাসন দিয়েছে। তাঁর দাবি, এই ধরনের অভিযোগ নিম্নস্তরের রাজনীতি ছাড়া কিছু নয়। সিঙ্গুরের স্থানীয় বিজেপি নেতা সঞ্জয় পান্ডেও একই সুরে কথা বলেন। তাঁর বক্তব্য, যে কেউ মিথ্যা অভিযোগ করতেই পারে। তার আইনগত মোকাবিলা করার পথ রয়েছে। তাঁরা এ বিষয়ে চিন্তিত নন। তবে নয়া বিতর্কের মধ্যেই সিঙ্গুরে আবার ঘুরে ফিরছে পুরনো ইতিহাস। ২০০৬ সালে টানা সপ্তমবার ক্ষমতায় ফিরে বামফ্রন্ট সরকার সিঙ্গুরে টাটা মোটরসকে ন্যানো কারখানা গড়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। প্রায় এক হাজার একর উর্বর জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা করা হয়। তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুরু থেকেই সেই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। তিনি আন্দোলনে নামেন, অনশন করেন, জমি রক্ষার প্রশ্নে রাজ্যের রাজনীতি উত্তাল হয়ে ওঠে।
২০০৮ সালের অক্টোবরে সেই আন্দোলনের আবহেই টাটা গোষ্ঠীর তৎকালীন কর্ণধার রতন টাটা ঘোষণা করেন, সিঙ্গুর থেকে প্রকল্প সরিয়ে গুজরাতের সানন্দে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ন্যানো কারখানা। তখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নরেন্দ্র মোদি। সিঙ্গুরে নেমে আসে স্তব্ধতা। প্রায় হাজার একর জমি পড়ে থাকে অনাবাদি অবস্থায়। সে জমিই পরে ‘টাটার মাঠ’ নামে পরিচিতি পায়। প্রায় সাড়ে সতেরো বছর পরে সেই মোদি এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি আবার আসছেন সেই সিঙ্গুরে, সেই টাটার মাঠে। আর তাঁর সভাকে ঘিরেই ফের সামনে চলে এসেছে শিল্পায়ন, জমি ও কৃষকের সম্মতির প্রশ্ন।
একদিকে বিজেপির দাবি, সিঙ্গুরে এক সময় শিল্পের বড়ো সুযোগ নষ্ট হয়েছিল রাজনৈতিক আন্দোলনের কারণে। যে মমতা ব্যানার্জি সিঙ্গুর আন্দোলনের জেরে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, ক্ষমতায় আসার পর এ তল্লাটের জন্য কিছুই করেন নি। বারবার অবহেলিত, লাঞ্ছিত হয়ে এখানকার আমজনতা। তাঁদের বক্তব্য, এখন বহু মানুষ শিল্প চান। ‘চাষ না হলে শিল্প হোক’— এমন দাবি না কি শোনা যাচ্ছে গ্রামেগঞ্জে। অন্য দিকে তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, সিঙ্গুর আন্দোলন ছিল সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার আন্দোলন। শিল্পায়নের নামে জোর করে জমি নেওয়া হলে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হতেন। সে লড়াই ন্যায্য ছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিধানসভা নির্বাচনের কয়েক মাস আগে সিঙ্গুরকে আবার রাজনৈতিক মঞ্চে এনে বিজেপি ‘মিসড ইন্ডাস্ট্রিয়াল অপারচুনিটি’-র তত্ত্বকে সামনে আনতে চাইছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সভার আগেই জমির সম্মতি নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তা সিঙ্গুরের পুরনো ক্ষতকে নতুন করে উসকে দিল কি না, সে দিকেই এখন নজর রাজ্য রাজনীতির।
❤ Support Us






